পাখি এক্সপ্রেস
গোলাম আযমের নেতৃত্বে নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী ও আমিনীদের ৫ সদস্যের বিশেষ দল স্বর্গের দরজার সামনে। কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও সবাই ঘামে ভিজে একাকার। মনে হচ্ছে কেউ তাদের গায়ে পানি ঢেলে দিয়েছে। জানামতে সব দোয়া মন্ত্র পড়েও কোন কাজ হচ্ছে না, স্বর্গের দরজাই খুলতেছে না। সবার চেহারায় শঙ্কার চাপ স্পষ্ট।
কে জানে আবার স্বর্গটাই হাতছাড়া হয়ে যায় কিনা। দলের সর্বকনিষ্ট আল্লামা দেলোয়ার সাঈদী হঠাৎ বলে উঠলেন, "সবাই মিলে জোরে চিচিং ফাঁক বলে চিৎকার করি, আমি দেখেছি আলীবাবা চিচিং ফাঁক বললে গুপ্তধনের দরজা খুলে যেতো; দেখি কাজ হয় কি না!" যে কথা সেই কাজ, সবাই মিলে দিল চিৎকার। তাদের চিৎকার স্বর্গের কন্ট্রোল রুম পর্যন্ত পৌঁছে যেতে না যেতেই কন্ট্রোলারের পিএস এসে দাড়ি, টুপি আর পাঞ্জাবী পরিহিত সাদা মানুষগুলোকে ভিনগ্রহের মানুষ ভেবে ভুল করে বসে। কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করে জানতে পারলো এরা বাংলাদেশের অন্ধকার জগতের ৫ নেককার বান্দা যারা জাতিকে সবসময় পিছিয়ে রাখার ভাবনায় থাকতো। কন্ট্রোলারের পিএসকে দেখে সবাই মিলে ঘিরে ধরলো।
তাদের কথা শুনে পিএস অট্টহাঁসিতে ফেটে পড়লো। তার হাসি ভালো লাগেনি আমিনী নামের সদস্যের। একটি ফতোয়া দেয়ার সুযোগ খোঁজার আগেই মুজাহিদ স্মরণ করিয়ে দিলো স্বর্গে যার যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে। নিজামী পিএসের হাসির কারণ জানতে চাইলে পিএস বলে, " আরে ব্রাদার... দুনিয়ার সবকিছু আপডেট হইলো, আর তোমরা আপডেট হইলানা! এখানে সব কিছু ডিজিটাল, দোয়া দুরুদে কাজ হইবো না। তোমাদের ফ্রিঙ্গারপ্রিন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনস্টল করা আছে, ডিজিটাল ডোর লকে আঙ্গুল বসালেই দরজা খুলে যাবে।
বহু হাঙ্গামা করে স্বর্গের ভেতর গিয়ে চোখ হলো আরো ছানাবড়ো। রুমের ভিতর ওয়াইফাই নেট কানেকশনযুক্ত হেডটপ, ফ্লাইং বেড, টেবিল, কিন্তু চেয়ার নেই। গোলাম আজম তখনো ঘাঁড় বাঁকিয়ে হুরপরী খুঁজতে ব্যস্ত। মুখখানা শুকিয়ে পোড়া রুটির মতো হয়ে গেছে। কনিষ্ঠদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, " নারে আমার কাছে ভালো ঠেকতেছে না, মওদূদী মনে হয় আমাগো লগে দালালী করছে, নইলে বেহেশতেতো এইগুলি থাকার কথা না! হুরপরী কই? আমার ফুল বাগান কই? শরাবের নহরও দেখতেছিনা? আজব কারবার! এইগুলো শুনে সাঈদী গেলো গরম হয়ে।
-"আমি কখনোই মাহফিলে জিহাদের কথা বলতে চাইতাম না, তোমরা জোর করে আমারে দিয়া কওয়াইয়া এখন ৭০টা হুরপরী হাতছাড়া করলাম"। একে একে নিজামী, মুজাহিদ আর আমিনীও গরম হয়ে গেলো। তাদের চেচামেচিতে কন্ট্রোলরের পিএস আবারো এলো। তার কাছে হুরপরী বিষয়ক নালিশ করতেই সে জানালো, " স্বর্গের কিছু লোকের ৭০টা হুরপরী থাকা সত্ত্বেও অন্যের জন্য বরাদ্ধকৃত হুরপরীদের নিয়ে টানাটানি করে। তাই তারা "ওইমেন রাইটস ফর পিস" নামক সংগঠনের ব্যানারে মানব বন্ধন করতে গেছে।
আপনাদের জন্য বরাদ্ধকৃতরাও তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেছে। কিছু আবার বিউটি পার্লার আর ফ্যাশন হাউজ খুলে বসে হুরপরীর চাকুরী ছেড়ে দিয়েছে। অধৈর্য হবেন না, দেখি কি ব্যবস্থা করা যায়।
বিউটি পার্লার আর ফ্যাশন হাউজের কথা শুনে আমিনীর তলপেটে চাপ পড়ে। দৌড়ে টয়লেটে গিয়ে দেখে সর্বনাশ, কমোডের এ কি দশা, হাতলওয়ালা একটি ঝুড়ির মতো কি যেন ছাদের ওপর থেকে ঝুলে আছে, ওখানেই বুঝি কাজ সারতে হবে? কিন্তু ওটাতো খানিকটা ওপরে, তবে কি করা? জোর করে কোন মনে জায়গামতো এনে কাজ সারলো।
কিন্তু আবারো বিপত্তি, ঢিলাকুলুখের ঝুড়িটা খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। এবার সে কি করবে? না এখানেতো এমন হওয়ার কথা নয়। স্বর্গতো ভিন্ন জিনিস। যা হোক কোনমতে পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে এসে সবার সামনে শুকনো মুখে দাঁড়ালো। আস্তে আস্তে বলতে থাকলো, " আমি এখানে থাকবো না।
চলে যাবো। " সবাই মিলে বুঝাতে লাগলে, " আরে অপেক্ষা করো, দেখি কি হয়? নইলে মওদূদীরে খুঁজে বের করে তার অন্ডকোষের উপর ২টা ক্ষুরের আঁছড় বসাবো। তুমি অধৈর্য হইও না। "
বিকেলে দিকে সবাই ঘুরতে বেরুলো। বড়ো একটি উদ্যান পেরিয়ে গেলো বেহেশতের এ শাখার যাদুঘর দেখতে।
ভেতরে ঢুকতেই ডারউইনের মূর্তি দেখে আতকে ওঠলো আমিনী। এই এই এসব কি ???? বলে খালি চিৎকার করতে লাগলো। আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, "নাহ এটা নিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করতে হবে, বেহেশতকে কোনভাবেই মূর্তির আখড়া বানানো যাবে না। " উত্তেজিত আমিনীকে অনেক কষ্টে অপর সদস্যরা থামালো। " কিছুদূর এগুতেই সামনে অপরূপ এক সুন্দরীকে দেখতে পেলো।
জিন্স আর টিশার্ট পরা মেয়েটিকে দেখেই নিজামী বলে ওঠলেন "আলহামিদুলিল্লাহ"। পরিচয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশী শুনেই মেয়েটি যাদুঘরের বাংলাদেশ অংশের পথ দেখিয়ে দিলো। বাংলাদেশের অংশের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য দেখেই গোলাম আজম বললো, " নিশ্চয় এখানকার প্রশাসক আ লীগকে সমর্থন করে। " তার কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ মুচকি হেসে দেয়, যা তাদের অগোচরে থাকলো। একে একে বাংলাদেশের অনেক নিদর্শন দেখতে দেখতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ কানে একটি গানের সুর এসে লাগলো। " আশা পূর্ণ হলো না............. আমার মনের বাসনা......। শুনেই আমিনীর কান খাড়া হয়ে গেলো। চিৎকার করে বলে ওঠলো " দাঁড়াও সবাই, বুঝতে পারছি, এখানেও জিহাদ করতে হবে। লালনের গান বাজায় কোন শালায়! যতোসব বেশরিয়তি কাম কাইজ"।
হঠাৎ খেয়াল করলো নিজামী তাদের সাথে নেই। থাকবে কোত্থেকে? নিজামীতো ওই সুন্দরী কইন্যার পিছে গিয়ে লাগছে।
চিৎকার চেঁচামেচি করে মোড় ঘুরতেই দেখলো স্বয়ং লালন ফকিরের ভাস্কর্য তার পেছনে। রক্তে জাগলো জিহাদী আগুন। ভেঙ্গে ফেলবে, গুঁড়িয়ে ফেলবে।
পৃথিবীর মটিতে লালনের মূর্তি থাকতে দেয়নি, এখাসে কি করে থাকে। যখনি মূর্তি ভঙ্গে ফেলার জন্য লালনের ডান হাত ধরে টান মারলো তখনই লালনও তাঁর বাঁ হাত দিয়ে আমিনীর গালে বসালো চড়। অবিশ্বাস্য এ দৃশ্য দেখে সবাই মিলে পড়লো "সুবহান আল্লাহ"। লালন এবার ক্ষেপে গিয়ে আমিনীর গায়ের জামা কাপড় খুলতে শুরু করলো। আর দু'গালে খালি ছড় মারতে থাকলো।
একে একে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আব্বাস উদ্দীন, জসিম উদ্দিন, আবদুল আলীমসহ অন্যান্য রোবটিক ভাস্কর্যগুলোও এগিয়ে এলো, যারা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে পারে। বিশৃঙ্খলা টের পেয়ে বেহেশতের এলিট ফোর্স চলে আসলো। গ্রেফতার করলো সবাইকে। ফোর্সের প্রধান বললো, আমরা আগেই জানতাম বিশেষ অনুরোধে কিছু মৌলবাদী স্বর্গে আসবে, তাই স্বর্গের এ অংশকে ঢেলে সাজানো হয়েছিলো। তারই অংশ এ রোবটিক ভাস্কর্যগুলো।
গ্রেফতারের পর নিজামীদের বিচার হলো। বিচারের রায়ে তাদেরকে স্বর্গে অবাঞ্চিত ঘোষনা করা হলো এবং নরকে প্রেরণ করা হলো। সাথে তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মওদূদীকেও পাঠানো হলো।
নরকের যে অংশে তাদেরকে রাখা হলো সে অংশে পৃথিবীর যতো নাস্তিক এবং জ্ঞানীদের রাখা হয়েছে। যাতে করে নিজামীদের কষ্টের পরিমান বহুল্যাংশে বেড়ে যায়।
এখানে এসে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু দৃশ্য দেখতে থাকলো। নারী পুরুষের সহাবস্থান দেখে তাদের চোখে সর্ষের ফুল ফটলো যেন। আবার সবাই এখানে খুব ব্যস্ত। কেউ লেখালিখি করছে, কেউ গভীর ভাবনায় মশগুল আছে, কেউবা গবেষনা করছে, কেমিষ্ট আর বায়োলজিস্টরা রাসায়নিক এবং উদ্ভিজ আবিষ্কারে মশগুল। কিছু প্রগতিশীল নেতাকে দেখা গেলো হতদরিদ্রদের সাথে আলোচনারত অবস্থায়।
কি করে তাদের অভাব দূর করা যায়, এ বিষয়ে কথা কলতে। অশিক্ষিতদের লেখা পড়া শেখাচ্ছে কয়েকজন। এসব দেখে মস্তিষ্ক অনেকটা ঠান্ডা হয়ে এলো।
কিন্তু ক'দিন থাকতে না থাকতেই হাঁপিয়ে ওঠলো তারা। কারণ তাদের সাথে কেউ কথা বলে না, মোলাকাত কর না, আমিনীর জন্য তামাক নেই, সাঈদীর জন্য মাহফিলের আয়োজন নেই, গোলামের জন্য গণিমতের মাল নেই, নিজামীর জন্য কচি কচি বালকের বন্দোবস্ত নেই।
যদিও মাঝে মাঝে তসলিমার মতো মেয়েদের দেখা যায়, কিন্তু তারাও আসে না। অবশেষে তারা ঠিক করলো এখানেও থাকবে না। স্বর্গ আর নরকের মাঝামঝি গহীন অরণ্যে চলে যাবে। এখানে থাকার চাইতে ওখানে থাকাই ভালো হবে।
অনেক কষ্ট করে খুঁজে বের করলো ডারউইনকে।
সবাই মিলে পা ধরে বসে আছে। আবেদন একটাই - " যে বিবর্তনের পথ ধরে বানর মানুষ হয়েছে, সে বিবর্তনকে পেছনে সরিয়ে নিয়ে এখন আবার মানুষকে বানর বানানো যায় কিনা, তার উপায় বের করতে। স্বর্গ বা নরকে থাকার চাইতে বানর হয়ে বনে জঙ্গলে থাকাটাই শ্রেয়। "
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।