আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বেশ্যার সাথে এক যুগ

...............................................................................................................................................................। আবুল ফজল খান সংক্ষেপে এ.এফ.খান। এ এফ খান নামেই তিনি সমাদৃত। একজন বিখ্যাত লেখক। পাঠকের কাছে তিনি খুবই প্রিয়।

তিনি যা লিখেন পাঠকের কাছে তা-ই প্রিয়,অনেক সুস্বাদু সেজন্য পাঠকও চোখ বন্ধ করে তা গ্রহন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনা। পাঠক ও উম্মুখ হয়ে থাকে কখন এ এফ খানের বই বাজারে আসবে। সময় ঘনিয়ে আসছে আগামী বই মেলার। বই মেলা মানেই তো প্রকাশনীর মেলা,বইয়ের মেলা,হাজারো পাঠকের আবির্ভাব,হাজারো লেখকের আবির্ভাব। যদিও বই মেলার পুরোটা সময় জুড়ে প্রভাব বিস্তার করে থাকে এ এফ খানের মত লেখকেরা।

পাঠকও পাগলপ্রায় হয়ে ছুটে আসেন এ এফ খান দের বই কেনার জন্য। গত বই মেলায় সব চেয়ে বেশি বই বিক্রি হয়েছে এ এফ খানের। তাই এবার অনেক নতুন প্রকাশনী বসে আছে নতুন বইয়ের আশায়,তাদের লেখা দেয়ার জন্য। কারন এ এফ খানের বই বের করতে পারলে তাদের প্রকাশনীতে পাঠকের ভিড় হবে ,বিক্রি বেশি হবে। এ এফ খান তাই বেশ ব্যস্ত,সারাক্ষন লেখার মধ্যেই থাকেন।

-কি ব্যপার,তোমাকে যে খেতে ডাকছি শুনছ না? -হুম! -তাহলে আসছনা কেন? -হুম! -কী হুম হুম করছ আমার দিকে তাকাও(একটু চিৎকার করে). -ও কি বললে?হ্যাঁ বল,এবার শুনছি। -কতবার বলব? -আর একবার বললেই হবে। -খেতে ডাকছি,উঠ খাবে, -হ্যাঁ আসছি। -আসছি না,উঠো। কী লিখছো?গত কয়েকদিন ধরে দেখছি তুমি খুব উঠে পড়ে লেগেছ লেখার জন্য।

-আর বলোনা,বই মেলা যে ঘনিয়ে আসছে মনেই নেই। প্রকাশনা গুলো বারবার বলছে লেখা দেয়ার জন্য। -তারা তো অনেক আগেই বলে রেখেছে,অনেকে তো এডভান্সও করে গেল,দিয়ে দাওনা? -এডভান্স করছে তাতে কী,আমার বইয়ে কি তাদের কখনো লোকসান হয়েছে,লেখা দিতে দেরি হয়েছে? তাদের যে বলবো ‘এত তাড়াতাড়ি আসার দরকার কি?এত তাড়াতাড়ি লিখতে ভালো লাগেনা আর মনে ও থাকেনা,বইমেলাটা আরেকটু কাছে আসুক তখন না হয় আসেন,আরে আমার লিখতে কি বেশি সময় লাগে। –বলতেই পারিনা। আমি এত জনপ্রিয় একজন লেখক কিভাবে এই কথা বলি।

ব্যপার না কিছুদিন একটূ ব্যস্ত থাকতে হবে এই আর কি? খেতে বসে গল্প করছে মি এন্ড মিসেস এ এফ খান। -এই বার তোমার কয়টা বই বেরুবে? -বেশি না মাত্র বিশটা। -বিশটাকে তুমি মাত্র বলছ? -মাত্রই তো,বুঝলাম না তুমি আমার পিছনে লাগছ কেন?মার্কেটে গেলেতো কম দামে কোন জিনিস কিনোনা। এত টাকা আসে কোথেকে? -তাহলে বই আরো দুইটা বাড়াতে? -ওরাতো বলছিল,কিন্তু আমি না করে দিয়েছে আর বেশি হলে পাঠকের পকেট খালি হয়ে যাবে আর আমার ও ক্ষতি হবে। -এ পর্যন্ত কয়টা লেখা শেষ হয়েছে? -১৩-১৪ টার মত হবে।

বাকি গুলোও অচিরেই শেষ হয়ে যাবে। -এখন যেটা লিখছ তার নাম কি? -‘বেশ্যার সাথে এক যুগ’! -কি বললে? -হুম!বইটাও অসাধারন হবে,কাহিনীটাও সুন্দর,আর এখন এই ধরনের নামের বই-ই পাঠক বেশি খায়। দেখবে এই বইটা আসছে বইমেলার সর্বোচ্চ সংখ্যক কপি বিক্রির দিক থেকে প্রথম হবে। অনেক উচ্ছ্বাসা নিয়ে কথা গুলো বললেন মি এ এফ খান। -তাই নাকি?তাহলে কাহিনীটা যে আমারও শুনতে হয়।

আমাকে একটু বলনা গল্পটা,আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করছে। -নাম শুনে বুঝতে পারছনা কেমন হতে পারে? -তা তো পাচ্ছি,কিন্তু স্পষ্ট করে না বললেতো কোতুহল থামাতে পারছিনা -একজন বিখ্যাত লেখক নাম যশ খ্যাতি তার সর্বত্র জুড়ে শুধু নেই তার পরিবারে। তার বউ তাকে ভালোভাবে পাত্তা দেয়না,তাদের সম্পর্কের এক যুগ পার হওয়ার কিছুদিন পর তার বউ তাকে রেখে চলে যায় অন্য পুরুষের হাত ধরে। তার বউকেই গল্পে বেশ্যা নামে ধরা হয়েছে। তার এক যুগের সংসার জীবনে তার চলাফেরা নাকি মাঝে মাঝে বেশ্যাকেও হার মানাত……।

-কি বললে?মিসেস এ এফ খান কে মি এ এফ খান কিছুটা সমীহ করে চলে,তার ভুলে বেশি জোর গলায় কিছু বলতে পারে না মি এ এফ খান,এটা দু জনেই ভালো ভাবেই জানে। তাই মিসেস এ এফ খান একটু রেগে গেল,গল্পটা কি তাকে উদ্দে…। -আরে না গল্প,এই এমন টাই আর কি,এখনো শেষ করিনি…বাকিটা পরে শোনো এখন হাতের লেখাটা শেষ করতে হবে। -যাও যাও,তাড়াতাড়ি উঠো আমারও সহ্য হচ্ছে না,আমারও হাতে অনেক কাজ জমে আছে। মি এ এফ খান লেখায় বসে গেলেন- ‘আমার জীবনে আমি লেখার চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম আমার ময়না পাখিটিকে(বেশ্যাকে)।

কারন সেই ছিল আমার লেখার মুল উৎস। তার সুর,ডানা মেলে উড়া……ইত্যাদি আমাকে লিখতে বাধ্য করত। আমি জানিনা কেন সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল,তবে আমি সবসময় তাকে শতভাগ ভালোবাসার চেষ্টা করতাম। সর্বশেষ আমি আমার ময়না পাখির সাথে আমাদের ছোট্ট বাসাটিতে যে রাত কাটিয়েছিলাম,তা আমি কখনো ভুলতে পারবোনা। একযুগ পরও আমার ময়না পাখিটি সেদিন কী উচ্ছ্বলতা নিয়ে ডানা ঝাপটিয়ে ছিল,বারবার আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল তার উষ্ণ আদরে,সুখের সবটুকু নির্যাস আমি সেদিন পেয়েছিলাম ,দিয়েছিল আমাকে আমার আদরের ময়না পাখি।

গতকাল উড়তে শেখা পাখিটিও বোধহয় এভাবে ডানা ঝাপটাতে পারবে না,এভাবে সুর তুলতে পারবেনা,……যেমনটা পেরেছিল আমার ময়না পাখিটি। আমাকে ছেড়ে চলে যাবে বলেই হয়ত এমন রাত আমাকে উপহার দিয়েছে তার স্মৃতি হিসেবে মনে রাখার জন্য। এর আগে অনেকদিন ময়না পাখিকে এমন ডানা ঝাপটানো তো দুরের কথা নীড়ে একসাথে ঘুমোতে পারিনি। ওকে প্রায় দেখতাম অনেক রাত করে বাসা ফিরে,আমাকে নানা অজুহাতে উলটো প্রশ্নবিদ্ধ করে,কিন্তু তার চেহারায় খুশির রেখা বিরাজ করতো,আমি যদি অই রাতে সুর তুলতে চাইতাম,ডানা ঝাপটাতে বলতাম সে বলতো আমি ক্লান্ত ঘুম আসছে,কাল হবে সোনা,তুমিও ঘুমাও আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি বলে তার হাত টা আমার মাথায় রেখে একটু নাড়াছাড়া করেই সে ঘুমিয়ে পড়ত,ভিতরের জ্বলন্ত আমি চোখ মেলে ছটপট করতে থাকলেও তৃপ্ত থাকি তার ঘুমো কন্ঠে ‘সোনা’ ডাক শুনে। উত্তপ্ত আমি হিংস্রতার মত ঝাপিয়ে পড়িনা বারন উপেক্ষা করে।

আমি হয়ত হিংস্রতার রুপ দেখাতে পারতাম কিন্তু প্রকৃত সুখের মধু আহরন করতে পারতাম না কেবল উত্তপ্ত আমি ঠান্ডা হতাম কিংবা জ্বলন্ত আমি নিভে যেতাম, কিছুটা আত্নতৃপ্তি পেতাম। আর তারপর আমার ময়না পাখিটা আমার উপর ক্ষেপে যেত,পরবর্তীতে আমিও শান্তি পেতাম না। কিন্তু এখন আমার সুখের শুন্যতা আমাকে ভাষা দিবে, লিখার ভাষা। ময়না পাখির উপর অভিমান করে আমি নতুন নতুন লেখা খুজে পাব,আমার ভাষা সমৃদ্ধ হবে। …।

’ মিসেস এ এফ খান রুমের দরজা বন্ধ করে মোবাইল ফোনে কথা বলছে। মি এ এফ খানের সেদিকে খেয়াল নেই কাজ একটাই লেখা শেষ করতে হবে। তার ইচ্ছা এ মাসের মধ্যেই সকল প্রকাশনীকে সে লেখা পাঠাবে। তারপর আবার একবছরের জন্য অবসর। একবেলা গড়িয়ে গেছে কারো খবর নেই সবাই সবার কাজে ব্যস্ত।

খানিক বাদে মিসেস এ এফ খান এসে পেছনে দাড়ালেন। কোন কথা না বলে এ এফ খানের লেখা পড়তে লাগলেন। এ এফ খান পুরোপুরি টের না পেলেও বুঝতে পেরেছেন তার চারপাশের কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি থামলেন না সে দিকে কর্নপাত না করে লিখেই চললেন। - ‘……এটা ছিল সে চলে যাওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ আগের কথা।

সে জানতো যে আমি লিখায় থাকলে আমার কোন হুশ থাকেনা। হয়ত সেজন্য সে সুযোগ গুলো কাজে লাগাত। আমি আমার লিখার ঘরে লিখে যাচ্ছি,হটাৎ করে কেন যেন মাথা টা একটু ব্যথা করতে লাগল,আমি কাউকে না ডেকে নিজেই উঠে চলে আসলাম ময়না পাখিকে ডাকার জন্য্য ভাবলাম তার সাথে খানিকক্ষন থাকলে হয়ত ভালো লাগবে। উঠে রুমের দিকে না আসতেই দেখলাম পরিশ্রান্ত এক যুবক,আমি রুমে ঢুকার আগেই সে বেরিয়ে পড়ল,আমি নিজেকে একটু আড়াল করলাম,লোকটির পিছু পিছু আমার ময়না পাখি দ্রুত বেগে হেটে আসছে আর তাড়াতাড়ি ওকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করছে । ময়না পাখি দরজা বন্ধ করে রুমের দিকে আসার আগেই আমি তার দিকে মুখ করে দরজায় দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি।

প্রথম দেখায় কিছুটা চমকে উঠার মত করে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে-কি ব্যাপার তুমি?লিখা শেষ?কিছু লাগবে?নাকি এই মুহুর্তে আর লিখতে ভালো লাগছেনা?জটিল বাক্যের মত করে এক বাক্যে অনেক গুলো প্রশ্ন করতে করতে আমার সামনে এসে দাড়াল। আমার চেহারায় এখন ক্লান্তির ছাপ নেই,নেই কোন ব্যথার যন্ত্রনার ছাপ। আমি না বুঝার মত করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলাম,যদিও আমি ঘটনার কিছুই জানিনা,আমার ভেতরে অনুভুত হওয়া ঘটনা সত্য নাও হতে পারে,যদিও সত্য না হওয়ার কোন আলামত আমি খুজে পাচ্ছিনা। না এমনিতেই মাথা টা একটু ব্যথা করছে ,ভাবলাম তোমার কাছে আসলে হয়ত ভালো লাগবে-ময়না পাখির উত্তরে আমি বললাম। যদিও অই মুহুর্তটা আমাকে কখনো মনে সায় দেয় তাকে আমি ময়না বলে সম্বোদন করি।

এত আদর মাখা নামটি আমি অপব্যবহার করি। -এসো ভিতরে এসে বসো আমি ভালো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেব,তাহলে দেখবে ভালো লাগবে। তার কথামত দুজনে ভিতরে প্রবেশ করলাম। তখনো সে আমাকে বলেনি অই লোকটা সম্বন্ধে। আমিও জানতে চাইনি।

ময়না পাখির মুখে হাসি আর তৃপ্তির রেখা লেগেই আছে। তার সমস্ত দেহকে এলোমেলো লাগছে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সে বলে উঠল- ও, তোমাকে তো বলা হয়নি একটু আগে তিয়াস আসছিলো। তিয়াস নামে আমাদের দুজনের পরিচিত কেহ আছে বলে আমার মনে হয়না। স্বভাবতই নামটা শুনে আমি একটু নড়ে উঠি-তিয়াস? -ও তোমাকে তো বলা হয়নি অই যে আমার ইউনিভার্সিটির ফ্রেন্ড ইশিতা তার দেবর,ও আসছিলো।

এদিকে কি কাজে যেন এসেছিল আমাকে ফোন দিয়েছে। বললাম, এদিকে এসেছো যখন দেখা করে যাও। তুমি লিখছিলে তো তাই আর বিরক্ত করিনি,তুমি কি মনে কর সে জন্য। থাকতে বলেছি,থাকবেনা তার নাকি জরুরি কাজ আছে তাই চলে গেল। -ও আচ্ছা!আমি নিরব শ্রোতার মত শুনে গেলাম।

অই লোকটার সাথে আমাদের যোগাযোগ কম,দেখা ও হয়েছিলো বোধহয় একবার কি দুবার তাই ওর নাম কি সেটাই ভুলে গেছি। তবে তার নাম তিয়াস বলে মনে হচ্ছেনা। ময়না পাখির কথা বলার অসাধারন ভঙ্গি আর আদরও আমার ভিতরে অনুভুত হওয়া ধারনাকে পুরোপুরি তাড়াতে পারেনি। আমি তখনো আমার ধারনায় নিজেকে অটল রাখার চেষ্টায় মত্ত। তবুও ময়না পাখির কথার সাথে নিজেকে সায় দিয়ে চললাম।

……। ’ হঠাৎ করে মি এ এফ খান থেমে গেলেন। লেখা বন্ধ করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বউয়ের দিকে তাকালেন। -তুমি?মিসেস এ এফ খান মনযোগ দিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। -কি ব্যপার থামলে কেন?ভালো হচ্ছে তো।

-সেজন্যই থামলাম। এখন ক্লান্তি লাগছে,তাই বন্ধ করলাম,জোর করে লিখলে লিখা ভালো হয়না। সময় নিলে পরিপুর্নতা আসে। এতদিন পর বউয়ের মুখে নিজের লেখার প্রশংসা শুনলেন। তাই নিজেও নিজেকে একটু মেলে ধরার সুযোগ নিলেন।

এতদিন পর মি এ এফ খানের মুখে এমন দায়িত্ববান এবং পরিপক্ক লেখকের মত কথা শোনার পর মিসেস এ এফ খান নিজের ভিতরে একটু সুখের ছোয়া অনুভব করলেন। এবার নিজে বললেন- -ভালো লাগছে তুমি নিজেকে বুঝতে পেরেছ। কিন্তু সব সময় এটা মাথায় রাখলে ভালো। …..অনেক দিন পর তাদের মাঝে এমন দায়িত্ববোধ মিশ্রিত কথোপকোথোন পর মিসেসে এ এফ খান চা বানিয়ে আনলেন। বললেন-আমি তোমার এই বইটা মনযোগ দিয়ে পড়বো,আমার খুব ভালো লেগেছে।

লেখা শেষ হওয়ার পর তুমি আমাকে কপিটা দিবে। -না,কপি দেয়া যাবেনা। বই যখন বেরুবে তখন পড়ো। তাহলে মজা পাবে। এখন পড়ে ফেললে আর মজা থাকবেনা।

তাছাড়া নতুন বইয়ের যে গন্ধ,যে স্বাদ,যে ভালোলাগা তা থেকে তুমি বঞ্চিত হবে এবং তখন একটা চমকও থাকবে। –মি এ এফ খান মিসেস এ এফ খান কে উদ্দেশ্য করে তার প্রতিউত্তরে কথাগুলো বললেন। কথাগুলো শুনতে শুনতে মিসেস এ এফ খান রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন অনেকটা কর্নপাত না করার মত করে। মি এ এফ খান লিখেই চললেন- ‘……সেই রাতের সুখ ময় ক্লান্তি শেষে ভোরের দিকে পরিশ্রান্ত আমার চোখ ভেঙ্গে পড়ে ঘুমের আশায়। ময়না পাখির ও কি ঘুমে চোখ ভেঙ্গে পড়েছিল কিনা আমার সেদিকে কোন খেয়াল ছিল না।

প্রচন্ড তৃপ্ততা নিয়ে সেদিন আমি ঘুমিয়েছি। ঘুম থেকে উঠার পর তাকিয়ে দেখি বিছানায় ময়না পাখি নেই। হয়ত আশেপাশে আছে কোথাও। অপেক্ষা,খোজা খুজি আর ডাকাডাকির পর তার কোন দেখা না পেয়ে আমি ভয় পেয়ে উঠি। তার নাম্বারে ফোন দিয়ে দেখি বিছানায় বালিশের পাশে বাজছে।

তখন আমার ভেতরটা আরো হু হু করে উঠে। আমি এখনো ময়না পাখিকে না পাওয়ার বিষয়টি কাউকে জানাইনি। কিছুক্ষন পর রুমের চারপাশে আমার ভালোভাবে চোখ পড়ে এবং একের পর এক শুন্যতা চোখে পড়ে। ড্রয়ার খুলে দেখি আমার বেশ কিছু টাকা নেই। একে একে দেখতে পাই ময়না পাখির অনেক প্রিয় জিনিস নেই।

আমার আর বুঝতে দেরি হলোনা সে চলে গেছে। চোর কিংবা ডাকাত ঢুকলে কোন কিছু রেখে যেত না। একটু আগে বালিশের নিচে তার ফোনের সাথে রাখা কাগজটা তখন আমার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল,এখন মনে পড়তেই আমি বালিশ উচিয়ে দেখি সত্যই একটুকরো কাগজ…। আর তাতে ময়না পাখির নিজ হাতে ছোট অক্ষরে খুব সুন্দর করে লেখা এই মুহুর্তে আমার কাছে অসুন্দর বাক্য-‘আমাকে ক্ষমা করো!ভালো থেকো!’মুহুর্তেই গড়িয়ে পড়া অশ্রুফোটা ততক্ষনে কাগজটিকে ভিজিয়ে যেতে লাগলো। আমি হাতে করে কাগজটিকে বুকের উষ্ণ আদরে একটু চেপে ধরলাম।

বেশি ক্ষন ঠাই দিলাম না সেখানে,হাতের মুঠোয়-ই তাকে পিষেই দিলাম ইচ্ছেমতো। ময়নার অন্য মনস্কতা আমি বুঝতে পারতাম কিন্তু এমন ভয়াবহ কিছু ঘটিয়ে ফেলবে জানতাম না। সে জানত তাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি কারন আমার কাছে থাকা কালে কখনো ভুল করেও একটু দুঃখ কষ্টের তাপ তার শরীরে আমি লাগতে দেই নি। চাপা কষ্ট বুকের মাঝে আগলে রেখে নিজের জীবনকে হালের বলদের মত জোর করে টানার চেষ্টা করতে থাকি। নিজেকে স্বভাবিক করার প্রত্যয়ে মনে যাই বলেছে তাই করার চেষ্টা করে গিয়েছি অনবরত।

বেশিদিন এ ঘানি টানতে হয়নি,মাত্র পাচঁদিন। আর তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছটকু সাহেবের। পাচঁদিন যেতে না যেতেই ছটকু সাহেব নামে একজন আমার এক্স ময়না পাখির ফোন নাম্বারে কল করে। আর সে কলটা আমি রিসিভ করি এবং শহীদ মিনার বা স্মৃতিসোধের সামনে শহীদদের স্মরনে যে ভাবে এক মিনিট বা দুমিনিট নিরাবতা পালন করা হয় ঠিক সেভাবে আমিও কলটা রিসিভ করে নিরবতা পালন করার চেষ্টা করি,এবং সময়কাল কখন পর্যন্ত স্থায়ী হবে তখনো আমি জানিনা,তবে আমার এ নিরবতা কোন শহীদদের স্মরনে ছিলনা। -হ্যালো!... -আমি নিশ্চুপ! -শোনো,আজ অফিসে এসোনা,আজ বাসায় চলে এসো,ওরা সবাই গ্রামে বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে,বাসায় সমস্যা হবেনা।

-আমি তখনো নিশ্চুপ এবং নিরব শ্রোতার ভুমিকা পালন করি -হ্যালো! -আমি তখনো নিশ্চুপ এবং লাইনটা কেটে দিই। কারন এখন আর আমার তার কোন কথা ভালো লাগছেনা। আমার যা জানার আমি জেনে গেলাম এবং ছটকু সাহেবের ফোন কাটার সাথে সাথে আমার ভেতরে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে,ময়না পাখির জন্য কোন রুপ কষ্টের বিপরীতে একজন বেশ্যার প্রতি নিজের ভিতর থেকে বমির মত অনবরত ঘৃনা বের হতে থাকে। ঘৃনা আমার নিজের কাছেও লাগছে,একজন বেশ্যার সাথে এতগুলো বছর আমি কী করে কাটালাম?আমার নিজেকে এখন নিজের থুথু মারতে ইচ্ছে করছে। আমি ক্রমাগত হালকা অনুভব করতে থাকি।

চোখের সামনে থেকে দৃশ্যমান বেশ্যার স্মৃতি মাখা সবকিছু আমি ডাস্টবিনে ফেলতে থাকি। ফেলতে ফেলতে এখন আমি নিঃস্ব। দৃশ্যমান আর কিছুই বাকি নেই। কিন্তু অদৃশ্য কিছু এখনো মাঝে মাঝে সামনে এসে দাড়ায়। বইয়ের শেলে যখন নিজের কোন পুরোনো বইয়ের দিকে চোখ পড়ে তখনি তার অদৃশ্য স্মৃতি সামনে আসে,কেননা আমার প্রতিটি লেখা,প্রতিটি বইয়ের পেছনে তার কোন না কোন স্মৃতি জড়িত,আর সেই তো ছিল ওসব লেখার অনুপ্রেরনা।

এখন আমার সেই বইগুলোর প্রতিও ঘৃনা জন্ম নেয়া শুরু হল। আমি বেশ্যাকে আমার চারপাশের সীমানা থেকে তাড়ানোর জন্য আমার শেল থেকে সমস্ত বই এক করে বহুদুরে বুড়িগংগার জলে ভাসিয়ে দিই। বাসায় ফিরে এখন আমার আরো ভালো লাগছে,বেশ্যার কোন স্মৃতি আমার চোখে সামনে পড়ছেনা,মনেও ভাসছেনা। কিছুটা তৃপ্ততাকে সাথী করে একটু ঘুমের আশায় বিছানায় নিজেকে হেলে দিই। চোখের পাতাদের এমন বন্ধন আমাকে ঘুমোতে বাধ্য করে।

কিন্তু স্থায়ী হলনা সে বন্ধন। ঘুমের মাঝে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট দৈহিক উত্তপ্তায় আমি হিংস্র হয়ে উঠতে থাকি,খুজতে থাকি আমার পাশে শুয়ে থাকা ময়না পাখিকে,প্রতিদিনকার সে ময়না পাখিকে না পেয়ে আমি জেগে উঠি। প্রচন্ড কামনায় আমি অন্ধকারে এ পাশ ও পাশ তাকাতে থাকি,খুজতে থাকি আমার ময়না পাখিটিকে। আমি যখন বুঝতে পারি আমার কোন ময়না পাখি ছিলনা আমার ছিল একজন বেশ্যা আমি বেশ্যার সাথে এতগুলো রাত গুলো রাত কাটিয়েছি,আমি এতকাল বেশ্যাকে আদরে জড়িয়ে দিয়েছি,আবার আমার ঘৃনা জন্মাতে শুরু করে । আমার যখন নিজের দিকে চোখ পড়ে আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা আমার এ শরীরে একজন বেশ্যাকে আমি পরম আদরে জড়িয়েছি,আর তাতে সুখ পেয়েছে একজন বেশ্যা যদিও আমিও সুখ পেয়েছিলাম।

আমি যখন আমার দু হাতের শক্ত আঙ্গুল গুলোর দিকে তাকাই আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা আমি আমার শক্ত দু হাতের আঙ্গুল গুলো পরম আদরে একজন বেশ্যার স্তনে ঘুরে বেড়িয়েছে বহুবার। আর তাতে সুখ পেয়েছে একজন বেশ্যা,যদিও আমিও সুখ পেয়েছিলাম। আমি যখন কামনায় পাগলপ্রায় হয়ে উঠা আমার শক্তি,আমার সৌন্দর্য,আমার পৌরুষত্ব,আমার ……লিঙ্গের কথা ভাবি,আমি বিশ্বাস করতে পারিনা একজন বেশ্যাকে সে কামনার সর্বচ্চো সুখটুকু দিয়েছে,যদিও আমিও সুখ পেয়েছিলাম। এসব আমাকে প্রচন্ড ভাবে বিষিয়ে তোলে,আমি রাতের অন্ধকারেই বেরিয়ে পড়ি,আমার আর ইচ্ছে করছেনা বাসায় ফিরে যাই,কেননা আমার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ-ই বেশ্যার স্মৃতি বহন করছে। সব স্মৃতিকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি এখন আমাকে কী করবো,আমার শরীরও যে স্মৃতি বহন করছে।

আমি কি হাত কেটে ফেলব?ঠোট ফেলে দিব?কেননা এই ঠোট দিয়ে যে আমি বেশ্যাকে সহস্রবার পরম আদরে চুমু দিয়েছি,আমি কি আমার জননাঙ্গ কেটে ফেলব?কিন্তু তাহলে তো আমি বাচবো না। আমি কী…… নিজেকে ধ্বংস করার দুর্বলতায় আমি আবার সকল স্মৃতির খোজে বেরিয়ে পড়ি,ডাস্টবিনের গাড়ির পথ ধরে শেষ জায়গায় যাই,ডাস্টবিনের বড় স্তুপ দেখে আমি ভয় পাইনা। আমি নেমে পড়ি,যতটুকই খুজি কোথাও চোখে পড়ে না আমার ফেলে দেয়া জিনিস গুলো,আমি চলে যাই বুড়িগঙ্গায়,যেখানে আমার সমস্ত বই আমি ফেলে এসেছি,যতদুর চোখ যায় কিছুই আমার চোখে পড়ে না। আমি পাড় খুজতে থাকি হয়ত কোথাও কোন বইয়ের একপাতা ভাসতে দেখি,কিন্তু আমি জানিনা এটা আমার কিনা। আমার দু,চোখ ভিজে যায় জলে,আমি নদীতে নেমে পড়ি আমার শরীর থেকে ডাস্টবিনের ময়লা পরিষ্কার করতে থাকি,এখন আর আমার উঠতে ইচ্ছে করছেনা,মন চাচ্ছে আমি ভেসে যাই দুর বহুদুর,যেখানে আমাকে কেউ খুজে পাবেনা………… ।

’ মি.এ এফ খান সব প্রকাশক কে জানিয়ে দিয়েছেন যে,তার পান্ডুলিপি সম্পুর্ন প্রস্তুত। যেকোন সময় এসে আপনারা নিয়ে যেতে পারেন। আবার এক বছরের বিরতি,মনে কিছুটা শান্তির বারতা নিয়ে হাসি মাখা মুখে মিসেস এ এফ খান কে বললেন-শোনো,আজ আমরা বাহিরে ডিনার করবো। আজ নিজেকে কিছুটা হালকা লাগছে,বেশ ভালো লাগছে। তুমি তৈরী থেকো।

আর তাছাড়া আমাদের তো চার বছর পুর্ন হল কিছু দিন আগে তার সেলিব্রেশন ও হয়ে গেলো। বিকেলবেলা দুজনের রিকশা করে ঘুরে বেড়ানো,নিজেদের পছন্দের জায়গাগুলোতে অলস সময় কাটানো,একেবারে নবদম্পতির মত মনে গভীর আবহ নিয়ে দুজনে উপভোগ করল,বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। তারপর রাতের ডিনার শেষে পরিশ্রান্ত মনে বাসায় ফিরল। নিরাবতাকে সাথী করে দুজনের ক্লান্ত দেহ লুটায়ে দিল বিছানার কোমল পিঠে। সারাদিনের এত ক্লান্তিকে মুছে দেবার জন্য আবার দুজনে জেগে উঠল।

মি এফ খান ও নিজেকে নব উদ্যমে ফিরে পেতে প্রানপন লড়াই চালিয়ে যেতে লাগল। খুব ভালো লাগছে মি এ এফ খানের কাছে। আজ বহুদিন পর তার প্রানসখী নিজের মত জেগে উঠল। বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছেনা তার সর্বস্ব সুখ আমায় বিলিয়ে দিতে। আজ সে গর্জে উঠেছে আমার কোন ভাবেই ক্লান্ত হওয়া যাবেনা,মি এ এফ খান নিজের ভিতরে বারবার সাহস সনচয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আর সে চেষ্টায় তাকে প্রানপন সহযোগিতা করছে তার বউ মিসেস এ এফ খান। কোমল পরিতৃপ্তিতে নিজেদের সারাদিনের ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দিয়ে নতুন ক্লান্তি সাথী করে শেষ প্রহরে ঘুমিয়ে পড়ল মি.এ এফ খান। এমন প্রশান্তির ঘুম অনেকদিন দেয়া হয়নি। দু জনের আপ্রান শ্রমে সম্মিলিত সুখের স্রোতধারা যে অনেকদিন পর বয়েছে। প্রশান্তির ঘুম শেষে উঠতে না উঠতে-ই ফোন বেজে উঠল- -হ্যালো,স্যার!কোথায়?আপনি আসছেন না কেন?জ্যামে আটকা পড়োছেন নাকি?আজ না আপনার ‘বেশ্যার সাথে একযুগ’ বইয়ের মোড়ক উম্মোচন।

মনে ছিলনা মি এ এফ খানের। তারিখ নিজেই ঠিক করেছেন অথচ এখন নিজেই ভুলে বসে আছেন। গভীর ঘুম তাকে সব ভুলিয়েছে,মিসেস এ এফ খানের অবলীলায় ঢেলে দেয়া অতিরিক্ত সুখ আহরন করতে গিয়েই সব ভুলে বসেছেন। -ও হ্যাঁ,আমি আসছি। একটু কাজে আটকা পড়েছি,কোন ভাবে ম্যানেজ করো সময় একটু বাড়িয়ে দাও আমি আসছি।

তার সাথে তার প্রানসঙ্গীও অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা। নিজে তাড়াহুড়ো করে তৈরী হতে হতে মিসেস এ এফ খানকে ডেকে চললেন। অনবরত ডেকেই যাচ্ছেন অথচ কোন সাড়া মিলছেনা। সাড়া না পেয়ে মি এ এফ খান খুজতে শুরু করলেন। কিন্তু বাসার কোথাও তাকে খুজে পেলেন না।

মিসেস এ এফ খান কোথাও নেই। মি এ এফ খান কিছুটা উত্তেজিত আবার চিন্তিত,সবাই অপেক্ষা করছে অথচ তিনি এখন পৌছাতে পারেননি। -হ্যালো। জি, স্যার!বলেন- -আজকের অনুষ্ঠান কি কোন মতেই বন্ধ করা যায়না? -কী বলেন স্যার? -হ্যাঁ,দেখোনা একটু চেষ্টা করে দেখ না?বিশাল সমস্যা হয়ে গেছে,পরে জানতে পারবে। -ঠিক আছে স্যার,আমি দেখতেছি।

মি এ এফ খান হন্য হয়ে খুজতে লাগলেন বউকে। বউয়ের নাম্বারে ফোন দিলেন,রিং বাজছে ঘরের ভিতর তিনি শুনতে পাচ্ছেন কিন্তু স্ত্রী কে দেখছেন না। মোবাইল বালিশের পাশে বাজছে। তিনি নিশ্চিত হয়ে গেছেন তার বউ চলে গেছে,বাসার দিকে ভালোভাবে নজর দিয়ে দেখতে লাগলেন,তার বউয়ের প্রিয় জিনিস গুলো নেই। মি এ এফ খান হতবাক হয়ে গেলেন।

কোথাও যেন মিল খুজে পেলেন,সেই মিলটা আরো ভালোভাবে খুজতে গিয়ে মোবাইল ফেলে রাখা বালিশের পাশটা ভালোভাবে খুজতে গিয়ে দেখলেন একটি ছোট্ট কাগজের টুকরো,…তিনি আরো হতবাক হয়ে গেলেন। কাগছের টুকরোতে লেখা-‘আমাকে ক্ষমা করো,ভালো থেকো’। মি এফ খান চোখ বন্ধ করে আরো মিল খুজতে লাগলেন। মোঃজাহিদুল হাসান রাশেদ ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.