লিখতে ভাল লাগে, লিখে আনন্দ পাই, তাই লিখি। নতুন কিছু তৈরির আনন্দ পাই। কল্পনার আনন্দ। বিখ্যাত লেখকের সাথে কিছুক্ষণ
মোহাম্মদ ইসহাক খান
আমি খুশিমনে লেখকের বাড়ির সামনে এসে হাজির হলাম। তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি সবার নেই, কাজেই আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়।
আমি সেসব ঝামেলার স্তর পার করে এসেছি বলেই কেউ আমাকে গেটে আটকাল না।
আমি কলিংবেল চাপলাম। আহা, কি মধুর শব্দ। একজন লেখকের বাড়িতে তো এমনটাই হবে। তিনি নিশ্চয়ই অত্যন্ত বেরসিক এবং পিলে চমকানো শব্দের কোন কলিংবেল লাগাবেন না।
লুঙ্গি পরা একজন লোক দরজা খুলে দিলো। কারে চান?
বেশভূষায় বোঝা যাচ্ছে যে সে এই বাড়িতে কাজ করে। আমি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে গলার স্বর যতটা মোলায়েম করা সম্ভব, তার চেয়েও বেশি মিহি করে বললাম, জি, আমি স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছি। কথাটা ঠোঁট থেকে কোমলভাবে ছেড়ে দিলাম, যেন লেখকের বাড়ির কাজের লোক নয়, লেখক নিজেই আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করেছেন, কারে চান?
অ্যাপয়েন্টমেন্ট কইরা আইছেন?
আমি পুলকিত হলাম। কি শুদ্ধ উচ্চারণে ইংরেজি শব্দটি বলেছে লোকটি।
কার বাড়িতে কাজ করে, দেখতে হবে তো। কাজীর বাড়ির বাঁদিও দু-তিন কলম লিখতে পারে।
আমি বললাম, জি। এখন দেখা করতে আসতে বলেছেন। উনি কি ব্যস্ত আছেন? না হয় পরে আসবো।
না, ভিতরে আসেন।
লোকটি দরজা ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ায়। আমি ঢুকে গেলাম।
বসেন, আমি স্যাররে ডাইকা আনি। বলে লোকটা ভেতরে চলে গেল।
আমি দুরুদুরু বুকে বসে রইলাম। এক্ষুনি একজন মহাপুরুষের সাথে দেখা হবে আমার। এই দেশের একজন মহান লেখক, যাঁকে সবাই এক নামে চেনে। আমি মনে মনে ঝালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলাম, কীভাবে কথা বলতে হবে। কোন বেয়াদবী যেন না হয়ে যায়।
অশুদ্ধ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা চলবে না। শান্তিনিকেতনী বাংলায় কথা বলতে হবে উনার সাথে, নইলে হয়তো রেগে যেতে পারেন। সম্ভব হলে "গেলুম", "খেলুম" জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতে হবে। উনার সাথে কি "গেছি", "খাইছি" জাতীয় কথা মানায়?
ওপাশের ঘরে বিকট শব্দে কাশি এবং কফ ফেলার শব্দ পাওয়া গেল। কে এই অপদার্থ? একজন লেখকের বাড়িতে বাস করছে, অথচ কোন এটিকেট শিখলো না।
আফসোস!
পর্দাটা ফাঁক করে একজন ঢুকল। আধবুড়ো একজন মানুষ। আরে, লেখক সাহেব আসছেন না কেন? এই বুড়োর সাথে কথা বলতে তো আমি আসিনি। মহামতি লেখক আমার সাথে দেখা করার সদয় আজ্ঞা প্রদান করেছেন, আমি ধন্য হয়েছি। তাই বলে নিজে না এসে অন্য লোককে পাঠাবেন, এটা কেমন কথা?
লোকটা কোন ভদ্রতার ধার না ধেরে সোফায় এসে বসে পড়লো।
তারপর লুঙ্গিটা হাঁটুর কাছ পর্যন্ত তুলে ঘসঘস শব্দে লোমশ পা চুলকোতে লাগলো। ছ্যা ছ্যা ছ্যা, আমি যে এখানে বসে আছি সেটা পর্যন্ত খেয়াল করছে না।
গামছা ঝুলানো ছিল কাঁধে, লোকটা নোংরা গামছায় সশব্দে নাক ঝাড়ল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী ব্যাপার?
আমি তাজ্জব। কোন ভদ্রলোক একজন অপরিচিত লোকের সাথে "কী ব্যাপার" বলে কথা শুরু করেন না।
অথচ এই ব্যাটা কেমন তাচ্ছিল্যের সাথে আমার সঙ্গে কথা বলছে। আমার ইচ্ছে হল কষে একটা চড় লাগাতে। তবুও ভদ্রতা বজায় রেখে যথাসম্ভব কোমল স্বরে বললাম, আমি স্যারের সাথে একটু দেখা করতে এসেছি। দয়া করে যদি উনাকে পাঠিয়ে দেন ... ...
লোকটা বলল, আমিই স্যার। কী বলবে বল।
তুমি করে বলছি, তুমি আমার ছেলের বয়সী। কিছু মনে কোরো না।
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এই লুঙ্গি আর স্যান্ডোগেঞ্জি পরা, কাঁধে নোংরা গামছা ঝোলানো অতি সাধারণ চেহারার বুড়ো লোকটাই মহামতি লেখক? কি আশ্চর্য ব্যাপার! আমি ভেবেছিলাম, যাঁকে দেখবো, তাঁর গায়ে থাকবে অতি পরিপাটি করে ইস্ত্রি করা পায়জামা আর পাঞ্জাবী, কাঁধে ঝোলানো থাকবে ঘিয়ে রঙয়ের কাশ্মীরি শাল। চোখে থাকবে ভারী কিন্তু অতি সুন্দর ফ্রেমের একটি চশমা।
দশ হাত দূর থেকে তাঁর শরীরের প্রগাঢ় জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার গন্ধ পাওয়া যাবে। চোখে থাকবে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ঝিলিক।
কিন্তু এই পাকা লোমে ভরা পা-ওয়ালা লোকটা বলছে, "আমিই স্যার। " ঐ তো লোকটার স্যান্ডোগেঞ্জিতে দু'দুটো ফুটো দেখা যাচ্ছে, ঐ তো লোকটার চোখে পিচুটি জমে আছে, ঐ তো বিশ্রীভাবে কাঁধ থেকে ঝুলে আছে গামছাটা, ঐ তো লোকটার নাকের ওপর একটা মাছি এসে বসলো।
আমি মুখ খোলার আগেই তিনি বলে উঠলেন, বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই তো? কিন্তু কী করবো বল? রাস্তায় বেরুনোর উপায় নেই, লোকজন ছেঁকে ধরে।
কাজেই ঘরে বসে যতটা পারি ক্যাজুয়াল হয়ে চলি, লুঙ্গি পরি, গামছা ঝুলাই। ঘরে তো আর পাঞ্জাবী-পায়জামা পরে বসে থাকা যায় না, হা হা হা।
হাসলে লোকটার আলজিব পর্যন্ত দেখা যায়। হলুদ ময়লা দাঁত, কালো রঙয়ের মাড়ি। অথচ এই লোকটিই আমার স্বপ্নের লেখক? অতি শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি? কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?
আমি বিনয়ের সাথে বললাম, স্যার, আমি তো ভেবেছিলাম ... ...
তিনি আবারো মুখ থেকে কথা কেড়ে নিলেন, ভেবেছিলে, আমি না জানি কত স্মার্ট, আমার গা থেকে জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার গন্ধ আসবে, তাই তো?
আমার সন্দেহ ধীরে ধীরে কেটে যায়।
নিশ্চয়ই তিনিই লেখক সাহেবই হবেন, নইলে আমার মনের কথা ঠিক ঠিক পড়ে ফেলছেন কী করে?
লেখক আবার বললেন, তোমরা ভাবো, আমরা লেখক, আমরা অন্য জগতের প্রাণী। মোটেই তা নয়। আমরা তোমাদের মতোই খাই, তোমাদের মতোই ঘুমাই, রিচ ফুড খেলে আমাদেরও পেট নেমে যায়। রাস্তায় আমরাও থু থু ফেলি। আমার বউ আমাকে দু'বেলা নিয়ম করে বকাঝকা করে, একজন অতি সাধারণ মানুষের বউয়ের মতো, বুঝলে? তোমাদের মতোই সুখ-দুঃখ আমাদেরও আছে।
ভদ্রলোক কথা বলতে ভালোবাসেন, বোঝাই যাচ্ছে। হয়তো তাঁর সাথে কেউ কখনো সহজ গলায় কথা বলে না, তাই একাই কথা বলে যাচ্ছেন। লেখকের হাসিটি কুৎসিত হলেও খাঁটি দিলখোলা হাসি, দেখলেই বোঝা যায়।
আমার অনুমান যে সঠিক, তা বোঝা গেল উনার কথাতেই, তিনি বললেন, লেখক হিসেবে খ্যাতি ছড়াবার পর থেকে আমার স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে গেছে। প্রকাশকেরা আসে নতুন গল্পের জন্য তাগাদা করতে, আর ভক্তেরা আসে "পাম" দেয়া কথা বলতে, গদগদ অবস্থা, পারলে পায়ে পড়ে যায়।
আমি একজন সাধারণ লেখক, আমারই এই অবস্থা, ঘরে বন্দী জীবন কাটাচ্ছি, উৎপাত এড়াতে। তাহলে ভেবে দেখো, শো-বিজ জগতের সেলিব্রিটিদের কী অবস্থা? মাঝে মাঝে মনে হয়, সব ছেড়েছুড়ে দিই। কিন্তু খ্যাতি জিনিসটা এতই নেশার মতো, একবার পেলে আর সেটা ছাড়া যায় না, সেটাই তোমাকে কন্ট্রোল করা শুরু করে। সবাই ভাবে আমরা কত সুখে থাকি, অথচ একটা স্বাভাবিক জীবনের যে আনন্দ, সেটার সাথে কি এসবের তুলনা হয়? যখন সভা-সেমিনারে অথবা বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে যাই, তখন আমাদের চেহারার ওপর একটা মুখোশ থাকে, বুঝলে? এই হলাম আসল আমি। সেসব পালিশ দেখে যারা ভুলে যায়, তারা বোকা ছাড়া আর কিছু নয়।
একটু দম নিয়ে তিনি বললেন, অনেক আসে আমাকে চোখের দেখা দেখতে। একজন তো শুধু আমাকে ছুঁয়ে দেখতে এসেছিলো। তা তুমিও কি ঐ দলের, নাকি একটু গল্পসল্প করবে? একটু সুখদুঃখের আলাপ?
আমি এক মুহূর্ত ভেবে সিদ্ধান্ত নিই। গল্প করবো স্যার।
গুড।
লেখক সাহেবের দু'চোখ চকচক করে ওঠে।
লেখক সাহেব কথা বলতে শুরু করেন। অতি তুচ্ছ বিষয়ে তুচ্ছ কথা। রাজনীতি, দেশের দূরবস্থা, বাজারে জিনিসপত্রের উঠতি দাম, এসব নিয়ে কথা। মনে হয় তাঁর সাথে এই প্রথম কেউ গল্প করতে এলো।
আমি অবাক হয়ে চেয়ে থাকি, তিনি কত জমানো কথা আনন্দের সাথে বলে ফেলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে একটানা কথা বলে হাঁপিয়ে উঠছেন, হাসির ঘটনা এলে ঘর কাঁপিয়ে হাসছেন। অনেক মানুষের মুখ হাসে কিন্তু চোখ হাসে না। লেখকের সারা শরীর একসাথে হাসছে। অতি আনন্দময় দৃশ্য।
অনেকক্ষণ ধরে গল্প করলাম আমরা।
লেখক সাহেব বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে গুরুগম্ভীর মত ব্যক্ত করলেন, কারা ভালো খেলে, কাদেরকে শরীরের একটি বিশেষ স্থানে লাথি মেরে দল থেকে বের করে দেয়া উচিৎ, সেটাও বললেন। রাজনৈতিক নেতাদেরকে অত্যন্ত কটু ভাষায় গালিগালাজ করলেন, চায়ের স্টলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরা যেমন করে থাকেন।
একসময় চা-নাস্তা এলো, তিনি পিরিচে ঢেলে চা ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে সুরুত করে সশব্দে চুমুক দিয়ে খেলেন।
আমি একসময় উঠে পড়ার কথা বলতেই তিনি বললেন, যাবে? যাও তাহলে। তোমার সাথে কথা বলে ভাল লাগলো।
কতদিন কারো সাথে মন খুলে কথা বলতে পারি না। পেটে অনেক কথা জমে ছিল, আজ কথা বলে পেট খালি করলাম, হা হা হা।
আমি বিদায় নিয়ে চলে আসি। কোন অটোগ্রাফ নেয়া হয় নি, তাঁর নতুন লেখা উপন্যাস নিয়ে আলোচনা- সমালোচনা হয় নি। শুধু সস্তা গল্প হয়েছে।
এমন একজন বিখ্যাত লেখকের সাথে সাহিত্য নিয়ে কোন আলোচনা না করেই বেরিয়ে আসছি, ভাবা যায়?
বেরিয়ে আসার সময় লক্ষ করলাম, তিনি আবার ঘসঘস শব্দ করে পা চুলকোচ্ছেন। গামছায় আবার নাক মুছলেন। বললেন, কিছু মনে কোরো না। একটু ঠাণ্ডা লেগেছে।
আমি চলে আসি।
রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। ভাবছি, লেখকও তো মানুষ। তিনিও আমাদের মতো আটপৌরে জীবন যাপন করেন। তাঁরও কত সীমাবদ্ধতা আছে। তিনি তো নিজের মুখেই বললেন, তিনি অন্য জগতের কেউ নন।
এই পৃথিবীরই রক্তমাংসের মানুষ। তাঁর সাথে শান্তিনিকেতনী বাংলা ভাষায় কথা বলা হয় নি, তিনি আঞ্চলিকতাদুষ্ট ভাষাতেই কথা বলেছেন, সেই যে, "খাইছি", "গেছি" টাইপ।
আসলে সব মানুষই বোধহয় এক। সবাই অতি সাধারণ মানুষ। তাঁদের মধ্যেই কেউ কেউ, কখনো কখনো অসাধারণ হয়ে ওঠেন।
(৮ ডিসেম্বর, ২০১২)
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।