আমরা এমন একটা পরিবেশ চাই, যেখানে শিশুরা তাদের পছন্দ-অপছন্দের ধাপগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে বড় হবে।
===ফয়সল সাইফ===
Wahhabism বা وهابية, Wahhābiyyah: এটি মূলত সুন্নি ইসলামের একটি শাখা। অবশ্য সুন্নি-ওয়াহ্যাবী নিয়েও একটি বির্তক আছে। তবে, মূলত ওয়াহ্যাবীজম হল অতি রক্ষণশীল মুসলমানদের একটি দল। যা মধ্যযুগীয় ধর্মতত্ত্ববিদ শেখ ইবনে তাইমিয়া এবং ইসলামী আইনজ্ঞ আহমদ ইবনে হাম্বল এর অধ্যয়ন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে।
তা ছাড়া এটি পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদিস অধ্যয়নের মাধ্যমে মুসলমান সমাজকে মৌলিক ইসলামী উৎসের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছে। বর্তমানে এর সাথে মৌলবাদী ইসলাম নামটি জড়িয়ে গেছে।
প্রাথমিকভাবে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাব (1703-1792) বিভিন্ন মসজিদে আগত মুসল্লিদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে মুসলমান সমাজে তাঁর সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর এই কাজে তাঁকে সাহায্য করতে স্থানীয় আমির উসমান ইবনে মুআম্মার এগিয়ে আসেন। এর ফলে মুসলমান সমাজে ব্যাপক শুদ্ধিকরণ চর্চার দ্বারা, ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাব একজন জনপ্রিয় সংস্কারক হয়ে ওঠেন।
বর্তমানে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাব এর শিক্ষার্থীরা সৌদি আরবে ইসলামের সবচেয়ে প্রভাবশালী শাখা নিয়ন্ত্রণ করছেন। ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে ওয়াহ্যাবী মতবাদ সৌদি আরবে অবিসংবাদিত প্রাধান্য অর্জন করে নিয়েছে।
সৌদি লেখক আব্দুল আজিজ কাশিমের মতে, “ওয়াহ্যাবীজমের পরিচয়বাহী হিসেবে ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাবের শিক্ষা প্রতিষ্টানে অটোমানরা ছিল। তারপর মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ আগমনের ফলে তা আরো প্রসারিত হয়। যাইহোক, আমরা এটাকে ওয়াহ্যাবী আন্দোলন না বলে, বরং শেখদের দ্বারা সালাফি আন্দোলন বলতে পছন্দ করি”।
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাব এর কর্মবৃত্তান্ত: মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাব দক্ষিণ ইরাকের বসরা নগরীতে পড়ালেখা করেন। এবং সেখানে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই তার মধ্যে বর্তমানে ওয়াহ্যাবীজম নামে পরিচিত ধারণাগুলোর সূত্রপাত হয়। তারপর 1740 সালের দিকে তিনি তাঁর জন্মশহর ওয়ায়নাতে ফিরে আসার আগে শিক্ষা প্রচারের উদ্দেশ্যে মক্কা এবং মদীনা গমন সহ হজ্ব পালন করেন। ওয়ায়নাতে ফেরার পর ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাব তাঁর শহরের শাসক ইবনে মুয়াম্মার সহ সকল অনুগামীদের আকৃষ্ট করতে শুরু করেন। সেখানে ইবনে মুয়াম্মার এর সমর্থনে তিনি তাঁর ধারণার কিছু কাজ বাস্তবায়ন করতে শুরু করেন।
যেমন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাহাবী যায়েদ ইবনে আল খাত্তাবের কবর সমতলকরণ। ব্যাভিচারিদের পাথর মেরে হত্যা ইত্যাদি। ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাবের এসব কাজ বনু খালিদের নেতা সুলায়মান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে গুরায়ের এবং আল হাসা ও খাতিফের প্রধানদের কাছে অগ্রহণযোগ্য ঠেকে। ফলে তাঁরা ওয়ায়না থেকে ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাবকে বহিষ্কার করেন।
সে সময় ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাবকে প্রতিবেশী ধিরিয়ার শাসক মুহাম্মদ ইবনে সৌদ আমন্ত্রণ জানান।
ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাব ধিরিয়ায় গেলে সেখানকার শাসকের সাথে একটা চুক্তিতে আসেন, যে মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাবের শিক্ষাদান পদ্ধতিতে সাহায্য সহযোগীতা করবেন। যার ফলে ইবনে সৌদ ও তাঁর পরিবার ওয়াহ্যাবী আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচিত থাকবেন।
18 শতকে ইবনে সৌদ থেকে শুরু করে তাঁর উত্তরাধিকারীগণ পরবর্তী 140 বছর সৌদি আরব এবং তাঁর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ অধিকারের এক পর্বতসম ক্যাম্পেইন চালিয়ে যান। এর মধ্যে তাঁদের সবচেয়ে বিখ্যাত ও বিতর্কিত আক্রমণের একটি হল 1802 সালে কারবালা আক্রমণ।
ওয়াহ্যাবী কাহিনীকার উসমান বিন আব্দুল্লাহ বিন বশির লেখেন-
ওয়াহ্যাবীরা দেয়াল ভেঙে শহরে ঢুকে এবং বাজার ও ঘরের অধিকাংশ লোকজনকে হত্যা করে।
তাঁরা আল হুসাইনের কবরের ওপর রাখা গম্বুজকে ধ্বংস করে। তারপর গম্বুজের আশপাশে যা পাওয়া যায় অস্ত্র, পোষাক, সোনা, কার্পেট এবং পবিত্র কোরআনের মূল্যবান কপি নিয়ে যায়।
1818 সালে তাঁরা অটোমান বাহিনীকে পরাজিত করে। তারপর অবশেষে ইসলামের সংস্কারে তাঁরা তাঁদের দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। অটোমান সম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে হিজাজ এবং আরব উপদ্বীপ সহ তাঁরা একটি জাতি হিসেবে সৌদি আরব প্রতিষ্টিত করেন।
যে রাষ্ট্রের সরকার পরবর্তীতে ধর্মীয় রক্ষণশীল নিয়ম জোরদার করেন।
Wahhabism বা وهابية, Wahhābiyyah-দের মূলনীতি: ওয়াহ্যাবীজম অদ্বিতীয় সৃষ্টিকর্তা এবং আল্লাহর রাজত্বে দৃঢ় বিশ্বাস করে। তাঁরা মনে করে আল্লাহই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য। কোনো শপথের বেলায় একমাত্র আল্লাহই নাম নেয়ার যোগ্য।
ওয়াহ্যাবীজমের আকিদাহ হল পবিত্র কোরআন, মৌলিক ও প্রমাণিত হাদিস গ্রন্থে যা খুবই সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে এবং প্রথম দিকের মুসলিম সম্প্রদায়ের ঊদাহরণ এবং চার সৎ পথের খলীফার (632-661) অনুসরণে চলা।
ধর্মীয় পন্ডিত ও নেতৃবৃন্দের সম্পর্কে: ইবনে আব্দুল ওয়াহ্যাব তাঁর বই কিতাব আল তাওহিদে বর্ণনা করেন, যে পবিত্র কোরআনের বাণীর এবং সহীহ হাদিসের সমর্থণ ছাড়া কোনো মুসলিম পন্ডিতদের অন্ধ আনুগত্য করা অনুচিত।
ওয়াহ্যাবীজমের বিরুদ্ধবাদীদের মত: ওয়াহ্যাবীজম ইরাকের কারবালা দখলের পর শিয়াদের পবিত্র নগরী নাজাফ এবং মুহাম্মদ (সাঃ) এর নাতি হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) এর সমাধি সমতল করে দেয়। 1804 সালে ইবনে সৌদ’রা মক্কা এবং মদিনাও দখল করেন। তারপর শিরকের উৎস চিহিৃত করে বিভিন্ন উপাসনালয়, মিনার ধ্বংস করেন। হযরত ফাতিমা (রাঃ) এর কবরের ওপর নম্বর প্লেট মুছে দেন।
1998 সালে সৌদ’রা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মাতা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের কবরকে সমতল করে কবরের ওপর গ্যাসোলিন ঢেলে তাঁদের বিরোধী মুসলিম বিশ্বে বিরক্তি ও নিন্দার উদ্রেক করেন। এ কাজের পেছনেও যাবতীয় শিরকী বন্ধ করাই ছিল তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।
সুফিবাদের বিরুদ্ধেও ওয়াহ্যাবীজমের অবস্থান স্পষ্ট। বুযুর্গানে দ্বীন ও অলী-আওলীয়াদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান থেকে বরকত লাভ প্রসঙ্গে তা প্রচন্ড দ্বিমত পোষণ করে।
বলা যায়, ইসলামের নানা মতবাদীদের মধ্যে ওয়াহ্যাবীজম বা সালাফি আন্দোলনই একমাত্র সবার সাথে ভিন্নমত পোষণ করে।
তা ছাড়া অন্য সব মতবাদই একে অন্যের প্রতি সহনশীল।
ওয়াহ্যাবীজমের সাথে দারুল উলম দেউবন্দ মাদ্রাসার সম্পর্ক: ওয়াহ্যাবীজমের আকিদা-বিশ্বাসের সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুই-একটা পার্থক্য থাকলেও, প্রায় সিংহভাগ ক্ষেত্রেই ভারতবর্ষের অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দারুল উলম দেউবন্দ মাদ্রাসা একমত। যেমন:
(ক) রাসূল (সাঃ) কে ভক্তির অতিশয্যে অতিপ্রশংসা করতে গিয়ে এমন কোনো কথা না বলা, যা পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদিসের বিরুদ্ধে যায়। বা তাতে পবিত্র কোরআন বা সহীহ হাদিসের সমর্থন নেই।
(খ) নবী (সাঃ) কে গায়েবী সালাম, আস্সালাতু আস্সালামু আলাইকা বলা কে শিরক ও হারাম।
(গ) নবী (সাঃ) গায়েব জানেন না।
(ঘ) ঈদ’ই মীলাদুন্নবী পালনের কোনো ভিত্তি নেই। বরং তা বিদআত।
(ঙ) জশনে জুলুস ঠিক নয়।
(চ) নবী (সাঃ) হাযের-নাযের নন।
(ছ) বুযুর্গানে দ্বীন ও অলী-আওলীয়াদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান থেকে কোনো বরকত লাভ করা যায় না।
(জ) তাবীজ-কবজ প্রসঙ্গে নেতিবাচক মত পোষণ করে।
(ঝ) নবী (সাঃ) মানুষ ছিলেন বলে দাবী করে।
(ঞ) এগার শরীফকে বিদআত বলে রায় দেয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে, দারুল উলম দেউবন্দ চার মাযহাব মানার ক্ষেত্রে ওয়াহ্যাবীজমের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে। ওয়াহ্যাবীজম বলে- যে ব্যক্তি চার মাযহাবের ইমামগণের কথাকে বিনা দলীলে গ্রহণ করে, সে পবিত্র কোরআন এবং সহীহ হাদীস’এর ওপর নির্ভর করল না। এক্ষেত্রে ডঃ জাকির নায়েক ধারাটি আবার ওয়াহ্যাবীজমের সাথে একমত। সত্যি বলতে ডঃ জাকির নায়েক’কে বলা যায়, ওয়াহ্যাবীজমের একনিষ্ট ভক্ত। আর দারুল উলম দেউবন্দও সেক্ষেত্রে খুব একটা পিছিয়ে নেই।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।