আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি-মাহবুব উল আলম চৌধুরী।১৯৫২ সালের ২১ শে ,ফেব্রুয়ারীর প্রথম প্রহরে যে কিংবদন্তীর কবিতা সর্বপ্রথম রচিত হয়েছিলো।

কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি-মাহবুব উল আলম চৌধুরী ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশি যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে−রমনার রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচুড়া গাছের তলায় ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য−বাংলার জন্য। যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে একটি দেশের মহান সংস্কৃতির মর্যাদার জন্য আলাওলের ঐতিহ্য কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য ও কবিতার জন্য− যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে পলাশপুরের মকবুল আহমদের পুঁথির জন্য− রমেশ শীলের গাথার জন্য, জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ জন্য। যারা প্রাণ দিয়েছে ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, গজল নজরুলের “খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি। ” এ দুটি লাইনের জন্য দেশের মাটির জন্য, রমনার মাঠের সেই মাটিতে কৃষ্ণচুড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত। রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি বুকের রক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সেরা কোনো ছেলের বুকের রক্ত।

আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের প্রতিটি রক্তকণা রমনার সবুজ ঘাসের উপর আগুনের মতো জ্বলছে, জ্বলছে আর জ্বলছে। এক একটি হীরের টুকরোর মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছেলে চল্লিশটি রত্ন বেঁচে থাকলে যারা হতো পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যাদের মধ্যে লিংকন, রকফেলার, আরাগঁ, আইনস্টাইন আশ্রয় পেয়েছিল যাদের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছিল শতাব্দীর সভ্যতার সবচেয়ে প্রগতিশীল কয়েকটি মতবাদ, সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি। যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে আমরা তাদের কাছে ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ। আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির দাবি নিয়ে। আমরা জানি ওদের হত্যা করা হয়েছে নির্দয়ভাবে ওদের গুলি করা হয়েছে ওদের কারো নাম তোমারই মতো ওসমান কারো বাবা তোমারই বাবার মতো হয়তো কেরানি, কিংবা পূর্ব বাংলার নিভৃত কোনো গাঁয়ে কারো বাবা মাটির বুক থেকে সোনা ফলায় হয়তো কারো বাবা কোনো সরকারি চাকুরে।

তোমারই আমারই মতো যারা হয়তো আজকেও বেঁচে থাকতে পারতো, আমারই মতো তাদের কোনো একজনের হয়তো বিয়ের দিনটি পর্যন্ত ধার্য হয়ে গিয়েছিল, তোমারই মতো তাদের কোনো একজন হয়তো মায়ের সদ্যপ্রাপ্ত চিঠিখানা এসে পড়বার আশায় টেবিলে রেখে মিছিলে যোগ দিতে গিয়েছিল। এমন এক একটি মূর্তিমান স্বপ্নকে বুকে চেপে জালিমের গুলিতে যারা প্রাণ দিল সেই সব মৃতদের নামে আমি ফাঁসি দাবি করছি। … খুনি জালিমের নিপীড়নকারী কঠিন হাত কোনোদিনও চেপে দিতে পারবে না তোমাদের সেই লক্ষদিনের আশাকে, যেদিন আমরা লড়াই করে জিতে নেব ন্যায়-নীতির দিন হে আমার মৃত ভাইরা, সেই দিন নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে তোমাদের কন্ঠস্বর স্বাধীনতার বলিষ্ঠ চিৎকারে ভেসে আসবে সেই দিন আমার দেশের জনতা খুনি জালিমকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাবেই ঝুলাবে তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মতো জ্বলবে প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে। ———————————————- ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ একুশের প্রথম কবিতা। কবিতাটির সাথে সবাই কমবেশী পরিচিত।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলিবর্ষনের খবর পেয়ে সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে বসে কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় কবিতাটি লিখেন। মূল কবিতাটি ছিল প্রায় ১৭ পৃষ্টার। দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ থাকায় সমগ্র কবিতাটি এখন আর পাওয়া যায় না। (বিপ্রতিপ ভাইয়ের সৌজন্যে) ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.