আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

তাহার সঙ্গে কথা (২)



--আমি জানতাম। কারণ এটাই এখন রেওয়াজ হয়ে গেছে। আমি যা-ই বলি না কেন সেটা ইগনোর করাটাই তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে-- --সামান্য একটা কথার সূত্র ধরে তুমি অজস্র অনাবশ্যক কথা বলে চলেছো অঞ্জলি। লেখাটা আমায় এখনই শেষ করতে হবে, প্লিজ! --প্রেমের গল্প নিশ্চয়ই! তুমি তো ইদানীং পদ্য ছেড়ে গল্প লিখে বেশ নাম করেছো শুনতে পাই। তোমার গুণমুগ্ধ শালী তো তোমায় একালের বিশিষ্ট প্রেম বিশারদ বলে মনে করে।

তোমার শালী কিন্তু আমার মায়ের পেটের বোন, এটা মনে রেখো কিন্তু-- --কি বলতে চাইছো তুমি? এতক্ষণে নীলাঞ্জনের কণ্ঠে উষ্মার আঁচ পেল অঞ্জলি। ভেতরে ভেতরে সে এটাই চাইছিল। --মল্লিকার গাধা হোক উজবুক হোক একটা বর আছে। মল্লিকার সঙ্গে তুমি যা খুশি করতে পারো। আমার বোনের সঙ্গে পারো না।

--তোমার পাগলামি ক্রমশ: বরদাস্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। ইদানীং তোমার মুখে যা আসছে বলে যাচ্ছো-- --পরিকল্পনামাফিক চেষ্টা করেও তুমি আর মল্লিকা আমায় পাগল প্রমাণ করতে পারবে না। আমার দাদা উচ্চপদস্থ হেলথ্ অফিসার। এছাড়া অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে তুমি আমায় ডিভোর্স করতে পারবে না। কোনো অবস্থাতেই আমিও তোমায় ডিভোর্স দেবো না।

খুবই মুশকিলে পড়েছো তুমি! নীলাঞ্জন রীতিমতো উদ্বেগের সঙ্গেই অঞ্জলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেণ্ড। একজন মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে তার মনে হলো। এই অঞ্জলিকে নিয়ে বেশ কয়েকটা প্রেমের কবিতা লিখেছিল নীলাঞ্জন। তখন কবিতাই লিখতো। বিশেষ করে বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে বলতে গেলে কবিতার বান ডেকেছিল।

অঞ্জলি পাশে থাকলে তখন যে কোনো বিষয়ই কবিতা হয়ে উঠতো। প্রজাপতি বৃষ্টি ঝড় আমের মঞ্জরী শিমূল পলাশ ঝর্ণার শব্দ নদীর স্রোত পাখির ডাক সবকিছুই কবিতার শব্দ হয়ে উঠতো। তারই ফলশ্রুতি প্রথম কবিতার বই 'নীলাঞ্জলি'। তারপর যত দির গেছে অঞ্জলি ধীরে ধীরে বদলে গেছে আমূল। এখন নীলাঞ্জনের লেখালেখি ওর কাছে নিতান্তই মেয়েদের সঙ্গে বিশেষ করে মল্লিকার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ছল মাত্র! নীলাঞ্জনের কোনো লেখাই অঞ্জলি শোনে না।

মতামত দেওয়া তো দূরের কথা। অনেক সময় ইচ্ছে করেই নীলাঞ্জনের পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠাগুলো এলোমেলো করে দেয়। ভেতর থেকে দু'এক পাতা সরিয়ে ফেলে। লেখালেখির জগতের লোকজনদের সঙ্গে বিচিত্র ব্যবহার করে। সাহিত্য সম্মেলন জাতীয় কোনো অনুষ্ঠানে নীলাঞ্জনকে ঘিরে মেয়েদের ভিড় অঞ্জলিকে ক্ষিপ্ত করে তোলে।

সেটা বাড়ি ফেরার পর টের পেতো নীলাঞ্জন। কিছুদিন ধরে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে আচমকা বেড স্যুইচ অন করে নীলাঞ্জনকে প্রায় শিউড়ে দিয়ে অঞ্জলি সরে গেছে দূরে। চাপা গলায় ঝলসে উঠেছে-- --আমি অঞ্জলি। মল্লিকা নই! বিধ্বস্ত হতাশ নীলাঞ্জন বেড স্যুইচ অফ করে অন্ধকারে বালিশে মুখ গুঁজে ভোরের প্রতীক্ষায় ছটফট করেছে। এখন আর অন্তরঙ্গ মুহূর্ত বলে ওদের জীবনে প্রায় কিছুই নেই।

তবুও নীলাঞ্জনের আকাশটা অনেক বড়। বন্ধু-বান্ধব আছে, কফি-হাউস আছে। গল্প-কবিতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। মল্লিকা আছে। নীলাঞ্জনের প্রতিটি লেখা গভীর মনযোগের সঙ্গে পড়ার আন্তরিক আগ্রহ আছে।

এটুকু আছে বলেই লেখার জায়গাটা ছেড়ে নীলাঞ্জর চলে যেতে পারেনি। নীলাঞ্জন ভাবলো বাকি লেখাটুকু অফিসের ক্যান্টিনে বসেই সেরে নেবে। গল্পের শেষ কয়েকটা পাতা ওর চোখের সামনে ভাসছে, অনেকটা টিভির সংবাদপাঠকের সামনের সংবাদ লেখা টিভি স্ক্রিনের মতো। শুধু কাগজের পৃষ্ঠায় শব্দগুলো পরপর বসিয়ে নেওয়া। কলম বন্ধ করে কাগজগুলো টেবিল থেকে তুলে নেবার আগেই অঞ্জলি প্রায় ছোঁ মেরে কাগজগুলো তুলে নিয়ে প্রবল ক্রোধে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে দলা পাকিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

অবিশ্বাস্য এই ঘটনায় ভয়ঙ্কর ভাবে জ্বলে উঠতে পারতো নীলাঞ্জন। জ্বলে উঠলোও ভেতরে ভেতরে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো-- --তবুও তোমাকে সহ্য করার ক্ষমতা আমার রয়েছে অঞ্জলি। কিন্তু তোমাকে ভালোবাসার ক্ষমতা আর আমার নেই। অঞ্জলির সামনে থেকে সরে যেতে যেতে অন্যান্য দিনের মতো আজো কিছু ভাঙচুরের শব্দ শুনতে পেল নীলাঞ্জন।

দৃশ্য তিন : সঞ্জয় কফির কাপটা নীলিমার সামনে রেখে পাশের চেয়ারে বসলো-- --নাও কফি খেতে খেতে লেখার ব্যাপারটা ভাবো। নীলিমা সঞ্জয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। সঞ্জয় চওড়া পাড় শালটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছে। শেভ্ করাও হয়ে গেছে। চুলগুলো একটু এলোমেলো।

সঞ্জয়ের টোটাল চেহারায় সবসময়ে একটা বিশৃঙ্খল সৌন্দর্য দেখতে পায় নীলিমা। ওর মন্দ লাগে না। সঞ্জয়ের পেশার মধ্যেও শৃঙ্খলা শব্দটার অবস্থান গাঢ় নয়। প্রখ্যাত একটা ইংরেজী দৈনিকের সিনিয়র রিপোর্টারদের একজন। বাঘা বাঘা রাঘববোয়ালদের সঙ্গে চমত্কার ডিবলিং করতে পারে।

বিশেষ করে রাজনীতির বাচাল ও মুর্খ নেতাদের নিয়ে ওর নিয়মিত কলাম 'খেলা' এবং সেই খেলার সূত্রে প্রায় প্রতিদিন তৈরি করা জোকস্ নিয়ে টেবিল মাতাতে ওর কোনো জুড়ি নেই। মাঝে মাঝে শ্লীলতার সীমা ছাড়ালেও সকেলই বেশ এনজয় করে। সাংবাদিকতার ফাঁকে ফাঁকে গল্প কবিতা রম্য ভারি প্রবন্ধ---যখন ওর মুড ওকে যেটায় প্রোভোক করে ও তাই লেখে। ওর লেখার চাহিদা আছে বাজারে, কিন্তু নিজের লেখার প্রতি তেমন কোনো মায়া-দয়াও ওর নেই। নীলিমা বিয়ের আগে লেখালেখি করলেও বিয়ের পরে অনেকটাই সরে এসেছিল।

সংসার ওকে সুযোগ দিচ্ছিল না বলে সঞ্জয়ের মনে হচ্ছিল। মনে হতেই চমত্কার একটা রুটিন তৈরি তার মধ্যে নীলিমাকে জুড়ে দিল সে। লেখার জন্যে পড়ার জন্যে এমন কি ভাবার জন্যেও সময় হাতে পেয়ে নীলিমা প্রায় নেচে উঠলো। ওর দায়িত্ব শুধু লেখার। বাকি সবটুকু দায় সঞ্জয়ের।

পত্র-পত্রিকায় নীলিমার লেখা প্রকাশিত হয়। চারপাশে প্রশংসার প্রজাপতি ওড়াউড়ি করে। মাঝে মধ্যে দু'একটা ভ্রমরের গুঞ্জনও যে কানে আসে না তা নয়--কিন্তু সঞ্জয় যার স্বামী এবং বন্ধু তার পক্ষে অন্য দিকে তাকাবার সময় হাতে থাকে কি করে? --কখন ঘুম থেকে উঠলে টের পাইনি। কফিতে চুমুক দিয়ে নীলিমা অকাক হয়ে তাকালো সঞ্জয়ের দিকে। --জাস্ট আধঘন্টা আগে।

আড়াল থেকে লক্ষ্য করছিলাম তুমি কিছু একটা ভাবছো। তাই ডিস্টার্ব না করে-- --রাত তিনটেয় বাড়ি ফিরে ছ'টায় ঘুম থেকে উঠে ফিট-ফাট হয়ে যাও কি করে কে জানে! মাত্র তিন ঘন্টা ঘুম-- --তিন ঘন্টা নয় ম্যাম্--আজ মাত্র দু'ঘন্টা। তিনটেয় ফিরে ভোর চারটে পর্যন্ত তোমাকে নিয়ে যে দারুণ ব্যস্ত ছিলাম-- --যাহ্! কিন্তু জানো, ঐ সময়টা আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে থাকি তো--মনে হয় স্বপ্ন দেখছি, সন্ধে থেকে সারা রাতের প্রতীক্ষা ভোরে গিয়ে স্বপ্ন হয়ে জেগে ওঠে-- নীলিমার পরিতৃপ্ত মুখের মধ্যে এক চিলতে রোদের আভা। --তোমার কথাগুলো, আই মীন তোমার ফিলিংসগুলো যেভাবে তুমি অনায়াসে প্রকাশ করো আমি ঠিক ঐ ভাবে পারি না। কথাগুলো খুব চমত্কার সাজাও তুমি।

আমার খুব ভালো লাগে। --তোমার হয়তো মনে হয় গল্পের কোনো একটা চরিত্র লেখকের মর্জি মতো ঠোঁট নাড়ছে-- --একেবারেই মনে হয় না। যারা লেখে ছবি আঁকে গান গায় তারা ভীষণভাবে সংবেদনশীল আবেগপ্রবণ হয়। তাদের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যদি কান পেতে শোনো তাহলে দেখবে তার মধ্যে গেরস্থালী শব্দ প্রায় থাকেই না। তুমি হয়তো লক্ষ্য করে থাকবে যেকোনো সেন্টিমেন্টাল কথায় মল্লিকার চোখে জল এসে যায়।

তোমারও আসে-- --মোটেও না। আমি ওর মতো অতবেশি ভাবুক নই-- --আমি তোমার পাশে তোমার মনের মতো হয়ে আছি বলেই হয়তো-- --মনের মতো হয়ে আছো মানে কি? তুমি কি ভালোমানুষ সেজে আছ নাকি? প্লে করছো? (চলবে)

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।