কাজ-কাজ আর কাজ। ক্ষমতার আগ্রাসন হতে মুক্তি।
বিয়ের শাড়ি বলতেই চোখে ভেসে ওঠে বেনারসি। আগে ব্রোকেট বেনারসির কদর ছিল তুঙ্গে। এই শাড়ি যেমন কারুকার্যখচিত ছিল, তেমনি ছিল ভারী।
শাড়ির জমিনজুড়ে থাকা নকশা যে কারও নজর কাড়তে পারত। ধীরে ধীরে এই শাড়ির ডিজাইনে ঢুকে পড়ে ভারতীয় নকশা। পুঁতি, কাচ ও পাথরসহ বিভিন্ন ডিজাইনের দাপুটে রাজত্বে পড়ে যায় এই ব্রোকেট বেনারসি শাড়ির কদর। সময়ের ফেরে খদ্দেরের কথা মাথায় রেখে বেনারসি শাড়িতেও আসে নতুনত্ব। আর সে জন্য সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ সব ধরনের বেনারসির দেখা পাওয়া যায় বাজারে।
যার মধ্যে ধারকন, বরকিট, লগন, চুন্দ্রি, কুমকুম, জংলা, এক ধরকি, কাঞ্জিবরম ও বেল সার্টিনের নাম করতেই হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বহির্বিশ্বেও তৈরি হচ্ছে এর চাহিদা। এমনকি সুদূর আমেরিকায়ও ব্যক্তিগত উদ্যোগেই ছড়িয়ে পড়েছে এর নামডাক।
বেনারসির চল ছিল প্রথম থেকেই। সেই ১৯৪৭ সালে ভারতের বেনারস থেকে গুটিকতক পরিবার চলে আসে বাংলাদেশে।
আদমজী, মদনগঞ্জ, ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয় বেনারসি কারখানা। ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটতে থাকে আরমানিটোলা, নবাবগঞ্জ, লালবাগ, হাজারীবাগ, বেচারাম দেউড়ি ও চকবাজারে। কিন্তু স্বাধীনতার পর পর পুরান ঢাকা থেকে কারখানাগুলো সরে আসে মিরপুরে। ১৯৭২ সাল থেকে বাঙালিদের অনেকেই জড়িয়ে পড়েন এ ব্যবসায়। বদলও আসতে থাকে আগের সেই পুরনো ডিজাইনে।
মাথার ওপর চালাঘর। দরজা দিয়ে ঢুকতেই দুই সারি ধরে গিয়েছে তাঁতযন্ত্র। হাতের পেশির জোরে বয়নশিল্পীরা চড়িয়ে যাচ্ছেন নান রঙের সুতা। মাকু দিয়ে বুনে চলেছেন কাপড়। পাট্টাকে হেরফের করে নতুন নতুন নকশা তোলায় ব্যস্ত চলি্লশোর্ধ্ব মোঃ হারুন।
সেই ১৯৭৬ সাল থেকে তার হাত দিয়ে উঠে এসেছে বাহারি নকশার বেনারসি শাড়ি। এই দীর্ঘ সময়ে বেনারসি শাড়ির অনেক রদবদলও দেখেছেন তিনি।
ধারকান বেনারসির সুতা চড়াতে চড়াতে তিনি বললেন, 'শখের বশেই শিখেছিলাম এ কাজ। তখন কাজের মজুরি ছিল ভালো। তাই অনেকের মতো আমিও বেছে নেই এ কাজ।
কিন্তু এখন এই শাড়িতে বিভিন্ন নকশা চলে আসায় আগের সেই মজুরিও পাওয়া যায় না। ' শাড়ির ডিজাইন আনুযায়ী মজুরিরও হেরফের হয়। তবে নকশা অনুযায়ী সময়ও লেগে যায় প্রচুর। শুধু একটি সূক্ষ্ম নকশার শাড়ি তুলতেই সময় লাগ প্রায় ১০ দিন। কিন্তু সে তুলনায় পাওয়া যায় না মজুরি।
মোঃ জসিম ১৪ বছর ধরে জড়িয়ে আছেন এ কাজের সঙ্গে। অর্ধেক মাস ধুন্ধুমার শাড়ি উঠাতে পারলেও বাকি সময়টা আর পেরে ওঠেন না। শরীরও চায় না আর কাজ করতে। আর এভাবেই মাসের অর্ধেক সময় শাড়ি বুনন ও বাকি সময় বিশ্রাম নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন কাজ। তাঁতের হাতা ধরে টেনে টেনে সুতা চড়াতে গিয়ে মাঝপথে হাঁপিয়ে উঠছেন কারিগর মোঃ পাপ্পু।
শুকনা চামড়ার ওপর ভেসে উঠেছে হাড়জিরজিরে পাঁজরগুলো। শরীরে তেমন জোর পান না। বছর চারেক আগেও সপ্তাহে ২-৩টা শাড়ি উঠাতে পারতেন। তাঁতে চড়িয়েছেন থান বেনারসি। কাজ করতে করতে বেশ আক্ষেপের সুরেই বলে উঠলেন, 'এই মজুরিতে সংসরাই চলে না, তা দিয়ে আবার ভালো খাবার! ২-৩টা শাড়ি নামাতে পারলে মজুরি পাই ৩০০-৪০০ টাকা।
সুবিধা হলো থান বেনারসিতে নকশা নেই, তাই কম সময়ের মধ্যে নামানো যায় এই শাড়ি। জানা গেলো, সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে শাড়ি বানানোর কাজ। এই সময়টুকুতে তাঁত চালাতে গিয়ে চাপ পড়ে শিরের পাঁজরে। তাই শরীরের জোর যতদিন আছে, ততদিন বীরদর্পেই চালানো যায় এ কাজ। কিন্তু ৩০ বছরের কোঠায় এসে ঠিকই বিদ্রোহ করে বসে শরীর।
তখন ভাগ্যের ফেরে কোনো মহাজনের কৃপাদৃষ্টি পড়লে আরও কিছু সময়ের জন্যও টিকে যান বয়শোর্ধ্ব কারিগররা। কিন্তু সে সময়ই বাদ সেধে বসে শরীর। দানা বাঁধতে থাকে নানা অসুখ-বিসুখ। আর তাই হারিয়ে যেতে থাকে কাজের ক্ষমতা। এভাবেই ধীরে ধীরে অকেজোর খাতায় জুড়ে যায় নিজের নামটি।
মিরপুর ১০, ১১, ১২ নম্বরের এলাকাজুড়ে বেনারসি পল্লী। কারখানার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে শো-রুমও। নালা-নর্দমার ধার ঘেঁষে বেড়ার ঝুপড়ি ঘরে কাজ করে যাচ্ছে অগুনতি কারিগর। শাড়ির চড়া মূল্য হাঁকানো হলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি এই শিল্পীদের। বরং শো-রুমের ওই চাকচিক্যময় বেনারসিগুলো কারিগরের জীবন নিয়ে যেন কটাক্ষ করে যাচ্ছে প্রতিমুহূর্তে।
মূলত স্বাধীনতার পর মিরপুরের পরিত্যক্ত পরিসরে গড়ে ওঠে এই কারখানাগুলো। এরপর আর কোনো উদ্যোগও হাতে নেওয়া হয়নি এই শিল্প খাতকে নিয়ে। মিরপুর বেনারসি দোকান-মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মোঃ তাজুল ইসলাম সেই '৮৬ সাল থেকে জড়িয়ে ছিলেন এই ব্যবসার সঙ্গে। কিন্তু এখন সরে এসেছেন এই পেশা থেকে। তিনি বললেন, ''বেনারসি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে '৯৬ সালে তৎকালীন সরকার ভাষানটেকে ১০০ একর জমি বরাদ্দের ঘোষণা দেন।
এ জন্য প্রতি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি সে সময় থেমে যায়। ফলে বেনারসি কারিগর ও ব্যবসায়ীদের জমি বরাদ্দের এই দাবি চাপা পড়ে যায় অনির্দিষ্টকালের জন্য। অথচ সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দাঁড়িয়ে যেত সম্ভবনাময় এই শিল্প খাতটি। দেশে ও দেশের বাইরের বাজারে দাপিয়ে বেড়াত বীরদর্পে।
''
শাপলা বড়ূয়া
Daily samakal
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।