আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কয়েকটি সংলাপ ('জহির রায়হান' রচিত)

মাথায় অনেক গল্প আসে; কিন্তু লেখার মত পর্যাপ্ত ধৈর্য-শ্রম-অধ্যবসায় নেই। গল্পগুলোকে তাই ছোট করে কবিতা বানাই.... কয়েকটি সংলাপ - জহির রায়হান [আজকের সংলাপ। পথে-প্রান্তরে যে সংলাপ শুনছি] (এখানে 'আজকে' বলতে লেখক ১৯৭১ সালকে বুঝিয়েছেন। এই লেখার রচনাকাল ফেব্রুয়ারী'১৯৭১) কী চাই? একুশে ফেব্রুয়ারির চাঁদা। কী করবেন? একটা ম্যাগাজিন বের করব।

ম্যাগাজিন বের করে কী হবে? বাঙলা একাডেমী থেকে ওরা পুরস্কার দেবে বলেছে। ওখানে জমা দেব। ************************ নাহ। তোমাদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না। ওরা নামজাদা সব গায়ক-গয়িকাদের বুক করে বসে আছে।

আর তোমরা সব আলসের হদ্দ চুপ করে ঘরে বসে গরুর গোস্ত খাচ্ছ? চিন্তা করবেন না স্যার। আয়োজন আমরাও কম করিনি। ওদের চেয়ে আমাদের ফাংশন, আপনি দেখবেন অনেক ভালো হবে। ভালো হবে কী। ভালো হতেই হবে।

এর সঙ্গে আমার মান-সম্মান জড়িয়ে রয়েছে। বুঝলে না, আমি হলাম তোমাদের প্রেসিডেন্ট। আর হ্যাঁ। আমার বক্তৃতাটা ভালো করে লিখে দিও কিন্তু। একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাসটা যেন থাকে ওর মধ্যে।

আর শহীদদের নামগুলো। দেখো, গতবারের মত আবার উল্টাপাল্টা লিখে রেখো না। ************************** না, না, তুমি চিন্তা করো না। আমি দিনকয়েকের মধ্যে বাড়ি আসছি। তারপর ওদের মাথা ভাঙব।

কিন্তু তুমি আসবে কি করে? কেন? তুমি না বললে, ছুটিছাটা নেই। আছে, আছে, ওই তো দিনকয়েক পর একুশে ফেব্রুয়ারি ছুটির দিন। তুমি একটুও বোঝ না। আমি আগের দিন রাতেই এখান থেকে রওনা হয়ে যাব। তারপর দ্যাখো না শালাদের মাথা যদি না ভেঙেছি।

কী সাহস ওদের, আমার ক্ষেতের কুমড়ো চুরি করে নিয়ে যায়! *************************** ওরা কোথায় মিটিং করবে? পল্টনে। আর তারা? তারা করবে বায়তুল মোকাররমে। ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট খালি নেই? নেই। বাঙলা একাডেমী? ওখানেও কারা যেন সেমিনার করছে। তাহলে? কী যে করব বুঝতে পারছিনা।

শোনো। এক কাজ করো। আমাদের মিটিংটা আমরা রেসকোর্সেই করব। আল্লা যা করে ভালোর জন্যেই করে! রেসকোর্সে মিটিং করলে এমন জমা জমবে না, বাকি সবার চোখে ধাঁধাঁ লেগে যাবে। ************************** এই শোনো।

আজ কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। কেন? দেরি হলে প্রভোস্ট ভীষণ রেগে যাবে। শেষে আর কোনও দিনও বাইরে আসতে দেবে না। কিন্তু আমার যে তোমার সঙ্গে অনেক অনেক কথা ছিল। ছিল তো বুঝলাম।

কিন্তু। আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না? কী? কাল রাতে শহীদ মিনারের ওখানে এসো। ওখানে কেন? আমরা সবাই ওখানে আলপনা আঁকতে যাব। অনেক রাত পর্যন্ত থাকব। ইচ্ছেমত কথা বলা যাবে।

তোমাদের প্রভোস্ট কি অত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে দেবে? দেবে না মানে? বিশ আর একুশে বাধা দিলে ওর হাল খারাপ করে দেব না আমরা। ************************* স্যার। কী? ছাত্ররা সব ঘন ঘন আসছে যাচ্ছে। কেন? কেন? ছাত্ররা কেন আসছে? বিজ্ঞাপন চাইছে! কিসের বিজ্ঞাপন? একুশে ফেব্রুয়ারিতে সবাই সংকলন বের করছে কিনা। হুঁ।

এক কাজ করুন। এ বছরটা জয় বাংলার বছর। কাউকে ফিরিয়ে দেয়া যাবে না। আমি একটা ফান্ড স্যাংশন করে দিচ্ছি। ওখান থেকে সবাইকে কিছুকিছু ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিয়ে দেন।

এতে আমাদের কোম্পানির গুডউইল আরো বেড়ে যাবে। আর শুনুন। ইয়েস স্যার। আপনার পরিচিত কোনো কবিটবি আছে? কেন স্যার? না, ভাবছিলাম, শহীদদের ওপরে চার লাইন কবিতা লিখে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করলে--- সেটা নিয়ে ভাববেন না স্যার। সেটা আমি নিজেই লিখে দিতে পারব স্যার।

আপনি জানেন না স্যার, আমারও একটু-আধটু লেখার অভ্যাস আছে স্যার। তাহলে তাই করুন। আরেকটা কথা ছিল স্যার। কী? আমাদের ওই পিয়নটা স্যার। এবারের ঘূর্ণিঝড়ে ওর ঘর-বাড়ি সব শেষ হয়ে গেছে স্যার।

ও একমাসের বেতন এডভান্স চাইছে স্যার! কিসের মধ্যে কী নিয়ে এলেন। যা বললাম তাই করুন গিয়ে এখন। ওসব আজেবাজে ব্যাপার নিয়ে আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না। বলে দিন হবে না। ***************************** কটা ভেঙেছিস? চারটা।

তুই? আমি পাঁচটা গাড়ির নম্বরপ্লেট। আর সতেরটা সাইনবোর্ড। জানিস, আমাদের পাড়ার সেই মোটা সাহেবটা, ওই-যে সেই লোকটা যার মেয়ের কাছে একটা চিঠি লিখেছিলাম বলে আমাকে থাপ্পড় মেরেছিল। মনে নেই তোর? সেই তখন থেকে ঘাপটি মেরে বসে আছি। দাঁড়াও একুশে ফেব্রুয়ারি আসুক।

গাড়িতে ইংরেজি নম্বরপ্লেট। নাক খসে দেব না? দিলাম, শালার গাড়িসুদ্ধু ভেঙে দিয়েছি। ঠিক করেছিস। শালার আমরা সংস্কৃতি সংস্কৃতি করে জান দিয়ে ফেললাম। আর ব্যাটারা ইংরেজি নাম্বার লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবে।

ঠিক করেছিস। রচনাকাল : ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ (জহির রায়হান'এর "গল্প সমগ্র" বইয়ের "কয়েকটি সংলাপ" শীর্ষক গল্প থেকে নেয়া) পাঠক ভেবে বলুন তো, সেই সময় থেকে এখনকার আমাদের চিন্তা-ভাবনা কি খুব বেশি পরিবর্তিত হয়েছে? এতটা বছরেও আমরা নিজেদের কতটা ঠিক করতে পেরেছি??? এরা বড় হয়ে কী গল্প লিখবে আমাদের নিয়ে??? (এই পোস্টের হাতে-আঁকা ছবিগুলো সব (২০১১ সালে) একুশে উপলক্ষ্যে আয়োজিত ছোটদের একটা চিত্র-প্রদর্শনী থেকে নেয়া)  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।