আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কী যে পোড়া কপাল!

সত্যানুসন্ধিৎসু

মোশারফ চলে গেছে লক্ষীপুরে - ঈদ করতে। যাবার প্রস্তুতি চলছে সরোয়ারের মধ্যেও। দুপুরের পর পরই ঈদের ছুটি দিয়ে দিলাম সকল ষ্টাফকে। বিকেল নাগাদ রিসিপশনিষ্ট, পিওন সবাই একে একে যার যার দেশে চলে গেল। বন্ধু আলমগীরের সঙ্গে এলভিসকে তার নানার বাড়ি পাকশী পাঠিয়ে দিলাম ঈদ করতে।

ঈদ করতে ঢাকা থেকে কেবল আমিই কোনও দিন বাড়ি যেতে পারিনি। পারিনি বলতে - ইচ্ছে ছিল কিন্তু ঝামেলার জন্য যাওয়া হয়নি - ব্যাপারটা তা নয়। আমি যাই না, কারণ, নিজের ভিটেমাটি বলে সকলেরই একটা ঠিকানা থাকে, আমার সেরকম কিছু নেই। তাই, কোনও ঈদে বাড়ি যাবার প্রশ্ন আসে না। যাবার মতো আমার অন্যকোনো জায়গাও নেই।

বাবা মৃত্যুর আগে তার স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি আমার সৎ মা ও সৎ ভাইবোনদের নামে উইল করে গেছেন। এই কারণে দেশের বাড়ির উপর আইনগত কোনও অধিকার আমার নেই বলে জানি। স্বাধীনতাযুদ্ধের পরের বছর জুন মাসে আমার মা হার্টফেইল করে মারা যান। তখন আমি দশম শ্রেনীর ছাত্র। আমার ছোট দু’বোন, তাদের বিয়ে-থা আমিই দিয়েছি এবং এখন তারা সুখে আছে।

যাহোক, যে ঘরটায় আমি থাকতাম সেই ঘরে এখন আমার সৎ মা থাকেন। আমার বিয়ের পর এসব নিয়ে বাবার সাথে বিবাদের পর আমি রাগ করে সেই যে বাড়ি থেকে চলে এসেছি, আর ফিরে যাইনি। আর সেদিন থেকেই আমার স্থায়ী ঠিকানা বলে যেটুকু ছিল তা ধুয়েমুছে গেছে। আগামীকাল ঈদ। এই ঈদের বাজারে ঢাকায় তেমন লোকজন নেই, সব যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

প্রত্যেকবার ঈদ এলে এমনটাই দেখা যায়। রাজধানীর অর্ধেকেরও বেশি লোক শহর ছেড়ে চলে যায় আপন-আপন ঠিকানায়, কোলাহলময় শহর যেন হয়ে পড়ে নীরব-নিস্তব্ধ। আমাদের নতুন ব্যবসা, ঈদের প্রাক্কালে এ ব্যবসায় লাভ-লোকসানের ব্যাপার ততটা গুরুত্বপুর্ণ না হলেও অফিসে উপস্থিত থাকতে হয় তাই অফিসে আসা। সকাল-সকাল বাড়ি ফিরে এলাম। ঈদের বাজার বলতে বড় ধরনের কিছু করতে পারিনি বলে স্ত্রীর কাছ থেকে এক ধরনের নীরব ভর্ৎসনা পেতে লাগলাম।

নিজের জন্য তো নয়-ই এমনকি কারো জন্যই কিছু কেনা হয়নি। বলেছি, এবারের ঈদটা কোনোমতে পাড়ি দিয়ে আগামী ঈদে যা যা করণীয় করবো। কিন্তু আমার কথায় খুশী হতে পারেনি আমার স্ত্রী সুলতানা। আমার নতুন এই ব্যবসার বয়স সবেমাত্র পনর দিন। সেখানে এখনো পরিপুর্ণভাবে গোছগাছ করে ওঠাই সম্ভব হয়নি।

আর অভাবও যেন আমার পিছু ছাড়ছে না। কবে যে আমার এ দৈন্যতা দূর হবে তা এখানও জানি না। রাতে এসব নিয়ে সুলতানা আমার সঙ্গে ভীষণ ঝগড়া শুরু করে দিল। তার কাছে আমার কোনও যুক্তিই গ্রহণযোগ্য হয় না। তার চাই হাজার হাজার টাকা, যখন প্রয়োজন তখনই তাকে সেই টাকা দিতে হবে।

দিতে না পারলেই আমি খারাপ, আমি অথর্ব, আমি জঘন্ন। কখন ঘুমিয়েছি মনে নেই। সকাল ছটায় ঘুম ভাঙলে বিছানা থেকে উঠে আগে একটা ঔষধ খেয়ে নিলাম। শরীর বেশ দুর্বল লাগছিল, গতকালের মতো জ্বরের প্রাবাল্য আজ অবশ্য ছিল না তবে শেষ রাতের দিকে ঘুমানোর ফলে চোখে ঘুমের আবেশ তখনও লেগেছিল। কিন্তু সবাই ঘুম থেকে উঠলো বেশ বেলা করে দশটায় যখন অফিসের পিওন দুটো এসে দরজার কড়া নাড়লো।

কেমন যেন গুমোট ধরেছিল বাড়ির আবহাওয়া। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সারারাত এমনকি আজও সারাক্ষণই সুলতানা আনমনে একা-একা বক-বক করেই যাচ্ছিল। সন্ধ্যায় পিওন ছেলেগুলো মটরশুটি ছড়াচ্ছিল। ড্রইংরুমের বিছানায় শুয়ে সুলতানা ক্ষুব্ধ স্বরে বললো, এ বাড়ির সব কিছু ঠিকঠাক করে দিয়ে আমি চলে যাব।

আমি আর এ বাড়িতে থাকবো না। সুলতানার এই হুমকি আর ভর্ৎসনা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। বলতে গেলে বিয়ের পর থেকে এযাবত এতো শুনেছি যে, ওসবে আমার কান যায় না। ওসব কথার উত্তর দিতে গেলে ওর সাথে ঝগড়ায় অংশ নিতে হয়, কিন্তু তা আমি কখনও করি না। বিরক্তির বশেই করি না।

আমার খুব রাগ হয়, সেই রাগকে কষ্ট করে দমিয়ে রাখতে হয়। বাড়িতে অফিসের পিওনরা আছে, তাই কোনো কথা বাড়ালাম না। সকালে লাচ্ছা সেমাই আর দুপুরে খিঁচুড়ি রান্না হয়েছিল, রাতে আর নতুন কোনো রান্না হলো না। ঈদের জন্য সব ধরনের কাঁচা বাজার করেছিলাম। অফিসের পিওন দুটো ঈদে বাড়ি যাবে না বলে বাসায় এসে থাকতে বলে দিয়েছিলাম।

কিন্তু বাসায় এ অবস্থার জন্য ওদেরও তেমন খাওয়া জুটলো না দেখে খুব অপমানিত বোধ করতে লাগলাম। বাড়িতে ছেলে-মেয়েরা রয়েছে যারা এখন আর ছোট্টটি নেই। কিন্তু ভয়ে কেউ তার সাথে কথা বলতে সাহস পায় না। তার চালচলন কথাবার্তা এমনই ভীতিকর যে, মনে হয় যে উনিই শহরের অলিখিত মেয়র আর অন্যেরা অচ্ছুৎ-অস্পৃষ্য বস্তিবাসী যাদের বেঁচে থাকার কোনওই অধিকার নেই। তার আচার-আচরণ এমনই অপ্রতিরোধ্য যে, সকলের জন্যই তা অসহনীয় পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।

ফলে সংসারের কাজকর্ম হয়ে পড়েছে স্থবির। একেক সময় একেকটি বাতিকে পেয়ে বসে তাকে। এসব বাতিকের ভূত তাড়াতে-তাড়াতে সবাই এখন ক্লান্ত। আমার চরিত্রটা যেন আজন্ম দুর্ভাগ্যপীড়িত; ঠিক কোনখানে আমার ত্রুটি সেকি আমার জন্মই দায়ী কি কর্মগুণ যে বৈশিষ্টের কারণে আমি এরকম হয়ে পড়েছি, তা আমি বুঝিনা। শুধু এটুকুই বুঝি যে কেউ আমার দ্বারা কষ্ট পেলে তা আমার মনেও কষ্ট হয়ে বিঁধে।

আমার যত অনিয়ম, ব্যর্থতা সব দুঃশ্চিন্তা আর অনাহারের সঙ্গে মিলেমিশে সয়লাব হয়ে গেছে। দাম্পত্য জীবনকে আমি অশান্তির অপর নাম বলে জেনেছি। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সাথে অনুক্ষণ টেনশন, বিরক্তি এবং স্ত্রীর পীড়াদায়ক আচরণ জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। আমার খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই, ঘুমের কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই, জীবনযাত্রা পুরোটাই এলোমেলো। আমি আজ তিন দিন ধরে অসুস্থ, কিন্তু তাতে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই।

নিজেই ঔষধপত্র খেয়ে যাচ্ছি নেতিয়ে পড়া শরীরটাকে কিছুটা সবল করা যায় কি-না সেই আশায়। ঈদের দিন কোনো ভালো রান্না হবে তা নয়, কিন্তু সুলতানা রান্নাই করলো না। তাই কারও তেমন কিছু খাওয়াও হলো না। বলতে গেলে আজ দু’দিন ধরে প্রায় অনাহারেই কাটলো। প্রায় প্রতিটি ঈদ-ই কেন যেন আমার জন্য একই যাতনা বয়ে আনে।

একটি ঈদের সঙ্গে আরেকটি ঈদের কী অদ্ভূৎ মিল দেখতে পাই। এ যেন ঈদ নয়, ঈদ নামের প্রহসন যা বারে বারে আমাকে ভীষণ বিরক্তির মধে ফেলে দেয়। অসুস্থতার উপর দুপুরের বাসি খাবার খেয়ে, রাত তিনটে পর্যন্ত নির্ঘুম কাটিয়ে শরীর ভীষণ খারাপ করতে লাগলো। তিন দিন ধরে এভাবেই বলতে গেলে উপোষের মধ্যে অতিক্রান্ত হয়ে গেল ঈদ। সুলতানার দূর্ব্যবহারে অতীষ্ঠ হয়ে অবসরের অধিকাংশ সময়গুলো কাটালাম বাড়ির বাইরে গিয়ে, অগত্য সাইবার ক্যাফেই যেন ছিল আমার জন্য নিরাপদ আশ্রয়।

ঈদের ছুটি শেষে যেদিন অফিস খুললাম সেদিন সারাক্ষণ অফিসেই কাটালাম। ভুলে অফিসের ড্রয়ারের চাবি ফেলে এসেছি বাড়িতে, সেটা নিতে বিকাল পাঁচটার দিকে কী বাড়িতে এলাম। বাড়ি ফিরেই সিলভিয়ার কাছে শুনলাম, সুলতানা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে! বলে গেছে, আর সে বাড়িতে আসবে না! পরে এসে একদিন সে সিলভিয়াকে নিয়ে যাবে! আমার যেন কিছুই বলার ছিল না। সিলভিয়াকে কি বলে সান্ত্বনা দেব কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না। সত্যি সত্যিই সুলতানা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে কি-না তাও জানিনা।

মাথা এমনিতেই এলোমেলো, কোনো কাজ করছিল না। বাড়ির সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খোঁজ করেও পেলাম না চাবির গোছাটা। টেলিলের ড্রয়ার খোলা রেখে গেছি আমি। খোলাই পড়েছিল, টাকাগুলো নেই, চাবিও নেই। হয়তো ড্রয়ার খোলা পেয়ে আমার জমানো টাকাগুলোও নিয়ে ভেগেছে।

সুলতানা ছাড়া আর কেউ করবে না এ কাজ। যাই হোক, মাথা ঠান্ডা রাখাটাই শ্রেয় মনে করলাম। গত কয়েকদিন যাবত সুলতানা এমন কথাই বলে আসছিল যে, সে চলে যাবে। আজ সে সত্যি সত্যি চলে গেছে। কোথায় গেছে? সিলভিয়া বললো, তা বলে যায়নি।

হয়তো পাকশী চলে গেছে। -তোমাকে কিছু বলেনি? না, বলেনি। -তোমাকে যাবার সময় আদর করেনি, চুমু খায়নি? না, আদরও করেনি, চুমুও খায়নি। এসব কথা সিলভিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম সুলতানার চলে যাবার মুহূর্তটি কেমন ছিল তা জানার জন্য। মেয়েটার দিকে চেয়ে দেখি, ওর মুখখানা শুকনো।

অনাহারে রয়েছে সারাদিন। কোনোকিছু খাওনি? না, খায়নি। বললাম, রান্নাঘরে গিয়ে দেখো তো কোনো খাবার-টাবার আছে কিনা? সিলভিয়া রান্নাঘর থেকে ফিরে এসে বললো, একটা রুটি আছে, সকালের। -শুধু কি একটাই? -হ্যাঁ। সিলভিয়ার চোখের পানি তখনও শুকায়নি।

মায়ের তিরোধানে সে বোধ করি সারাদিনই কেঁদেছে। আদর করে কাছে টেনে নিয়ে সিলভিয়াকে বললাম, যাও তো আম্মু, মুখ-হাত ধুয়ে এসো। আমার একমাত্র মেয়ে সিলভিয়া। সে এখন পনর বছরের কিশোরী। বাথরুমে গিয়ে সিলভিয়া হাত-মুখ ধুয়ে এলো।

আমি বললাম, রুটিটা খেয়ে নাও। সিলভিয়া রুটি আনলো। তারপর ভাঁজ করে শুকনো রুটিটা খেতে লাগলো শিশুর মতন। আর সে দৃশ্য দেখে আমার বুকের ভেতরটা ফেটে চৌচির হয়ে যেতে লাগলো। মেয়েটা আমার যেন সত্যি সত্যিই শিশুই রয়ে গেছে এখনও।

নানান কথা ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যে উৎরে রাত নামলো। কি ভেবে যেন আটটার দিকে নজরুলকে ফোন করলাম, আমি কিছু বলার আগেই নজরুল জানালো, আজ সাহানার ডায়ালাইসিস করার দিন ছিল। সুলতানাও ছিল সেখানে। একটু আগেই ধানমন্ডীর ওই ক্লিনিক থেকে সুলতানা বেরিয়ে গেছে বাসায় ফেরার কথা বলে। সকাল ন’টা থেকে এপর্যন্ত আমরা সবাই ক্লিনিকেই ছিলাম।

গতকাল মা এসেছে, সেও ছিল আমাদের সঙ্গে। নজরুল আরও বললো, মাকে নিয়ে আমি সকালে আপনাদের ওখানে আসছি, থাকবেন। নজরুলের কথায় অনুমান করতে আমার কোনও অসুবিধা হয় না যে, সুলতানা বাসা ফেলে সেখানে গিয়ে সারাদিন ধরে হয়তো আবার বিরুদ্ধেই বদনাম করেছে ইচ্ছেমত। এখন নজরুল আসবে শালিস-দরবার করতে। আসুক।

বউকে নিয়ে নজরুলও ভুগছে এক বছর ধরে। আজ এ হাসপাতালে কাল ও হাসপাতালে করে করে। দু’টি কিডনিই তার অকেঁজো। বলতে গেলে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা হিসেবে চলছে ডায়ালাইসিস। কথা শেষ করে সিলভিয়াকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, তোমার মা আসছে, সে গিয়েছে ধানমন্ডী, এখনি এসে পড়বে।

আমি একটু চা করতে গেলাম কিচেনে। কিছুক্ষণ পরই সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্ধ। সুলতানা এলো। আমার সঙ্গে কোনো কথা হলো না। চরম বিরক্তিতে মনটা বিষিয়ে ছিল।

এই আপদ থেকে কিভাবে আত্মরক্ষা করতে পারি ভাবতে-ভাবতে রাগে, দুঃখে আমি বাড়ির বাইরে চলে এলাম। বাড়ির পাশের একটা ছোট্ট সাইবার ক্যাফেতে বসে দীর্ঘক্ষণ ধরে ভাবলাম। অতীত-বর্তমান আর অবিষ্যত নিয়ে অজস্রবার যোগ-বিয়োগ করেও কোনওকিছু মিলাতে ব্যর্থ হয়ে, এক সময় বাসায় ফিরে এলাম। রাতের কোনো এক মুহূর্তে নীরবতা ভেঙ্গে সুলতানা হঠাৎ বললো, কাল ফুফু আসবে তার সঙ্গে আমাকে পাঠিয়ে দেবে। আমি আর এখানে থাকবো না।

বললাম, ঠিক আছে, তাই হবে...। সুলতানার কথায় অসহিষ্ণু হয়ে বললাম। পরদিন সকালে অফিসে বেরুতে অনেক দেরি হয়ে গেল। মনেমনে নজরুলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। দুপুর বেলা নজরুল, ওর মা আর ছেলে শামীম এলো।

কিছুক্ষণ পরই সুলতানার প্রসঙ্গে কথা উঠলো। আমি বললাম, যেখানে সেখানে কেবল আমার বদনাম। আমি যদি তেমনটাই হয়ে থাকি তবে তুমি চাইলে এখনই আমি তালাক দিয়ে দিতে পারি। সুলতানা প্রশ্ন করলো, তুমি কিসে খুশি হও? -তুমি বিদায় হলে তাতেই আমি খুশি হই। আমি ভেতরের উত্তেজনা চেপে যতদূর পারলাম স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিলাম।

-ঠিক আছে, আমি চলে যাব। বোধহয় আগে থেকেই সে ভেবে রেখেছিল আমার সঙ্গে কী কথা বলবে, তাই তাৎক্ষণিকভাবে বললো, তবে এভাবে কেন, যেভাবে যাবার নিয়ম সেভাবে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও, আমি চলে যাচ্ছি। -তাই যাও। আইন যেভাবে বলে আর সমাজে যেটা চলে সেভাবেই সবকিছু নিষ্পত্তি হোক। -তুমি কি বলতে চাও? সুলতানার কন্ঠস্বর চড়তে লাগলো।

কিন্তু আমি ততধিক স্বাভাবিক স্বরে বললাম, আমি তালাকের কথা বলতে চাই। তুমি চাইলে এখনই আমার নিকট থেকে তালাক নিতে পারো, আমি প্রস্তত। তোমার সঙ্গে তর্ক করে সময় নষ্ট করতে চাই না। তুমি একটা বাজে, মিথ্যুক, চোর এবং প্রতারক মহিলা ছাড়া আর কিছু নও। তোমাকে দানব ছাড়া মানুষ বলা যায় না।

তোমার কথাবার্তা, চাল-চলন সবকিছু রাস্তার খান্‌কিদের চেয়েও খারাপ। তোমার জন্য এ সংসার আজ তছনছ হয়ে গেছে। এর একটা বিহিত হওয়া উচিত। নজরুল আমাদের পারিবারিক অশান্তির বিষয়টা অনেক আগেই জানতে পেরেছে। নজরুলের মা - যিনি আমার দূর-সম্পর্কের চাচী এবং সুলতানার আপন ফুফু হন তিনি এসব ব্যাপার তেমন জানেন কিনা তা আমার জানা নেই।

আমাদের এই ধরনের উত্তপ্ত কথাবার্তা শুনে উনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এক সময় বললেন, এসব কী কথাবার্তা শুনতে হচ্ছে আজ আমাকে! যদি তাই হয় তবে তো আমাদের মৃত্যু ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না দেখছি...। নজরুল আর তার মা বেশিক্ষণ তিষ্ঠাতে পারেনি এখানে। আর আমাদের সমস্যারও কোনও সমাধান হলো না। স্বামী হিসেবে তো নয়ই একজন মানুষ হিসেবেও আমাকে গণ্যই করে না সুলতানা।

আমার কথা অমান্য করা, আমার মৃত বাবা-মা সম্পর্কে বদনাম করা, যেখানে খুশি সেখানে যাওয়া, যা খুশি তাই করা, বারবার মিথ্যে কথা বলা, যখন-তখন যার-তার সঙ্গে ঝগড়া বাধানো - এগুলো হচ্ছে সুলতানার নৈমিত্তক কাজের অংশ। এইসব কাজের বাইরে সে কতখনও যায় না। মনস্তত্ত্বের কোনো অধ্যায়ে লেখা থাক আর না-ই থাক মেয়েরা নাকি দুটো কারণে এমন আচরণ করে: যদি বিয়ের আগে অন্য কাউকে সে দেহদান করে থাকে আর স্বামী যদি যৌন অক্ষম হয়। বিয়ের আগে সতীত্ব হারিয়ে থাকলে স্বামী তাকে যত যৌনসুখই দিক না কেন সে স্বামীকে ও স্বামী-সংসারকে মানবে না এবং এধরনের আচরণগুলো করবে। কিন্তু আমার মধ্যে সেই ধরণের অক্ষমতা নেই।

তা সত্ত্বেও আমার বা আমাদের বাড়ির কারো সঙ্গে কষ্মিনকালেও তাকে সদাচারণ করতে দেখিনি। তার মুখের জবান গায়ে আগুন লেগে যাবার মতো উত্তপ্ত। কেউ জানে না এ সমস্যার সমাধান কি! বিবাহবিচ্ছেদই এর একমাত্র সামাধান কিনা তা আমি ঠাহর করতে পারি না! সর্ববিষয়ে অসন্তুষ্ট এই নারীর অত্যাচার দোজখের যন্ত্রণার চেয়েও যে অসহ্য এবং ভয়ঙ্কর হতে পারে তা হয়তো অনেকেই কল্পনা করতে পারবে না। আর এই ধরনের সংসারের হাল ধরে রাখতে গিয়ে আজ আমার মানসিক মৃত্যু অবধারিত হয়ে গেছে। আমি বাঁচতে চাইছি কিন্তু সেই বাঁচা মৃত্যুর চেয়েও ভীতিকর বোধ হচ্ছে।

এই ধরনের নারী অসতী হলে তা যেকোনও পুরুষের জন্য নরকযন্ত্রণার শামিল। আর আমার বেলাতেও এধরনের অবস্থার ব্যত্যয় ঘটেনি। আঠারো বছর আগে, বিয়ের পর আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম - সুলতানার মধ্যেও ঐ ধরনের সকল বৈশিষ্টই জ্বলজ্বল করছে। পরে এসব নিয়ে অনেক ভেবেছি আমি। তখন এটাও ভেবেছি বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান হিসেবে সুলতানা যে আহ্লাদীপনা শিখেছে এটা তারই পরম্পরা।

আমি জানিনা অন্য অনেকের মতো আমি নির্বোধ না বদমাইশ। আমার হৃদয়ে তৃপ্তি নেই, আমার মন অস্থির, কিছুই আমার কাছে যথেষ্ট নয়, আনন্দের মতো কষ্টেও আমি চটপট অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। এভাবে দিনের পর দিন আমার জীবন নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে চলেছে যেটা জানে কেবল অন্তর্যামী। আমি সীমাহীন বিতৃষ্ণা নিয়ে বেঁচে আছি। হয়তো আমার মতন অনেকেই এরকম বিতৃষ্ণায় ভূগছে।

কিন্তু যারা বাস্তবিকই বেশি একঘেঁয়েমীতে ক্লান্ত সেটাকে তারা প্রকাশ না করতে এমন প্রাণপন চেষ্টা চালায় যে, সেটা যেন পাপ-বিশেষ। সমাজের মোহমুক্তি শুরু হবার ফলে এটা ঘটেছে। সমাজের উপরের স্তরে ফ্যাশনের মতো যেমনটি ঘটে থাকে। ভবিষ্যত সম্পর্কে পরিকল্পনা, উচ্চাকাঙ্খা নেই এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। আমার সেসব নেই।

শুধু বর্তমান নিয়ে বাঁচার নিরন্তর সংগ্রাম করতে করতেই জীবন থেকে একটি একটি করে হারিয়ে যাচ্ছে দিন। এখন পর্যন্ত আমি কিছুতেই মনস্থির করতে পারিনা যে কী করবো! সেই অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা যেন ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণের মতোই আমাকে নিঃশেষ করে ফেলছে। যে সিদ্ধান্তের ওপর আমার ভবিষ্যতের গতি-প্রকৃতি, টিকে থাকা না থাকা সবকিছু নির্ভর করছে সেই সিদ্ধান্তটিই আমার নেওয়া হয় না। তাই আমার জীবন থেকে দারিদ্রতাও ঘোঁচে না। যখনি একটু ভালো অবস্থার মধ্যে চলে এসেছি তখনি আবার ভূমিধসের কবলে পড়ে তলিয়ে গেছি আরও নীচে আর তখন ভেবেছি কোনোদিনই বোধহয় আর এই অতল গহ্বর থেকে মুক্ত হতে পারবো না।

আমি কী নির্বোধ যে এইসব উত্থান-পতনের রহস্য আমি বুঝতে পারিনা! কী যে পোড়া কপাল আমার! *২০০২-এর স্মৃতিকথা থেকে। (ক্রমশ) পরের সংযুক্তিগুলি: -সীমানা পেরিয়ে -কাঁকন বাজে রিনিঝিনি -সব নষ্টের মূল -বউ বললো: তোমার হাড়-মাংস খেয়ে তারপর যাব -ঊষা বললোঃ মদ খাবো


এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।