আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আমি কাঁদতে ভুলে গেছি ! আর একবার প্রাণ খুলে কাঁদতে চাই

দিনদিন আমার শারীরিক এবং মানসিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে । আমি আর আগের মতো হাসতে পারি না , খেলতে পারি না । এমন কি বন্ধু দের সাথে আড্ডা দেবার ক্ষমতা ও আর অবশিষ্ট নেই । ইদানিং ঘর থেকে বের হই না বললেই চলে । পেপার পত্রিকা কিংবা রেডিও টেলিভিশন দেখা বন্ধ করে দিয়েছি প্রায় বছরখানেক হলো।

মাঝে একটা সময় ছিল যখন খুব কাদঁতাম একা একা কিন্তু এখন আর আমার কান্না পায় না ! যে কারণে আমি আজ এরকম : প্রাককথন : সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমি চিরকাল মার খেয়ে আসছি । ছোটবেলায় আমার বন্ধুরা বিভিন্ন কৌশলে আমাকে মারতো । একটা খেলা ছিল বোমবাষ্টিং নামে - যেখানে একটা টেনিস বল দিয়ে একজন আরেকজনের গায়ে লাগাতে হতো । খেলার নিয়ম ছিল - যার হাতে বল থাকবে সে তার নিকটবর্তী খেলোয়াড়কে জ্বলাবে (গায়ে বল ছুড়ে মারবে) । কিন্তু, আমার বন্ধুরা কেন যেন আমাকেই টার্গেট করতো আর ষড়যন্ত্র করে আমাকেই শুধু জ্বলাতো ।

আমি এর কোনো কারণ খুঁজে পেতাম না । আর ওদের থেকে শক্তি ও আমার কম ছিল তাই কখনো প্রতিবাদ করতে পারতাম না আমি । প্রতিদিন মার খেতাম আর বাসায় এসে একা একা কাঁদতাম !!! কিন্তু পরদিন বিকেলে ঠিক ই আবার খেলতে যেতাম এই ভেবে যে - হয়তো আজ আর মার খাবো না । কিন্তু সেদিন ও চোখের জল নিয়েই আমাকে বাড়িতে ফিরতে হতো বাসার ভেতরকার অবস্থা ছিল আরো ভয়াবহ । আমার মায়ের অত্যাচারের সেই সব দৃশ্য মনে পড়লে এখনো আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই ! তার কয়েক ধরনের শাস্তির ভেতরে ছিল - * বাথরুমে কয়েক ঘন্টা আটকে রাখা ।

দিনের বেলায় তবু সহ্য করা যেত কিন্তু রাতের বেলা লাইট বন্ধ করে যখন আটকে রাখতো তখন ভয়ে আমার অন্তরাত্বা শুকিয়ে যেত । তাছাড়া বাথরুমে প্রায়ই বড় সাইজের মাকড়সা আর টিকটিকি থাকত যেগুলোর ভয় দেখানো ও ছিল শাস্তির একটা অংশ । * পেটে এমন খিমচি (জোরালো চিমটি) দিতো যে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসতো । তখন আমার বয়স বড়জোর ছয় কি সাত । আর এ শাস্তি চলেছে আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি সেই পর্যন্ত ।

* হাতের দু 'আঙুলের ভেতরে কলম ঢুকিয়ে জোরে চেপে ধরতো যার ফলে পরবর্তীতে আমার হাতের কয়েকটা আঙুল বিভিন্ন দিকে বেঁকে যায় । অবশ্য এটা ছিল ক্ষুদ্রতম শাস্তি * কখনো কখনো খাওয়া বন্ধ করে দিতো , কখনোবা বাসার বাইরে বের করে দিতো দু'চার ঘন্টার জন্য , কখনো হয়তো ঘুমের ভেতরে বেধড়ক মার শুরু করতো ... বেত, খাটের স্ট্যান্ড , চেয়ারের পায়া , বাথরুমের একটা খোলা স্টিলের পাইপ ছিল - যখন যেটা হাতের কাছে পাওয়া যেত সেটাই চলতো আরকি ... * সবথেকে ভয়াবহ শাস্তি ছিল - দেয়ালের সঙ্গে মাথা ধরে বাড়ি দেয়া ! অর্থাৎ সে আমার মাথাটা ধরে দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা দিতো । এটা আমার ক্লাস ফাইভ এ থাকাকালীন তোলা ফটো । ( কেউ ভাবতে পারে আমি হয়তো খুব খারাপ ছিলাম বিধায় এ ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা । কিন্তু তাদের সে ভাবনা ভুল ।

কারণ , ছোটবেলা থেকেই এমন টাইপের ছিলাম যে - কেউ মারলে তাকে উল্টে না মেরে বরং তার হাত ধরে বলতাম - ব্যাথা পাননি তো ? ) তাহলে শাস্তি কেন পেতাম ? খুব ছোটখাটো কারণে যেমন : দুপুরে না ঘুমানো , পড়ার সময় কোনো টিভি সিরিয়াল দেখার বায়না ধরা , সকালবেলায় ঘুম থেকে দেরীতে ওঠা , গল্পের বই পড়া, ছোট ভাই-বোনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি কিংবা মারামারি ....... মা যে শুধু নিজে শাস্তি দিয়েই ক্ষান্ত থাকতেন তা নয় । বাবা অফিস থেকে ফিরলে তিনি বাবার কাছে পুনরায় নালিশ দিতেন । তারপর ঐ এক অন্যায়ের কারণে বাবার মার ও খেতাম । সবচাইতে কষ্ট লাগতো তখন যখন ছোট ভাই-বোন মিথ্যা নালিশ করে আমাকে ডাবল মার খাওয়াতো । ক্লাস নাইন এ থাকাকালীন আমি প্রথম এর প্রতিবাদ করি ।

প্রতিবাদ করায় অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে যায় । এরপর শাস্তি দিতে কোনো ই্যসু লাগতো না । যখন তখন বিনা নোটিশেই ... এ মুহূর্তে একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই । আমার মা সেলাই জাতীয় টুকিটাকি কাজ (ব্লক , বাটিক, এমব্রয়ডারী, এপলিক ...) করতেন বাসায় । এ সময়টায় তিনি পুরোপুরি এতে আত্ননিমগ্ন হয়ে যান ।

সারাদিন ই প্রায় বাইরে বাইরে থাকতেন আর সন্ধ্যা হলেই বাসায় ফিরে আমাকে আর অন্যান্য ভাইবোনগুলিকে শাসন শুরু করতেন । সারাক্ষণ ই কেন যেন তার মেজাজ গরম থাকতো । ....... ২০০৫ সালের কথা । এস.এস.সি তে আরো অনেকের মতোই জি.পি.এ ৫ পেলাম । আমার বন্ধুরা কেউ কেউ ঢাকায় চলে গেল ।

আমি ও দিনরাত স্বপ্ন দেখতে লাগলাম হয়তো এ যন্ত্রনা থেকে এইবার মুক্তি পাওয়া যাবে ! খুব ইচ্ছা ছিল নটরডেমে পড়ার । কিন্তু আমাকে সেখানে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগটা ও দেয়া হলো না । অনেক কাকুতি মিনতি করলাম বাসায় - অন্তত ঢাকার যে কোনো ভালো একটা কলেজে পড়বো বলে ! তা ও হলো না । আমাকে বলা হল - আমি নাকি মশারি টানাতে পারি না , একা একা খেতে পারি না , বাইরে রাস্তা পার হতে পারি না ... এইসব ফালতু অযুহাত দিয়ে তারা আমার ঐ সময়কার স্বপ্নটাকে মাটি চাপা দিলো আমাকে ভর্তি হতে হল আমার বাসার নিকটবর্তী একটা কলেজে । মূলত, তখন থেকেই আমার জীবনের ছন্দপতন হয় ।

কলেজে যেতাম ঠিক ই কিন্তু রাগ করে ক্লাস করতাম না । এতদিনকার সঞ্চিত রাগ তখন আমার বুকের ভেতরে চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ছে । দুঃখ, কষ্ট, যণ্ত্রনা আমাকে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছিলো । রাত জেগে লিখালিখি করতাম - তেমন কিছু না , শুধু আমার কষ্টের কথাগুলোই লিখতাম কখনো গল্পাকারে কখনো বা কবিতাকারে । মাঝে মাঝে ধরা পড়ে এর জন্য ও শাস্তি পেয়েছি ।

যাকগে সেসব কথা । ইন্টার ফার্ষ্ট ইয়ার চলে গেল । ইয়ার ফাইনাল না দিয়ে বাবাকে আরেকবার অনুরোধ করে বললাম - বাবা , আমি আর বাসায় থাকবো না । হয়তো এখানেই কোনো হোষ্টেলে নয়তো ঢাকায় গিয়ে পড়বো । আবেদন নাকচ হলো ।

বাসার সবার ডিসিশন - আমাকে এখানেই ফাষ্ট ইয়ারের সাথে আবার ক্লাস করতে হবে । আমি বহুদিন ওদের ক্লাসের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে থেকেছি , ভেতরে ঢুকতে পারিনি শুধু লজ্জায় ! টেষ্ট পরীক্ষা চলাকালীন একদিন আমি বাবার দু'হাত জড়িয়ে অনেক কাঁদলাম বাবা বুঝতে পেরে আমাকে কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকার একটা বেসরকারী (কারণ, ইয়ার গ্যাপের ফলে সরকারী কলেজে পড়তে পারবো না) কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়ে চলে আসলেন । কলেজের নিজস্ব হোষ্টেল ছিল । সেখানেই থাকতাম । তবে সেখানকার খাবার এতটাই সস্তা আর অরুচিকর ছিল যে প্রথম প্রথম কিছুদিন আমি খেতে পারতাম না ।

পরবর্তীতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম । আমার তখনকার সবথেকে বড় মনঃকষ্ট ছিল এই যে - আমি আমার ক্লাসমেট কিংবা রুমমেটদের কখনোই আমার ইয়ার গ্যাপের কথা বলতে পারতাম না । তাদের সঙ্গে মুক্তমনে কোনো আলোচনায় অংশ নিতে পারতাম না । সবসময় লুকোচুরি করতে হতো । যে দু'টি প্রশ্ন আমাকে সব থেকে বেশি বিদ্ধ করত তা হলো - * কেউ যখন জানতে চাইতো - 'তোমার বয়স কত ?' * কেউ যখন প্রশ্ন করতো - 'এ প্লাস পেয়ে তুমি এইরকম নামহীন একটা কলেজে ভর্তি হলা কেন ?' বেশিরভাগ সময় আমি অন্য প্রসঙ্গ টেনে এড়িয়ে যেতাম, মাঝে মাঝে মিথ্যে বলতে হতো ।

সত্য বলতে শঙ্কা হতো - যদি তা শুনে সবাই ধিক্কার দেয়, এড়িয়ে চলে ! আমি তখন বাইরে খুব একটা বের হতাম না । যদি আগের কোনো ক্লাসমেট কিংবা ব্যাসমেটের সঙ্গে দেখা হয় এই লজ্জায় ! এভাবে একসময় এইচ.এস.সি পরীক্ষা ও হয়ে গেল । ইউ.সি.সি তে 'ক' ইউনিটে ভর্তি হলাম ভার্সিটি কোচিং করার জন্য । মাত্র ৭ দিন ক্লাস করার পর জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে বাসায় চলে আসি । প্রায় দেড় মাস পর ফিরে গিয়ে দেখি ক্লাস শেষ , তখন স্পেশাল কেয়ার নিচ্ছে যারা ইউ.সি.সি তে পরীক্ষায় ভালো করেছে তাদের ।

আমি যেহেতু পরীক্ষা দিইনি তাই স্পেশাল কেয়ার এর আওতাভুক্ত নই । কিন্তু এতদিন হয়ে যাওয়া ক্লাসের লেকচার শিটগুলো (অসুস্থতার কারণে যে লেকচারগুলি পাইনি) আমার দরকার ছিল তাই গেলাম নিতে । অফিস থেকে বললো - এটা চেয়ারম্যানের রুম থেকে নিতে হবে । ইউ.সি.সি চেয়ারম্যান তখন মিঃ পাটোয়ারী । গিয়ে বললাম - স্যার, আমি অসুস্থার জন্য গত দেড়মাস ক্লাস করতে পারিনি ।

আমাকে লেকচার শিটগুলি দেন । তিনি বললেন - কি হয়েছিল ? 'জন্ডিস । ' 'তুমি যে সত্যিই অসুস্থ ছিলে তার প্রমাণ কোথায় ?' জানতাম এরকম একটা কিছু হবে । তাই মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়ে গিয়েছিলাম । ওটা দেখালাম ।

তিনি বললেন - ঠিক আছে । তোমার গার্জিয়ান কে খবর দাও । সে আসলে তোমার লেকচার শিট দিব । আমি বললাম - স্যার, আমার গার্জিয়ান এখানে থাকেন না । তিনি বললেন - গার্জিয়ান ছাড়া লেকচার শিট দেয়া যাবে না ।

আমি বললাম - ঠিক আছে স্যার । আমার লেকচার শিট লাগবে না । ইন্টারমিডিয়েটে থাকা অবস্থায় । এটাই ছিল ইউ.সি.সির সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ । ঐদিন ই আমি প্রতিজ্ঞা করলাম - বাংলাদেশের কোথা ও 'ক' ইউনিটে আমি পরীক্ষা দেব না রুমে এসে Physics, Chemistry, Biology, Math বই আর গাইড দড়ি দিয়ে বাঁধলাম এবং ঐ বিকেলেই সবগুলো কেজিদরে (সম্ভবত ৬৭ টাকায়) বিক্রি করে দিলাম ।

এরপর আমি পড়াশুনা ছেড়ে দিলাম । সারাদিন শুধু ঘুমাতাম । ওহ্ এর মাঝে এইচ.এস.সির রেজাল্ট দিয়েছে যা আমার হতাশার মাত্রাকে (মাত্র ৪.২) প্রলম্বিত করলো । আমি খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিলাম । দিনরাত শুধু ঘুমাতাম ।

শরীর শেষ হয়ে গেল । এসময় কয়েকটা ভার্সিটিতে পরীক্ষা দিলাম (শুধুমাত্র 'ঘ' ইউনিট) ; যে আমি কোনোদিন সাধারন জ্ঞান পড়ি নাই একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানে চান্স পেয়ে ভর্তি হলাম । সাল তখন ২০০৯ । অর্থাৎ, আমার সেশন ২০০৯-১০ । ইস্ ! কষ্টগুলি যদি তখনো আমাকে ছেড়ে যেত বোধহয় কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারতাম ।

কিন্তু তা আর হবার উপায় কোথায় ? জন্ডিস আবার ধরলো , তারপর পক্স । পরীক্ষার ঠিক আগে আগে চোখে সমস্যা দেখা দিল ; অপারেশন করালাম , চশমা নিলাম । পরীক্ষা আর দেয়া হলো না । আবারো ফার্ষ ইয়ারে । কিন্তু এখন আর আগের লজ্জা নেই ।

শুধু বিষন্নতা আর ঘুমের সমস্যার দরুন এখন ক্লাস করতে পারি না । হয়তো অচিরেই পড়াশুনা ছেড়ে দিতে হবে ! ............................. এখন আমি একটাই স্বপ্ন দেখি আমার থেকে হাজার গুন বেশি কষ্ট পাওয়া একজন মানুষকে নিয়ে - যাকে আমি ভালোবাসি - যার বিরহে অহর্নিশি একলা একলা কাঁদি-হাসি । তাকে নিয়ে অন্য কোনো গ্রহে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে খুব ! -যে গ্রহে কোনো মানুষ নেই , নেই কোনো শারীরিক কিংবা মানসিক শাস্তির আতংক ! পুনঃশ্চ : কিছুদিন ধরেই আমি খুব কাদার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না । তবে, আমি জানি আমাকে কাঁদতে হবে নইলে আমি বাঁচবো না ! ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.