আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আত্মঘাতী রাজনীতির মলিন অবয়ব

জনগণ এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছে। গণতন্ত্রকে বেছে নিয়েছে রাষ্ট্রপরিচালনার ব্যবস্থা হিসেবে। আর সেই গণতন্ত্রে জনগণের রায়ই শেষ কথা। সে রায় কারও কাছে ভ্রান্ত মনে হলেও ধরে নিতে হবে, জনগণ বিচার-বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একে তাচ্ছিল্য বা উপহাস করা জনগণের প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শনের নামান্তর।

হয়তো বা সাময়িক অসহিষ্ণুতা বা আবেগপ্রসূত সে মতামত। তবু এ বিষয়ে দায়িত্বশীল মহলের মতামতকে আমলে নিতেই হবে।
বিষয়টি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে ক্ষমতাসীন মহলের কতিপয় মন্তব্য প্রসঙ্গে। বলা হচ্ছে, যাঁরা সৎ ব্যক্তি ও উন্নয়ন করেছেন তাঁরা ভোট পাননি। আরও বলা হয়, যাঁরা সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও খুনের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা জিতে এসেছেন।

এটা বলতে গিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে ক্ষমতাসীন দলের অধিকাংশ প্রার্থীর জয়লাভের বিষয়টি স্মরণে আছে কি না অনুধাবন করা গেল না।
উল্লেখ্য, এ নির্বাচনগুলো আইনের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে স্থানীয় সরকারের পরিবর্তে জাতীয় নির্বাচনে রূপ নেয় অনেকটা নির্বাচন পর্বের সূচনা থেকেই। প্রথম পর্বের চারটিতে হেরে সবশেষে অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি নির্বাচনটিতেও সরকারি দল সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। প্রতি ওয়ার্ডে একজন এমপি ছাড়াও সমন্বয়ের দায়িত্বে বহু নেতা ছিলেন। এটাকে তারা বিরোধী দলের জয়যাত্রাকে বিপরীতমুখী করতে সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

এর গুরুত্ব তুলে ধরে তাদের মনোবল চাঙা করতে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধ বলে একজন বিখ্যাত কলাম লেখক মন্তব্য করেছিলেন।
কিন্তু এখানেও লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে ক্ষমতাসীন দল-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী পরাজয় বরণ করলেন। অবশ্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা চলমান থাকলে এ ধরনের জয়-পরাজয় কারও জন্যই স্থায়ী নয়। আর বাস্তবতাও সদা পরিবর্তনশীল। তবে যাঁরা জয়ী হয়েছেন, তাঁদের প্রতি সৌজন্য না দেখানো উদারতার অভাব প্রকাশ পায়।

আর সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও খুনের অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে থাকতেই পারে। তবে প্রমাণিত হলে তো তাঁরা দণ্ডিত হতেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন না। হয়তো বা বিচারাধীন বা তদন্তাধীন এ ধরনের অভিযোগ। এমনি অনেক অভিযোগ ছিল ২০০৮-এর নির্বাচনের সময় মহাজোটের অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে। তাঁরাও জিতেছেন।

এমনকি তাদের আগের সরকার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় মদদে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি যে বিশাল বলয় সৃষ্টি করেছিল, জনগণ ২০০৮-এ তা উপেক্ষা করেছে। তখন তাদের সামনে ছিল চারদলীয় জোটের ২০০১-২০০৬ মেয়াদি সরকারের কার্যক্রম। উভয় কাঁধে ঘা। তাই একটিতে দীর্ঘকাল বোঝা বহন করতে পারে না জনগণ। অপরটিতে ঘা হলেও সময়ান্তরে কাঁধ বদলাতে হয়।

২০০৮-এর নির্বাচনের পর মহাজোট সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিশ্চিত করেছে তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রায় সব মামলা প্রত্যাহারের। সুতরাং অভিযোগ থাকলেও অতীতের মতো এবারও জনগণ যাঁদের ভোট দিয়েছে, জনপ্রতিনিধির ন্যায্য মর্যাদা তাঁদের প্রাপ্য। এর ব্যত্যয় জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতি অবজ্ঞার নামান্তর। এটা না করে বরং দেখা উচিত, কেন সরকারি দলের ‘সৎ ও যোগ্য’ প্রার্থীদের মেয়র পদে ভোট দেয়নি পাঁচটি মহানগরের ভোটাররা।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এ নির্বাচনগুলোতে পুরোপুরি জাতীয় নির্বাচনের আবহ বিরাজ করেছিল।

স্থানীয় ইস্যু বা প্রার্থী যতটুকু বিবেচনায় এসেছেন, অনেক বেশি এসেছে জাতীয়ভাবে ক্ষমতাসীন দলের বিগত সাড়ে চার বছরের কার্যক্রম। তাদের সময়ে উন্নয়নকাজ অনেক হয়েছে, এটা অনস্বীকার্য। তবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, শেয়ারবাজার ও ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে বেশুমার অনাচার, গ্রামীণ ব্যাংক ও অধ্যাপক ইউনূসকে নিয়ে অকারণ টানাহেঁচড়া, তাদের ছাত্র-যুব সংগঠনের সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি, স্থানীয় পর্যায়ে গ্রাম্য মোড়লস্বরূপ নেতৃত্ব ইত্যাদি ক্ষমতাসীন দলটির বিজয়ের পথে বড় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় কিছু অপপ্রচারের অভিযোগ। আমাদের রাজনীতিতে এটি নতুন নিয়ামক নয়।

১৯৪৬-এর নির্বাচনে তো এটাই ছিল প্রধান নিয়ামক। প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী শক্তি প্রবল শক্তিশালী হওয়ায় আমাদের দেশে ১৯৫৪ ও ১৯৭০-এর নির্বাচনে এ ধরনের প্রচার বা অপপ্রচার হালে পানি পায়নি। ইদানীং প্রায়ই এটা গুরুত্ব পাচ্ছে। এর কারণ, জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো বহুধা বিভক্ত। আর তাদের প্রায় সবাই যখনই সুযোগ পায়, ধর্মকে ব্যবহার করতে ছাড়ে না।

এমনকি এখন যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন প্রার্থীদের যদি সৎ ও যোগ্য বলে ধরেও নেওয়া হয়, তাঁদের সমর্থনে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁদের অনেকেরই অবস্থান এর বিপরীত মেরুতে। অনেকটাই গণবিরোধী। জাতীয় রাজনীতি যখন এসব ফলাফলের নির্ণায়ক হয়, তখন প্রার্থীর গুণাগুণ অনেক সময়ই বিবেচনায় আসে না। যেমনটা আসেনি ২০০৮, ২০০১-এর সংসদ নির্বাচন এবং ১৯৫৪ ও ১৯৭০-এর নির্বাচনে।


তবে এটা ঠিক, ভোটাররা ক্ষমতাসীন দল-সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে কাদের ভোট দেবে না, এটা হয়তো ঠিক করেই ফেলেছিল। আর বিকল্প কিছু না থাকায় তারা বিরোধী দল-সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে। বিকল্প থাকলে ফলাফল অন্য রকম হতে পারত। কেননা ভোটারদের স্মৃতি থেকে এখনো মুছে যায়নি ২০০১-২০০৬-এর শাসনকাল। বিকল্প ক্ষমতাবলয় সৃষ্টি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদের উত্থান, লাগামহীন দুর্নীতি ও সন্ত্রাস এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্বৃত্তায়নের বিষয়টি এত সহজে ভুলে যাওয়ার নয়।

এমনকি সাম্প্রতিক কালে বিরোধী দলের নেতার নামে প্রকাশিত ওয়াশিংটন টাইমস পত্রিকার একটি নিবন্ধ এ দেশের জনগণের স্বার্থের প্রতিকূলে গেছে বলে অনেকে মনে করেন। এটি অস্বীকার করা হলেও জনমন থেকে বিভ্রান্তি দূর হয়নি। তবু ভোটাররা তাদের সমর্থিত প্রার্থীদেরই ভোট দিয়েছে। তারা এও জানে, দেশের প্রধান দুটো রাজনৈতিক দল মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিপরীত দিক দিয়ে দেখলে চেহারাটা একটু ভিন্ন মনে হয়, কিন্তু মান একই।

এ দুটো দলের কোনোটি নিজেদের ত্রুটি স্বীকার করে পরিচ্ছন্ন একটি ভাবমূর্তি নিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্তরিক অঙ্গীকারে এগিয়ে আসছে না। চাইছে অন্যের ত্রুটির ওপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে কিংবা ক্ষমতা দখল করতে।
পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলকে কেউ কেউ আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য একটি প্রাথমিক জরিপ বলে ধরে নিচ্ছেন। এটা হতেই পারে। তা যদি হয়, তবে ক্ষমতায় আসবে বর্তমান বিরোধী দল।

এরূপ হলেই কি জনগণ ন্যূনতম সুশাসন আশা করতে পারে? তারা কি তাদের অতীত কার্যক্রমগুলোর জন্য কখনো জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে? করেনি। বরং সেগুলোই যে যৌক্তিক ছিল, তা-ই বলা হচ্ছে। আরও দাবি করা হচ্ছে, সরকার তাদের অন্যায়ভাবে মামলায় জড়িত করছে। তাহলে সুশাসনের আশা আমরা করতে পারি কীভাবে?
আর যাঁরা সরকার চালাচ্ছেন, গত সাড়ে চার বছরে তাঁরা কী দেখিয়েছেন? একতরফা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নিজেদের মর্জিমাফিক সংবিধানকে সংশোধন করছেন। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের উপেক্ষা নজরে আসার মতো।

সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অকারণ ও অন্যায্যভাবে হেয় করে নিজেদের উদ্ধত আচরণের প্রমাণ রাখছেন। যেকোনো বিষয়ে তাঁদের অসহিষ্ণু আচরণে জনমন ক্ষুব্ধ। আর বিকল্প হিসেবে বেছে নিতে চাইছে মাত্র কয় বছর আগে যাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছিল তাঁদের। অবশ্য এরূপ তারা করেছে ২০০১ আর ২০০৮-এর নির্বাচনেও। লাভ কতটুকু হবে বা আদৌ হবে কি না, এ ব্যাপারে অনেকেই সংশয়বাদী।

তবু বিকল্প খুঁজছে, এতে সন্দেহ নেই। আর এর ইঙ্গিত পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল। শাসক দল জনগণকে ধরে রাখতে পারছে বলে মনে হয় না। আর যেহেতু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণের রায়ই শেষ কথা, এটাকে মেনেও নিতে হবে। ক্ষমতায়নের পাশাপাশি সম্মান ও মর্যাদা জানাতে হবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের।


আমাদের প্রধান দুটো রাজনৈতিক দল দীর্ঘ দুই দশকের ওপর পালা করে দেশ শাসন করছে। তাদের প্রতিটি সরকারের সময়েই ভালো অনেক কাজ হয়েছে। সাফল্যও উল্লেখ করার মতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা সে সাফল্যকে সংহত করে দেশ শাসনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এর প্রধান কারণ অপর পক্ষের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা।

ক্ষেত্রবিশেষে জনগণের বৃহত্তর কল্যাণকে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে উপেক্ষা। গণতন্ত্রের নামে তারা দেশ শাসন করলেও জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব প্রকট। তারা শুধু শাসক হিসেবে জনগণের স্বীকৃতি চায়; নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচন-পরবর্তী তাদের অনুভূতি প্রায়শই উপেক্ষিত হয় শাসকদের কাছে। আর তা হলো, শাসকদের ক্ষতি নেই।

ক্ষেত্রবিশেষে তাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করেই সে স্বীকৃতি তারা নিয়ে নেয়। যেমনটা আমরা দেখি মহাভারতের যুগে কৌরবদের মাঝে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘গান্ধারীর আবেদন’ নামক কবিতায় সেই চিত্রটি তুলে ধরেছেন। পাণ্ডবদের সঙ্গে জয়ী হওয়ার পর দুর্যোধনের পিতা ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে জনগণের নিন্দা ও ধিক্কারের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ায় তাঁর জবাব ছিল:
নিন্দা! আর নাহি ডরি,
নিন্দারে করিব ধ্বংস কণ্ঠরুদ্ধ করি।
নিস্তব্ধ করিয়া দিব মুখরা নগরী
স্পর্ধিত রসনা তার দৃঢ়বলে চাপি
মোর পাদ পীঠ তলে।


মহাভারতের যুগ গেছে বহু সহস্র আগে। কিন্তু আমাদের শাসনব্যবস্থা তেমন কিছু অতিক্রম করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।
এবারে কী হবে এখনই বলা অসম্ভব। কেননা নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতি নিয়ে উভয় দলই নিজ অবস্থানে অনড়। উভয় পক্ষই কিছু না কিছু ছাড় দিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও পক্ষপাতহীন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে না পারলে আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা হোঁচট খেতে পারে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা করেন।

তবে এমনটা ঘটুক—এটা এ দেশের জনগণ চায় না। তাদের প্রত্যাশা, সকল অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে সকল দল-মতের অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন। পাশাপাশি আরও আকাঙ্ক্ষা থাকছে, সে নির্বাচনে যাঁরা বিজয়ী হয়ে আসবেন, তাঁরা দেশে সুশাসন নিশ্চিত করবেন। হয়তো বা অতীতে অনেক ভুল হয়েছে। গেছে বেশ কিছু অমূল্য সময়।

নতুনভাবে তো যাত্রা শুরু করতে পারি আমরা।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com।

সোর্স: http://www.prothom-alo.com     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।