আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণার কথা-২

কাজই খালি জানতে চাওয়া.তাই অনেকে বিরক্ত হয় এই সিরিজের অন্যান্য পোষ্টগুল (১ , ৩ , ৪ ) পূর্বের পোস্টে বোসন আর ফার্মিয়ান কণার কথা বলেছিলাম আজ ফার্মিয়ান কণাদের দিয়েই শুরু করি । এই কণা গুলোকে বলা হয় ‘বস্তু কণা’ অর্থাৎ আমরা আমাদের চারপাশে যাই দেখি সবই এই ফার্মিয়ান কণা দিয়ে গঠিত (তবে ফার্মিয়ান কণার মধ্যে যে বল আছে তা কিন্তু বোসন কণার জন্য সৃষ্টি) , এরা অড হাফ ইন্টিজার ১/২ স্পিনযুক্ত কণা অর্থাৎ ১/২ ,৩/২ ,৫/২ ... ইত্যাদি । এই কণাগুলো পদার্থবিদ ওলফ্ গ্যাংগ পাউলির বর্জন নীতি (পরমাণুর দু’টি বা তার বেশি সমতুল্য ইলেক্ট্রন থাকতে পারে না যার কোয়ান্টাম সংখ্যা গুলোর মান একই ) মেনে চলে । এই নীতি অনুযায়ী দুইটি অনুরুপ কণা একই অবস্থায় (state) থাকতে পারে না । অর্থাৎ অনিশ্চয়তার নীতির সীমার মধ্যে তাদের একই অবস্থান এবং একই বেগ থাকা সম্ভব নয় ।

এই নীতিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ব্যাখ্যা করে , কেন বল কণার (বোসন কণাদের বল কণা বলা হয় ) প্রভাব বস্তু কণা গুলি কোন একটি উচ্চ ঘনত্ব বিশিষ্ট অবস্থায় বিরাজ করে না । অর্থাৎ যদি দুইটি বস্তু কণার অবস্থান প্রায় একই হয় , তবে তাদের বেগ অবশ্যই ভিন্ন হবে । আর এই কারনেই কণাগুলো একই অবস্থানে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না । যদি এই বর্জন নীতি ছাড়াই বিশ্ব গঠিত হতো , তাহলে কোয়ার্ক গুলো ভিন্ন ভিন্ন সুনির্দিষ্ট প্রোটন আর নিউট্রন গঠন করতো না অথবা প্রোটন আর নিউট্রন , ইলেক্ট্রন এর সাথে মিলে সুনির্দিষ্ট পরমাণু গঠন করতো না । উপরে কোয়ার্কের কথা বলা হয়েছে যারা না জানে তারা আবার বলবে এই কোয়ার্ক মশাই আবার কে? যে কিনা আবার প্রোটন আর নিউট্রন কে গঠন করে , আসলে কোয়ার্ক হচ্ছে ফার্মিয়ান কণার একটি গ্রুপের নাম ।

গ্রুপ না বলে বলা উচিত ফার্মিয়ান কণাদের দুইটি পরিবারের একটি পরিবার । ফার্মিয়ান কণাদের পরিবার দুইটি হচ্ছে- ক) কোয়ার্ক এবং খ) লেপ্টোন চিত্র: ফার্মিয়ান কণাদের পরিবার । কোয়ার্ক হলো এক প্রকার মৌলিক কণা। এরা হ্যাড্রনদের গঠন উপাদান। মারে গেলমেন এদের নাম দেন কোয়ার্ক।

নামটি জেমস জয়েস এর ফিনেগান্স ওয়েক এর একটি হেঁয়ালিপূর্ণ উক্তি: "থ্রি কোয়ার্ক্স ফর মিউস্টার মার্ক!" থেকে নেয়া হয়েছে। চিত্র:কোয়ার্ক এর ছয়টি ফ্লেভার কোয়ার্ক এর ছয়টি ফ্লেভার বা ধরণ আছে: আপ, ডাউন, চার্ম, স্ট্রেঞ্জ, টপ ও বটম । এই ছয়টি ফ্লেভার আবার তিনটি প্রজন্ম (Generation) গঠন করে । এই প্রতিটি ফ্লেভারের আছে তিনটি করে বর্ণ চার্জ: লাল, সবুজ ও নীল এবং এই প্রত্যেকটি কোয়ার্কের একটি করে আবার প্রতিকোয়ার্ক আছে (আরো ছয়টি প্রতিকোয়ার্ক আছে ) । এই প্রতিকোয়ার্কের প্রতিটি চিহ্ন হবে বিপরীত ।

তাই আমরা বলতে পারি কোয়ার্ক হচ্ছে মোট ৩৬টি । কোয়ার্কের চার্জ ভগ্নাংশ (প্রোটন বা ইলেকট্রনের তুলনায়) পরিমাণ হয়ে থাকে। নিম্নের চিত্রে একেকটি ফ্লেভারের যে তিনটি ভিন্ন কোয়ার্ক ও তিনটি ভিন্ন প্রতিকোয়ার্ক হয় তা ‘আপ ফ্লেভারের’ উদাহরণ হিসেবে দেখান হল । চিত্র:আপ ফ্লেভারের উদাহরণ দেওয়া হল । মনে রাখার জন্য একটি উদাহরণ দিলে কেমন হয়? ধরেন আপনি যে এলাকায় থাকেন সেখানে A,B,C,D,E এবং F নামের ৬টি বাংলা মিডিয়াম স্কুল (ছয়টি ফ্লেভার) আছে ।

আপনাকে এই স্কুলগুলোর নবম শ্রেণী পরিদর্শন করে একটি রিপোর্ট দিতে বলা হল । আপনি রিপোর্ট লিখলেন ঠিক এইভাবে এই স্কুলগুলোর নবম শ্রেণীতে বালক (কোয়ার্ক) ও বালিকা (প্রতিকোয়ার্ক) দুই ধরনের শিক্ষার্থী আছে এবং এই শিক্ষার্থীরা আবার ৩টি বিভাগ অর্থাৎ বিজ্ঞান(লাল), ব্যবসায়-শিক্ষা(নীল) ও কলা(সবুজ) বিভাগে বিভক্ত । এখন কেউ যদি আপনার কাছে এসে নবম শ্রেণীর কোন শিক্ষার্থীর সম্পর্কে জানতে চায় তখন আপনি কি করবেন ? অবশ্যই জিজ্ঞাসা করবেন শিক্ষার্থী কোন স্কুলে (কোন ফ্লেভারের কোয়ার্ক ) পড়ে ? সে বলল A নামক স্কুলে (ধরি আপ ফ্লেভারের কোয়ার্ক ) পড়ে । তারপর আপনি জিজ্ঞাসা করবেন শিক্ষার্থীর নাম কি? নামের মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন শিক্ষার্থী বালক না বালিকা (কোয়ার্ক না প্রতিকোয়ার্ক ) । তারপরে আবার জিজ্ঞাসা করবেন কোন বিভাগে (লাল , নীল নাকি সবুজ কোয়ার্ক ) পড়ে? সে বলল বিজ্ঞান বিভাগ, তখন আপনি খুব সহজেই শিক্ষার্থী সম্পর্কে তথ্য দিতে পারবেন ।

উপরের উদাহরণটির মত কোয়ার্কের ক্ষেত্রেও এমন কিছু হয় তবে তা হয় জটিল ধরনের কিছু গণিত ব্যবহার করে । যাইহোক মূল কথায় ফিরে আসি । আমরা কি জানি আমদের পরিচিত প্রোটন এবং নিউট্রন কণা কি দিয়ে গঠিত? না জানলে কোন সমস্যা নাই আমি বলে দিচ্ছি । প্রোটন মূলত ২টি up quark এবং ১টি down quark দিয়ে এবং নিউট্রন ১টি up quark এবং ২টি down quark দিয়ে গঠিত । এ ছাড়া অন্যান্য কোয়ার্ক দিয়ে অনেক কণা গঠিত হয় কিন্তু এদের ভর বেশি বলে এরা প্রোটন বা নিউট্রন এ রুপান্তর হয় ।

চিত্র : কোয়ার্ক দ্বারা প্রোটন ও নিউট্রনের গঠন । এইবার আসি লেপ্টোন (Lepton শব্দটি নেয়া হয়েছে ‘Light-weight’ শব্দদ্বয় হতে যার অর্থ হালকা ভর ) এর কথায় , আমরা যে ইলেক্ট্রন এর কথা জানি তা লেপ্টোন পরিবারের সদস্য । এই লেপ্টোন কে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয় – • চার্জ লেপ্টোন • নিউট্রাল লেপ্টোন (যা নিউট্রিনো নামে বেশি পরিচিত ) চার্জ লেপ্টোন কণা অন্য কোন কণার সাথে মিলিত হয়ে যৌগিক কণা গঠন করতে পারে , যেমন বলা যায় পজিট্রোনিয়াম পদ্ধতি বা Positronium system (Ps),যা মূলত ঋণাত্মক ইলেকট্রন ( e-) এবং প্রতিইলেকট্রন বা ধনাত্মক পজিট্রন (e+) সমন্বয়ে গামা রশ্মি উৎপন্ন করে বায়ু মাধ্যমে যার স্থায়িত্ত ১৪৫ ন্যানো সেকেন্ড । অন্য দিকে ‘নিউট্রাল লেপ্টোন’ কণা অন্য কোন কণার সাথে মিলিত হবার প্রবণতা খূব একটা দেখায় না । চিত্র : পজিট্রোনিয়াম পদ্ধতি কোয়ার্কের মতো লেপ্টোনেরও ছয়টি ধরণ আছে ।

এই ছয়টি ধরণকে প্রধানত চার্জ (Q), ইলেকট্রন সংখ্যা(Le), মিউয়ন সংখ্যা( Lμ), এবং ট্যাউ সংখ্যা( L τ) এর উপর ভিত্তি করে ভাগ করা হয়েছে । লেপ্টোনরাও ৩টি প্রজন্ম (Generation) গঠন করে • ১ম প্রজন্ম (1st Generation) হচ্ছে ‘ইলেকট্রনিক লেপ্টোন’ যার মধ্যে আছে (electron) ইলেকট্রন (e-) এবং (electron neutrinos ) ইলেকট্রন নিউট্রিনোস্ (Ve) অন্তর্ভুক্ত । • ২য় প্রজন্ম (2nd Generation) হচ্ছে ‘মিউনিক লেপ্টোন’ যার মধ্যে আছে (muons) মিউনস্ (μ )এবং (muon neutrinos) মিউনস্ নিউট্রিনোস্ (Vμ) অন্তর্ভুক্ত । এবং • ৩য় প্রজন্ম (3rd Generation) হচ্ছে ‘টাউনিক লেপ্টোন’ যার মধ্যে আছে (taus ) ট্যাউস্ (τ -) এবং (taus neutrinos) ট্যাউস্ নিউট্রিনোস্ (V τ) অন্তর্ভুক্ত । চিত্র: লেপ্টোনেরছয়টি ধরণ প্রতিটি লেপ্টোনের রয়েছে আবার একটি করে প্রতিলেপ্টোন (আরো ছয়টি প্রতিলেপ্টোন আছে ) ।

এই প্রতিলেপ্টোনের প্রতি চিহ্ন হবে বিপরীত । যেমন পজিট্রনের ক্ষেত্রে চার্জ(Q) হবে +১ এবং ইলেকট্রন সংখ্যা(Le) হবে -১ । তাই আমরা বলতে পারি লেপ্টোন হচ্ছে মোট ১২টি । মনে রাখার জন্য আবার সেই পরিদর্শকের কাছে যাই চলেন । ধরেন আপনি যে এলাকায় থাকেন সেখানে G,H,I,J,K এবং L নামের ৬টি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আছে ।

আপনাকে এই স্কুলগুলোর Standard Nine ক্লাস পরিদর্শন করে একটি রিপোর্ট দিতে বলা হল । আপনি রিপোর্ট লিখলেন ঠিক এইভাবে এই স্কুলগুলোর Standard Nine ক্লাসে বালক (লেপ্টোন) ও বালিকা (প্রতিলেপ্টোন) এই দুই ধরনের শিক্ষার্থী (কারণ ইংলিশ মিডিয়ামে বিজ্ঞান, ব্যবসায়-শিক্ষা ও কলা বিভাগ আলাদা ভাবে ভাগ করা হয় না ) আছে । যেমন লেপ্টোনের বর্ণ চার্জ বলে কিছু নাই শুধু আছে এদের কণা ও প্রতিকণা । যাই হোক আমি বুঝার জন্য দুইটি উদাহরণ ব্যবহার করলাম তবে আবার কেউ সত্যি সত্যি ভাববেন না যে বালকরা কণা আর বালিকারা প্রতিকনা । যদি তাই হতো তাহলে পৃথিবীতে মানুষ বলে কিছু থাকতো না, সবার ভর শক্তিতে রুপান্তর হতো ।

আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এই দুইটি উদাহরণের জন্য, কারণ অনেকেই আছেন যারা এই উদাহরণ দুইটি কে অন্যভাবে নিবে । চিত্র: ভরের বৃদ্ধি অনুযায়ী কোয়ার্ক ও লেপ্টোনের ৩টি প্রজন্ম (Generation) আমরা সর্বশেষে বলতে পারি যে ফার্মিয়ান কণা হচ্ছে সর্বমোট (৩৬টি কোয়ার্ক)+(১২টি লেপ্টোন)=৪৮টি । যদিও প্রমিত মডেলে (Standard Model) ১২টি ফার্মিয়ান ফ্লেভারের কথা উল্লেখ থাকে চলবে...... ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.