আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

স্বাধীনতা ও কুসুম[গল্প]-সময়কাল-১৯৬৯, শেষ অংশ

আমার শ্বশুড় বাড়ীর লোকজন বেশ ভাল এবং সহযোগী। ঘরে সবাই বাংলা বলে শুধু শ্বশুড় ছাড়া। তবে আমি কিছুতেই সহজ হতে পারছি না। ইমতিয়াজের সহজ সরল আঁচড়ন যে কোন নারীকে আকৃ্ষ্ট করবে কিন্তু আমাকে নয়। মা-বাবার প্রতি আমার রাগটাও পড়ছে না।

বিয়ের এক বছর কেটে গেল। এরি মধ্যে মাত্র দুবার বাবার বাসায় গিয়েছি। আমার ক্ষোভের বিষয়টি তারা বুঝেছেন। এটা অবশ্য বলা হয়নি ১৯৬৯ এর গণ -অভ্যুত্থানের সময়টায় তাকে বদলি করা হয় ঢাকায়। ঢাকার অবস্থা তখন ভীষন গোলমেলে।

থমথমে চারিদিক। মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। সারাক্ষন অস্বস্থি। নেত্রকোনা যেতে ইচ্ছে করছে। পাকিস্থান আর্মিদের কারো ছুটি নেয়া এখন গ্রহণ যোগ্য নয় ।

ইমতিয়াজের আরো কঠিন সময়। কারন অফিসাররা ইতিমধ্যে সকলেই অবগত হয়ছেন তার মা বাঙালী এমনকি তার সহধর্মীনিও। তখন কেমন জানি ওর জন্য আমার মনে সহানুভূতি তৈরী হতে থাকল। এদিকে বেশ কটি মাস এভাবে কাটছে। ১৯৭০সালে সারা পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন চলছে।

আমি রোজা মানত করেছি যেন শেখ সাহেব জিতেন। ঘটলও তাই । আমি রোজা রাখলাম। ওর মা আমাকে ডাকলেন কেন খাচ্ছি না। তাকে সরাসরিই বললাম বঙ্গবন্ধু জিতেছে তাই।

মা বললেন আরে বেটি তুইতো বাঘের বাচ্চা,তোকে দিয়েই হবে । এদেশটা একদিন স্বাধীন হবেই রে মা। তবে তোর শ্বশুড় জিজ্ঞেস করলে বলিস শরীর খারাপ লাগছে । যা হোক পরবর্তিতে আবার যখন শুনলাম তাকে সরকার গঠন করতে দেয়া হচ্ছেনা তখন মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল। এ নিয়ে সর্বত্রই চলছে তীব্র আন্দোলন।

স্বাধীন তখন আমার গর্ভে। শুধুমাত্র বৈবাহিক সূত্রতা ধরে ইমতিয়াজকে বদলি করে দেয়া হল করাচিতে । এতটাই অসহায় বোধ করছি আমি কাউকে বলতে পারছিনা কিচ্ছু । এদিকে ভিসা,টিকিট রেডি । কিন্তু আমি স্রেফ না করে দিয়েছি করাচি যাব না।

ইমতিয়াজের জন্য খুব কান্না পাচ্ছে তবু নিজেকে শক্ত করে থাকলাম । তবে যাবার সময় ওর কান্না দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। তবু আমি এ মাটি ছেড়ে কোত্থাও যাব না। আমার শ্বশুড়ের চোখ দুটোও পানিতে টলমল করছে । আমাকে বুকে নিয়ে বললেন -জিতে রহ বেটি।

আমি তাকিয়ে থাকলাম যতদূর গাড়িটা দেখা যায়। আর প্লাবনের ধারার মত যা আমার চোখ থেকে বেরুচ্ছে তা দু হাতে চেপে ধরে রোধ করার চেষ্টা করছি। ব্যাগটা কাঁধে চেপে বেরিয়ে গেলাম এই শরীরেই। রাত দশটায় গিয়ে দরজায় টোকা দিলাম ,মা দরজা খুলতেই হাউমাউ করে অঝোরে কাঁদতে থাকলাম। যেন বুকের ভেতরটা হাল্কা করার আপ্রান চেষ্টা।

এদিকে আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকল। মা বাবা আমাকে নিয়ে বেশ উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। ইমতিয়াজের কোন সংবাদ পাচ্ছিনা। দেশের অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে পাক সরকারের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। জেনারেল ইয়াহিয়া পরিস্থিতির উন্নতি করতে ঢাকায় এসেছেন।

পরিস্থিতি সামলাবার নাম করে পাকিস্থানি আর্মি আর গোলাবারুদ এনে বাঙালী দমনের সকল প্রস্তুতি চলতে থাকল ভেতরে ভেতরে । রেডিওতে সারাক্ষন কান পেতে থাকছি আমরা দেশের সঠিক খবরটি পাবার আশে। বিদেশি সেন্টারগুলিতে সংবাদ প্রেরণের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে তারা । বঙ্গবন্ধুকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে শুনে বাবা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এর আগ পর্যন্ত আমরা আশায় ছিলাম যে স্বাধীনতার ঘোষণাটুকু যখন দেয়া হয়েই গেছেতো সব পরিস্থিতি বাঙালীদের অনুকূলেই রয়েছে।

২৭শে মার্চ আবার তাঁর পক্ষ হতে মেজর জিয়াউর রহমান সেই ভাষণটি আবার পাঠ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে ২৬শে মার্চ থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। তার আগের দিন দেশের অগণিত বুদ্ধিজীবিদের নির্বিচারে ধরে নিয়ে যায় । এবং হত্যা করে রায়েরবাজারে। বাবা সেদিন ছোট কাকার চিন্তায় দিশেহারা।

ছোট কাকা ফজলুল হক হলে থাকতেন ,তিনি সক্রিয় একজন ছাত্র নেতাও। এদিকে সকাল থেকে আমার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। সারাটা দিন ঘরেই শুয়ে । মা-বাবা কাকাকে নিয়ে চিন্তিত দেখে তাদেরকে বলিছিওনা কিছু। রোজকার মত সন্ধ্যের সময় বাবা মাগিবের নামাজ শেষে ইয়াছিন সূরা পড়ে আমায় ফুঁ দিতে এলেন।

-কিরে মা তোর কি শরীরটা বেশী খারাপ হইছে। -হ্যাঁ,সকাল থেকেই খারাপ লাগছে। -আমারে কইতাচস না কেরে ?তর মাওতো কিস্তা কয় না। বাবা চিৎকার করেই মাকে ডাকলেন -কুসুমের মা কইগো,এইম্যা আইয়ো। মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন,বাবাকে বললেন -তোমার মনটা খারাপ দেইখ্যা কিছু কই নাই।

তুমি চিন্তা কইর না দাই বেডিরে কওয়া আছে যহন লাগব আইয়্যা ফরব। -দেহ ঘরে কিতা আছে এরে কিছু খাওয়াও। এখানে একটা কথা বলে রাখি বাবা মা একান্ত যখন কারো সামনে না পড়েন তো শুদ্ধ বাংলা বলেন না। একেবারে খাঁটি নেত্রকোনার ভাষায় কথাবলেন। বাবার ভাষ্যমতে এইটা বললে নাকি তিনি শান্তি পান ।

যাই হোক রাতের দশটা তখন ভীষন ব্যাথা শুরু হল দাইকে খবর দেয়া হল। তবে সমস্যা হল বাচ্চার মাথা কিছুতেই নিচে নামছে না। এত রাতে কোন উপায় না দেখে বাবা টেলিফোন করলেন তার এক বন্ধুকে গাড়ী নিয়ে আসার জন্য। তখনকর দিনে সারা শহরে দুএক জনের গাড়ী থাকত । এই সময় দেশের যা অবস্থা নিজের দরকারেও কেউ রাস্তায় তা নামান না।

যাক অনেক করে আমার পরিস্থিটি শেষ পর্যন্ত তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন বাবা। মাকে সংগে নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে। তখনকার সেই সময় সরকারী হাসপাতালেই ছিল মানুষের শেষ ভরসা। নার্সিং হোম ছিল না। রাত একটার সময় জন্ম নিল আমার একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বনটি।

নার্স এসে যখন মার কোলে দিলেন। বাবা খুশিতে কেঁদে ফেললেন। মাও কাঁদতে লাগল। বাবা তখনি কোলে নিয়ে ঘোষণা দিল -আমার নাতিনের নাম স্বাধীন। ও স্বাধীনতা নিয়েই এ বাঙলায় এসেছে।

স্বাধীন সত্যিই আমার স্বাধীনতা। কোন দিন আমার স্বাধীনের ভালবাসার অংশীদার কেউ হয়নি। একা একা কাঁটিয়েছি এতগুলো বছর। স্কুলের চাকরী আর স্বাধীন আমার সারাবেলাকার সংগী ছিল। এখন সে কত বড়।

হুবুহু দেখতে বাবার আদল। ইমতিয়াজের চোখ, চেহারা,স---ব। একটা মানুষ করে হুবুহু আর একজন হয়। স্বাধীন যখন সব কিছু বুঝতে শিখেছে তখন একদিন আমায় বলেছিল , -মা কারো বাবাতো পাকিস্তানী না, তো আমার বাবা কেন?আমিতো তাদেরকে ঘৃণা করি । আমি তাকে বুঝালাম।

-শুধু বাবা পাকিস্তানী হলেই দোষ নয়। তোর দাদুমণি বাঙালী ছিলেন ,তোর মা বাঙালী। তাছাড়া যুদ্ধে তোর বাবারও অনেক কিছু হারাতে হয়েছে । বাঙালী মায়ের সন্তান বলে ,বাঙালীর স্বামী বলে। তোকে হারিয়েছে ,আমাকে হারিয়েছে।

না জানি চাকরীটাও হারাতে হয়েছে কিনা?আমি আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। তখন স্বাধীনও আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,'সরি'। আর কখনো সে বাবাকে নিয়ে কোন প্রশ্ন আমাকে করেনি। । ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.