আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অভিশপ্ত (৪র্থ পর্ব)



১ম পর্ব - ৩য় পর্ব Click This Link চেয়ারম্যানের বাসা থেকে বের হয়েই সে চলে যায় মোনায়েম মাষ্টারের বাড়ি। যে করেই হোক মাষ্টারকে ক্ষমা চাওয়াতে পারলেই সে নিজেও বাঁচবে সাথে মাষ্টারও বাঁচবে। দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ে রফিক। - কি রফিক! কি হইছে? রফিকের সারা শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। হাপাতে হাপাতে সে বলল, স্যার আপনেরে আল্লাহর দোহাই লাগে আপনে চেয়ারম্যনের কাছে মাফ চান।

মাষ্টার বুঝে যায়। মাষ্টার বুঝে যায় তার উপর কোনো আঘাত আসতে পারে। আর তাই রফিক এসেছে তার সাবধান বাণি শোনাতে। মাষ্টার একটি মিষ্টি হাসি দিয়ে বলেন, বস তুই। ঠান্ডা হ।

লেবুর শরবত বানায়া দিমু? - না না স্যার। আমি কিছু খামু না। - আচ্ছা খাইস না। এখন বল কি হইছে? - স্যার কি দরকার আপনের এই বয়সে চেয়াম্যানের লগে গুতাগুতি করনের। কি জন্যে এভাবে তারে অপমান কইরা ক্ষেপাইয়া দেন।

মাষ্টার হাসেন। শুধুই হাসেন। রফিক অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে মাষ্টারকে। মাষ্টার তখন বলল, শোন রফিক, ওর মতো জানোয়াররে অপমান করলে আমার শান্তি লাগে। -কিন্তু কি দরকার।

কি পাবেন এই শান্তি দিয়া? -কি শান্তি পাবো? কাপুরুষ হয়ে না থাকার শান্তি। প্রতিবাদ করার শান্তি। এই বয়সে তো রাস্তায় রাস্তায় হরতাল অবরোধ করার মতো শক্তি নাই। তাই বয়কটের মাধ্যমে প্রতিবাদ। - কিন্তু কেন এই প্রতিবাদ! কি লাভ? মাষ্টারের চোখ লাল হয়ে ওঠে।

ক্যান প্রতিবাদ? তুই জানোস না ঐ হারামীটা যুদ্ধের সময় কি করছে? এই গ্রামের মানুষ সব ভুলতে পারে আমি কিন্তু ভুলি নাই। এই গ্রামের চা দোকানদার জব্বার ভুলতে পারে তার মেয়েকে এবং তার স্ত্রীকে মিলিটারী ক্যাম্পে তুলে দিয়ে এসেছিল এই কাশেম। আমি ভুলি নাই। পাগলী মরিয়মের নামের পাশে পাগলী কেন লাগলো তা এই গ্রামের মানুষ ভুলে যেতে পারে কিন্তু আমি ভুলি নাই। আমার মনে আছে, কাশেম নিজ হাতে মরিয়মের তিন ছেলেকে এবং তার স্বামীকে জবাই করে হত্যা করেছিল।

আমি ভুলি নাই কিছুই। বাংলার ইতিহাসের এই রক্তাক্ত অধ্যায় আমি ভুলি নাই। তাই প্রতিবাদ করি। আমার ছেলে এই দেশের জন্য নিজ দেহকে বিসর্জন দিছে আমি তা ভুলি নাই। আমার ছেলে আমারে চিঠিতে লিখছিল, বাবা তোমাকে একটি নতুন দেশ উপহার দিবো।

আমার ছেলের সেই উপহার সংরক্ষণের জন্য আমার প্রতিবাদ। আর তুই বলতাছস আমি ঐ কুত্তাটার কাছে মাফ চামু। অসম্ভব! অসম্ভব রফিক। আমার ছেলের রক্ত এই মাটিতে মিশে আছে। আমি পিতা হয়ে সেই রক্তের উপর দাড়িয়ে কোনো রাজাকারের কাছে ক্ষমা চাবো না।

এই সব কিছু রফিক হতভম্বের মতো শুনছিল। এক পর্যায়ে সে মাষ্টারকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। এবং কাঁদতে কাঁদতে বলে, স্যার আমি এখন কি করমু। কি করমু? মাষ্টার রফিকের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলেন, বাবা, তুই কি করবি এটা তোরে ঠিক করতে হইবো। তবে একটা কথা মনে রাখিস, মৃত্যুর আগে যখন নিজেকে প্রশ্ন করবি, তুই এই দেশের জন্য এই জাতির জন্য কি করেছিস, যখন তোর বিবেক বলবে, তুই কি করেছিস সারাজীবন।

তখন এই সব প্রশ্নের উত্তর যখন তুই পাবি না তখন কিন্তু নিজের জীবনকে পুনরায় শুরু করবার কোনো সুযোগ থাকবে না। নিজেকে জবাব দেয়ার মতো কিছু করে মৃত্যুই হচ্ছে বীরের মতো মৃত্যু। চেয়ারম্যান তার বসার ঘরে মুখ গম্ভীর করে বসে আছে। আজ রাতেই রফিকের মাষ্টারের বাড়িতে আগুন লাগানোর কথা। কিন্তু রফিক সকালের পর আর আসে নি।

মিঠুকে খবর দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যাতে রফিককে নিয়ে তাড়াতাড়ি আসে। আগুন লাগানোর কাজটা ঠিক হবে কি ভুল হবে তা নিয়ে ভাবনায় মগ্ন কাশেম চেয়ারম্যান। এমন সময় আকমল দৌড়াতে দৌড়াতে চেয়াম্যানের বসবার ঘরে ঢুকে বলা শুরু করে, চাচা, ও চাচা। আযাব, গজব পরছে আমাগো গেরামে।

হে আল্লাহ। আমরা কি পাপ করছি! মাষ্টার বিচলিত কন্ঠে বললেন, অই হারামজাদা কি হয়েছে? - চাচা, গেরামে অভিশাপ ঢুকছে। মসজিদের ইমামের কাছে চান্দা চাইছে। সে দেয় নাই। এখন নাপাকীগুলা লেংটা হইয়া মসজিদের সামনে নাচা শুরু করছে।

চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের সমস্ত কিছু যেনো ভেঙে পড়ছে। তার চারপাশে সব কিছু যেনো ঘোলা হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে তার শরীরে শক্তি ঝরে পড়ছে। তার পবিত্র গ্রামে ঢুকেছে অভিশপ্ত তৃতীয় লিঙ্গ। যাকে আমরা বলি হিজড়া সম্প্রদায়।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।