আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অফিসে যে বস্ সেই পিয়ন , সব সম্ভবের দেশ- চীন: পর্ব ৮ [বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে]

ভুল করেছি,প্রায়শ্চিত্য করবো না, তা তো হয় না মোবাইলের কাস্টমার কেয়ার অফিসে ঢুকার সময় দরজার পাশে দাঁড়ানো লোকটি আপনাকে ওয়েলকাম জানাবে। এদের বুকে রিবন লাগানো থাকে এটা দেখতে হুবহু প্রেসিডেন্টদের সাথে থাকা গার্ডের মত লাল নীল বিভিন্ন রঙের ফিতা। রাস্তায় হকারদেরও বিভিন্ন প্রমোশনাল প্যাকেজ বিক্রি করার সময় প্রেসিডেন্টদের গার্ডের মত বুকে ফিতা লাগানো থাকে, হোটেল রেস্টুরেন্টের দারোয়ানরাও বিভিন্ন রঙের ফিতা জড়িয়ে রাখে মনে হয় যেন এরা কাউকে লাল গালিচা সম্বর্ধনা দিতে প্রস্তুত, আর হাঁ অনেক অফিস এমনকি ফুট ওভার ব্রিজেও লাল গালিচা বিছানো থাকে। আপনি অফিসে ঢুকার পর আপনার কি দরকার, কোন কাজে আসছেন সেটা শুনে ঐ অনুযায়ী বলে দিবে কোন কাউন্টারে যেতে হবে কিংবা কার সাথে কথা বলতে হবে, আরও বলে দিবে একটু বসুন,অপেক্ষা করুন,ঐ লোকের পরে আপনার সিরিয়াল। কিছুক্ষণ পর আপনি ভিমরি খাবেন যখন দেখবেন দরজার পাশের দারোয়ান লোকটি বা পিয়ন হিসেবে কাজ করা লোকটি অফিসের বস্ এর চেয়ারে গিয়ে বসেছে, কাগজে সীল ছাপ্পর লাগাচ্ছে।

একজন চাইনিজ এমপ্লয়ি ঐ অফিসের A-Z সব কাজ জানে, অফিসিয়াল আওয়ারের কিছু সময় দারোয়ান বা ইনফরমার হিসেবে, কিছু সময় পিয়ন হিসেবে, কিছু সময় অফিসারের চেয়ারে বসে কাজ করবে। এদের ব্যাংকে নগদ গ্রহণ, নগদ প্রদান, একাউন্ট ওপেন বা ব্যাংক ড্রাফট্ করার জন্য আলাদা আলাদা ডেস্ক নেই; যে কোন কাউন্টারের যে কেউ আপনার যে কোন কাজ করে দিবে। আমাদের দেশে এ্যাকাউন্ট ওপেন করা মানেই তো বিশাল এক ঝামেলার কাজ যদি সাথে আবার ডেবিট কার্ড (ATM) চান, একই সাথে বেশ সময়ও লাগে। আচ্ছা ভাবুন তো চীনে কতক্ষণ লাগতে পারে! আপনার সকল অনুমানকে ভুল প্রমাণ করে পুরোপুরি অবাক করে দিবে কারন এরা ১৫ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন হিসাব খোলা, ডেবিট কার্ড এবং অনলাইন ব্যাংক একাউন্ট খুলে ইলেকট্রনিক key দিয়ে দিবে। কি ভাবছেন এদের অফিসের পিয়নরা খুব দ্রুততার সাথে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরে এই কাজগুলো সম্পাদন করে! না, আপনার ধারনা ভুল।

এদের সরকারি, বেসরকারি কোন অফিসেই পিয়ন নেই। ব্যাংকের ম্যানেজারকে পুরো অফিস আওয়ারই দৌড়ের উপর থাকতে হয়, নিম্নপদস্হ এমপ্লয়িরা চেয়ারে বসে কাজ করে আর ম্যনেজার সাহেব পেছনে সীল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যখনই যে কাউন্টার থেকে ডাক আসে তখনই সেখানে ছুটে গিয়ে সীল ছাপ্পর লাগায়। আমি অবাক হই যখন দেখি এরা কলম দিয়ে স্বাক্ষর করে না, নিজের নাম সম্বলিত চাইনিজ অক্ষর দিয়ে বানানো লাল রঙের সীল মেরে দেয়। চাইনিজরা ঐতিহ্যগতভাবে লাল রঙকে সৌভাগ্যবান মনে করে তাই এদের সকল অফিসিয়াল সীলই স্কারলেট কালারের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার ছাত্রদের যে নম্বরপত্র বা সনদ দেয় সেখানেও কলমের কালির কোন স্বাক্ষর দেয় না, শুধু সীল। দোকান থেকে কিছু কেনার পরে যে ভাউচারটা দিবে সেখানেও একই অবস্হা, শুধু সীল। নবীন প্রবীণ সবাই সানন্দে প্রযুক্তিকে আলিঙ্গন করে নিয়েছে। প্রত্যেক এমপ্লয়ি ফটোকপি, প্রিন্ট,স্ক্যান, কম্পিউটারে টাইপ রাইটিং, ইন্টারনেট ব্যবহার করে ইমেইল করা বা কাউকে কোন ফাইল পাঠানো যখন যেটা দরকার হচ্ছে সে নিজেই করছে, কখনও অন্য টেবিলে পাঠাচ্ছে না। আমি চাইনিজ এমপ্লয়িদের বলি সব জান্তা সমশের [নিজস্ব অফিসিয়াল কাজের ভিত্তিতে] শুধু সরকারি/বেসরকারী অফিসের লোকজনই নয় ছোটোখাটো দোকানীরাও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই, সামনে একটা কম্পিউটার আছেই।

মনে হতে পারে, কম্পিউটার রাখছে জাস্ট ভাব মারার জন্য এবং গান,সিনেমা দেখার জন্য। না, সেরকম মোটেও নয়: দোকানের হিসাবপত্র কম্পিউটারে সংরক্ষণ করে, QQ নামে একটা জটিল জিনিস আছে, এটা স্কাইপির মত তবে সুযোগ সুবিধা স্কাইপির তুলনায় অনেক বেশি। কাস্টমার কিংবা অন্যান্য ব্যবসায়ীদের সাথে QQ এর মাধ্যমে যোগাযোগ করে, মোবাইলে পয়সা খরচ করার প্রয়োজন হয় না। ফুটপাতের গরীব হকারদের তো আর কম্পিউটার নেই তাই বলে যে তারা পিছিয়ে আছে, তা নয়, সেও মোবাইলে QQ ব্যবহার করছে, মোবাইলের খরচ বাঁচাচ্ছে। রাস্তায় যে সিদ্ধ করা ভুট্টা/ মিষ্টি আলু বেঁচতেছে তাকেও দেখবেন মোবাইল টিপতেছে ইন্টারনেটে QQ ব্যবহার করছে।

মোবাইলের ফ্লেক্সির দোকানদারও কম্পু থেকে টপ-আপ করে দিচ্ছে। ভাবতে পারেন ওগো তো সবকিছু চাইনিজ ভাষায় কিন্তু আমাদের দেশে ইন্টারনেট ইংরেজি ভাষায় এজন্য আমরা পারি না। কিন্তু চাইনিজ অক্ষর কম্পিউটারে বা মোবাইলে সরাসরি লেখা যায় না কারন হাজার হাজার চাইনিজ অক্ষর, keyboard এ কয়টা ধরবে! এদের pinyin নামে একটা সিস্টেম আছে যেখানে বাটনে ইংরেজি অক্ষরই লিখতে হয় তারপর সেখান থেকে চাইনিজ অক্ষর ইনপুট করে। অনেকে আছে ইংরেজি pinyin সিস্টেম পারে না, তারা মোবাইলের স্ক্রীনে চাইনিজ symbol আঁকে তখন ডান পাশে ঐ আঁকানো symbol এর কাছাকাছি কিছু symbol শো করে সেখান থেকেই কাঙ্খিত অক্ষর সিলেক্ট করে। এদের হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করতে যাবেন, ঢুকতেই ক্যাশের লোকটিই কম্পিউটারের স্ক্রীনে তাকিয়ে বলে দিবে এত নাম্বার টেবিলে যান।

মনে হচ্ছে এগুলো আলিশান রেস্টুরেন্ট! না, শেরাটন হোটেল তো দূরের কথা, ঠাঁটারী বাজারের স্টার হোটেলের মতৌ অত বড় না, চানখাঁরপুলের নীরব হোটেলের মত; বড়জোর হয়ত দোতলা। ওয়েটাররা ওয়াকিটকিতে জানিয়ে দিচ্ছে ঐহিসেবে ক্যাশিয়ার লোকটা কম্পুতে ডাঁটা সাজিয়ে রাখে। এরা ইন্টারকমের চেয়ে ওয়াকিটকির ব্যবহার বেশি করে, তাই প্রত্যেকেই যে কোন পজিশনে থেকেই দ্রুত তথ্য আপডেট করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অফিস থেকে ছাত্র-শিক্ষকদের কিছু জানানোর জন্য ইমেইল বা মোবাইলে মেসেজ দেয় অথবা QQ গ্রুপের মাধ্যমে জানায়। তারা চিঠি ইস্যু করে না যেমন এই নোটিশের অনুলিপি ভিসি অফিস, ডিন অফিস, হল প্রভোষ্ট, ডি.এস.ডব্লিউ বরাবর পাঠানো হল।

QQ গ্রুপের মাধ্যমে বিনা পয়সায় জানিয়ে দিচ্ছে, কাগজের পয়সা সেভ হচ্ছে। হয়ত মনে হতে পারে আমাদের দেশে জনসংখ্যা বেশি, অল্প শিক্ষিত লোকজনের সংখ্যা অনেক তাই অফিসে পিয়নের পোষ্ট না থাকলে তো ওরা না খেয়ে মরবে! না, এটা ভুল ধারনা। দেশে অনেক রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান না থাকায় এবং মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় প্রতিদিন জানমালের ক্ষতি হচ্ছে, পেপারে দেখেছিলাম রাস্তায় একসিডেন্টের কারনে মোট জিডিপির ২% ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সরকার পিয়নদের পিছনে যে খরচ করে ঐ টাকা এবং একই লোককে রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। এতে করে অনাকাঙ্খিতভাবে কোন মার বুকও খালি হবে না, জিডিপিও বৃদ্ধি পাবে।

চাইনিজদের অফিসে পানি দেওয়া, চা বানানো কিংবা বাইরে থেকে সিঙ্গারা, সিগারেট আনার জন্য যেমন কোন পিয়ন থাকে না তেমনি কোন এমপ্লয়ির গাড়ি চালানোর জন্যও কোন ড্রাইভার থাকে না। যার যার গাড়ি তার তার নিজের তো চালাতে হয়ই এমনকি গাড়ি মোছামুছি, জানালার গ্লাস ধোঁয়া, প্রয়োজনে পানচার হওয়া চাকাও নিজেকে চেঞ্চ করতে হয়। এখন প্রশ্ন মনে জাগবে সরকারি কর্মকর্তারা যদি নিজে গাড়ি চালায় তাহলে ড্রাইভাররা তো বেকার হয়ে যাবে, এটাও ভুল ধারনা। সারাদেশে দক্ষ ড্রাইভারের অভাবে গাড়ি মালিকরা বাধ্য হয় শুধু গরু ছাগল চেনা অপরিপক্ক ছেলেদের হাতে এত দামের সাধের গাড়ির স্ট্যান্ড ছেড়ে দিতে! চাইনিজদের লোকসংখ্যা কিন্তু আমাদের প্রায় ৯ গুণ আর এদের বাপ-দাদাদের হল্যান্ডের মত তালুকও ছিল না। একটা সময় তাদের আমাদের অবস্হা একই রকম ছিল বরং ইউরোপের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমরাই এদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলাম।

৮০ এর দশকে তিং শিয়াও ফিং নামে একজন সংস্কারবাদী নেতা চীনের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে বিদেশী কোম্পানিগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের জোগান দেয়। কম মূল্যের শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি নিজেরাও ওদের কাজ শিখে নিয়ে Huawei, ZTE , Haier এরমত বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ব্র্যান্ড কোম্পানি দাঁড় করিয়েছে। এছাড়াও কম দামে মোটামুটি ভাল কোয়ালিটির অনেক কোম্পানিই দাঁড় করিয়েছে যেমন- symphony মোবাইল। আমাদের দেশেও ওয়ালটন সেদিকেই এগুচ্ছে।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।