আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বাবুই পাখির স্কুল

চিত্রদীপ জ্বেলে রেখো ময়ূখ পিদিম; রাত্রি-কথায় বেঁধে নেবো ভোরের খোঁপা।

উৎসর্গ - আমার বাবুই_ পাখিকে

আজকাল ছেলে-মেয়েদের কাছে স্কুল কেমন লাগে, বন্ধু-বান্ধব বা স্কুলের শিক্ষকদের কেমন লাগে সেটা ব্যাপকভাবে জানার সুযোগ আমার নেই, নিজের ছেলের অনুভূতি জানা ছাড়া। আমার ছেলে বাবুই একটু অন্তর্মুখি স্বভাবের। নতুন ফ্রেন্ড পেতে বা অপরিচিত কারো সাথে পরিচিত হবার অদম্য ইচ্ছে থাকলেও নিজ থেকে এগিয়ে যেতে পারে না। লজ্জা, শংকা, অস্বস্তি সবই একসাথে কাজ করে।

মারামারি বা ধাক্কাধাক্কি করে নিজের জিনিসটা আদায় করতে পারে না, ঘরে এসে তোড়জোড় আমার সাথেই দেখায়। সাধারণত এতোটা ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি লিখে ব্লগে কখনো দেইনি। আজ বাবুইয়ের একটা অনুভূতি জানানো এবং তার কাছাকাছি কী সমাধান পাওয়া যেতে পারে ভেবেই এই পোস্ট টা লিখলাম।

ও আগে একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়তো। কিন্তু প্রতি বছর স্কুলের বেতন এবং রি-এডমিশন ফী বাড়ছে, যা আমার মতো চাকুরীজীবী অভিভাবকদের জন্য একটা পীড়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বাংলা মিডিয়াম স্কুলেই ও পড়েছে ক্লাস টু থেকে ফোর পর্যন্ত। ওদের সেই স্কুলে পড়াশোনার মান যথেষ্ট ভালো কিন্তু স্কুল ক্যাম্পাস আধুনিক ফ্ল্যাট বাসার মতোই। আমি চাইনি ছেলেকে ফার্মের মুরগীর মতো তুলুতুলু করে বড় করতে। অন্তত শিক্ষাজীবন যাতে আনন্দের হয় সেটা চেষ্টা ছিল। সে যাই হোক, ওকে এবার একটা সরকারী স্কুলে ভর্তি করিয়েছি।

ভর্তি পরীক্ষায় তার ভীষণ ভীতি। তবুও সে সব কিছুই উৎরে গিয়ে টিকেছে সে স্কুলে।


তার বন্ধু-বান্ধব কোনকালেই বেশি ছিল না। দুই থেকে তিনজন। তার প্রথম ভয় ছিল এতো বড় স্কুলে সে হারিয়ে যাবে, আমাকে খুঁজে পাবে না ছুটির সময় ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু।

কিন্তু এর পেছনে যে ব্যাপারটা ছিল সে আমাকে প্রথমে বলেনি। যেদিন সে প্রথম ক্লাস করে বাড়ি ফিরছিল আমার সাথে, আগের স্কুলটা পার হবার সময় দেখি সে চুপিচুপি তার চোখ মুছছে। ধরা গলায় আমাকে বলল --

আম্মু, স্কুল বদলানো কী এতোই জরুরী? আমার অভিজিতকে অনেক দেখতে ইচ্ছে করছে।

অভিজিত তার বন্ধু। ফোনে কথা বলতে বললে সে আবার রাজী হয় না।



যাই হোক, একে একে সে অনেক ত্রুটি খুঁজে পেলো নতুন স্কুলের। তার ক্লাসমেটরা সুন্দর করে কথা বলে না, স্কুলে টিফিন টাইম দেয় না ( অবশ্য এখন ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, তাই দিচ্ছে ) , স্যার/ ম্যাডামরা " তুই " করে বলে, স্যার পিটুনি দেয় হাতের তালুতে, স্কুলে এতো ছাত্রছাত্রী কেন ইত্যাদি। তাছাড়া বোর্ড বই গতকালই সে সম্পূর্ণ সেট পেয়েছে, এর আগে তার হতাশা ছিল এই স্কুলে সে আর কোনোদিন বই পাবে না পুরো সেট।

তবে রোজ সকালের এসেম্বলি, জাতীয় সঙ্গিত এসব তার পছন্দ। স্কুলে একটা ক্যান্টিন আছে, সেখানে নিজে গিয়ে খাবার কিনে আনার স্বাধীনতা তাকে মাঝে মাঝে দিয়েছি।

এতে সে খুশী। নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারছে এটা তার কাছে বিশাল কিছু।

স্কুলের বড় ক্লাসের ছাত্ররা ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট খেলে এসব দেখে তার খুব ইচ্ছে হয় খেলতে। কিন্তু তার ধারণা কেউ তাকে খেলতে নিবে না। ওর ছুটির টাইমটায় আমার লাঞ্চ আওয়ার থাকে, তাই মাঝে মাঝে ওকে আনতে যাই।

আজকে ফেরার সময় আবার ফুলে ফুলে কান্না।

আম্মু এই স্কুলটা ভালো না। ম্যাডাম আজকে মেরেছে।

অপরাধ বিশাল কিছু না। আজ ওদের ইসলাম শিক্ষা ক্লাসের সময় ম্যাডাম এসে বলেছিল - যারা যারা ইসলাম ক্লাস করবি দুই তলায় ক শাখায় গিয়ে বস।

আর হিন্দু ধর্মের যারা তারা এই ক্লাসেই থাক। বাচ্চারা ধাক্কাধাক্কি করে বের হচ্ছিলো ক্লাস থেকে, সে ভেবেছে ভিড় কমলে সে বের হবে। ক্লাস থেকে বের হতে দেরি হওয়ায় তাকে তার ক্লাসের ম্যাডাম মাথায় একটা গাট্টা মেরেছে। তারপর সে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরল।

তাকে প্রায়ই শোনাতে হয় আমরা অনেক আনন্দ নিয়ে স্কুলে যেতাম।

স্যারের মার যদি স্কুল লাইফে কেউ না খায় তাহ্লে সে তার ছেলেমেয়ে বা নাতি নাত্নির কাছে কী গল্প করবে? তার জীবন বৃথা ইত্যাদি বলে তাকে বুঝ দেই । আর এখানে অনেক ছাত্রছাত্রী, প্রতিযোগিতা বেশি। ১২০ জনের মাঝে ক্লাসে প্লেস করা অনেক সম্মানের যা ৪০ জনের মাঝে প্লেস করে সে পাবে না। নিজেকে শক্ত হতে হবে, নিজের প্লেস, নিজের বসার জায়গা এসব নিজেকেই দখল করে নিতে হবে নিজের যোগ্যতায় ইত্যাদি অনেক কিছুই তাকে বোঝাই রোজ।

কিন্তু তার মন এখানে কিছুতেই বসে না।

স্কুল , কোচিং, বাসায় পড়া সব মিলিয়ে রেস্ট বলতে ঘুমের সময় আর শুক্রবার। তার ব্যাগ টা তার পিঠ থেকে নিতে চাইলে তার পৌরষে লাগে বন্ধুদের সামনে - ক্যান আমি বড় হয়েছি না ?

সে যাই হোক, পড়াশোনা অনেক নিরানন্দের ব্যাপার বোধ হয় - তাকে দেখলে মনে হয়। পড়তে হবে তাই পড়ে। পড়াশোনা না করলে রিকশা চালাতে হবে না হলে আচার বিক্রি করতে হবে, মানুষ মূর্খ বলবে এই ভয়েও সে পড়ে বোধ হয়। রেজাল্ট ভালো করলে মায়ের কাছ থেকে , কোচিং থেকে, বাবার বা নানীর কাছ থেকে পুরস্কার পাবে এই আশাতেও পড়ে।

কিন্তু আমি আনন্দের ছাপ দেখি না। আমি ছোট বেলায় কীভাবে পড়েছি, কী কী আনন্দ করেছি স্কুলে সে সব শুনেও তার আগ্রহ হয় না। স্কুল যে আনন্দের জায়গা হতে পারে এটা আমি আজকাল স্কুলের বাচ্চাদের চেহারায় দেখি না।

ক্রিকেট নিয়ে তার দারুন আগ্রহ। তাদের স্কুলে ক্রিকেট এর কোচিং হয়।

এই কারণে কিছুটা আগ্রহ স্কুলের জন্য তার অবশিষ্ট আছে। আমি জানি না স্কুল নিয়ে ছেলেকে কী করে আগ্রহী করে তুলবো। শিক্ষক রা তুই করে সম্বোধন করেন, অকারণে আজকে তাকে মার খেত এহয়েছে, বা অন্য বাচ্চারা মার খায় ক্লাসে এটা তার কাছে এক বিরাট বিস্ময়। এই পোস্ট আমি বাবুইকে উৎসর্গ করলাম। আর এই পোস্টের কমেন্ট সে দেখবে আমি যখন ব্লগে বসবো।



স্কুলকে কী কী কারণে ভালোবাসা উচিত , কী করে ক্লাসের ফাঁকে টিফিনের সময়টায় খেলাধুলা করে কিছুটা আনন্দ হলেও পাওয়া যায় এই পরামর্শ ব্লগে বাবুইয়ের মামা-খালামনিরা আশা করি দেবেন।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।