আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ব্ল্যাকআউট : অবদমনে কান্ত ফড়িঙজীব... রুদ্র আরিফ



পরিবেশটা আমাদের পরিচিত। বিষয়টা আমাদের প্রতিদিনকার। তবু, আমরা, প্রতিদিনের জীবনে মৌলিক যে বিষয়টাকে পাশ কাটানোই শ্রেয় ভেবে নেই, অনেকটা রোদের গল্প করতে করতে জীবনের স্যাঁতস্যাঁতেপনাকে পাশ কাটানোতেই অভ্যস্থÑ সেই লুকিয়ে রাখা বাস্তবতাকে একটানে সরিয়ে ফেলেছেন ব্ল্যাকআউটের নির্মাতা। ব্ল্যাকআউট দেখার পর, এ কারণেই, কিছুণ টাস্কি খেয়েছিলামÑ এই টাস্কি খাওয়ায় মুগ্ধতা নেই, মুগ্ধতা তো রোদের বিষয়, প্রকাশ্যে গর্ব বিলিয়ে বেড়ানোর গল্প; এই টাস্কি খাওয়া অবদমনে কান্ত আমাদের প্রতিদিনকার ব্যক্তিগত জীবনের লুকানো কাদাময় বা পচা অথচ সত্য গল্পের চিত্রায়ণ দেখে। আমরা তো এ সত্যকে পাশ কাটাতে চাই আধুনিকতা ও স্মার্টনেসের দোহাইয়ে; কিন্তু, রোদ নিভে গেলে কিংবা নিজের ঘরের ভেতর রোদকে ঢেকে দিলে দরোজায়, যে জীবন আমাদের, যে চিরায়ত সাধারণ অথচ অপ্রকাশনীয় জীবনÑ তার খোঁজ দিতে বা নিতে অভ্যস্থ নই আমরা।

ব্ল্যাকআউট আমাদের সেই অনভ্যস্থতাকে ধাক্কা দেওয়ার কাজটাই করেছে। সময়, সবুজ ডাইনি: ব্ল্যাকআউটের গল্প সাধারণ, সাদামাটা। কোনো পোশাকী রঙ নেই, রোদ নেই। দুই তরুণের চিলেকোঠার জীবনই এর গল্প। আর গল্পের ফাঁকফোঁকরে সাপের ফোঁস ফোঁস তেজ আর পিচ্ছিলতা নিয়ে চন্দ্রশালার দরজা ঠেলে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে পড়ে গ্লানিকর অথচ সবুজ অতীত এবং কল্পনার বর্ণিল পাখা।

একজন কবি। একজন পেইন্টার। একজন রোদের আলোয় স্নান করে, ভেসে যায়; তারপর ঠোঁকর খেয়ে সূর্যের, ফেরত আসে আহত ঘোড়ার তেজ নিয়ে। আরেকজনের ঘুমচোখ-মাতলামি জুড়ে অবদমনের পিষ্টতা। আসলে,ওরা দুইজন আমাদের জীবনের দুটি ফটোকপি।

আমার কিচ্ছু ভাল্লাগে না: অবদমনে কান্ত, বিপ্তি কবিকে বাইরের জগত টানে না আর। সারাদিন ঘরে শুয়ে থেকে থেকে নিজের মনটাকেও বন্দি করে ফেলতে চায় বুঝি বা সে! এই কবি, যে ছোটবেলায় লুকিয়ে বিড়ি খেতে গিয়ে মার হাতে ধরা পড়ে জনসমে নাকে খত দিয়েছিল, যে বাউলের শঙ্খধ্বনিতে দিনের শুরুটা দেখত অবাক হয়ে, টগবগে ঘোড়ার মতো দাবড়িয়ে বেড়াতো প্রিয় আজিজ মার্কেট আর কবিতার অলিগলি, অবদমনে কান্ত-বিপ্তি সে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে ভাড়াঘর ও ছাদের গণ্ডিতে। তার আড়মোড়ায়, তার স্বপ্নে, তার মাস্টারবেশন ও মদ্যপানে একঘেয়ে জীবনের প্রতি ভয়াবহ বিতৃষ্ণা। রুমমেটের বান্ধবীকে দেখে তার অবদমিত যৌনবোধ জেগে ওঠে তুমুলভাবে। ফলে, বাথরুমে ঢুকে ‘কৃত্রিম ঝর্ণা’ ছেড়ে স্নান করার আগে নির্মাতা এই কবির সঙ্গে নোংরা ডোবায় ডুব দিয়ে নাকে কাদা নিয়ে ভেসে ওঠার যে মুহূর্তকালীন দৃশ্য জুড়ে দিয়েছেন, তা তুমুল সেক্স প্রত্যাশা করে আবারো অবদমনের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

কল্পনার সবুজ জগতে ফুলে ঢাকা প্রেমিকার ঠোঁটে ডুবিয়ে দিয়ে সে খুঁজে বেড়ায় শরীরের সাড়া। আই ওয়ান্ট টু বি এ মডেল: আমাদের প্রজন্মের ভেতর, প্রতিষ্ঠিত হবার পথে, মগজকে পাশ কাটিয়ে, চিন্তাকে পাশ কাটিয়ে শরীরকে দাঁড় করিয়ে দেবার যে জনপ্রিয় প্রবণতাÑ তারই প্রতিনিধিত্ব করে আষাঢ়স্য কিশোরী মিটি। তরুণ আর্টিস্টের সাথে তার সময় কাটানো, তার ঢঙ করা, তার এক্সপ্রেশনÑ সবটাতেই হাই এম্বিসান লুকিয়ে আছে। প্রেমিক আর্টিস্টের কল্পনায় সে বার বার আসে, এলোমেলো হয়ে আসে, অগোছালো হয়ে আসে, ছিড়ে-খুঁড়ে আসে। কিন্তু প্রকৃতার্থে পেইন্টিংয়ের মডেল হতে সে আগ্রহী নয়, তার আগ্রহ বাণিজ্যিক প্রসাধনে।

‘আই ওয়ান্ট টু বি এ মডেল’Ñ ২০০৬-এ একটি প্রজন্মের একদল মেয়ের ঘুম ও জাগরণের, হাঁটা ও শুয়ে পড়ার স্বপ্নীল বিষয়। আহমদ ছফা: দ্য প্রফেট ছবিতে আর্টিস্ট ধ্র“ব এষ স্বপ্ন দেখেন এবং দর্শককে দেখান আহমদ ছফা’র ‘পুষ্প বৃ ও বিহঙ্গপুরাণ’ নিয়ে সিনেমা বানানোর। কিন্তু, আর সব নিয়ে ভাবনা না থাকলেও ধ্র“ব এষ সমস্যায় পড়েন আহমদ ছফা’র চরিত্রটি কাকে দিয়ে করাবেনÑ এই ভেবে। কে হবে ছফা ভাইÑ এ রকম জিজ্ঞাসা তিনি ছুড়ে দিলে ব্ল্যাকআউটের সাব টাইটেলে ‘অযসড়ফ ঝড়ভধ’ শব্দের বদলে দচৎড়ঢ়যবঃ’ ভেসে ওঠে। যেহেতু ব্ল্যাকআউট সারাবিশ্বের সিনেমা, ফলে ‘আহমদ ছফা’ নামটাকে বাংলাভাষার বাইরের দর্শকের না চেনারই কথা, আর না চিনলে কেন তার চরিত্রটি নিয়ে স্বপ্নগ্রস্থ নির্মাতা আর্টিস্ট দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেনÑ তা ভেবে উঠতে বেগ পেতে হতে পারে; তাই সাব টাইটেলে ‘প্রফেট’ শব্দটি দিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে চরিত্রটির গুরুত্বপ্রকাশে অদ্ভুত কৌশল নিয়েছেন নির্মাতা।

দিস ইজ ঢাকা, বাংলাদেশ; আরেকটু হলেই ভুলে গিয়েছিলাম রাফি ও মাদল । দুই বন্ধু। চিত্রকর ও কবি । ওদের ঘরের দেয়ালে সেঁটে রাখা মৃতফড়িঙগুলোর মতোই ওদের অতিমানবিক যৌনবোধ রঙিন, অথচ ওড়ার আকাশ নেই বলে চার দেয়ালে গুমোটবন্দি। তবু সব পাশ কাটিয়ে শরীর যখন কথা কয়ে ওঠে, তখন উত্তর প্রত্যাশা থাকে আরেক শরীরের।

ফলে, মাঝেমধ্যে, একই রকমের শরীর হলেও দুটো শরীর ঠিকই আহত ঘোড়ার মতো লাফিয়ে উঠতে চায়। লাফিয়ে ওঠেও। কিন্তু রাশ টেনে ধরে তাদের ভেতরে বাস করা রোজকার সমাজের অভ্যস্থ ছাপ। রাশ টেনে ধরেন টোকন ঠাকুর। ব্ল্যাকআউট-এর দুই বন্ধু ঘুমিয়ে পড়ে।

তাদের কিছু মনে থাকে না, তারাও বলে যে, তাদের কিছু মনে নেই। মনে না থাকলেও, তাদের শেষ আড়মোড়া, তাদের পরস্পরের শারীরিক স্পর্শকাতরতা যে ইঙ্গিত দেয়, ফাইনালি সিনেমা শেষে এনিমেটেড ঘোড়া তাকে বয়ে নিয়ে ঢুকে পড়ে আস্তাবলে। কী আছে তাতে? অবদমনের বিপরীত কোনো শব্দ? বোধ করি, ইঙ্গিত, ইঙ্গিত আর ইঙ্গিতে ঠাসা ব্ল্যাকআউট প্রকৃতার্থেই একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক ছবি। কিন্তু সমস্যা হলো, এইসব ইঙ্গিত বুঝতে হলে দর্শকের জানাশোনার গণ্ডিটা সাধারণ সিনেমা দেখার গণ্ডির বাইরে নিতে হবে, শিল্প-সাহিত্য ও বিশ্ব সিনেমার খোঁজখবরটা তার কাছে থাকলে ভালো হয়। তা না হলে, ছবিতে হুট করেই বয়স্ক এক লোকের ফটোগ্রাফে ফুলের মালার চিত্র দেখে কী বুঝবেন পাঠক/দর্শক, যদি কবি বিনয় মজুমদারকে তার চেনা না থাকে? যিনি জানেন বিনয়কে,যিনি বিনয়ের কবিতার অপোকাতর মর্মার্থ জানেন, তার তো এরূপ ইঙ্গিত বুঝতে সমস্যা হবার কথা নয়।

এমনি করে হিটলারের হেডকোয়ার্টার ইভা ব্রাউনের স্তন, ভ্যানগগের শস্যেেত উড়ে যাওয়া একদল কাক, পিয়েতা... ইত্যাদি হাজারো ইঙ্গিত কবিতার অর্থবহ রহস্যময়তা নিয়ে ছড়িয়ে আছে সিনেমাটায়; এই ইঙ্গিতসমগ্রই ব্ল্যাকআউটের শস্য। কারিগর: চিত্রনাট্য ও পরিচালনা : টোকন ঠাকুর অভিনয় : রাহুল আনন্দ, তানভীর হাসান, তিনা, সারা, ধ্র“ব এষ, কফিল আহমেদ, বাপ্পি আশরাফ, জাহেদউদ্দিন, আবদুল হালিম চঞ্চল, মোমিন আলী মৃধা দাদু, বিমল বাউল, বর্ষা বিভাবরী প্রমুখ। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনা : সামির আহমেদ, সঙ্গীত : অর্ণব আর্ট-টাইটেল-গ্রাফিক্স : আবদুল হালিম চঞ্চল ফটোগ্রাফি : রিচার্ড রোজারিও আস্তাবল এনিমেশন : চিন্ময় দেবর্ষি আর্ট মডেল : ফাতেমা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান : আস্তাবল লাভ ফ্যাক্টরি

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.