আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অস্ত্রের বদলে বই পাঠান

শিক্ষা ও মানবাধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করে ১৯৯৭ সালের ১২ জুলাই। ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর সে তালেবান জঙ্গিদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই সে ২০১৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে

 আজ লাইব্রেরি অব বার্মিংহামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট মানুষদের সঙ্গে উপস্থিত থাকতে পারাটা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম আমার জন্য একটি বিশেষ স্থান। কারণ, গুলিবিদ্ধ হওয়ার সাত দিন পর এখানেই আমি নিজেকে জীবিতরূপে আবিষ্কার করি।

আমার প্রিয় পাকিস্তানের পর এখন এটাই আমার দ্বিতীয় আবাস।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আজ আমি আমার নিজের একটি গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই। সোয়াতে আমার স্কুলে আমি খুব ভালো ও অনুগত ছাত্রী ছিলাম। আমার ক্লাসে আমি সর্বোচ্চ নম্বর পেতাম। স্কুলের পাঠ্যবই ছাড়াও আমি লাইব্রেরি থেকে নয়টি বই পড়েছিলাম, যার দুটি ছিল দি আলকেমিস্ট ও সোফিস ওয়ার্ল্ড।

কিন্তু গত বছর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমি এখানকার নতুন সমাজের সঙ্গে পরিচিত হলাম, যা পাকিস্তানের সমাজ থেকে অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। এখানে ছয়-সাত বছরের একজন শিশুও আমার চেয়ে বেশি বই পড়েছে। এখন আমি সংকল্প করেছি, আমিও হাজারো বই পড়ে নিজের জ্ঞানকে শাণিত করব। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, বই ও কলম হচ্ছে সেই অস্ত্র, যা সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করতে পারে। এ জন্য শিক্ষাকে শুধু যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে না দেখে হূদয় দিয়েও তার মর্ম উপলব্ধি করতে হবে।

এই পথই আমাদের শান্তি ও সাফল্যের লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে সহায়ক হবে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, কিছু বইয়ে তুমি তোমার অতীতকে খুঁজে পাবে আর কিছু বই তোমাকে নিয়ে যাবে ভবিষ্যতে। বই-ই মানুষের অনুভূতিকে সজীব রাখে। অ্যারিস্টটলের দর্শন এখনো জীবন্ত, রুমির কবিতা এখনো আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস আর শেক্সপিয়ারের সাহিত্যকর্মের গুরুত্ব কখনোই ম্লান হওয়ার নয়।
ইউরোপের বৃহত্তম এই লাইব্রেরি বহু দশক ধরে বার্মিংহামের জনগণকে শিক্ষিত করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও আলোকিত করতে থাকবে।

প্রবাদ আছে, ‘বই ছাড়া একটি ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো’। আর আমি বলি, লাইব্রেরিবিহীন একটি শহর একটি কবরস্থানের মতো।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে এখনো পাঁচ কোটি ৭০ লাখ শিশু স্কুলশিক্ষার বাইরে রয়েছে। নাইজেরিয়া, সিরিয়া ও সোমালিয়ায় শান্তি ও উন্নতির লক্ষ্যে আমাদের উচ্চকিত হওয়া দরকার। পাকিস্তান, ভারত ও আফগানিস্তানের শিশুদের পক্ষে আমাদের আওয়াজ তুলতে হবে।

যারা সন্ত্রাস, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও শিশু পাচারের শিকার; চলুন আমরা আমাদের কাজ ও স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা করতে সোচ্চার হই। চলুন তাদের সাহায্য করি বই পড়তে ও স্কুলে যেতে। আর আমরা যেন ভুলে না যাই, একটি বই, একটি কলম, একটি শিশু ও একজন শিক্ষকও পৃথিবী বদলে দিতে পারেন।

প্রিয় বন্ধুরা, ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর তালেবান জঙ্গিরা আমার কপালের বাঁ দিকে গুলি করেছিল। তারা গুলি করেছিল আমার বন্ধুদেরও।

তারা ভেবেছিল, গুলি করে আমাদের মুখ বন্ধ করে দিতে পারবে। কিন্তু তাদের সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তারপর সেই নীরবতা থেকেই গর্জে উঠেছে হাজারো কণ্ঠ।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমি কারও বিরুদ্ধে নই। আমি এখানে তালেবান বা অন্য কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিশোধের কথা বলতে আসিনি।

আমি আজ এখানে এসেছি প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলতে। এমনকি আমি সব জঙ্গিগোষ্ঠী, বিশেষ করে তালেবানদের ছেলেমেয়েদের জন্যও শিক্ষার সুযোগ চাই। সত্যি বলতে কি আমি সেই তালেবানকেও ঘৃণা করি না, যে আমাকে গুলি করেছিল। যদি আমার হাতে এখন একটি বন্দুক থাকে এবং সে আমার সামনে দাঁড়িয়েও থাকে, তবু আমি তাকে গুলি করব না। এই করুণা আমি শিখেছি হজরত মোহাম্মদ (সা.), যিশু খ্রিষ্ট ও গৌতম বুদ্ধের বাণী থেকে।

এ হচ্ছে পরিবর্তনের সেই ধারা, যা আমি মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছি। এটি হচ্ছে অহিংসার সেই দর্শন, যার জ্ঞান আমি পেয়েছি মহাত্মা গান্ধী, বাছা খান (খান আবদুল গাফফার খান) ও মাদার তেরেসার কাছ থেকে। আর এ হচ্ছে সেই ক্ষমাশীলতার শিক্ষা, যা আমি আমার মা-বাবার কাছে শিখেছি।

আমার মনে পড়ে, আমাদের স্কুলের এক ছেলেকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, তালেবানরা কেন শিক্ষার বিপক্ষে? সে তার বই দেখিয়ে বলেছিল, তালেবানরা জানে না, এই বইয়ে কী লেখা আছে। জঙ্গিরা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ইসলাম ও পশতুন সমাজের নামের অপব্যবহার করছে।

আজ আমরা এখানে আমাদের সমস্যাগুলোর দীর্ঘ তালিকা তৈরি করতে উপস্থিত হইনি, আমরা এসেছি সেগুলোর সমাধান খুঁজতে—আর এটি খুবই সরল: শিক্ষা, শিক্ষা ও শিক্ষা।

বন্দুক পাঠানোর পরিবর্তে তাই আপনারা কলম পাঠান, ট্যাঙ্কের পরিবর্তে পাঠান পাঠ্যবই। যুদ্ধসেনা নয়, পাঠান শিক্ষক।

সূত্র: লাইব্রেরি অব বার্মিংহামের উদ্বোধন এবং হার্ভার্ড ফাউন্ডেশনের পদক গ্রহণকালে দেওয়া বক্তৃতা, সেপ্টেম্বর ২০১৩।

ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: অরিন শায়লা নুসরাত

 



সোর্স: http://www.prothom-alo.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.