আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গোলাম আযমের আপিল

অপরাধ বিবেচনায় ‘সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য’ হলেও ‘বয়স ও স্বাস্থ্যের অবস্থা বিবেচনায়’ গত ১৫ জুলাই গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড জয়নুল আবেদীন তুহিন সোমবার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল ফাইল করেন।
জামায়াত নেতাদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম পরে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা গোলাম আযমের খালাস চেয়ে আবেদন করেছি। আবেদনে আমাদের যুক্তির পক্ষে সাড়ে ৯ হাজার পৃষ্ঠার দলিল দেয়া হয়েছে। ”
গোলাম আযমের অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, আপিলের পক্ষে মোট ১০৯টি যুক্তি (গ্রাউন্ড) দিয়েছেন তারা।


গোলাম আযমের আইনজীবী প্যানেলের পক্ষে দেয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “এটা নিঃসন্দেহে সত্য যে, অধ্যাপক গোলাম আযম রাজনৈতিকভাবে অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী ছিলেন। পাকিস্তানের স্বাধীনতা ও সাবভৌমত্বের জন্য তিনি কাজ করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে কাজ করা আর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।
“আমরা মনে করি, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো উপাদান নেই। আইনের দৃষ্টিতে ট্রাইব্যুনালের এ রায় কোনো রায়ই নয়।

উচ্চ আদালতে আমরা ন্যায়বিচার পাব বলে আশা করি। ”
ইমরানের পাঠানো ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ট্রাইব্যুনালের রায়ে টিক্কা খান ও ইয়াহিয়া খানের সাথে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অধ্যাপক গোলাম আযমকে দোষী করা হয়েছে।
“কিন্তু ওই বৈঠকের কার্যবিবরনী প্রকাশ করতে রাষ্ট্রপক্ষ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। কারও সাথে দেখা সাক্ষাত করা মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়। এই অভিযোগগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় পড়ে না।


একইভাবে শান্তি কমিটি গঠনে জড়িত থাকাও মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে পারে না বলেও বিজ্ঞপপ্তিতে দাবি করা হয়।  
“তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগে পত্রিকার খবর ছাড়া অন্য কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে রাষ্ট্রপক্ষ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। পঞ্চম চার্জ সম্পর্কে ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, অধ্যাপক গোলাম আযমের একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সিরু মিয়াকে হত্যা করে। প্রসিকিউশন সেই চিঠিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করতে পারেনি। তারপরও মাননীয় ট্রাইব্যুনাল গোলাম আযমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজা প্রদান করেছেন, যা নজীরবিহীন।


ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উস্কানি, সহযোগিতা এবং হত্যা-নির্যাতনে বাধা না দেয়া- এই পাঁচ ধরনের অপরাধের প্রতিটিই প্রমাণিত হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর মুক্তযুদ্ধকালীন আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর রায়ে বলেন, “তার যে   অপরাধ এর সবগুলোই সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। তবে গ্রেপ্তারের পর থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে ভর্তি আছেন। তার বয়স ও শরীরিক অবস্থা বিবেচনা করে এই সাজা দেয়া হয়েছে। ”
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে দমনের জন্য পাকিস্তানের সামরিক কর্তাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে শান্তি বাহিনী ও রাজাকার বাহিনী গঠন এবং সেগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় সভা করেন।

এ দুটি অভিযোগে প্রতিটিতে তাকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়।
তৃতীয় অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে উস্কানি দেয়ার ২৮টি ঘটনার কথা বলা হয়। চতুর্থ অভিযোগে ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতা বা সম্পৃক্ততার ২৩টি ঘটনা। এ দুটি অভিযোগের প্রতিটির জন্য তাকে ২০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দলটির যুদ্ধকালীন প্রধানের বিরুদ্ধে পঞ্চম অভিযোগ ছিল পুলিশ কর্মকর্তা সিরু মিয়া ও তার ছেলেকে হত্যার নির্দেশ দেয়, যার জন্য তাকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।


রায়ের দিন থেকেই প্রতিটি অপরধের সাজা একের পর এক কার্যকর হবে বলেও ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়েছে।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দেন গোলাম আযম। এসব আধা সামরিক বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশে ব্যাপক হত্যা ও নির্যাতন চালায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও প্রকাশ্যে তদবির চালান এই জামায়াত নেতা।
মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ১৯৭১ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তানে যান গোলাম আযম।

যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর সেখান থেকে চলে যান যুক্তরাজ্যে।
৭ বছর লন্ডনে অবস্থান করার পর ১৯৭৮ এ সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে আবার বাংলাদেশে আসেন এই জামায়াত নেতা; নাগরিকত্বও ফিরে পান। ১৯৯৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমিরের পদ থেকে অবসরে গেলেও দলটির তাত্ত্বিক গুরু হিসেবে সম্পৃক্ততা বজায় রাখেন।
গোলাম আযম ফেরার পর থেকেই একাত্তরের ভূমিকার জন্য তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন এবং ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ গণ আদালতে প্রতীকী বিচার ও ফাঁসির রায়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি চূড়ান্ত রূপ পায়।


সে সময় ক্ষমতাসীন সরকার সেই দাবিতে সাড়া না দিলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠনের মধ্য দিয়ে বহু প্রতীক্ষিত সেই বিচার কাজ শুরু হয়।
২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এর ভিত্তিতে ওই বছর ১২ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ২০১২ সালের ১১ই জানুয়ারি গোলাম আযমকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে বিচারকরা তাকে কারাগারে পাঠান। তখন থেকেই তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে রাখা হয়েছে।


এরপর পাঁচ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬১টি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করে গত বছরের ১৩ মে জামায়াতের এই সাবেক আমিরের বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ১৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হলেও গোলাম আযমের পক্ষে সাক্ষ্য দেন কেবল তার ছেলে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী।

সোর্স: http://bangla.bdnews24.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.