আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

নাফাখুম পর্ব ২: ঢাকা থেকে থানচি

একদিন হয়তো তুমি পড়বে এই লেখা, তাই লিখি

রেমাক্রিখুমে টিলার উপরে ছোট বাংলো, নীচে মারমাদের বসতি; নাফাখুম পর্বঃ ১ ঢাকা থেকে ট্রেন ছাড়ার কথা রাত সাড়ে ১১টায়, সেটি ছাড়ল সাড়ে ১২টায়। তুর্ণা নিশীথা। চট্টগ্রামে এবারই প্রথম ট্রেনে করে যাচ্ছি। বান্দরবানে যা্ওয়ার জন্যে বাস ভালো, রাত বারোটায় ছেড়ে একেবারে সকাল সাতটার দিকে বান্দরবানে নামিয়ে দেয়। এসি গাড়িও আছে।

কিন্তু বাসের বদলে বহুত ধরাধরি করে ট্রেনের টিকেট কাটলাম, কারণ কুমিল্লায় মেঘনা ব্রিজের কাজ চলছে। বাস অনেক ঘুরে যাবে, ফলে প্রচুর সময় লাগবে। ফিরতি পথের এসি টিকেট পেলেও, যাবার টিকেট পেয়েছি শোভন। ভাড়া তিনশ ষাট টাকা করে। চারদিনের ছুটিতে পুরো ঢাকার মানুষ পাগল হয়ে বাইরে যাচেছ।

যেখানে সিট পেয়েছি, তার পাশের জানালায় কোন কাচ নেই। পথে নাকি ঢিল মেরে ভেঙ্গে দিয়েছে, তারপরে আর সাড়ানো হয়নি। ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি, ঢাকায় গরম পড়লেও, ঢাকার বাইরে বেশ ঠান্ডা। সেই ঠান্ডা জানালা দিয়ে হুড়হুড় করে আসছে। মিরাজের আবার টনসিলের সমস্যা।

দেখা গেল, ঠান্ডা মান্ডা লেগে জ্বরই এসে যাবে। ভাগ্যিস, সেটা আর আসে নি। রাতটা ঠিকমতো ঘুম হলো না। একটু পরপরই নানা জায়গায় ট্রেন থামে। তখন ফেরিওয়ালারা নানা জিনিসপত্র নিয়ে বগিতে ঘোরাঘুরি করে।

সিটগুলোও খারাপ। এই করে করে সাতটার দিকে চট্টগ্রাম পৌছলাম। লাকি বক্সে করে নুডলস এনেছিল। সেই ঠান্ডা নুডলস সকালের নাস্তা হিসাবে খেলাম। ঠান্ডা হলেও নুডলসটা বেশ মজাই ছিল।

স্টেশনে নেমে একটা সিএনজি নিয়ে গেলাম বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে গিয়ে দেখি, একঘন্টা পরপর বাস ছেড়ে যাচ্ছে। তখনি একটি বাস ছিল। কিন্তু সিট পেছনের দিকে বলে আর সেটায় উঠলাম না। সাড়ে নটার দিকে পরের বাস ছাড়ল।

ভাড়া জনপ্রতি একশ বিশ টাকা। সিটগুলো আরামদায়ক। ট্রেনে ঘুম হয়নি, তাই সিটে বসতে না বসতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘন্টা দুয়েক পড়ে একেবারে বান্দরবানে গিয়ে চোখ খুললাম। বান্দরবানে গিয়ে চৌরাস্তায় একটা হোটেলে অনেক দরাদরি করে একঘন্টার জন্যে তিনশ টাকা দিয়ে দুটা রুম নিলাম।

একটায় আমি আর মিরাজ, আরেকটায় মেয়েরা। এখানে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিয়ে থানচির উদ্দেশ্যে যাত্রা হবে। গোছলটা সেরে ফেললাম। দাতটাথ মেজে বের হতে হতে একটা বেজে গেল। মেয়েদের তাজিনডং রেস্ট্রুরেন্টে রেখে আমরা গাড়ি ঠিক করতে গেলাম।

গাড়ি ঠিক করতে গিয়ৈ বেশ দরাদরি করতে হলো। অবশেষে সাত সিটের ল্যান্ডরোভার ঠিক করা হলো, পাঁচহাজার টাকায়। এটি আমাদের নীলাচল, বৌদ্ধমন্দির, চিম্বুক, নীলগিরি, শৈলপ্রতাত ইত্যাদি দেখিয়ে থানচিয়ে নামিয়ে দিয়ে আসবে। মেঘলাটা বাদ দেয়া হয়েছে। পরে অন্য কোন সময় হয়তো মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র দেখে নেয়া যাবে।

এমনিতেই দেরি হয়ে গিয়েছিল। কারণ এসব দেখার জন্যে সকালে রওনা হতে পারলে ঠিক হতো। কিন্তু কি আর করা। তাড়াতাড়ি তাজিনডং রেস্তোয়ায় খেয়ে নেয়া হলো। লাকি গরুর মাংস ঝুরা ভাজি এনেছিল।

ভাত, ডাল আর সবজি দিয়ে সেটা খা্ওয়া হলো। এই রেস্তোরার খাবারটা বেশ ভালো। তাড়াতাড়ি খেয়ে প্রথমে আমরা নীলাচল গেলাম। আমি মিরাজ এখানে এর আগে একবার এসেছি। মেয়েরা এবারই প্রথম।

লাকি এর আগে বান্দরবান হয়ে কেওকারাডং গিয়েছিল, কিন্তু সেবার এখানে আসা হয়নি। অনেক ছবিটবি তোলা হলো। কিন্তু হাতে সময় কম। তাড়াহুড়ো করেই আবার গাড়িতে। তবে এতো কমসময়ে আসলে নীলাচলের সৌন্দর্যটা ঠিক বোঝা যায়না।

এখানে পুরো একটা বিকেল বসে থাকতে হয়। সন্ধ্যা মেলাবার অনেক পরে নীলাচল ছাড়তে হয়। কিন্তু আমাদের হাতে সময় নেই। এবার বৌদ্ধমন্দির। সেখানে বিশ টাকা করে দিয়ে টিকেট কাটতে হলো।

সেটা্ও ঝটিকা পদ্ধতিতে দেখা হলো। আবার ল্যান্ডরোভার। গাড়িটা বেশ আরামদায়ক। সামনের সিটে লিনা আর লিভি বসল, মাঝে আমরা তিনজন। পেছনের তিনটা সিট একেবারে ফাঁকাই গেল।

শৈলপ্রপাত দেখতে গিয়ে বিপদ। কাপড়টাপড় দরাদরি করে মেয়েরা নীচে নামল। সেখানে একটি পানির কুয়ো পার হতে গিয়ে লিভি পানির ভেতর পড়ে গেল। একটি আদিবাসী বাড়ির পেছনে গিয়ে সে কাপড় চেঞ্জ করে এলো। চিম্বুকে ঢোকার আগে সেনাক্যাম্পে নাম ধাম লিখতে হলো।

তবে চিম্বুকে আর গাড়ি দাড়ালো না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। চরাই উতরাই পেরিয়ে গাড়ি নীলগিরির দিকে চলল। সেখানে কিছুটা সময় কাটানোর পরিকল্পনা আছে আমাদের। রাস্তার এই অংশটা চমৎকার।

রাস্তার ঠিক পাশৈই খাদ। দুরে বির্স্তীত পাহাড়, পাহাড়ের সবুজ। মাঝে মাঝেই সাঙ্গু দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে রাস্তাটি এমন সংকীর্ণ হয়ে যায় যে ভয় লাগে। রাস্তায় মানুষজন অনেক কম।

হটাৎ দেখা যায় পাহাড়ি মানুষ পিঠে বোঝা নিয়ে হেটে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে বুনো ঝোপ। দুরে পাহাড়ে জুম চাষের আগুনের ধোয়া। নীলগিরি এসে গেলো। এখানে একটা বিরতি।

বিকেল নেমে এসেছে। সবাই দুদ্দাড় করে নেমে ঘুরাফুরি করলাম। পঞ্চাশ টাকা করে টিকেট করতে হলো। গাড়ির জন্যে দুইশ। মেয়েরা এবারই প্রথম এখানে এসেছে।

তারা সবাই খুশি। কিন্তু সময়ের কারণে শান্তিমত ঘুরতে ফিরতে পারল না। ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলে নিল। নীলগিরি এমন একটা জায়গা, যেখানে আসলে সারাদিন কাটিয়ে দেয়া যায়। দুরে সাঙ্গুর আকা বাকা রেখা দেখা যাচ্ছে।

আকাশে হালনা কুয়াশা। বিকেলের বাতাসে শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। আবার থানচির পথে। এইটুকু আমার জন্যও নতুন। এর আগে আমি নীলগিরি পর্যন্ত এসেছি।

কিন্তু এদিকে এই প্রথম। বলিয়াপাড়া বিজিবি ক্যাম্পে থামতে হলো। নাম ঠিকানা লেখা হলো। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে যাচেছ বলে তারা আর যেতে দিতে রাজি নয়। কিন্তু এখন তো পেছনে যাওয়াও সম্ভব না।

অনেক বলে কয়ে আবার রওনা হলাম। রাত আটটা নাগাদ থানচি এসে পৌছলাম। এখানে একটাই সরকারি বাংলো। আগেই বলা ছিল। বাংলোর কেয়ারটেকারকে খুজে নিয়ে বাংলোয় উঠলাম।

এখানে থাকার অন্য কোন থাকার নেই। তবে পাহাড়িদের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা আছে। বাংলোটা একটা টিলার উপরে। দোতলায় তিনটা রুম আছে। আমরা দুটা রুম নিয়ে নিলাম।

প্রতিটা রুমে দুটা করে ডাবল খাট। রুমগুলো ভালোই, তবে পানি নীচ থেকে বয়ে তুলতে হয়। একজন পানি তুলে দেন, ত্রিশ টাকা করে। ব্যাগট্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। এখানে আর গোছলের মধ্যে গেলাম না।

এমনিত্ওে অনেক ঠান্ডা। বাইরে দেখি কুয়াশা জমেছে। আকাশে বেশ বড় চাঁদ। আর দুইদিন পরে পূর্নিমা। চারদিক আলোকিত হয়ে আছে।

বাংলোয় কারেন্ট আছে। মোবাইল চার্জ দেয়া হলো। একটু পরে খাবার খেতে নীচে নামলাম। কেয়ারটেকার আমাদের একটা দোকানে নিয়ে গেল। সেখানে আবার তন্দুরি রুটিও হয়।

আমরা গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেলাম। পাহাড়ি কলা খাওয়া হলো। আগামীকাল সকালে নাফাখুমের উদ্দেশ্যে র্ওনা হবো। কেয়ারটেকার কয়েকজন নৌকার মাঝিকে ডেকে আনল। যাওয়া আসার ভাড়া নিয়ে তারা পাচহাজহার টাকা চায়।

তাদের সাথে আর বনল না। ঠিক করলাম, সকালে ঘাটে গিয়েই দরাদরি করে নৌকা ঠিক করে নেব। সকাল সাতটার দিকে ঘুম থেকে উঠে নীচে গেলার নাস্তা করতে। রাতের হোটেলেই এলাম। তন্দুরি, ভাজি, ডিমভাজি দিয়ে নাস্তা সারা হলো।

কয়েক বোতল পানি কিনে নিলাম। তাড়াহুড়ো করলেও রুম থেকে বের হতে হতে নয়টা বেজে গেল। এখানেও বিজিবি ক্যাম্পে আবার নাম লেখাতে হলো। আমরা কোন গাইড নিতে চাইনি, কারণ যে পথে যাব তাতে নৌকার মাঝিই যথেষ্ট। কিন্তু বিজিবির লোকজন গাইড ছাড়া যেতে দেবে না।

কেন যেন মনে হলো, এদের সাথে গাইডদের হয়তো চুক্তি আছে। অনেকটা বাধ্য হয়ে গাইড নিতে হলো। প্রথমদিন ৬০০, পরে প্রতিদিন ৫০০ টাকা। খাবার খরচ আমাদের। নৌকা ঠিক হলো আসা যাওয়া মিলে সাড়ে চার হাজার টাকা।

দশটার দিকে র্ওনা হলাম। নৌকার পেছনে শ্যালো ইঞ্জিন বসানো। নদীতে কোথাও পানি একবিঘত মাত্র, কোথাও আবার বেশ গভীর। দুই পাশে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। সেই নদীর পাড়ের তামাকের ক্ষেত।

কোথাও কোথাও পাহাড়ি মেয়েরা ছাকনি দিয়ে মাছ শামুক এসব ধরছে। নদীর পরে কোথাও কোথাও ছোট ছোট দোকান। সেখানে চা কলা বিস্কুট বিক্রি হয়। যারা ঘন্টা দেড়েক চলার পরে তিন্দু এলো। বিজিবির একজন সিনিয়র অফিসার আসবেন, তাই নদীর পাড়েই চেয়ার টেবিল পাতা।

আমরা উপরে উঠে একটা দোকানে চা খেলাম। এখানে থাকার ব্যবস্থা আছে। ছোট ছোট ঘর, প্রতিরাত একশ টাকা। আধাঘন্টা পর আবার নৌকায় উঠলাম। একটু এগোতেই বড় পাথর এলাকা পড়ল।

সেখানে বিশাল বিশাল সব পাথর। এত বড় যে কয়েকজন মিলে তাবু খাটিয়ে থাকা যায়। একটা পাথরে মোমবাতি রয়েছে। স্থানীয়রা একে বলে রাজা পাথর, দেবতা মনে করে পুজা করে। সেইসব পাথরের ভিতর দিয়ে অনেক কসরত করে নৌকা পাড় করতে হলো।

পথে বেশ কয়েক জায়গায় নামতে হলো। পানি একবিঘতের মতো, আমার নামার পরে নৌকা টেনে পার করতে হলো। দুই জায়গায় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বেশ খানিকটা হাটতে হলো। এরকম কোথাও কোথাও ছোট দোকান। একটি দোকান থেকে আমরা সেদ্ধ ডিম খেলাম।

দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম বনমোরগ আছে কিনা? তিনি বলছেন, ছিল কিন্তু বিক্রি হয়ে গেছে। আবার পেলে আমাদের জন্য রেখে দেয়ার জন্যে বললাম। যাবার পথে নিয়ে যাবো। (তবে যাবার সময় বনমোরগ পাইনি। ) বেলা দেড়টার দিকে রেমাক্রি মুখে এসে পৌছলাম।

নদীর মুখ থেকে ঠিক উপরে একটা টিলায় আমাদের থাকার বাংলো। কিন্তু তখনো সেখানে যারা আছে, তারা সেটি ছাড়ে নি। তাই আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হলো। রেমাক্রিখুমে টিলার উপরে ছোট বাংলো, নীচে মারমাদের বসতি; নাফাখুম পর্বঃ ১

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.