আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

লেবু বন্দনা

কলার বাজার খুব সস্তা দুপুরের কাঠ ফাটা রোদে ভার্সিটি থেকে বাসার গলিতে রিকশা বিদায় দেওয়ার পর পর-ই আমার প্রথম কাজ এলাকার কাচা বাজার থেকে এক হালি লেবু কেনা । লেবুর শরবত হল আমার মত গরিবের গ্লুকোজ । একদম হালাল আর একশো পারসেন্ট ন্যাচারাল । ক্লান্তি ও দূর হয় আর শরীর ঠাণ্ডা করে ফটাফট । লেবু কেনার পর ই গলির মাথায় মুদির দোকানে যাই চিনি কিনতে ।

দুপুর দুইটার পর মুদি দোকানদার নিজে থাকেন না , তার প্রাইমারি ইস্কুল পড়ুয়া ছেলেকে দোকানে বসিয়ে যান । সেই ছেলেকে দেখলেই হাসি মুখে বলি - চিনির কেজি কত ? - ৫০ টাকা । কয় কেজি লাগবে ? - আমাকে আড়াইশো গ্রাম দাও । - আড়াইশো মানে কত ? - আড়াইশো মানে দুই শত পঞ্চাশ গ্রাম । এক হাজার এর চার ভাগের এক ভাগ ।

ছেলে মাথা চুলকাতে চুলকাতে চিনি মাপতে যায় । আমিও অপেক্ষা করি । ডিজিটাল মিটারে চিনি মাপে । তার অদ্ভুত সমস্যা হল সে ২২০ গ্রাম মাপার পর আস্তে আস্তে কমিয়ে বস্তায় রাখতে থাকে । যখন বলি , বাবা আড়াইশো গ্রাম হতে তো আরও ত্রিশ গ্রাম চিনি লাগবে ।

তখন সে চিনি আরও কমিয়ে বস্তাতে রাখতে থাকে । আরও একটু জোরে যখন বলি বাবা , চিনি তো আরও লাগবে । তখন আবার বস্তা থেকে অল্প অল্প চিনি মেপে দিতে থাকে । কিন্তু কখনও সে আড়াইশো গ্রাম চিনি আর মাপতে পারে না । মাপ ঠিক রাখতে গিয়ে সে সব সময় আমাকে ৫-১০ গ্রাম চিনি বেশি ই দিয়ে ফেলে ।

গরমের ভিতর এক সময় অধৈর্য হয়ে বলি - তুমি বরং আমাকে ৫ গ্রাম চিনি কম ই দাও , এটা এমন বড় কিছু না । কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না । এরপর যখন দাম দিতে যাই , তখন শুরু হয় আরেক ধইর্জের পরীক্ষা । সে ক্যালকুলেটর অনেক গুলো বোতাম টিপতে থাকে । কিন্তু টাকার অঙ্ক টা সে আর কখনোই বের করতে পারে না ।

মাথা চুল্কায় । - বাবা , মাথায় কি উকুন ? - জী, না । ( ভস্ম দৃষ্টি তে তাকায় আমার দিকে , এর একটু হলেই মান হানির মামলা করবে এমন অবস্থা ) - বাবা , এক কেজি চিনি পঞ্চাশ টাকা হলে আড়াইশো চিনি বারো টাকা পঞ্চাশ পয়শা হয় । পঞ্চাশ পয়শা তো নাই তুমি তের টাকাই রাখ । তার সন্দেহ হয় আমি কম কম বলছি , নিশ্চই আমি তাকে ঠকাচ্ছি ।

সিউর হওয়ার জন্য সে আবার ক্যালকুলেটর এর দিকে তাকায় । শেষ পর্যন্ত কোন গতি করতে না পেরে ১৩ টাকা ই রেখে দেয় । তবুও তার মনে সন্দেহ কমে না । সন্দেহ কমানোর জন্য তাকে ঐকিক নিয়মের হিসেব টা একটু মনে করিয়ে দেই । - শোন , এক কেজি তে হয় এক হাজার গ্রাম ।

আড়াইশো গ্রাম হল এক কেজির চার ভাগের এক ভাগ । তাই তোমাকে আমি দিলাম পঞ্চাশ টাকার চার ভাগের এক ভাগ মানে বার টাকা পঞ্চাশ পয়শা । পঞ্চাশ পয়শা বেশি ই আছে । আর কোন ক্লাসে পড় তুমি ? বাসায় গিয়ে ঐকিক নিয়ম টা একটু ভাল করে দেখ । বাপের ব্যাবসা তো ভবিষ্যতে তোমাকেই সামলাতে হবে ।

তাই পাটি গনিতা না শিখলে কিন্তু কোন গতি নাই । লজ্জিত ভঙ্গিতে ফিক করে হেসে দেয় সে । অনেক লেকচার , অনেক উপদেশ শেষে বাসায় ফিরে লেবুর শরবত বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি । এক গ্লাস ঠান্ডা পানি , ৭-৮ চামচ চিনি , একটা সম্পুর্ন লেবুর রস আর কয়েক চিমটি লবন । ব্যাস , জীবন ডা বাচাইলা ! শিগগিরি কয়েক গ্লাস দাও টাইপ ড্রিঙ্ক ! নটরডেমে পড়াকালীন আজমল স্যার বলতেন - যখন ই ক্লান্তি আসবে তখন ই লেবুর শরবত খাবে , এই শরবত দ্রুত শরীরে মিশে যায় আর ইন্সট্যান্ট এনার্জি দেয় ।

ব্রেইন ও ঠান্ডা করে । মাড়ির সমস্যা কমায় । চর্বি কাটতে সহয়তা করে । সব সমস্যার ওয়ানস্টপ সল্যুশন । সেই থেকে আজ অবধি যখন ই লেবুর শরবত দেখি , আজমল স্যার এর কথা মনে পড়ে ।

আর বিছানায় গা এলিয়ে লেবুর শরবতের গুনাগুন ভাবতে ভাবতে তলিয়ে যাই প্রশান্তির এক ঘুমের জগতে - সে জগত শুধুই সবুজ আর লেবুর সুবাসময় । ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ৪২ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।