আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বিলেত: পাখির চোখে দেখা-চার

মার্চ ৮, '১৩ইং লন্ডনে আসার পর মাত্র অল্প কয়েকদিন পার হয়েছে। ক্লাস শুরুর আগের কয়েকটা দিন নানা ঝামেলার মধ্যে দিয়ে গেছে। নানা ফরম ফিলআপ ও রেজিস্ট্রেশনার চক্কর । এখানে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ইউটিলিটি বিল কপি, এন আই নম্বর ইত্যাদি ছাড়া কোন কাজেই আগানো মুশকিল। যেমন ধরা যাক, জিপির অর্থাৎ সাধারন চিকেৎ সকের ব্যাপারটা।

ওটার জন্য নাম নিবন্ধন করাতে গিয়ে শুনলাম উপরের যেকোন একটা লাগবে। ব্যাংকে একটা একাউন্ট থাকা এখানে আবশ্যিক । ওটা আমাদের মত বহিরাগতদের জন্য প্রথমবার করা বেশ কঠিন একটা ব্যাপার। আমার ইন্সটিটিউট থেকে নেয়া লেটার , পাসপোর্ট এসব দেখানোর পরেও চায় ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ইউটিলিটি বিলের কপি। আজব ব্যাপার!যে দুই দিন আগে এই দেশে এসেছে সে এসব কোথায় পাবে? গিয়েছিলাম আমার চাচার সাথে।

উনার এখানে দশ বছরের বেশী হয়ে গিয়েছে, এখন স্থায়ী হবার জন্য কাগজ জমা দিয়েছেন। ওনার কাছেই শুনলাম, অতীতে নানা ব্যাংক প্রতারণার কারণেই এখন এসব সতর্কতা। শুধু এই ব্যাপারেই তো ন্য, অভিবাসী এক শ্রেনীর নানা অনিয়ম, সুবিধার অপব্যবহার এসব কারণে আগের যে কোন সময় থেকে এখন সব অভিবাসীসহ বহিরাগতদের জীবন এখানে অনেক কঠিন। গোটা দুই ব্যাংকে বিফল হবার পর অবশেষে দানে দানে তিনে কাজ হলো। অবশেষে অ্যাকাউন্ট খুলতে সক্ষম হলাম।

আমার চাচা গজ গজ করতে লাগলেন, 'যেসব লোকগুলি খারাপ কিছু করে সেগুলোকে মহা আদরে কাজ করে দেয়, আর হ্যারাসমেন্ট হয় শুধু জেনুইন লোকজনেরই। ' এখানে আসার পর আমি যে বাড়িতে উঠেছি, তাতে আমার নিজের একটা রুম,ম্যাচ বক্সের মত- রুমটার নামও শুনলাম বক্সরুম। বাকি আরও দুটা রুম, ওগুলোতে যথাক্রমে এক পাকিস্তানি ও চাচার ফ্যামিলির বাস। কমন স্পেস কিচেন, ছাদ ও বাথরুম। পাকিস্তানি পরিবারটা নেহায়েত মন্দ নয়, ভালোই, তবে শুরুতে ওদের সাথে থাকতে হবে একই ছাদের নিচে, শুনে -অস্বীকার করবো না মনটা বেশ খচখচ করছিল।

যতই মনকে উদার করতে চেষ্টা করি না কেন যে এরা সেই নৃশংশ গণহত্যা সংঘটিত করে নি, করেছে এদের পিতা বা পিতামহের প্রজন্ম, যা সম্পর্কে ওদের সাধারন জনতাকে রাখা হয়েছে অজ্ঞ এবং এখন যখন ওদের নতুন প্রজন্ম ধিরে ধীরে সব জানছে, তখন সংখ্যায় এখনও অল্প হলেও ক্ষমার প্রার্থনার দাবি তুলছে ওদের নেতৃত্বের কাছে এবং একের অপরাধে অন্যকে দায়ী করাটা অনুচিৎ............. ..তারপরও সেই ওদের সাথে একসাথে থাকাটা আমার খুব প্রীতিকর মনে হয় নি -চিরায়ত বাঙালি সংস্কারের বশে। তাছাড়া বাসাটাও অতিজঘন্য, ভাড়াও সে তুলনায় বেশী । কিন্ত আমি হালচাল না জানা পরদেশে নতুন, তায় আবার এখানে এখন থাকার মত বাড়িরও দারুন ক্রাইসিস, সুতরাং ওখানেই থাকতে বাধ্য হলাম। লন্ডনে আসার পর মানুষ আর মূলত তাদের পোষা কুকুর ছাড়া আর যে প্রাণীটির আধিক্য চোখে পড়েছে তা হচ্ছে কবুতর। এদেশের ঘোলাটে আকাশের সাথে মিলিয়ে তাদের রং নানা শেডের ধূসর বর্ণের, দল বেঁধে ওড়ার সময় যেন আকাশের বুকে মিশে যায়।

আমাদের বাড়ির সামনে ও ছাদের আশেপাশে দল বেঁধে জটলা পাকায় সারা দিনমান। বাড়ির সামনে নোংরা একসারি গ্যারেজ, তাতে রাত না নামা পর্যন্ত খাটে নানা দেশী কর্মীরা। এদেশের নির্মম কঠোর জীবনযাত্রা। প্রতিটি পয়সা সমান কড়ায় গন্ডায় আদায় করে নেয়া শ্রমের বিনিময়ে আসে। তার মাঝে মাঝে মমতার ফুল ফুটে, কোন কিছুই সম্ভবত মানুষকে পুরোপুরি যান্ত্রিক করে তুলতে পারে না, কিছু পরিমাণে মানবিকতা কোমলতা রয়েই যায়।

এই কর্মঠ মানুষগুলো নিয়ম করে প্রতিদিন বেওয়ারিশ কবুতরগুলোকে খাবার দেয়। এক রবিবারের কথা। সামনের খোলা ছোট্ট ছাদটাতে আমি চায়ের মগ নিয়ে অ্যাকাউন্টিং এর জটিল ডেবিট ক্রেডিটের হিসাব মিলানোয় ব্যস্ত। এমন সময় পাকিস্তানি মা-টি এসে তার ছোট্ট মেয়েটিকে একবাটি পাউরুটি দিয়ে বসিয়ে দিয়ে গেল ওখানে। ভারি মিষ্টি মেয়ে জারা, একমনে পাউরুটি ছেড়ায় ব্যস্ত।

ওর হাতের দিকে তাকিয়ে আমি কিন্তু চমকে উঠলাম, পাউরুটির ফাঁকে ফাঁকে ফান্গাস পড়েছে, এই জিনিস জারার পেটে গেলে ও নির্ঘাত মারা পড়বে। ওর মা কি এটা খেয়াল করেনি নাকি! জারার মাকে জিজ্ঞেস করতেই মৃদু হেসে জানালো, এই পাউরুটির ফান্গাস সে খেয়াল অবশ্যই করেছে, তবে কিনা এটা জারার জন্যে নয়- কবুতরের খাওয়ার জন্য জারা এসব টুকরো করছে। গ্যারেজের লোকরা প্রতিদিন দিলেও সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারে কেউ আসে না, সুতরাং ঐদিন কবুতরগুলোকে খাবার দেয়ার ও কেউ থাকে না, তাই জারা ওদেরকে খাওয়াবার জন্য এসব পাউরুটি টুকরো করছে। কিছুক্ষণের মাঝেই এগুলো ছড়িয়ে পড়বে অভুক্ত পাখিগুলোর মাঝে। জারা একমনে টুকরো করার কাজে ব্যস্ত, বেশিক্ষণ ওর আকাশচারি বন্ধুদের যেন অপেক্ষায় থাকতে না হয় ।

আমি আবার আমার পড়ায় মন দিলাম। ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.