আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

রূপকথার বিষন্ন বালিশ

পারলৌকিক হ্যাঙ্গারে হ্যাঙ্গ হয়ে আছে ইহকাল / পুনরায় জন্ম নেয়া এখন বিশেষ প্রয়োজন

সৌরভের নানি সারাদিন শুয়ে থাকে। তাঁর আর কোনো কাজ নেই। সৌরভ স্কুল থেকে ফিরে গোসল খাওয়া শেষ করে যখন বিছানায় একটু পিঠ লাগায় তখন তার নানির শুরু হয় কথা। কথা না বলে বকবকানি বলাই ভালো। নানির কথা সৌরভের বিরক্তিকর লাগে।

নানি কানে শোনে না। নানিকে যতই বলা হয় চুপ থাকতে নানি ততই যেন মনে করে তাঁকে কথা বলতে বলা হচ্ছে; যেন তাঁর কথার চাকে কেউ ঢিল ছোঁড়ে। এভাবে বকবক করার এক পর্যায়ে নানি ঠাণ্ডা হয়। সৌরভও আর ঘুমুবার চেষ্টা করে না। কারণ তার ঘুম আর ক্লান্তি নানির কথার দমকে উড়ে যায়।

সৌরভ চুপচাপ শুয়ে থাকে। ঠিক তখনই নানি হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। একপর্যায়ে আস্তে আস্তে শুরু হয় তার কথা...অন্যরকম ভঙ্গিমায়। নানির গলার স্বর আস্তে আস্তে নিচু হয়ে যেতে থাকে। নানি শুরু করেন রহস্যময় সব গল্প।

তাঁর কোনো গল্পই সৌরভের শেষ পর্যন্ত শোনা হয় না। গল্প শেষ হবার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। প্রতিবার সৌরভের নতুন একটা গল্প শুনতে হয়। পুরোনো গল্পগুলোর জন্য সৌরভের কষ্ট হয়। কিন্তু নানিকে সে পুরনো গল্পের কথা বলে না।

কারণ নতুন গল্পগুলো পুরোনোগুলোর থেকেও অন্যরকম। নানি শুনতেও পায় না যে তাকে সৌরভ পুরনো গল্পগুলো সম্পূর্ণ করতে বলবে! তাছাড়া নানি কোনো দিনও মনে রাখতে পারে না যে আগের দিন তিনি কোন গল্পটা বলেছিলেন। সৌরভের নানি যেন রহস্যময় এক গল্পের বাক্স। নানির গল্পগুলো নানির চেয়েও পুরনো, রহস্যময়, বিদঘুটে, স্যাঁতসেতে, অচেনা আর পুরনো ঘরের মতো ধুলো আর মাকঢ়শার জালে ভরা। নানির গল্পগুলো শুনলে তার মনে হতো সে হয়তো গল্পের কোনো চরিত্র হয়ে গেছে, গল্পের কোনো অংশ হয়ে গেছে; গল্পের ঝর্ণা-উর্দ্ধুগানগাওয়া টিয়াপাখি-রঙ জ্বলে যাওয়া শাড়ি-মাছ ধরা জালের গন্ধ... আরো কত কি! নানির পানের সুবাস, তাঁর পানের বাটার গন্ধে সৌরভ আজও ফিরে যায় নানির গল্পের ঐ জায়গাগুলোতে, যে জায়গাগুলোতে নানি গল্পের মধ্যদিয়ে সৌরভকে পর্যটনের অনুভূতি দিতো, যে জায়গাগুলোতে নানি ছেলেবেলায় খুব দৌড়ে বেড়াতো; কোনো এক সাকোর পাড়ে নানির সখা আসতো নানির জন্য কামরাঙ্গা নিয়ে, সাকোর উপর দিয়ে নানি আর তার দলবল ঝাঁপিয়ে পড়তো খালের পানিতে, নানির পায়ের ছাপ ধরে ধরে নানির পোষা কুকুরটা নানিকে খুঁজে বের করে সারাদিন তার সাথে দৌড়ে বেড়াতো।

মন খুলে নানি গল্পগুলো বলে যায়। নানি একবার গল্প বলতে বলতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো, কিন্তু সৌরভ বুঝে উঠতে পারে না নানি ক্যানো গল্পের ভেতরে কাঁদবে! কাঁদার সময় নানির চোখে কোনো পানি থাকতো না। সৌরভের নানি অদ্ভুত শুকনো কান্না কাঁদতে পারেন! নানি কখনো গল্পের মধ্যে এমন হাসি শুরু করে যে তাঁর বিষম ওঠে যায়, পানি এনে খাইয়ে দিয়ে তাঁর বিষম থামাতে হয়। সৌরভ মনে করার চেষ্টা করতে থাকে প্রতিনিয়ত, নানি ঠিক কোন গল্পটা বলার সময় কেঁদে ফেলতো। একটা সময় মনে করতে না পেরে সে ভাবে — নানি বুড়ি হয়ে গেছে সেজন্যই হাসি কান্নার কোনো ঠিক ঠিকানা মেলে না।

নানির কোনো কোনো গল্পে থাকতো কাজল পরা এক দাড়িঅলা বুড়ো যে গাঁয়ের মেয়েদের কাঁখের কলসির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখনো খাদে গড়িয়ে পরতো কখনো গাছের গুড়িতে ধাক্কা খেতো। তার মাথার টুপিতে কখনো কাক পায়খানা করলে সে কাককে বেজন্মা বলে গাল দিতো আর সে পান খেয়ে মানুষের ঘরের দেয়াল পানের পিক ফেলে নষ্ট করতো ঠিক কাকেরই মতো। সারাদিন উর্দ্ধু গান গাইতো বলে বুড়োটাকে মনে হতো পৃথিবীর সবচে’ সুখী মানুষ। নানি মনে করতেন ঐ উর্দ্ধু গান গাওয়ার জন্যই কাক তার মাথায় পায়খানা করতো। লোকটার প্রত্যেক গ্রামেই ছিলো একটা করে বউ এবং চারটে করে বাচ্চা।

নানির গল্পে সৌরভ বুট আর বুলেটের শব্দ শুনতে পায়। নানির গল্পে সৌরভ রক্ত আর লাল রঙ দেখতে পায়; সৌরভ গরু জবাই দেবার সময় গরুর রক্তের কথা ভাবে। জীবনে একবারের বেশি সে গরু জবাই দেয়া দেখেনি আর দেখতে চায়ও না। গল্পের মানুষেরা পাখা মেলে উড়ে যায় অন্য দেশে. অন্য রাজ্যে. কেউবা অন্য গ্রহে কিংবা অন্য কোথাও। গল্পের শিকারীরা হরিন শিকারে গিয়ে তরুণ হরিনের শিং ভেঙে দিয়ে চলে আসে আর দুঃখী হরিনেরা তাদের বিচিত্র শিংগুলোর জন্য দুঃখ করতে করতে বুড়িয়ে যায়।

নানি গল্প বলতে বলতে টাইম মেশিনের মত এক যুগ থেকে আরেক যুগে, এক কাল থেকে আরেক কালে চলে যেত। গল্পের হাফপ্যান্ট পরা ঠোলাগুলোর হাতে ডাণ্ডাগুলো বদলে কখন যে রাইফেল হয়ে যেতো সৌরভ বুঝে উঠতে পারতো না। নানির গল্পের রক্ষীবাহিনী নাকি আজকের দিনের র‌্যাবের মতো কালো পোশাকে ঘুরে বেড়াতো আর মানুষ ধরে ধরে জবাই করতো। নানির গল্পের মিলিটারিরা মানুষের ঘর জ্বালিয়ে দিতো। নানি তাদের গাল দিতো শুয়োরের বাচ্চা বলে।

মা একদিন নানির কানের কাছে মুখ এনে চিৎকার করে বল্লেন, “মা, বাচ্চার সামনে মুখ খারাপ করবেন না, স্কুলে গিয়ে ওগুলো বল্লে প্রেস্টিজ যাবে”। মুসলমান হয়ে মুসলমানের ঘর পুড়িয়ে দেবার জন্য নানি ওদের শুয়োরের বাচ্চা বলতো, আর নানি যে মানুষ হয়ে মানুষকে শুয়োরের বাচ্চা বলছে! নানির গল্পের পান খাওয়া উর্দ্দু গান গাওয়া বুড়োটা তার বন্ধুদের নিয়ে মিলিটারিদের সাথে থাকতো আর হুজুর হুজুর করতো। মিলিটারি আর টুপিআলা লোকগুলো কোনো বাসায় পুরুষ মানুষ থাকলে তাদেরও ধরে নিয়ে যেতো যাতে তারা যুদ্ধে যেতে না পারে। নানি বলতো টুপিআলারা নাকি মেয়েদেরও ধরে নিয়ে যেতো। মেয়েরাও কি যুদ্ধে যেতো? নানিকে জিজ্ঞেস করেছিলো সৌরভ, মেয়েদের কেনো ধরে নিয়ে যাবে; মেয়েরাতো যুদ্ধে যায় না নানি।

নানি বলেছিলো বলাৎকার করতে নিয়ে যায়। বলাৎকার কী, কীভাবে সেটা করে নানি তা বলেনি। বাবাকে জিজ্ঞেস করেছে বাবাও বলেনি। টিচারকে জিজ্ঞেস করেছে টিচার বলেছে বড় হলে বুঝতে পারবে। সৌরভ মেনে নিয়েছে।

বড় হয়েই না হয় বুঝবে। অনেক কিছুইতো জানে না সে। সে ভেবে নেয় বলাৎকার নিশ্চয়ই যুদ্ধের মতোই কিছু। নানির গল্পের টুপিআলা বুড়োর আর তার বন্ধু দুষ্ট মেলেটারিরা ক্যানো শুধু শুধু অত্যাচার করতো তাও নানি বলেছে। গল্পে তারা যখন কৃষকের ঘরে আগুন দিচ্ছে তখন সৌরভের চোখে ভেষে ওঠে গ্রামের বাড়িতে দেখা বিশাল খড়ের গম্বুজ।

সৌরভ ভাবে সে যদি গাড়ি চালাতে পারতো, সে আগুন নেভানো লাল গাড়ি চালিয়ে চলে যেতো কৃষকের ঘরের খড়ের গম্বুজটাকে বাঁচাতে। সৌরভ চোখের সামনে দেখে জেলের মাছ ধরা জাল পুড়ছে; তখন তার ক্যাপ্টেন প্লানেট হয়ে সমুদ্রের সব পানি নিয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয় আগুন ধরে যাওয়া জালের উপর। সৌরভের কখনো মনে হয় সে যদি যাদুকর হতো ওদের গুলির বাক্সগুলোর সব গুলি যাদু দিয়ে ক্যাণ্ডি বানিয়ে দিতো। সৌরভ বিবিসি-তে দেখেছে কীভাবে বোমা ফেলে মানুষ মেরে ফেলে যুদ্ধে। নানি একদিন খুব বিষন্ন হয়ে গেল।

কারো সাথেই কথা বলতো না। শুধু সৌরভকে কোলে নিয়ে বিষন্ন মুখে বসে থাকতো। নানির কোলে তার বেশিক্ষন ভালো লাগতো না। সৌরভের নানি একদিন মরে গেল। কেউ খুব বেশি কান্নাকাটি করলো না।

বাবার কান্নার সময় নেই, তিনি তার অফিস নিয়ে খুবই বিজি। মা শুকনো চোখ মুছতে মুছতে এক সময় চোখের চামড়া লাল করে ফেললো তবু কোনো পানি খুঁজে পাওয়া গেলো না তাঁর চোখে। গ্রাম থেকেও কেউ আসলো না। সৌরভের মতো একদল ছোট মাওলানা এসে শুধু কান্নার মতো এক ধরণের করুণ আওয়াজ তুলে ঢুলে ঢুলে কোরান পড়তে থাকলো নানির মাথার কাছে গোল হয়ে বসে। সৌরভ ভাবলো নানি কি কিছু শুনছে? নানির কোরান পড়া ওদের থেকেও সুন্দর ছিলো।

নানি কোরান পড়ে পড়ে সৌরভকে কোরানের ভেতরের গল্পগুলো বলতো...কিভাবে আকাশ থেকে তারা খুলে নিয়ে ফেরেশতারা খারাপ জ্বীনদের গায়ে ছুড়ে মারে যাতে তারা আল্লা আর ফেরেশতাদের গোপন কথা দুনিয়ায় গিয়ে বলে না দেয়, কীভাবে আল্লা মানুষকে পুরষ্কৃত করবেন মৃত্যুর পর হুর, আঙুর আর মদ দিয়ে। কীভাবে আল্লা মানুষকে সৃষ্টি আর ধংশ করে দেন; কীভাবে নবীরা যুদ্ধ করতেন। নবীদের অলৌকিক ক্ষমতার কথা যখন নানি বলতেন সৌরভ ভাবতো ডেভিড কপারফিল্ডের কথা। নবীরা কি কপারফিল্ডের চেয়েও আজব কাজ পারতো? নানি বলতেন আখেরাতে মেয়েলোকের চেয়ে পুরুষের পুরষ্কার বেশি। সৌরভ নানিকে বলেছিলো, নানি তুমি আল্লাকে বলো পুরুষের চেয়ে মেয়ে লোকের পুরষ্কার বাড়িয়ে দিতে।

দেখোনা মা সারাদিন কত খাটুনি খাটে, আমাকে স্কুলে নিয়ে যায় নিয়ে আসে. সবার খাবার তৈরি করে. বাসার সব কাজ করে. সেলাই করে. তোমাকে খাওয়ায়Ñগোসল করায় আরো কত কি! বাবাতো এতো খাটে না নানি; বাবা সারাদিন অফিসে বসেইতো কাটায়। আল্লাকে বলোনা নানি মেয়েদের পুরষ্কার বাড়িয়ে দিতে। সৌরভ তার নানিকে কবরখানায় রেখে আসলো। সৌরভের অনেক খারাপ লাগলো যে ওরা তার নানিকে মাটি চাপা দিয়ে রেখে দিলো। নানিকে রেখে এসে ভাত খেয়ে সৌরভ দেখলো যে ঘরটায় তার নানি থাকতো সে ঘরটা ঝাড়া মোছা হচ্ছে।

ঘরটা আজ থেকে সৌরভের। নানির শাড়ি আলনা লাঠি সব সরিয়ে ফেলা হলো। সৌরভ শুধু নানির বালিশটা সরাতে দিলোনা। তেল চিটচিটে বিবর্ণ ছোপ ছোপ কালো রঙের বালিশটা মাথার কাছে নিয়ে সে ঘুমায় আর সেই বালিশের ঘ্রানে সৌরভের মনে ভাষতে থাকে নানির বলা গল্পগুলো। গল্পগুলো দৃশ্য হয়ে সৌরভের চোখের ভেতর খণ্ড বিখণ্ড চলচ্চিত্র তৈরি করতে থাকে।

সৌরভের হঠাৎ একদিন মনে পড়ে যায় কোন গল্পের সময় নানি কেঁদে ফেলেছিলো — যেদিন নানিদের বাড়িতে টুপিআলা আর তাদের মেলেটারি হুজুররা এসেছিলো সেদিন; তারা সবাইকে মারধর করছিলো সে জন্য নানি কেঁদেছে! নানিকে ঘরের ভেতর আটকে মেরেছিলো সে জন্য বোধহয় নানি কেঁদেছে। মনে পড়েছে। সৌরভের মন খারাপ হয়ে গেল। নানির বালিশটাকে হঠাৎ তার নানির মুখ মনে হলো। বিষন্ন মুখ।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।