আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

খবরের কাগজপ্রিয় মানুষটি

মজিদ সাহেব চোখের চশমাটা নিজ কাপড় দিয়ে মুছলেন। চোখে নিয়ে এগিয়ে গেলেন জানালার দিকে। জানালায় দাঁড়িয়ে রাস্তার মানুষ-জনদের দেখতে লাগলেন। এটা তার রোজকার কাজ। আজও তার ব্যতিক্রম নয়।

এভাবে উনি কি দেখেন রোজ? দেখেন সাধারণ মানুষদের চলাফেরা, তাদের কর্মব্যস্তা আর বিশেষ করে তাদের দুঃখ-কষ্ট! মজিদ সাহেব মানুষদের চেহারা দেখে বুঝতে চেষ্টা করেন মানুষটির কি কি দুঃখ-কষ্ট আছে। সে চেষ্টায় তিনি কতটুকু সফল তা বলা যায় না। বলা সম্ভব নয়। মজিদ চৌধুরী। ৫৬ বছর বয়স্ক একজন রিটায়ার্ডপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরিজীবি।

আছেন আপাতত একটি বৃদ্ধাশ্রমে! বয়সের তুলনায় খুব দ্রুত তিনি মুটিয়ে গেছেন। তাকে দেখলে মনে হয় কোন জীবিত ভূত! চেহারা ভেঙ্গে খান খান, শরীর অসম্ভব হ্যাংলা এবং কণ্ঠস্বর তুলনামূলক ভাবে বেশ ভারী। তবে এক সময় তিনি ছিলেন উচ্ছল। কঠোর পরিশ্রমী আর নিজ জীবনে চরম সার্থক একজন মানুষ। যিনি অন্য মানুষের নিকট প্রেরণা হিসেবে ভূমিকাও রেখেছেন।

মানুষ হিসেবে তিনি কেবলই ‘অনন্য’ ছিলেন! তারপর...? দৈনিক পত্রিকা পড়া বাদ দিয়েছেন দিন তিনেক হলো। অথচ মজিদ সাহেবের সবচাইতে প্রিয় কাজটি হলো পত্রিকা পড়া। এটা কিন্তু হটাৎ করে নয়, সেই ছোটবেলা থেকে তার পত্রিকা পড়ার অভ্যাস। কিনে, চেয়ে, কখনও জোর জুলুম করে (!) হলেও পত্রিকা পড়েছেন তিনি। এটা তার ভালোলাগার শ্রেষ্ঠে।

অথচ সেই মজিদ সাহেব পত্রিকা ছুঁয়েও দেখছেন না! আসলে মজিদ সাহেব ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। রোজ পত্রিকা খুললেই কেবল খুন-রাহাজানি, দুর্নীতিগ্রস্থ রাজনীতি, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন সহ নানান অসহনীয় দুঃখ-যন্ত্রণাকর খবর দেখতে হয়। অথচ দেশের উন্নয়ন বা প্রাপ্তি মূলক কোনো খবর প্রচার হয় না। দেশ কি ধ্বংস হতে চলল? মজিদ সাহেব অসুস্থ্য বোধ করেন। সেসব খবর আর পড়তে পারেন না।

তিনি সরল মনে ভাবতে থাকেন, দেশে এত কেন সমস্যা? কেন মানুষের এত দুঃখ-যন্ত্রণা? হটাৎ মজিদ সাহেব নিজের কথা ভাবেন, একবার সরল মনে নিজের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেনÑ আমি কি সুখী? খুব একলা মজিদ সাহেব। খুব। বাইশ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন রাহেলা বেগম-কে। বিয়ের পর থেকে তার জীবন পাল্টে যেতে থাকে। নিজেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুখী মানুষ ভাবতেন তিনি! আসলেই তিনি খুব সুখী ছিলেন।

সব ছিল তার। না পাওয়া আর শত হতাশার জীবনে রাহেলা বেগম তার সকল শূণ্যতা পূরণ করেছিল। তার জীবনে একে একে শত সাফল্য এনে দিয়েছিল। মজিদ সাহেবের জীবনটা একটা স্বর্গে রূপান্তর করেছিল সে। বিয়ের দ্বিতীয় বছরের শেষের দিকে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান জন্ম দেন রাহেলা বেগম।

জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার পেলেন মজিদ সাহেব। এভাবেই চলছিল বেশ। কিন্তু পরিবর্তন আসে তার জীবনে। ঝড়ো পরিবর্তন! দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিয়ে মারা যান রাহেলা বেগম। মজিদ সাহেব ভেঙ্গে পড়েছিলেন, বড় একলা হয়ে পড়েছিলেন।

শোকে তার মৃত্যুপর্যায় অবস্থা। কিন্তু ছোট দুটি সন্তানের কথা চিন্তা করে ধীরে ধীরে শক্ত হলেন। দুই পুত্র সন্তানকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করে শিক্ষা-দীক্ষায় বড় করলেন। এখন তারা দেশের বাইরে। বড় বড় চাকরি করে।

তাদেরও পরিবার হয়েছে। কিন্তু জীবনের এই পর্যায় শুধু এটুকু বড় অন্যায় যে, তার দুই পুত্র তার কোনো খোঁজখবর নেয় না। ভুলে গেছে তারা নিজ জন্মদাতা পিতাকে। তাদেরকে মানুষ করবার কারিগরকে...। রোববার প্রতিদিনকার মতোনই পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে।

হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষ পত্রিকা পড়ছে। অথচ অনেক মানুষই হয়ত নজর এড়িয়ে চলে গেছেন পনেরো তম পৃষ্ঠাকে। যেখানে ছোট্ট করে একটি শোকগাঁথা প্রকাশ হয়েছে। খুবই ছোট্ট করে। ‘আমাদের মাঝে জনাব মজিদ চৌধুরী আর নেই।

বার্ধক্য জনিত কারণে গতরাতে অত্র বৃদ্ধাশ্রমে তিনি তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইলাইহি রাজেউন। আমরা সকলে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। ’ ছবিহীন এই শোকগাঁথা হয়ত তাদের সন্তানেরা কোনদিন পড়বার সুযোগ পাবে না। দৈনিক পত্রিকা ভক্ত মজিদ সাহেবও নিজের মৃত্যুর শোকগাঁথা পড়বার সৌভাগ্য পেলেন না! কিন্তু শত কষ্টের মাঝে তিনি একটা ভাবনা ভেবে সুখী ছিলেন যে, মৃত্যুর পর তিনি রাহেলা বেগমের দেখা পাবেন।

দেখা তাকে পেতেই হবে। তখন তিনি তাকে দ্বিতীয় বারের মত হারিয়ে যেতে দেবেন না। শক্ত করে ধরে রাখবেন, নিজের বুকের সাথে...। আকাশলীনা পত্রিকার ২৩তম (মে ২০১২) সংখ্যায় প্রকাশিত ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.