আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বয়সের ভারে মুহ্যমান রাজনীতি

মানুষের চিন্তা, চেতনা, বুদ্ধি, বিবেচনাবোধ ইত্যাদিকে বয়স নানাভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলেই আমার মনে হয় । বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের শারীরিক অক্ষমতা প্রকট হতে থাকে। শুধু শারীরিক দিক না মানসিক দিক দিয়েও মানুষ দুর্বল হতে থাকে। এই শারীরিক এবং মানসিক দুর্বলতা প্রকট আকারে ধরা পড়ে যখন মানুষ কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন থাকে। দায়িত্বে থাকাকালীন অবস্থায় একজন বয়স্ক মানুষ যতই চেষ্টা করুক সুন্দরভাবে তার কাজ সম্পন্ন করতে, সতর্ক হয়ে দায়িত্ব পালন করতে কিছু একটা গড়মিল হবার সম্ভাবনা থেকেই যায় বলে আমার মনে হয়।

মাঝে মাঝে হয়ত কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কিংবা কাজকেও তাঁর কাছে অর্থবহ বলে মনে হতে পারে। আমার কাছে মনে হয়, ওই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কিংবা ভুল কাজের পিছনে ওই মানুষটার বয়সই প্রকৃতপক্ষে দায়ী।
বয়স্ক ব্যক্তিদের এই শারীরিক এবং মানসিক সমস্যার কথা চিন্তা করেই পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশে চাকরির ক্ষেত্রে একটা বয়সসীমা ঠিক করে দেয়া হয়। ওই বয়সসীমা অতিক্রম করলে তাদের চাকরি থেকে অবসর নিতে হয়। এই বয়সসীমা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।

যেমন আমেরিকাতে সাধারনত চাকরীর বয়সসীমা ৬৭ পর্যন্ত রাখা হয়েছে, ইউকে তে সেটা মোটামুটি ৬৮, ফ্রান্সে ৬৫, জার্মানি তেও সেটা ৬৭ রাখা হয়েছে (তত্ত্বসূত্রঃ উইকিপিডয়া) ।
সাধারণত প্রতিটা দেশেই এই সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া থাকে। আমাদের দেশেও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের চাকরীর মেয়াদ ৬০ বছর ধার্য করা আছে। বিশেষ কোন ক্ষেত্রে কিংবা বিশেষ কারো জন্য সেটা এক দুই বছর এদিক সেদিক করা আছে কিন্তু সবার ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ দ্বারা একটা বয়সসীমা ঠিক করে দেয়া হয়ে থাকে।
অনেক সময় অবসরে যাওয়া ব্যক্তি হয়ত সবদিক থেকে চাকরি করার জন্যে যথেষ্ঠ মানসিক এবং শারীরিক দক্ষতাসম্পন্ন থাকতে পারেন কিন্তু চাকরির বাধ্যবাধকতার জন্য তাকে অবসর নিতে হয়।

চাকরির বয়সসীমা থাকার ভাল দিকটা হল বয়সের কারনে সৃষ্টি হওয়া কোন সমস্যার কারনে যাতে কেউ চাকরিক্ষেত্রে কোন বড় ধরনের ভুল না করতে পারে যার জন্যে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে সাধারন মানুষ কিংবা অন্য কেউ। আবার অবসরের পর একজন মানুষ অন্যরকম একটা জীবনও পেতে পারেন যেখানে থাকবে না কোন বাধ্যবাধকতা, ঠিক সময়ে অফিসে যাবার তাড়া, পরিবারকে দিতে পারবেন অফুরন্ত সময়, নিজেও পাবেন একটু অবসর, একটু বিশ্রাম।
একটা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে বয়স বিবেচনা করা যতটুক যুক্তিযুক্ত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রেও ব্যপারটা গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার বলে আমি মনে করছি। একটা দেশের রাজনীতির সাথে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কিত। রাজনীতির সাথে অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি,পররাষ্ট্রনীতি,কূটনীতি যেমন সম্পর্কিত ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বও অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতির উপর নির্ভর করতে পারে।

রাষ্ট্রের ভালর জন্যে দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের সবসময় সুবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটা দেশের সরকারপ্রধান কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের যেকোনো অবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্তের কুফল বয়ে বেড়াতে হতে পারে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের। একটা দেশের সরকারপ্রধান কিংবা অন্যান্য রাজনিতিকদের দেশের স্বার্থে রাষ্ট্রের জনগনের স্বার্থে সবসময় দূরদর্শী চিন্তা করতে হয়। রাষ্ট্রের উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে এবং রাষ্ট্রকে বহির্বিশ্বের একটা সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যেতে এই রাজনীতিবিদদের সবসময় সঠিক কল্পনাপ্রসূত এবং সর্বগ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার মত মানসিক দৃঢ়তা সম্পন্ন হতে হয় তাদের।

রাষ্ট্রের যেকোনো দূর্যোগময় মুহূর্তেও মানসিক শক্তিসম্পন্ন হয়ে দূর্যোগ মোকাবেলা করতে সঠিক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে সচেষ্ট হতে হয় তাদের। বয়সের কারনে অক্ষম হয়ে যাওয়া কোন ব্যক্তির কোন অবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্তে যাতে রাষ্ট্রকে বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়তে না হয় সেজন্যেই রাজনীতিবিদদের জন্যও একটা নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকা দরকার বলে আমি মনে করছি।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বয়সের গুরুত্ব আমরা আরেকটু ভাল করে বুঝতে পারব যদি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় উন্নত বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এমন কাউকে সরকারপ্রধান কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান বানায় যিনি বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত না অথবা যার বার্ধক্য শুরু হতেই দেরি আছে অনেক। একটু খোঁজ নিলে আমরা দেখতে পারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বয়স এখন ৫২ বছর, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিস হল্যান্ড এর বয়স এখন ৫৯, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের বয়স মাত্র ৪৭ বছর, রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদভের বয়স এখন ৪৮, জার্মানির চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মারকেল এখন ৫৯ এ আছেন।

এখানে উল্লেখিত দেশগুলো প্রতিটা ক্ষেত্রেই যথেষ্ট স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও তাদের দেশে বিরাজ করছে না কোন ধরনের অস্থিতিশীলতা। ওইসব দেশগুলোর পর্যায়ক্রমে উন্নত থেকে উন্নততর অবস্থায় যাওয়ার পিছনে কিংবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা অব্যহত থাকার পিছনে আমি ওদের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সুবুদ্ধি সুবিবেচনাবোধের কথা বিশেষ ভাবে বলতে চাই। উপরে উল্লেখিত দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকারপ্রধানদের বিবেচনাবোধের পিছনেও আমি বয়সের একটা ভূমিকা দেখতে পাচ্ছি। উনারা ৫৯ এ যেটা চিন্তা করতে পারছেন ৬৯ এ অবশ্যই সেটা পারবেন না, ৪৮ এ যেটা পারছেন ৫৮ তে এসে সেটা নাও পারতে পারেন।


এখন আমরা যদি এই উপমহাদেশে ফিরে আসি ঠিক উল্টো চিত্র দেখতে পাব। এখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর বয়স ৮১ বছর, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের বয়স ৬৪ আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী আছেন এখন ৬৬ তে। প্রত্যেকেই দেখা যাচ্ছে ষাটোর্ধ এবং দেশগুলোর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের চাকরির বয়সসীমার উপরে উনাদের বয়স। একটু খোঁজ নিলেই দেখতে পাব যে প্রতিটা দেশেই কোন না কোন অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক অবস্থার কথাতো কারো অজানা নয়।

দেশের খারাপ সময়েও আমাদের ষাটোর্ধ রাজনীতিবিদদের মুখ থেকে প্রায়ই হাস্যরসাত্মক, অবিবেচনাপ্রসূত বক্তব্য শোনা যায়। আমাদের ষাটোর্ধ অর্থমন্ত্রীর মুখ থেকে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য বের হয় যা থেকে আমাদের পত্রিকাওয়ালারা ব্যবসাসফল, পাঠকদের জন্য আনন্দের খোরাক যোগায় এমন সব সংবাদ আহরন করতে পারেন। তাঁর বক্তব্যের কিছু নিদর্শন- “'আমি শেয়ার বিজনেস বুঝি না'”, “সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বেশি কিছু না”, “সাভারের দুর্ঘটনা ভয়াবহ কিছু না”, “ ক্ষমতায় থাকলে ক্ষমতাধরদের আয় বাড়া স্বাভাবিক” ইত্যাদি ইত্যাদি। এই মানুষটার উদ্ভট সব বক্তব্যের পিছনে উনার বয়সকেই আমার সবচেয়ে বড় অন্তরায় মনে হয়েছে। আরেক ষাটোর্ধ ব্যক্তি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, “ছাত্রদলের ক্যাডারদের নাড়াচাড়ায় ভবন ধ্বসে পড়েছে”।


নতুন খবর হিসেবে যোগ হয়েছে আমাদের ৬৮ বছর বয়সী প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষমতায় গিয়ে গোপালগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করা, সস্তায় যাকে তাকে বেয়াদব বলা ইত্যাদি। আমাদের রাজনীতিবিদদের এসকল হাস্যকর কথাবার্তার পিছনে উনাদের বয়সের ভূমিকা অনেক বলেই আমার মনে হয়। রাজনীতিবিদদের এই যে অবিবেচনা সেটা কিন্তু শুধুমাত্র সুন্দর সুন্দর বক্তৃতাতেই সীমাবদ্ধ না তাদের কাজে, তাদের সিদ্ধান্তেও সেটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
দেশের অস্থিতিশীলতায় সঠিক, সুবুদ্ধিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না আমাদের রাজনীতিবিদেরা। আমাদের সংবিধানে কিংবা আইনে যদি এইরকম কোন ধারা থাকত যে, ৬০ বছর পর একজন রাজনীতিবিদকে স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে হবে তাইলে হয়তো আজকে আমাদের এই অবস্থা দেখতে হত না আর হয়ত নতুন নেতৃত্বও তৈরি হত তখন।

আজকে আমাদের চিন্তা করতে হচ্ছে এদের পরে কে হবে নেতৃত্বে আসীন। হয়তো এইরকম কিছু চিন্তা করতে হত না, আগে থেকেই প্রস্তুত থাকত নতুন নেতৃত্ব আর বয়সের ভারে মুহ্যমানদেরও একটু অবসর নেয়ার সময় থাকত।
আমাদের পিছিয়ে যাওয়া, আমাদের অস্থিতিশীলতার পিছনে বার্ধক্যে এসেও রাজনীতি করে যাওয়া এই প্রবীণদের অবদান কম না। আমাদের যেরকম সৎ আদর্শবান রাজনীতিবিদ দরকার তেমনি মানসিক শক্তি সম্পন্ন, সুস্থ বিচারবিবেচনাবোধ সম্পন্ন রাজনীতিবিদও দরকার।
Omit Chanda


সোর্স: http://www.sachalayatan.com/

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.