আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বাচ্চা ভয়ংকর কাচ্চা ভয়ংকর -২



প্রথম দিনের সেই ভয়াবহ অভিগ্গতার পর কিছুটা দমে গেলেও ভাবলাম যে করেই হোক এগুলোকে পটাতেই হবে। শুরু হল পটানোর প্রক্রিয়া। হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলাম চকলেট আর মজার মজার স্টিকার। কিন্তু বিচ্ছুগুলো যে এত ত্যাঁদোর তাই বা কে জানত? সোনামুখ করে চকলেট নিবে , হাতে স্টিকার লাগাবে। তারপর যেই সব নেয়া শেষ, ভোঁ দৌড় ক্লাসের বাইরে মায়ের কাছে এবং যথারীতি আমি তাদের পিছু পিছু ...।

অতঃপর চ্যাংদোলা করে ক্লাসে নিয়ে আসা। যাই হোক, কয়েকদিন পর পরিস্হিতির কিছুটা উন্নতি হল। চকোলেটের লোভেই হোক আর আমার আদরের কারনেই হোক ওরা ধীরে ধীরে মাকে ছেড়ে ক্লাসে থাকা শিখে গেল, শুধু একজন ছাড়া। এই বাচ্চাটি ওর মাকে কিছুতেই ক্লাস ছেড়ে যেতে দিবেনা। এ কয়েকদিন ওর কোন কথাই আমি শুনিনি শুধু ভ্যা.... শব্দ ছাড়া।

ও যেন পণ করেছে মা ছাড়া কারো সাথে কথা বলবেনা। কিন্তু এভাবে কতদিন? একদিন ওর মাকে আমি অনুরোধ করলাম ওকে রেখে চলে যেতে নইলে তো ওর অভ্যাস গড়ে উঠবেনা। ভদ্রমহিলা বের হয়ে গেলেন। শুরু হল ওর সপ্তম সুরে চিৎকার। ওকে থামানোর জন্য কোলে তুলে নিয়ে দেয়ালে ঝুলানো বিভিন্ন ছবি দেখাতে লাগলাম ওকে।

একসময় এনিমেল চার্ট এর সামনে নিয়ে এলাম। একটু কাজ হল । দেখলাম দুই হাত দিয়ে চোখ মুছে বড় বড় চোখে ছবিগুলো দেখছে সে। ওকে কুকুরের ছবি দেখিয়ে বল্লাম। তুমি এটাকে চেনো? মাথা ঝোকালো সে।

কান্না বন্ধ। বলত এটা কি? এইডা কুত্তা। জুড়িয়ে গেল কান আমার। এইরকম পরিবেশে এই ভাষা শুনব ভাবিনি। বুঝলাম বাসায় কেউ এই ভাষায় কথা বলার কারণে এই অবস্হা।

তারপর যতবারই বলি ছি কুত্তা বলতে হয়না বল কুকুর। ও ততবারই বলে, না এইডা কুত্তা। বল কুকুর। না, কুত্তা কুত্তা কুত্তা। বুঝলাম কপালে দুঃখ আছে।

কুত্তা >কুকুর >ডগ। কুকুরে আসতেই এত সময়, ডগে আনব কখন? এর চেয়ে তো ওর চুপ থাকাই ভাল ছিল। এগুলো তো কিছুই না। আমার আসল অগ্নিপরীক্ষা শুরু হলো কয়েকদিন পরে যখন নতুন একটি বাচ্চা এসে ভর্তি হল আমার ক্লাসে। এই বাচ্চা সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায় অন্যগুলো যদি বান্দর হয় এ হল বান্দরের প্রিন্সপ্যাল।

আর আমারও এমন কপাল অন্য আরেকটি সেকসন থাকা সত্তেও ও কিনা ভর্তি হল আমারই ক্লাসে। প্রথমদিনই এসে সে গোটা ক্লাসটি নিজ কন্ট্রোলে নিয়ে নিল। সে একাধারে বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী। প্রথম দিন স্কুল কিন্তু নো কান্নকাটি। তার দুই হাত সর্বদা সক্রিয়।

একহাত দিয়ে যদি একজনের চুল টেনে ধরেছে তো অন্যহাত দিয়ে আরেকজনের কান টানছে। দুই হাত যদি ধরে থাকা হয় নো প্রবলেম। পা আছেনা? পা দিয়ে ল্যাং মেরে ফেলছে আরেকজন কে। এক নিমিষের মধ্যে সবকিছু উলটপালট। আমার নিরীহ হাত ব্যগটিও রক্ষা পেলনা।

সব জিনিস বের করে সারা ঘরময় ছড়িয়ে রাখল। একটু অন্যদিকে তাকালেই ক্লাস থেকে এক ছুটে ও আই সির ( ডিফেন্সের উচ্চপদস্হ কর্মকর্তা, পদমর্যাদায় প্রিন্সিপ্যালের উপরে) অফিস রুমে যেয়ে টেবিলে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে। আমি যেয়ে বগলদাবা রে নিয়ে আসি। কিন্তু ওকে বকা দেয়া যায়না কিছুতেই। কারণ কিছু বলতে গেলেই ভুবনভোলানো হাসি দিয়ে জড়িয়ে ধরবে আমাকে।

তখন কি কিছু বলা যায়? ও আবার আমার ভাগ কাউকে দিবেনা। মিছ তুমি ওকে আদল কললে কেন? আমাকে কল। ওকে খাইয়ে দিলে কেন? আমাকে খাইয়ে দাও। ওকে গুববয় বল্লে কেন? আমাকে বল। এমনি কত অভিযোগ ওর।

কিন্তু ওর দুষ্টুমি কমছেনা কিছুতেই। সবাই কে প্রতিদিন মারছে। পূর্ববর্তী ক্যাডাররা ওর ভয়ে তটস্হ থাকে। প্রতিদিন অন্যান্য গার্ডয়ানের কমপ্লেনে অতিষ্ট আমি। একদিন ও আই সি নির্দেশ দিলেন ওকে অন্য সেকসন এ দিতে।

অন্য মিসকে হয়ত ভয় করবে এই ভেবে। মনটা খারাপই লাগছিল কিন্তু করার কিছুই নেই। ওকে যখন অন্য ক্লাসে নেওয়া হচ্ছিল ও প্রথমে বুঝতে পারেনি। কিন্তু ওই ক্লাসের দরজায় যেয়ে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই দাঁড়িয়ে পড়ল আর কিছুতেই সে ঢুকবেনা। ও আই সি যেই ওকে কোলে তুলে নিয়েছে ক্লাসে ঢুকানোর জন্য, দুমাদুম কিল, ঘুসি আর ল্যাং মারতে লাগল ওনার পেটে আর বুকে।

ওনি ওকে আটকাতে না পেরে ছেড়ে দিতেই ও এক দৌড়ে চলে এসেছে আমার কাছে। তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কান্না। ''মিছ আমি ওই থেছনে যাবনা, আমি তোমাল কাছে থাবব,আমি আর দুত্তুমি কব্বনা''। আমার যে কি হল দেখি আমার চোখ দিয়েও টপটপ পানি পড়ছে। এমন ভালবাসা পেলে কার না চোখে পানি আসে? আমি ওকে জড়িয়ে ধরে ও আই সি কে বল্লাম," প্লিজ, ও আমার ক্লাসেই থাকুক।

আমি দেখে রাখব ও দুষ্টুমি করবেনা"। ভদ্রলোক টিচার, স্টুডেন্ট এর যৌথ কান্না দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি এ কথা বলতেই তড়িঘরি করে বলে উঠলেন," ঠিক আছে ঠিক আছে ও আপনার ক্লাসেই থাকুক"। তারপর থেকে ফাইনাল এক্সাম পর্যন্ত ও আমার ক্লাসেই ছিল। তবে ওকে কাবু করার নতুন অস্ত্র পাওয়া গেল।

দুস্টুমি করলেই ওকে শুধু একবার বলা তোমাকে ওই সেকসন এ দিয়ে আসব সাথে সাথে সে ভদ্র । বলে,"দেখ আমি গুববয় আমি এততুও দুততামি কলিনা"। বলাই বাহুল্য, এই গুববয় হয়ে থাকার স্হায়িত্ব কখনোই দুই মিনিটের বেশি নয়। (চলবে)।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.