আমি আমার নিজেকেই খুঁজে বেড়াই, আমার মাঝে, তোমার মাঝে, আমাদের মাঝে :) যাই হোক মামার সাইকেলের পেছনে বসে ছুটলাম মামার বাড়ি । অইখানে গিয়ে পরেরদিন গেলাম নতুন স্কুলে । নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ, নতুন মাস্টার সবকিছু নতুন । প্রথম দিনেই আমার ইন্টারভিউ নেয়ার জন্য হেড মাস্টার এর ঘরে ডাক পড়ল । নাহ ভয় পাইনি কারন আমি যখন আমার গ্রামের স্কুল এ ভর্তি হই তখনকার একটা ঘটনা আছে।
প্রাইমারি স্কুলের শ্রেণীগুলোর ধারাবাহিক ক্রম গুলো বলে নেই আগে । ছোট ওয়ান ( নার্সারি – যেখানে বর্নমালার সাথে পরিচয় করানো হয় ) > বড় ওয়ান ( প্রথম শ্রেনী - যেখানে কিছু বাক্য গঠন আর নামতা/যোগ-বিয়োগ শেখানো হয় ) > দ্বিতীয় শ্রেনী > তৃতীয় শ্রেনী > চতুর্থ শ্রেনী > পঞ্চম শ্রেনী । তো আমি ছোট ওয়ান এ প্রথমে ভর্তি হলাম । বছর শেষে সমাপনি পরিক্ষায় ভাল নাম্বার সহ পাশ করলাম । এই ফলাফল দেখে আমার আব্বু আমাকে সরাসরি ২য় শ্রেনীতে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন ।
আব্বুর এই আবেদন শুনে আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক (যার কথা আমার বাল্যকাল ১ এ বলা হয়েছে ) আমার সাক্ষাতকার নিতে চাইলেন । আমি গেলাম, তিনি যা যা প্রশ্ন করলেন ঠিক ঠিক উত্তর দিলাম। তিনি খুশি হয়ে আমাকে ২য় শ্রেনীতে ভর্তি করার অনুমতি দিলেন ।
আসলে ছোটবেলার সব ঘটনা মনে থাকেনা কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা থাকে যেগুলো চোখের সামনে ছবির মত ভাসতে থাকে । এটাও এমনি ।
আর তাছাড়া আমার শিক্ষার শুরু আমার বাসায় হয়েছিল । সন্ধায় আম্মু নিয়ে পড়াতে বসতেন আর একটু রাত হলে আব্বু বাসায় এসে দায়িত্ব নিতেন পড়ানোর । একদিন একটা কবিতা লিখছিলাম “ হাসতে নাকি জানেনা কেউ, কে বলেছে ভাই ?” হঠাত আম্মু খেতে ডাকলো । লেখা রেখে খেতে গেলাম এসে দেখি আব্বু হাসছেন। জিজ্ঞেস করতেই আমার খাতা আমার চোখের সামনে মেলে ধরলেন, আমি পড়লাম “ হাসতে নাকি জানেনা কেউ, কে বলেছে ভাই ? এই শোনোনা কত হাসির খবর বলে যাই, খোকন হা ” ( ‘হা’ এর পরেরটুকু না লিখেই খেতে চলে গিয়েছিলাম), জানিনা এতে হাসার কি ছিলো কিন্তু অনেক হেসেছিলাম সেদিন।
যাই হোক ফিরে আসি আসল ঘটনায়। নতুন স্কুলের হেড মাস্টার আমাকে কিছু প্রশ্ন করে সঠিক জবাব পেয়ে খুশি হলেন। নতুন ক্লাশ , নতুন বন্ধু । আমি আর আমার ছোট খালা একই সাথে পড়তাম । আমি নতুন দেখে তার এক বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল, যে পরে আমার খুব ভাল বন্ধু হয়েছিলো ।
নাম ছিল আমিনুল, আমরা একসাথে স্কুলে যেতাম একসাথে আসতাম । প্রতিদিন সকালে ওর বাসায় গিয়ে ওকে নিয়ে একসাথে যেতাম । একবার রাস্তায় কিছু ফুলের গাছ পেলাম । নিয়ে গিয়ে দুজন মিলে স্কুলের সামনে লাগিয়েছিলাম। কিছুদিনের মধ্যে সেই চারা গাছ বড় হয়ে ফুল ফুটলো , দেখলাম অইটা ছিল মোরগ ফুলের গাছ ।
২-৩ মৌসুমেই পুরা স্কুল আঙ্গিনা ভরে গেল গাছে । আমাদের এই কাজ দেখে আমাদের স্কুলের হেড মাস্টার একটা বাগান করার পরিকল্পনা করলেন। আর তা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে করলেন । প্রত্যেকটা শ্রেনীর জন্য আলাদা আলাদা যায়গা নির্ধারন করে দিলেন। বাগান প্রতিযোগিতা, মুলতঃ সেখান থেকেই বাগান করা আমার শখ হয়ে দাঁড়ায় ।
কিন্তু সেই শখটা সেই প্রাইমারি পর্যন্তই ছিল । এর পরে আর কোনো কিছু শখ হিসেবে বেড়ে উঠেনি । যাই হোক, সেই বাগান প্রতিযোগিতায় আমাদের শেনীই বিজয়ী হয়েছিল। স্কুলের সময়টুকু সবসময় উপভোগ করতাম।
শুধু সমস্যা হত বাসায় আসলে ।
আমার মেজ মামা আমাদের ৩ জনকে ( আমি, ছোট খালা আর ছোট মামা ) এত কড়া শাসনে রাখতেন যে জিবনটা দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল । আগে পড়তাম আনন্দের সাথে, যখন নিজের বাসায় ছিলাম। চাচাত ভাইদের বই নিয়ে একা একাই পড়তাম, ভালো লাগত । কিন্তু মামার বাসায় গিয়ে পড়ার প্রতি এমন একটা ধারনা এসে গিয়েছিল যে পড়ার কথা শুনলেই মনটা খারাপ হয়ে যেত । মুলতঃ লেখাপড়ার প্রতি অনিহা সেখান থেকেই সৃষ্টি ।
যতটুকু পড়তাম তা মামার ভয়ে পড়তাম । রেজাল্ট ভালো হত কিন্তু মনটা খারাপ থাকত।
আব্বু প্রতি সপ্তাহে একবার আসতেন নানির বাড়ি । কতদিন যে চিঠি লিখেছি আব্বুকে দেব বলে , কিন্তু ভয়ে দিতে পারিনি । কি লিখতাম জানেন ??? লিখতাম – আব্বু , আমি এখানে থাকবনা, আমাকে নিয়ে যান।
এখানে ভাল লাগেনা .................. এইসব ।
কেন লিখতাম তার দুই-একটা উদাহরন দেই। গ্রামের বাচ্চারা গরমের সময় পানিতে দাপাদাপি করতে খুব পছন্দ করে, আমিও এর ব্যাতিক্রম না । একদিন গোসলে গিয়ে একটু লম্বা সময় নিয়েছিলাম । মামি, নানি, খালা অনেকে অনেকবার বলেছে আমি উঠিনি পুকুর থেকে।
সাথে আমার সমবয়সি কয়েকটা মামা ছিল । তখন মেজ মামা এলেন । এসে আমার সাথের মামাদের ডেকে পানি থেকে তুলে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন আর নিজে বসে রইলেন পুকুর পাড়ে, যেন আমি না উঠতে পারি । পাক্কা দুই ঘন্টা পানিতে আমি একা একা । ভীষন ভয় পেয়েছিলাম ।
আরেকদিন ঘরের ভেতর আমি আর আমার ছোট খালা পড়ছিলাম, মামা তখন বাইরে ছিল । পড়তে পড়তে এক সময় আমি পড়া বাদ দিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম । এমন সময় মামার আগমন ঘটল । আমাকে ওই অবস্থায় দেখে ওই অবস্থায়ই থাকতে বললেন । থাকলাম ১ ঘন্টা জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে ।
মামা আমাকে কখোনো মারেননি কিন্তু কেন জানি ভয় পেতাম ।
তারপরেও সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তাম । কোনদিন আম বাগানে আম চুরি করা, তো কোনদিন বড়মামার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া । কোনদিন মামাত ভাইদের সাথে মার্বেল খেলা , তো কোনদিন তাদের সাথে মাঠে গিয়ে ধান কুড়ানো ( কুড়ানো ধান দিয়ে আইস্ক্রিম খাওয়ার জন্য ) ।
যাই হোক শেষ পর্যন্ত পার করলাম মামার বাসার দেড় বছর।
তারপর ফিরে আসলাম চিরচেনা আপন রাজত্বে । শুরু হল আবার সেই বাঁদরামি ।
আমার বাল্যকাল ২
আমার বাল্যকাল ( পর্ব ১ )
*** এই পোস্টটা আমার কাছেই কেমন যেন লাগছে, মজার কিছু লিখতে পারলামনা। কিন্তু মামার বাসায় অনেক মজা করেছিলাম, এখন মনে পড়ছেনা । যাই হোক হাই স্কুল জিবনের বাঁদরামির গল্প সামনের পোস্ট এ ।
ধন্যবাদ ***
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।