আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

তাঁর আবিষ্কারের নিহিতত্ত্ব।সত্যেন্দ্রনাথ বোস।

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে নাকি একলা চলতে হয়।

সত্যেন বোসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি তাঁর এই মৌলিক তাত্তি্বক আবিষ্কারের জন্য হলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সার্বিক অবদান ও প্রচেষ্টার নিহিতার্থ ভিন্নভাবে উপলব্ধি করার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্যেন বোসের অনেক গুণ ছিল। অত্যন্ত মেধাবী, অসাধারণ প্রতিভা, গভীর দেশাত্মবোধ, বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা এবং বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছে দেওয়ার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রচেষ্টা ও অবদান, তাঁর সংগীতপ্রিয়তা ও পারদর্শিতা_সব মিলে একজন বিদগ্ধ, প্রগতিশীল মানুষরূপে তাঁর কর্মময় জীবন তাঁকে সবার কাছে প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় করেছ। সত্যেন বোসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি তাঁর এই মৌলিক তাত্তি্বক আবিষ্কারের জন্য হলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সার্বিক অবদান ও প্রচেষ্টার নিহিতার্থ ভিন্নভাবে উপলব্ধি করার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সত্যেন বোসের অনেক গুণ ছিল। অত্যন্ত মেধাবী, অসাধারণ প্রতিভা, গভীর দেশাত্মবোধ, বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা এবং বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছে দেওয়ার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রচেষ্টা ও অবদান, তাঁর সংগীতপ্রিয়তা ও পারদর্শিতা_সব মিলে একজন বিদগ্ধ, প্রগতিশীল মানুষরূপে তাঁর কর্মময় জীবন তাঁকে সবার কাছে প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় করেছে আলী আসগর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জীবন বর্ণাঢ্য ও ঘটনাবহুল। বিশ্বজোড়া তাঁর খ্যাতি। বাঙালি জাতি তাঁকে নিয়ে গর্বিত। বিশ্ব বিজ্ঞানসভায় বাঙালি জাতি যে একান্তই বহিরাগত, অযোগ্য ও অপাঙ্ক্তেয় নয়, বরং মর্যাদার আসন লাভ করতেও সক্ষম, তা প্রমাণ করেছেন যে কজন বিজ্ঞানী, সত্যেন বোস তাঁদের প্রধান একজন।

তাঁর নাম যুক্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর আবিষ্কৃত কোয়ান্টাম সংখ্যায়নের জন্য। আইনস্টাইন ব্যক্তিগতভাবে সত্যেন বোসের প্রবন্ধ Plank’s Law and Light Quantum Hypothesis জার্মান ভাষায় অনুবাদ ও প্রশংসামূলক অভিমত দিয়ে Zeitschriftfur Physik-এ প্রকাশের জন্য প্রেরণ করেন। যে মূল বিচার্য আইনস্টাইনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হলো, বোস প্লাংকের কৃষ্ণকায়ার বিকিরণের নিয়মটি সনাতনী তড়িৎ-চৌম্বকতত্ত্বের স্বীকার্যকে ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ কোয়ান্টাম-তত্ত্বের স্বত সিদ্ধান্তের আলোকে উপপাদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের রিডার হিসেবে কার্জন হলে বসে সম্পাদিত তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে পরিচিত করল বিশ্বজুড়ে। সত্যেন বোসের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ অবশ্য তাঁর নাম অনুসারে বিশেষ মৌলিক, যা বোস সংখ্যায়নের নিয়ম মেনে চলে তাঁর নামকরণ।

যেসব কণিকার স্পিন জোড় সংখ্যায় প্রকাশিত, ফলে পাউলিও বর্জন নিয়ম মানে না তাদের বোসন বলা হয়। বিষয়টি আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভাষায় বললে দাঁড়ায়, যেসব কণিকায় বর্ণনাকারী ওয়েভ ফাংশন বা তরঙ্গ অপেক্ষার প্রতিসম, তারা বোসন এবং এরা যেকোনো সংখ্যক একই অবস্থাঙ্কে থাকতে পারে। বিষয়টি বিমূর্ত গাণিতিক সৌন্দর্যের। সত্যেন বোসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি তাঁর এই মৌলিক তাত্তি্বক আবিষ্কারের জন্য হলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সার্বিক অবদান ও প্রচেষ্টার নিহিতার্থ ভিন্নভাবে উপলব্ধি করার। সত্যেন বোসের অনেক গুণ ছিল।

অত্যন্ত মেধাবী, অসাধারণ প্রতিভা, গভীর দেশাত্মবোধ, বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা এবং বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছে দেওয়ার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রচেষ্টা ও অবদান, তাঁর সংগীতপ্রিয়তা ও পারদর্শিতা_সব মিলে একজন বিদগ্ধ, প্রগতিশীল মানুষরূপে তাঁর কর্মময় জীবন তাঁকে সবার কাছে প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় করেছে। তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে অনেক লেখাও হয়েছে। আমি নিজেও একাধিক প্রবন্ধ লিখেছি সেই সত্যেন বোসকে নিয়ে। এখানে তাঁর পুনরাবৃত্তি না করে অন্য এক ধরনের বিশ্লেষণে যেতে চাই সত্যেন বোসের বিশেষ অবদানের বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়নের। বিজ্ঞানীর জীবন ও কাজ সম্পর্কে উপলব্ধি এবং বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয়।

গুরুত্বপূর্ণ কারণ, বিজ্ঞানের আবিষ্কার শুধু প্রকৃতির ঘটনামালাকে বুঝতেই সাহায্য করে না, কার্যকারণের নিয়মে ক্রমাগত প্রকৃতির নিয়ম শুদ্ধতররূপে উদ্ঘাটনের ভেতর দিয়ে পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণের গভীরতর স্বাধীনতা দেয়। আকর্ষণীয় কারণ, বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কারের আড়ালে শ্রমের সঙ্গে প্রতিভা, সৃজনশীলতা, অনুসন্ধিৎসা এবং অনির্বচনীয় নানা ঘটনার আকস্মিক সম্মেলন আছে, যা একে অনিশ্চয়তা ও নাটকীয়তার শিহরণ দেয়। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ইতিহাসে এবং সেই কারণে বিজ্ঞানীর জীবনে এমন কিছু উপাদান আছে, যা উপস্থিত দুঃসাহসিক অভিযানের রোমাঞ্চকর কাহিনীর মধ্যে। বিজ্ঞান আসলেই একটি অন্তহীন অভিযাত্রা, সমগ্র মানবজাতির সেখানে অসংখ্য বিজ্ঞানীর উদ্ভাবনী মন তাঁদের প্রেরণাকে নিমজ্জিত করে বৈজ্ঞানিক সমস্যার মধ্যে। কোনো বিজ্ঞানী যখন খ্যাতি অর্জন করেন এবং তাঁর আবিষ্কার স্বীকৃতি লাভ করে তখন একটি গণহৈচৈ প্রচার ও প্রচারণা, এমনকি বাগাড়ম্বরও লক্ষ করা যায় কখনো কখনো।

প্রবণতা থাকে, একজন নায়ক সন্ধানের এবং আবিষ্কারের ঘটনাকে নাটকীয় রূপ দেওয়ার। আমি এখানে সেই উপরিগত জনপ্রিয়তা ও বাহ্যিক নাটকীয়তার কথা বলছি না বিজ্ঞানী ও তাঁর আবিষ্কার সম্পর্কে। কোনো বিজ্ঞানী ও তাঁর কাজকে উপলব্ধি করতে হলে বিজ্ঞানীর জীবন, তাঁর আবিষ্কারের ভৌত ও মানসিক পরিবেশকে উপলব্ধি করতে হবে সেই অনন্য বৈশিষ্ট্যে, যেখানে বিজ্ঞানী নিঃসঙ্গ, নিমগ্ন বিস্ময়ান্বিত ও দুঃসাহসী অভিযাত্রী নতুন আবিষ্কারের পথে। কোনো নতুন আবিষ্কার যখন সংঘটিত হয় সেখানে অনিশ্চয়তা থাকে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা থাকে, প্রতিবন্ধকতা, ভুলভ্রান্তি ও অসম্পন্নতা থাকে। এসব কাটিয়ে উঠতে মুক্ত মন, চিন্তার স্বাধীনতা, সাহসিকতা ও ঐকান্তিকতা চাই।

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সুনির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত পথ নেই। যে আবিষ্কার যত মৌলিক, সেখানে বিজ্ঞানীয় উদ্ভাবিত পদ্ধতিও তত অভিনব। বিজ্ঞানী যখন প্রথম কোনো তত্ত্ব বা সূত্র আবিষ্কার করেন, তখন তিনি নিজেই একমাত্র ব্যক্তি যে এ সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত এবং এর সমর্থক। কিন্তু বিজ্ঞানের তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতায় এটাও একটি শর্ত যে তা অন্তত নির্বাচিত বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের কারো কারো কাছে বোধগম্য হতে হবে। এই যে নিঃসঙ্গ একা পথ চলে কোনো নতুন সত্যকে এককভাবে উপলব্ধি করা এবং তারপর ধাপে ধাপে অন্যদের কাছে পেঁৗছে দেওয়া, তা এক জটিল দীর্ঘ অভিযাত্রা।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীর জীবন ও তাঁর কাজ বর্ণিত হয় শুধু সাফল্য এবং জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে। কিন্তু কোনো বিজ্ঞানীকে জানতে হলে এবং তাঁর আবিষ্ক্রিয়ার সামগ্রিক পরিবেশ বুঝতে হলে স্বীকৃতি লাভ ও জনপ্রিয়তা অর্জনের পূর্ববর্তী যে নিঃসঙ্গ, অজ্ঞাত দশায় অনিশ্চিত পথে বিজ্ঞানী যুদ্ধ করে চলেন তা উদ্ঘাটন ও অনুধাবন করতে হবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসের এই অংশটুকু স্বভাবতই অস্পষ্ট, কুয়াশাচ্ছন্ন। দেখা গেছে, বিজ্ঞানীরা নিজেও জানেন না তাঁদের আবিষ্কারের রহস্য। স্বাভাবিক কিছুটা অনুমান ও সত্তাকে অবলম্বন করে সত্যেন বোসের আবিষ্কারের পরিবেশ এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করার প্রয়াস থাকবে এ প্রবন্ধে।

প্রচলিত যে ধারা বিজ্ঞানীর জীবনী ও কর্ম তুলে ধরার, সেখান থেকে সরে এসে সত্যেন বোসকে তাঁর আবিষ্কারের পরিবেশে সৃষ্টিশীলতার আবহে বিশ্লেষণ করতে চাই। এ জন্য যে প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হবে তা হলো : সত্যেন বোসের জন্য কেমন করে সম্ভব হলো তাঁর কোয়ান্টাম সংখ্যায়নতত্ত্ব আবিষ্কার করা আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র ইউরোপ থেকে বহু দূরে অবস্থিত ঢাকায় বসে? কোয়ান্টাম সংখ্যায়নতত্ত্ব কী অর্থে ভিন্ন সনাতনী সংখ্যায়নিক পদার্থবিদ্যা থেকে? প্লাংকের উপপাদান কী অর্থে সন্তোষজনক ছিল না? বোস আইনস্টাইন সংখ্যায়নে আইনস্টাইনের অবদান কী? বোসের আবিষ্কারের সময় কী পরিবেশ ও কী ধরনের বৈজ্ঞানিক যোগাযোগ ছিল তাঁর? কী বিশেষ কৌশল বোস ব্যবহার করেছেন? তাঁর ব্যবহৃত সংজ্ঞা ও অনুমানগুলো কী অর্থে সৌভাগ্যজনক ছিল? সেই সংজ্ঞামূলক অনুকল্পগুলো কী? বোস আইনস্টাইনের সংখ্যায়নিক-তত্ত্বে কণিকা তরঙ্গ দ্বিত্ব কিভাবে প্রভাব রেখেছে? বোসের আবিষ্কারের প্রভাব কিভাবে আমরা দেখতে পাই পরবর্তী সময়ে? বোস যে আবিষ্কারের ধারা সৃষ্টি করেছিলেন কেন তা অব্যাহত থাকেনি পরবর্তী সময়ে? বোসের সৃষ্টিশীলতায় মানসিক রূপ কেমন ছিল? তাঁর অবদান দেশে ও বহির্বিশ্বে কেমনভাবে মূল্যায়িত হয়েছে? প্রথমেই দেখা যাক, কেন বোস এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব লাভ করলেন? সত্যেন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৯৪ সালে কলকাতায়। সে সময়টায় জাতীয়তাবাদের চেতনা সারা বাংলায় জেগে উঠেছিল প্রবলভাবে। শিক্ষিত দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ জনগণের একটি অংশ বিশ্বাস করত যে পরাধীনতা ও বিদেশি আধিপত্য থেকে মুক্তিলাভের একটি পথ হলো বিজ্ঞানচর্চা। এই চিন্তায় মূল উদ্ভাবক ছিলেন অবশ্য রাজা রামমোহন রায়।

পরবর্তী সময়ে মহেন্দ্রনাথ সরকার লন্ডনের বয়্যাল ইনস্টিটিউটের অনুসরণে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন অব সায়েন্স প্রতিষ্ঠিত করেন বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে দেশকে জানা ও মুক্তিলাভের কৌশলরূপে। এখানে গবেষণা শুরু করেন সিভি রমন। পরবর্তী সময়ে স্যার আশুতোষ মুখার্জি তাঁকে নিয়ে যান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন রমণ। ক্রিয়ার জন্য প্রথমে যে বাঙালি বিশ্বখ্যাতি লাভ করেন, বিজ্ঞানে অবদানের জন্য তিনি হলেন জগদীশচন্দ্র বসু। তাঁর জন্ম ঢাকার বিক্রমপুরে।

১৮৯৫ সালে জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতা টাউন হলে প্রদর্শন করলেন প্রথমবারের মতো তাঁর হীন তড়িৎ-চৌম্বক তরঙ্গ প্রেরণ এবং ১৮৯৬ সালে বয়্যাল ইনস্টিটিউটে লর্ড বেলভিনের উপস্থিতিতে একই উদ্ভাবন প্রদান করলেন। মার্কনি পরবর্তী সময়ে এই বেতার যোগাযোগ সৃষ্টি ও এর প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন। বস্তুত বিচ্ছিন্নভাবে হলেও বিজ্ঞানচর্চার ভিত্তি এবং তার চেয়েও বড় কথা বিজ্ঞানচর্চায় প্রেরণা ও অনুসন্ধিৎসা অবিভক্ত ভারতে সূচিত হয়েছিল। ফলে প্রেসিডেন্সি কলেজে উজ্জ্বল প্রতিভাধর কিছু শিক্ষকের সমাবেশ ঘটে, যেখানে সত্যেন বোস গণিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন। তাঁর সহপাঠী ছিলেন মেঘনাদ সাহা ও নিখিলরঞ্জন।

১৯১৩ সালে বিএসসি অনার্স পরীক্ষায় সত্যেন্দ্রনাথ প্রথম হলেন। ১৯১৫ সালে এমএসসি মিশ্র গণিতে একই ফল করলেন। সংক্ষেপে এই ছিল সত্যেন বোসের শিক্ষার পটভূমি। কিন্তু একটি ছোট্ট ঘটনার কথা উল্লেখ্য। ১৯০৪ সালে সত্যেন বোসের এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বসন্ত রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাঁর পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হলো না।

একটি বছর নষ্ট হলো বটে, কিন্তু এই সময় সত্যেন বোস উচ্চতর গণিত রপ্ত করে ফেললেন। আমার অনুমান, এই উচ্চতর গণিতে পারদর্শী হয়ে ওঠার সুফল তাঁর গবেষণায় প্রতিফলিত হয়েছে। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র হিসেবে জেসি বোস ও পিসি রায়ের সাহচর্য লাভের সুযোগ পেয়েছেন সত্যেন বোস। সেই সঙ্গে বিজ্ঞানী হওয়ার প্রেরণা সহপাঠী বন্ধু মেঘনাদ সাহা এবং প্রফুল্লচন্দ্র মহলানবিস সত্যেন বোসকে প্রভাবিত করেছে কোয়ান্টাম সংখ্যায়নতত্ত্বে গবেষণা করতে। মেঘনাদ সাহা সত্যেন বোসের সঙ্গে শুধু গবেষণা করেননি, তাঁরা একত্রে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ ও সাধারণ তত্ত্ব জার্মান থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।

সেটাই ছিল প্রথম অনুবাদ, যা প্রকাশের জন্য সত্যেন বোস আইনস্টাইনকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠিও দিয়েছিলেন। সত্যেন বোস যখন তাঁর কোয়ান্টাম সংখ্যায়নিক-তত্ত্ব আইনস্টাইনের কাছে পাঠান, তখন এই পূর্ব ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন। হতে পারে এই পূর্ব যোগাযোগ ব্যস্ত আইনস্টাইনকে প্রভাবিত করেছিল সত্যেন বোসের অনুরোধকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে। অনেক সময় কর্মব্যস্ততা ও বিশেষ তাত্তি্বক ধারণার প্রভাব নতুন ভাবনাকে ব্যাহত করে। সত্যেন বোস ইউরোপ থেকে দূরে ছিলেন এবং প্রত্যক্ষ প্রভাবমুক্ত থেকে গিবস ও প্লাংকের সংখায়নিক তত্ত্ব পড়ায় সুযোগ পান।

বন্ধু মেঘনাদ সাহা পাউলিও আইনস্টাইনের এ-সংক্রান্ত কাজের সঙ্গেও সত্যেন বোসকে পরিচিত করেন। সব মিলে একটি অনুকূল পরিবেশ কাজ করে সত্যেন বোসের জন্য, অবশ্য সেটা শুধু একটি সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছে। মূল শক্তি জুুগিয়েছে তাঁর নিজস্ব প্রতিভা ও স্বাধীনভাবে উদ্ভাবনী চিন্তার মানসিকতা। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা যখন ব্যস্ত ছিলেন বোয়ের পারমাণবিক-তত্ত্ব নিয়ে, সত্যেন বোস তখন কোয়ান্টামতত্ত্ব ও সংখ্যায়নিক বলবিদ্যার মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। তিনি অবশ্য অনুপ্রাণিত হন আইনস্টাইনের প্রদত্ত এই ধারণা থেকে, যেসব সংখ্যায়নিক বলবিদ্যার ভিত্তি হতে হবে কোয়ান্টাম ধারণা।

নার্মস্টের তাপ বলবিদ্যার তৃতীয় সূত্রও তাঁকে অনুপ্রাণিত করে থাকবে। আইনস্টাইনই প্রথম প্লাংকের কোয়ান্টাম ধারণাকে বলবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করে ব্রাউনীয় অস্থিরতাকে ব্যাখ্যা করেন। প্লাংকের উপপাদনে যে বিষয়টি আপত্তিকর মনে হয়েছে, তা হলো সে অনুরণনশীল যান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মডেল ধরে সেখান থেকে কোয়ান্টামতত্ত্ব দাঁড় করানো। এ ছাড়া প্রতিটি নির্বাচনকে সমান সম্ভাবনা ধরে নেওয়া যুক্তিসংগত মনে হয়নি আইনস্টাইনের কাছেও। সত্যেন বোসই প্রথম পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি মৌলিক কণিকাগুলোকে অপার্থক্যযোগ্য বলে গণ্য করেছেন।

এ ছাড়া আলোর কণিকা ফোটনের জন্য, এদের তাপীয় স্থিতিশীল অবস্থায় দুটি পোলারিত দশা থাকে বলে স্বীকার্যরূপে গ্রহণ করেছেন। এই কণিকাগুলো ভরহীন। কণিকাগুলোর সংখ্যা সংরক্ষিত নয়। দশাস্থানকে যেসব কোষে ভাগ করা হয়, তাদের আয়তন হবে প্লাংকের ধ্রুবকে তিন খাতে তুললে যা হয় তার সমান কোষগুলোর সংখ্যা নির্দিষ্ট হবে এবং এরা চিহ্নিত হবে কতটি কণিকা সেখানে আছে তার ভিত্তিতে। কণিকাগুলো সংখ্যায়নিক নিরপেক্ষতা রক্ষিত না হলেও কোষগুলোর সংখ্যায়নিক নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে।

বোস ঢ়=, অর্থাৎ কণিকার ভরবেগকে এর শক্তিকণা ও আলোর গতির অনুপাতরূপে প্রকাশ করেন। বোস পরিসংখ্যায়নের একটি বড় সাম্প্রতিক ফল হলো, বোস ঘনীভবন, যেখানে অতি পরিবাহিতা ও অতি ফ্লুয়িডিটি? ব্যাখ্যা আমরা পেতে পারি কণিকায় ওয়েভ ফাংশনের প্রতিসাম্যতা সৃষ্টি করে। সত্যেন বোস কেন তাঁর সৃষ্টিশীলতার ধারা বজায় রাখতে পারেননি, তার দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো : সত্যেন বোস বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক ভাবনাকে পরিচালিত করেছেন। বিশেষ করে পরীক্ষামূলক গবেষণায় তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁকে ব্যস্ত করে তোলে। তিনি অনেক বিষয় শুরুও করেছিলেন, যেমন এঙ্-রে অপবতন, চুম্বকত্ব, তড়িৎ চৌম্বক বিকিরণের পূর্ণ প্রতিফলন ইত্যাদি।

কিন্তু পরাধীন দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থ জোগান আসেনি। বিশ্বজুড়ে গবেষণা, বিশেষ করে ভৌত গবেষণা সংগঠিত, ব্যয়বহুল ও পরিকল্পিত হয়ে উঠেছে। রোমান্টিক একক বিজ্ঞানীর অবস্থা থেকে দলগতভাবে পারস্পরিক সহযোগিতার যুগে ব্যক্তি-প্রতিভা আকস্মিক কিছু বড় কাজ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা অপরিহার্য সুত্রঃ- শিলালিপি

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.