আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অত্যাচার

আমি যা বিশ্বাস করি না... তা বলতেও পারি না! সফিক এহসান (৩ জুন ২০০৩ইং) ফজরের সময় জেগে উঠলো কেরামত মিয়া। বাইরে বেরিয়ে দেখলো সূর্য তখনও ওঠেনি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। কাল রাতে বৃষ্টি হয়েছে। আজ ধানের চারাগুলো নিয়ে ক্ষেতে যাবে ধান বুনতে।

ঘরে গিয়ে তার তের বছরের ছেলে সুরতকে ডেকে তুলল। ততক্ষণে পাশের ঘর থেকে চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে এলো রাবেয়া। কেরামতের বড় মেয়ে, বয়স ষোল কি সতেরো হবে। স্ত্রী নেই কেরামত মিয়ার। মারা গেছে তাও প্রায় সাত-আট বছর আগে।

: ভাত দিমু বাজান? কেরামতের উদ্দেশ্যে বলল রাবেয়া। : আঁ, দে! বলে সুরতকে নিয়ে পুকুরে চলে গেল মুখ ধুতে। কাঁচা মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খেয়ে তাড়াতাড়ি করে চারাগুলো নিয়ে চলে গেল ক্ষেতে। রাবেয়াও থালা-বাটি নিয়ে পুকুর পাড়ে চলে গেল। গতবার কেরামতের সাথে তার ছোট ভাই রশিদ ছিল।

এবার অবশ্য নেই, ঢাকা চলে গেছে। জোর করেই পাঠিয়ে দিয়েছে সে। মেট্রিক পাশ করে ভাইয়ের সাথে কৃষি কাজ করার কোন মানে হয় না। তারচে’ ঢাকায় গিয়ে একটা কিছু করুক। পরে না হয় বিয়ে শাদি করানো যাবে।

এসব ভেবে পাঠিয়ে দিয়েছে কেরামত। ভাইটা চলে যাবার পর কেরামতের বাড়িটা কেমন যেন খালি খালি হয়ে গেছে। বাপ-দাদার ভিটা। ভাগাভাগি করে কেরামতের বাবা পেয়েছিল তিনটি ঘর। শনের চাল আর মাটির দেয়ালের সেই ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে অত্যন্ত জবুথবু হয়ে।

কোন একদিন কাউকে কিছু না বলেই হয়তো মুখ থুবড়ে পড়বে। মাঠে গিয়ে কেরামত দেখলো অনেকেই এসে পড়েছে। সে হাক দিল: কী আবুল মিয়া, আইজ এতো তাড়াতাড়ি আইয়া পড়ছো? কয়েকজন কৃষক মুখ তুলে তাকালো কেরামতের দিকে। ক্ষণিকের জন্য; তারপর আবার যে যার কাজে মন দিলো। গত বছর খরা হওয়ায় কারো ক্ষেতেই ভাল ধান হয়নি।

এবার তাই বৃষ্টি হওয়াতে সবাই খুশি। গতবারের ক্ষতি এবার পুষিয়ে নেবে। শুধু একটাই চিন্তা আবার বন্যা না হয়ে যায়! গতবার কেরামত রিতিমত হিমশিম খেয়ে গিয়েছিল। ভাগ্য ভাল জমিটা তার নিজের ছিল। অন্যদের মত বর্গায় জমি চাষ করতে হয় না।

তবুও মাতবরের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে অনেকগুলো টাকা। সন্ধ্যা বেলা বাড়ি ফিরে এলো কেরামত ও সুরুত। প্রচুর খাটুনি গেছে আজ। গতবার রশিদ থাকায় এতো অসুবিধা হয়নি। ছেলেটা কর্মঠ খুব।

কাজকে ভয় পায় না। ওর মত ছেলেরাই জীবনে উন্নতি করতে পারে। সারাদিনের ক্লান্তিতে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লো কেরামত মিয়া। পরিশ্রম শরীরে জানান দিচ্ছে। তবুও মনে একটা শান্তি অনুভব করলো সে।

বুক ভরা স্বপ্ন তার- যেদিন ফসল ঘরে তুলবে, সব দেনা সুদ করে দেবে, সেদিন তার কতই না সুখের দিন। সুখের দিনের কথা ভাবতে ভাবতে কেরামত মিয়ার দিন যায়, সপ্তাহ যায়। প্রায় দুই মাস পরের কথা- ধানের শীষ বেরিয়েছে। কোন কোনটি পাকতেও শুরু করেছে। কেরামত ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করছিল।

এসময়টা খুব সতর্ক থাকা লাগে। নানা রকম পোকা মাকড়ের আক্রমন বাড়ে এসময়ে। তাই সবাই যার যার ক্ষেতে কাজ করছিল। এমন সময় গ্রামের মতবর সাদেক গাজি ও তার এক চ্যালাকে এদিকেই আসতে দেখলো সে। মাতবর কাছে আসতেই তাকে সালাম দিলো কেরামত।

: ওয়ালাইকুম আস্সালাম। বাহ! ভালোই ফলন হইছে দেখা যায়! কেরামত উচ্ছাসের সাথে জবাব দিলো: হ-অ! আপনেগো দোয়ায়। মাতবরের চ্যালা বাচ্চু মিয়া বলল: হুজুরের ক্ষেতে আল্লায় সব সময় ভাল ফলনই দেয়। : তার মানে?! বোকার মত একবার মাতবরের আরেকবার বাচ্চু মিয়ার মুখের দিকে তাকালো কেরামত মিয়া। গম্ভির কণ্ঠে সাদেক গাজি বলল: এই সহজ কথা না বোঝার তো কিছু দেখি না।

যা হোক, চলি। কেরামত মাটির দিকে তাকিয়ে ওদের কথাগুলো নিয়ে ভাবে। কিন্তু আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারে না। তার মত সহজ-সরল মানুষের পক্ষে এ কথার অর্থ না বোঝাই স্বাভাবিক। আরও কয়েক দিন পর।

ক্ষেতের ধান প্রায় সবই পেকে গেছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে কেটে ফেলা দরকার। ঠিক এরকমই এক দিন সন্ধ্যায় সাদেক গাজি এলো কেরামত মিয়ার বাড়িতে। ঘর থেকে একটা চৌকি এনে বসতে দিয়ে কেরামত বলল: তারপর কী মনে কইর‌্যা মাতবর সাব? : কী আর; ধান কবে কাটবা তাই জানতে আইলাম। সেই দিন তো আবার আমার লোক পাঠাইতে হইব।

: ধান তো ছয় সাত দিনের মদ্দ্যেই কাটবার চাই। কিন্তু লোক পাঠাইবেন কইলেন, কিসের লোক? : বারে! ধানের তিন ভাগের দুই ভাগ নিয়া আমার গোলায় রাখতে হইবো না! : কেন! আমার ধান আপনের গোলায় রাখবেন কেন? : তুমার ধান! আমার জমির ধান আবার তুমার হইলো কিমুন কইর‌্যা? : আপনের জমি! এই সব কী কন? জমিতো আমার! : তুমার! তুমার কবে থিকা। গেল বছর খরায় যখন সব ধান নষ্ট হইল, তখন তোমার জমি বিক্রি কইর‌্যা দলিলে টিপ সই দিয়া ট্যাকা নিলা পাঁচশত, মনে আছে না ভুইল্যা গেছ? : আমি তো ট্যাকা নিছিলাম ধার, জমিতো বেঁচি নাই। ধান বেইচ্যা সব ট্যাকা সুদ কইর‌্যা দিমু। : এঁ-হ, কইলেই হইল! জমি বেইচা দিয়া আবার ট্যাকা দিলেই ফিরত পাইবা মনে করছো? পাঁচশ’ কেন পাঁচ হাজার ট্যাকা দিলেও আমার জমি আমি বেঁচুম না।

তয় তুমি তো আমার জমি বর্গায় চাষ করছো, তাই নিয়ম মত তিন ভাগের এক ভাগ তুমি পাইবা। : হুজুর এইটা বেঈমানী। মাত্র পাঁচশ’ টাকায় এই জমি তো কোন পাগলেও বেঁচবো না। আপনে আমার জমি ছাইর‌্যা দেন। : বেঈমানী না কী তা আদালতে মামলা করলেই বুঝবা।

: হুজুর, এমন জুলুম আল্লায় সইব না। আমি গরিব মানুষ, আমার মাথায় বাড়ি দিয়েন না। দয়া করেন হুজুর দয়া করেন। বলতে বলতে কেরামত মিয়া মাতবরের পায়ে পড়ে গেল। এবার মাতবর কুটিল হাসি হেসে বলল: আইচ্ছা, ধান দেওয়া লাগবো না; জমিও না।

তয় একটা শর্ত। শর্ত হইল, তোমার মাইয়া রাবেয়ারে আমার হাতে... মানে ওরে আমি আমার চার নম্বর বিবি বানামু। রাজি? কেরামত এবার খেকিয়ে ওঠে: মাতবর সাব, আপনের লজ্জা করে না? নিজের মাইয়ার বয়সি একটা মেয়েরে আপনে শাদি করতে চান! : ভাইব্যা দেখ, জমি আর ধান দিবা নাকি মাইয়া দিবা। : একটাও দিমু না; আপনে বাইরন আমার বাড়ি থিকা। নাইলে আমি লোকজন ডাকুম।

: ঠিক আছে, যাইতেছি। তয় কামডা তুমি ভাল করলা না। এর জন্যে পরে ফস্তাইবা কইলাম। বাড়ি ফিরে সাদেক গাজি তার লাঠিয়ালদের বলল: আইজ রাইতে কেরামতের ক্ষেতে আগুন দিবি। আমারে অপমান করার প্রতিশোধ আমি ক্যামনে লই তা ওরে দেখাইয়্যা দিমু।

মাঝরাতে প্রচন্ড জোরে কেরামতের ঘরের দরজায় টোকা দিলো কয়েকজন কৃষক। ‘কেডারে? কেডা দরজা টোক্কায়?’ বলতে বলতে দরজা খুলতেই তাদের মধ্যে থেকে আবুল মিয়া ব্যস্তভাবে বলল: কেরামত ভাই, তোমার সব শেষ হইয়া গেছে। তোমার ক্ষেতে কে জানি আগুন দিছে। কেরামত ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলো। তারপর ছুটে গেল ক্ষেতের দিকে।

সেখানে গিয়ে দেখলো তার এতো স্বপ্নের ক্ষেত আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। আর তরই সাথে তার বুকটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। ঢলে পড়ে গেল কঠিন মাটিতে। আর উঠলো না।

পরদিন ভোর বেলা। কেরামতের কাফনের কাপড়ে মোড়া লাশটার দিকে তাকিয়ে রাবেয়া চিৎকার করে কেঁদে ওঠে- ইয়া আল্লা, তুমি তো জানো কার জন্যে আমার বাপজান মরছে। তারে তুমি কোনদিন ক্ষমা কইরো না, কোনদিন না। পাশে দাঁড়ানো সাদেক গাজির এক চ্যালা বলল: হ-অ, বড় ভালা লোক আছিলো। পোলা-মাইয়া দুইটার কী হইব আল্লাই জানে।

অবশ্য আমাগো মাতবর সাবের যে দয়ার শরীল! একটা ব্যবস্থা করবই। অনেকেই তার কথায় সায় দিলো। ---------- ০ ---------- ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।