আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মহাকাশ : মানবজাতির চতুর্থ যুদ্ধক্ষেত্র ।


জোসেফ.ডব্লিও.এশি , কমান্ডার-ইন-চীফ অফ ইউ-এস স্পেস কমান্ড , মহাকাশ বিষয়ক মাসিক পত্রিকা " Progressive Magazine, January 2000" সংখ্যায় লিখেছেন "রাজনৈতিক ভাবে বিষয়টি স্পর্শকাতর , কিন্তু তা ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে । কিছু মানুষ বিষয়টি নিয়ে শুনতে চায় না এবং বিষয়টি তারা অস্পষ্ট মনে করে। কিন্তু নিশ্চিত-ভাবেই আমরা সবাই মহাকাশে যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা মহাকাশ থেকে যুদ্ধ ও মহাকাশে যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আর তাই আরা (মহাকাশে যুদ্ধের প্রস্তুতি-সরূপ) উচ্চ-শক্তি সম্পন্ন ও মারণাস্ত্র তৈরী করছি।

আমরা জাহাজে, বিমানে ও মূলত ভূমি হতে মহাকাশে নিক্ষেপণ-যোগ্য অস্ত্র তৈরীর দিকে মনোযোগী হচ্ছি"[/sb যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ভূমি, সাগর ও আকাশের পরেই মহাকাশের অবস্থান। প্রায় অর্ধশতাব্দি ধরে একে অপটিমাইজ করা হয়েছে। প্রায় ৯০০ স্যাটেলাইট পৃথিবীর প্রাত্যহিক আবহাওয়া monitoring, অনুসন্ধান এবং তথ্য উদ্ধারে সাহায্য, সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় সনাক্তকরণ ,সামরিক স্থান সনাক্তকরণ ,এর কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা , এর তথ্য পাঠানো , সরাসরি সামরিক সাহায্য সহ আরো অনেক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২৭০টি সামরিক স্যাটেলাইট ও ৬০০টি বেসামরিক স্যাটেলাইট ও আরো বিভিন্ন multi-purpose স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে। অনেক স্যাটেলাইট ক্রমবর্ধমানভাবে ‘dual-use' করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দিয়ে সামরিক এবং বেসামরিক উভয় অপারেশনে ব্যবহার করা যায়।

আমেরিকা সর্বদাই মহাকাশের সর্বাপেক্ষা সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করেছে , যা করার জন্য তারা খুবই আগ্রহী ছিল। অন্যান্য অগ্রসর দেশ ও জাতি এর সুবিধা নেয়ার জন্য সচেতন হচ্ছে , পাশাপাশি নিজেদের জন্য এথেকে উপকারিতা পেতে বিভিন্ন চেষ্টা ও গবেষণা করছে। মহাকাশের সামরিকিকরন মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হতেই মহাকাশ নিয়ে মানুষের আগ্রহ শুরু হয়। জার্মানিরা রকেটের উন্নতিসাধন করেছিল যা ছিল ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম। বিশ্বযুদ্ধে তাদের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারন ছিল এরোডাইনামিক্স ও রকেট প্রযুক্তির উচ্চ-শিক্ষা সম্পন্ন গবেষকদের আমেরিকা কর্তৃক অপহরণ ও রাশিয়ার কর্তৃক তাদের মিসাইল চুরি।

আমেরিকার সেনাবাহিনী ১৯৪৬ সালে চাঁদ ও এর সঙ্গে radar যোগাযোগ অর্জন , ১৯৫৪সালে Navy কর্তৃক একটি reflector আবিষ্কার এবং সেটি দিয়ে চাঁদের সাথে যোগাযোগ পরীক্ষা শুরু , ১৯৫৯ সালে এটি দিয়ে Hawaii এবং ওয়াশিংটন DCএর মধ্যে একটি তথ্য আদান-প্রদান সংক্রান্ত সংযোগ প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ১৯৫৭ সালে , রাশিয়া পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছতে সক্ষম প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুৎনিক ১, সফলভাবে চালু করেছিল। যা পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক, আন্দোলন ও প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল। তারা রাশিয়াকে প্রতিযোগী ভাবতে শুরু করল। শুরু হল মহাকাশ দখলের প্রতিযোগিতা।

শীতল যুদ্ধের সময় মহাকাশ দখলের প্রতিযোগিতা চুড়ান্ত রূপ নিল। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি Ronald Reagan এর মধ্যে প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিল যে ,লেসার কণা অথবা beam প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধাওয়া করতে, আগমনরত শত্রু-রাস্ট্রের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে ও একই সাথে আমেরিকাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম একটি shield তৈরী করার কথা। কিন্তু পরবর্তিতে "কৌশলগত প্রতিরোধ প্রবর্তন" অথবা " তারকা Wars " নীতি হিসাবে খ্যাত এই নীতিটি গুরুতর কৌশলগত ঝামেলা , ২৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙ্গে পড়ার কারনে তা বাতিল করা হয়। পরে আবারো Reagan সরকার থেকে পরবর্তিতে ধারাবাহিকভাবে সকল সরকার মহাকাশে আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ করতে, মহাকাশে অস্ত্র মজুদ করতে ও এই চতুর্থ সামরিক উৎসটিকে আরো dominant করতে আগ্রহী হয়। তারা বিশ্বাস করে নতুন এই সামরিক স্থানটির উপযুক্ত ব্যবহার তাদের আরো উপরস্থ সামরিক সক্ষমতায় পৌছে দেবে।

space-based অস্ত্রশস্ত্র তৈরী করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম জাতি হিসাবে বিশ্বের বুকে আবির্ভুত হতে চেয়েছিল। বিভিন্ন দেশগুলোর মহাকাশ নিয়ে কার্যক্রম ২০০৭ জানুয়ারিতে চীনের একটি আবহাওয়া স্যাটেলাইট , পৃথিবীর ৫০০ মাইল উপরে ধ্বংস করতে সক্ষম একটি ground-based medium-range ballistic ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। যথারীতি সারা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় উঠা শুরু হল। Gordon Johndroe , আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ মুখপাত্র বলল "চীনের মহাকাশ সংক্রান্ত অস্ত্রের উন্নতিসাধন এবং অস্ত্রশস্ত্রের পরীক্ষাকরণ বৈশ্বিক co-operation এর সঙ্গে খাপ-ছাড়া" । জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকা এ ঘটনা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল , কারণ এটি ছিল আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মহাকাশ নিয়ে প্রতিযোগিতা করার পর প্রথম উপগ্রহ ধাওয়া/ধ্বংশ করার পরীক্ষা।

নতুন প্রতিযোগি মাঠে আসায় অনেকেই অসন্তোষ হল। আমেরিকা চীনকে ভবিষ্যৎতের একটি সম্ভব্য বিপক্ষ/শত্রু হিসাবে বিবেচনা করল ও মহাকাশ dominance এর ক্ষেত্রে বিশাল threat হিসাবে গন্য করল। ১৯৮০ সালের পর হতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমেরিকা বাদে চীনই প্রথম একটি ground-based ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালাল। অবশ্য চীন এটি গোপনে করেছিল । পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে তারা মহাকাশকে সামরিক উদ্দ্যেশ্যের জন্য স্থান হিসাবে ব্যবহার করাটাকে অবিরামভাবে বিরোধিতা করছিল।

চীনের ট্রান্সপারেন্সির অভাব আমেরিকার জন্য এক দুশ্চিন্তার কারন হল। চীনের ব্যাপক ভাবে space-based বিজ্ঞান কর্মসূচী , দিকনির্নয়, telecoms এবং imagery স্যাটেলাইট তৈরী করল। আর স্যাটেলাইটের ‘dual-use এর কারণে কোনটা সামরিক আর কোনটা বেসামরিক স্যাটেলাইট তা বের করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা অন্যান্য সবাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। ২০০৫ পর্যন্ত, ৪৫ দেশ , যার যার নিজস্ব উপগ্রহ চালু করল। ভারত এবং চীন, মহাকাশ নিয়ে নিজেদের কার্যক্রম দ্রুত বিকশিত করল।

ভারত surveillance করার উদ্দেশ্যে নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রথম সামরিক উপগ্রহ উৎক্ষেপন করে। রাশিয়া, চীন, ভারত, ইজরায়েল, জাপান এবং European.Space.Agency(.ESA) এমন ধরনের সুবিধা চালু করল , যাতে অন্যান্য দেশসমূহ অর্থের বিনিময়ে তাদের সেটেলাইট ব্যবহার করতে পারে। রাশিয়া এবং চীন , তাদের নিজেদের আসল অস্ত্রশস্ত্রের সংখ্যা ,এর প্রমাণ ও মহাকাশে weaponisation এর বিরোধিতা করে আসছে ধারাবাহিকভাবে। আবার একই সাথে আন্তর্জাতিক মহলে রাশিয়ার সঙ্গে চীন মহাকাশের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র নষ্ট করতে একটি আন্তর্জাতিক সন্ধি তৈরি করতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। US Space Command , তাদের নতুন মহাকাশ সংক্রান্ত নীতিমালায় বলেছেন "‘In this new century, those who effectively utilize space will enjoy added prosperity and security and will hold a substantial advantage over those who do not.'" নীতিমালায় আরো বলা রয়েছে ""Nations built navies to protect and enhance their commercial interests, by ruling the seas. Now it is time to rule space." "the use of Army, Navy, and Air Force and Space forces, was set up in 1985 to help institutionalize the use of space explicitly mentions' the US wants to ‘control space to protect its economic interests and establish superiority over the world, সম্ভাব্য সমাধান মহাকাশ দখলের এ প্রতিযোগিতার একটি প্রধান কারন হল , বিভিন্ন দেশগুলো তাদের নিজেদের/দেশের স্বার্থের কারনে , রাজনীতির কারনে , বিশ্বের প্রভাব বাড়াতে মহাকাশ ব্যবহার করাটা তাদের অধিকার মনে করে।

আমেরিকা সর্বদাই মহাকাশে exploration এবং শান্তিপূর্ণ ব্যবহার করার এক সার্বিক চুক্তির সমস্ত প্রচেষ্টাতেই veto দিয়েছে। আর তাই জাতিসংঘ ও ব্যার্থ ও হয়েছে। আমেরিকার মত চীন এবং রাশিয়া তাদের জাতীয় আগ্রহকেই প্রথমে রাখে। জাতীয় আগ্রহকে supersede করে এমন কোনো চুক্তিই তারা করতে চায় না । ভবিষ্যৎ খিলাফত রাস্ট্র মহাকাশ ব্যবহার করা ও তার exploration ও শান্তিপূর্ণ ব্যবহার করার ব্যাপারটিকে এক অনন্য ও ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখবে এবং এর বিষয়ে এক সুনির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করবে।

মহাশূন্য এমন একটি অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে যেটি কোন জাতি তার মালিকানা দাবি করতে পারেনা , যদিও সকল জাতি এর দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিশ্বের সাগর এবং সবার সাধারণ সম্পদ/গণমালিকানা সম্পদ যেমন সুয়েজ খাল এবং সিল্ক রুটের (পূর্বের) মতই মহাকাশকে ব্যবহার করতে হবে। পূর্বে এ ধরনের সাধারণ সম্পদ গুলো স্থানীয়ের কর্তৃপক্ষের/রাস্ট্রের অধীনে ছিল এবং একটি ট্যাক্স ধার্য করা ছিল। এ ট্যাক্সের অর্থ দিয়ে সেই সম্পদ গুলো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষন করা হতো। উদাহরন সরূপ বলা যায় , উসমানীয় খিলাফত ভুমধ্যসাগরের পোতাশ্রয় ও বন্দরের উন্নয়নের জন্য ট্যাক্স ধার্য্ করেছিল।

মহাকাশ এমন এক এলাকা, যা সকল দেশের সীমানাকেই অতিক্রম করে। আর তাই মহাকাশকে আমাদের এইডস, ক্যান্সার, গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে কাজে লাগাতে হবে। ইসলামে গণমালিকানা সম্পদের ব্যবহারে সকল মুসলমানরা সমান হক রয়েছে। কিছু গণমালিকানা সম্পদের উদাহরন হল নদী , খাল, বন , সাগর ও মহাকাশ। তাই এই গণমালিকানা সম্পদে সবার সমান অংশ রয়েছে।

গণমালিকানা সম্পদকে কেউ ব্যাক্তিমালিকানায় নিতে পারবেনা। খিলাফত রাস্ট্র মহাকাশের এই অসীম সম্পদের সুষ্ঠ ব্যাবহার নিশ্চিত করতে শরীয়াহর দৃষ্টিতে বাধ্য। কারন খিলাফত রাস্ট্র পুঁজিবাদী নীতি তথা self-interest এর দৃষ্টিতে একে দেখবে না। বরং এমন এক দৃষ্টিতে দেখবে , যার ব্যাপারে কাল হাশরের ময়দানে তাদের ( দায়ীত্বশীলদের) প্রশ্ন করা হবে। এ থেকে সঠিক উপযোগিতা আদায় করা-সংক্রান্ত সকল কার্যাবলীর ব্যাপারে দায়ীত্বশীলদেরকে মহান আল্লাহ তাআলার নিকট জবাবদিহী করতে হবে।

মহাকাশের ব্যাপারে ভবিষ্যৎ খিলাফত রাস্ট্রের সম্ভাব্য কিছু মৌলিক দৃষ্টিভংগি হল : ১। মহাকাশ এক বিস্তৃত , বিশাল এলাকা , যা কোনো দেশ বা জাতি নিজের বলে দাবি করতে পারে না। ২। মহাকাশের সম্পদ আহরন , এর গবেষণা , উন্নয়নের জন্য সকল জাতিকে একযোগে কাজ করা উচিত। ৩।

সুনামি সহ অন্যন্য বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সতর্কতা সংকেত প্রেরণ ও আবহাওয়া গবেষনার উদ্দেশ্যে স্যাটেলাইটের আরো উন্নতিসাধন। ৪। মহাকাশে অস্ত্র মজুদ ও ব্যাবহারের প্রশ্ন তখনই উঠতে পারে যখন সকল দেশ সমান ভাবে মহাকাশের ব্যাবহার করতে পারছে, নির্দিষ্ট কিছু সুপার-পাওয়ার নয়। ৫। ইসলামের দৃষ্টিতে , গণমালিকানা সম্পদের সঠিক ,উত্তম ব্যাবহার নিশ্চিত করা খিলাফত রাস্ট্রের শরীয়াহ-প্রদত্ত দায়ীত্ব।

৬। রাসুল (সা এর হীলফুল ফুযুল এর চুক্তির মতই খিলাফাত রাস্ট্র মহাকাশের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চুক্তি করবে। বিশ্বের সকল জাতিকে মহাকাশের উত্তম ব্যাবহার নিশ্চিত করার জন্য নিঃস্বার্থভাবে , মুক্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে। মহাকাশের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য সব দেশের গবেষকদের সমানভাবে কাজ করা উচিত।
 


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।