আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’ গেদু চাচাকে লেখা প্রাকৃতিক গ্যাসের খোলা চিঠি।

গেদু চাচার খোলা চিঠি।

চাচা, ঢাকা শহরের কোন এক বাসার চুলা থেকে বলছি। সারা রাত জ্বলেছে আমার দেহের বাকি অংশ...আর কিছুক্ষণ পর আমিও জ্বলে শেষ হয়ে যাব...তাই ফুরিয়ে যাবার আগেই কিছু বলতে আপনাকে এই চিঠি লেখা। নীল রংয়ের এই আগুনের প্রতি দেশবাসীর অনেক মায়া...একটু খানি না দেখলে তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায় তাই একটা ম্যাচের কাঠি জ্বালানোর থেকে আমাকে জ্বলাতেই বেশি পছন্দ করে...আমি মাটির অন্ধকুপ থেকে পাইপে পাইপে যাত্রা করে বাসার পাইপ দিয়ে আপনাদের কাছে আত্মহত্যা করার জন্যে বসে থাকি। আপনি হয়ত বলবেন তোমার কাজ হলো জ্বলে পুড়ে আমাদের তাপ শক্তি দেওয়া তো এটায় আত্মহত্যা হবে কেন?...আপনার প্রশ্নের উত্তর আমি এক এক করে নিচে দেই? চাচা, আপনাদের মানব জাতির কোন এক বিখ্যাত লেখক লিখেছিলেন... ‘জন্ম আমার আজন্ম পাপ’।

পৃথিবীর অভ্যান্তরে নানা উপায় তৈরি হলাম আমি। আমার গুরুত্ব বোঝার সাথে সাথে আমার জন্মের পাপ শুরু হয়ে গেল। আর কোন দেশের কথা নাই বা বলি বাংলাদেশের কথায় আসি। যে দেশে অমুল্য সম্পদের মুল্য নাই সেই দেশে আমি কেন আসলাম এখন ভাবলে আমি উচ্চ স্বরে কাঁদি। দেশের কয়টা কুপে আমি আছি আর তাতে আমরা সঠিক কোন পরিমাণে আছি আপনি জানেন? আমাকে আপনারা কি ভাবেন বলেন তো? কবে জানি কোন সরকারের একজন বিশেষ ভাবে অজ্ঞ মন্ত্রী বলছিলেন...আপনারা নাকি আমার উপরে ভাসছেন।

আমি কথাটা শুনে সিলেটের হরিপুরের একটা স্থান থেকে এমন উপায়ে প্রতিবাদ জানালাম যে আপনারা চাইলেও আমাকে ব্যাবহার করতে পারবেন্না। দেখবেন আমি পুকুরের পানিতে বা ক্ষেতের ফসলের ফাঁক দিয়ে বুদবুদ দিয়ে বের হচ্ছি কিন্তু ছুঁতে পারবেন্না...মজা না চাচা? চাচা, আপনারাই প্রবাদ বানান আবার আপনারাই সেই প্রবাদের উদাহরণ হিসেবে হাজির হন। আপনাদের কিছু প্রবাদ আছে ‘কানা কে হাইকোর্ট দেখাতে নাই’বা‘উলু বনে মুক্তা ছড়াতে নাই’ বা ‘বানরের গলায় মুক্তার হার’...কিন্তু হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে আমাকে ব্যাবহারের ক্ষেত্রে সব সময়ই আপনারা উপরের প্রবাদ গুলার মত চলেছেন। আমাকে আবিস্কারের পর আপনারা কি করলেন?শুরু করে দিলেন নির্বোধের মত যথেচ্ছ ব্যাবহার যেখানে একবার ও ভাবলেন্না আমারও মজুদের একটা সীমা আছে...পর্যায় ক্রমে তা সব বংশধরদের ব্যাবহার করার অধিকার আছে। অবশ্য যেই দেশে দেশ চালনাকারীরাই জানেনা কিভাবে পরিকল্পনা করে চলতে হবে সেখানে আপনাদের কি দোষ দেব? সুনাগরীক কিভাবে হতে হয় সেটা তো আগে একটা সুনির্দিষ্ট উপায়ে শিখাতে হবে না হলে কিছুদিন পর পর গলা ফাটায় কাঁদলে কি সুনাগরীক হওয়া যায়? চাচা, পাশের দেশ ভারতে আমাদের আত্মীয়দের অভাব নাই।

ওরা হাসে আমাদের ব্যাবহার দেখলে। কেন জানেন?এক এক করে বলি তাহলে... ১। এত বড় একটা দেশ অথচ ওরা পাইপ লাইনে গ্যাসের সংযোগ সুবিধা কাওকে দেয় না। ব্যাবহার করো কোন অসুবিধা নাই কিন্তু তা সিলিন্ডার কিনে করতে হবে। আর আমাদের দেশে?...যে চাইবে সেই পাবে গ্যাসের লাইন...কত্ত সুবিধা তাও আবার...সারা মাস পুড়ালেও যা বিল একদিন পুড়ালেও তাই বিল।

বিল আবার তাও অফিস থেকে আসবে না...সারা বছরের বিলের কাগজ আপনারা কাছেই থাকবে আপনি এই মাসের বিল আগামি মাসের ২০ তারিখের মধ্যেই শোধ করে আসবেন। তো এখানেই শুরু আসল খেলা...যেখানে সারা মাস যাই খরচ করেন বিল একই তাই আপনারা আমাকে ব্যবহার করতে শুরু করে দিলেন ইচ্ছামত। একটা দেশলাই কাঠির জন্যে সারা দিন পুড়াচ্ছেন...কাঁথা শুকাতে...বর্ষাকালে ভেজা কাপড় শুকাতে আমাকে ব্যবহার করছেন। শীতকালে ঘর গরম করতে আমাকে ব্যবহার করছেন...কোথায় না আমাকে ব্যবহার করছেন?কিন্তু আমাকে ব্যবহার করে বিল টা কেউ আর দিচ্ছেন না...কেন দিবেন?বিল যখন পর্যন্ত কতৃপক্ষের কাছে মনে হবে যে লাইন কেটে দেবার মত হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আসবেনা...আর প্রতি বছর আসবে জুন ক্লোজিং এর সময়। মোটা অংকের বিল বাকি? দিয়ে দাও মিষ্টি খাবার টাকা আপনি খালাস।

উন্নত দেশে কি ব্যবস্থা? আপনার সংযোগের সাথে ব্যাংক একাউন্ট জড়িত থাকবে...আপনি বিল দেবেন্না? কিচ্ছু না...পর্যায় ক্রমে আপনার ব্যাংক থেকে টাকা কেটে নিয়ে যাবে...টাকা নাই ব্যাংকে? স্বয়ংক্রিয় ভাবে আপনার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে...আপনার বিরুদ্ধে আইন তৈরি আপনি মানবেন্না?...আপনি বাধ্য। আর আপনাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন তো কি হয়েছে? একটা পক্ষ যাবার সাথে সাথে টাকা ঘুষ দিলেই আবার সংযোগ দিয়ে দিল। ২। পাশের দেশ ভারত এর একটা চিত্র...ভেলরের একটা খাবার হোটেল...যেখানে দাও দাও করে জ্বলছে সিলিন্ডারের গ্যাস আর তাতে রুটি সেঁকে কাষ্টমারদের দেয়া হচ্ছে। এত সোজা না ওখানে গ্যাসের যথেচ্ছা ব্যবহার করে খাবার হোটেল চালানো।

আর আপনারা কি কখনো মনে করছেন পরম তৃপ্তি সহকারে যেই স্বাদের খাবার খাচ্ছেন তার জ্বালানী শক্তি কি হাস্যকর ভাবে আসছে? একটা তিন টাকার সিংগারা বানাতে কয় টাকার অমুল্য সম্পদ আমাকে ব্যবহার করছেন?সারাদিন আমি জ্বলতেই থাকি সেই সকাল থেকে রাত অবধি...তার খরচ কত?শুনে ভারতে থাকা আমাদের আত্মীয় গ্যাসেরা হেসেই খুন। একই পদ্ধতি...এক চুলা ৮৫০টাকা(বাড়তে পারে এখন-গেদু চাচা) তা একদিন ব্যবহার করো অথবা সারা মাস যত খুশি...বিলও সাধারণ গ্রাহকদের মত। কি দারুণ নির্বোধ আপনারা!!!! ৩। শিল্প কল-কারখানায় আমার ব্যাবহার নিয়ে আমার আপত্তি নাই...কিন্তু হঠাৎ করে যানবাহন কে সি এন জি তে রুপান্তরিত করার নামে আবার আমাকে ধ্বংসের চিন্তা মাথায় আসলো তা দেখে আমার দুঃখের সীমা থাকল না। সি এন জি করে কারা বা কিই বা তাদের পদ্ধতি কখনো দেখেছেন? আপনার দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সমন্ধে তো ধারনা থাকতে হবে না হলে উন্নত দেশ আর কিছু শিক্ষিত গর্ধব যা বলবে তাই শুনবেন? কি অবস্থা এখন দেখছেন? কোন পরিকল্পনা আছে আপনাদের রাস্তায় কতগুলা গাড়ি চলবে? তার কতটা অংশ সি এন জির আওতায় আসবে? কোন পরিকল্পনা নাই...তাই সেদিন দেখলাম একটা পেট্রল পাম্পে ৩০ বছরের পুরাতন বালির ট্রাক এসে সি এন জি নিয়ে গেল।

দেশের পরিবেশ বাঁচানোর হাস্যকর অবস্থা দেখে আমি অস্থির। আপনারা এক কাজ করতে পারেন সাইকেল,রিকশা,মোটর সাইকেল,ভ্যান সব সি এন জি করে ফেলেন;এত কষ্ট জিবন নষ্ট করে কেঁদে কি লাভ? একবার একটু ভাবেন তো আজ থেকে বিশ বছর পর যখন আমি থাকব না তখন এই সি এন জি তে রুপান্তরিত বাহন গুলা কিভাবে রাস্তায় চলবে?...কি হবে আপনাদের পরিবেশের অবস্থা? বি আর টি এ ঘুষ খেয়ে গাড়ি ছেড়ে দেয় আর আপনারা আমাকে পুড়ায় পরিবেশের কার্বন ডাই অক্সাইড কমান...হায়রে বাংলাদেশি রে...!!!! ৪। উন্নত আর ক্ষমতাধর সব রাষ্ট্রের খোঁজ রাখেন ঠিক মত চাচা? আমেরিকা, কানাডা,আর রাশিয়া বা আরো কিছু দেশ কি আপনাদের মত দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস ক্ষেত্র গুলা বিদেশিদের হাতে তুলে দিয়ে আরামে পায়ের উপর পা তুলে ঘুমায়?কি করলেন আপনারা কেয়ার্ন এনার্জির হাতে আমাকে তুলে দিয়ে? তাদের অসাবধনতার জন্যে কি পরিমাণ ক্ষতি আপনাদের হয়েছে জানেন?কিছু করতে পারছেন আপনারা? আপনারা আর কি করবেন?...আপনাদের তো একটা চকচকা গাড়ি দিলে পুরা বাংলাদেশ বেঁচে দিতে পারে কোল, শেল এদের মত কুখ্যাত ডাকাতদের কাছে। কেয়ার্নের হাতে টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্র তুলে দেবার আগে খোঁজ নিছেন কানাডা ভিত্তিক ঐ কোম্পানি নাইজেরিয়ায় কি ধ্বংস যজ্ঞ চালায় আসছিলো?ওদের দেশের ঢোকার আসল মতলব কি? আমেরিকা,রাশিয়া বা কানাডা আপনাদের মত মাছি মারা কেরানিদের একটা চল্লিশ টাকার গাড়ি দিয়ে দেশের অমুল্য সম্পদ ধ্বংস করে দিয়ে যায়...যেদিন আপনাদের এই সম্পদ আর থাকবেনা সেদিন আমেরিকা রাশিয়া বা কানাডার আসল চেহারা প্রকাশ পাবে...কারণ ওরা নিজেদের সম্পদ আগলে রেখে পরের সম্পদ ব্যাবহার করে...একদিন ওরা যা বলবে আমাদের তাই করতে হবে। ভবিষ্যত বারাক ওবামা যদি বলে তোদের জ্বালানি দেব না...তাহলে কোম্পনিইবা কিভাবে চালাবেন আর সি এন জি তে রুপান্তরিত গাড়িতে এসির বাতাস খেতে খেতে সুখ স্বপ্ন কিভাবে দেখবেন তা একবার ভাবেন।

যাই হোক চাচা, আমি কেন আত্মহত্যা করব তাই এতক্ষণ বললাম। আমার আগের জন পুড়ে শেষ এখন আমার পালা। ও বাবা আজকে আবার এই মেয়েটা দেখি হাবিবের সেই গান টা বাজাচ্ছে,‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বলাও...তাতে আগুন পাবে’...কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় সে কখনোই চুলা নেভায় না। তাই আমি ভবিষ্যতে ঢাকার কোন একটা সুরম্য অট্টালিকার রান্না ঘরের চিত্র কল্পনা করি যেখানে গ্যাস নেই রলে গৃহকর্তির সাধের রান্না ঘর আর তার অটবির ইন্টেরিওর ধোঁয়ায় কালো হয়ে গেছে...আর তিনি চোখে মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে চুলাতে খরি ঠেলছেন...আপনি কি বুঝতে পারছেন চাচা মিয়া কি সুখ আপনাদের সামনে আসছে?কেমন লাগবে গুলশান,বনানী বা হাইফাই সব বাসার জানালা থেকে যখন দেখবেন কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে? যাই হোক চাচা,হাবিবের ঐ গান টা আমি একটু গাই?...শেষ ই তো হয়ে যাব একটু পরে... ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও তাতে আগুন পাবে... শীতের কাছ থেকে দূরে পালাও তাতে ফাগুন পাবে... তবু আমাকে আর পাবেনা... কারণ আমায় অবহেলা করেছ’ আমাকে আর পাবেন্না...ভাল থাকবেন। ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’ গেদু চাচাকে লেখা প্রাকৃতিক গ্যাসের খোলা চিঠি।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.