আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

রাষ্ট্রপতি স্পিকার মন্ত্রী-এমপিদের বেতনভাতা বৃদ্ধি : কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা



রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, উচ্চ আদালতের বিচারক, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের বেতনভাতা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে গত পরশু জাতীয় সংসদে ছয়টি বিল পাস হয়েছে। আর এ বিল পাসের মধ্য দিয়ে সরকার প্রমাণ করল, সত্যি জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে আকাশচুম্বী হয়েছে। নীতিগতভাবে আমরা আমাদের কর্তাদের এ বেতনভাতা বাড়ানোর বিপক্ষে নই। কিন্তু সরকার এ বিলগুলো পাসের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে বড় ধরনের একটা রসিকতা করল বটে। এ হলো চৈত্র মাসে মাঘ মাসের জারি।

কে না জানে বাংলাদেশের জনজীবন এক মারাত্মক ক্রান্তিকাল পার করছে। কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ পতিত হয়েছে অসহনীয় দুর্গতিতে। জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া, তপ্ত চৈত্রের দাবদাহের হলকা যেন গোঁত্তা খেয়ে খেয়ে ফিরছে বাজারে, কাঁচাবাজারে—সে দাহে পুড়ছে প্রতিটি সংসার। বিদ্যুত্, পানি আর গ্যাসের জন্য হাহাকার মানুষকে স্মরণ করতে বাধ্য করছে, চৌদ্দশ’ বছর আগের কারবালার প্রান্তরের কথা। যানজটে নাকাল নগরবাসী।

স্থবির হয়ে পড়েছে জীবনের গতি। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে প্রতিটি মানুষ। আর তাদের আতঙ্কে অস্থির চোখের সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে চাপাতি, রামদা, বন্দুক উঁচিয়ে বীরদর্পে উন্মত্ত ষাঁড়ের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে সন্ত্রাসীরা। প্রতিদিন এন্তার ঘটছে খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলের হিংস্র প্রতিযোগিতা। বন উজাড়, উপকূলীয় বনাঞ্চল কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে ক্ষমতাসীনদের চামুণ্ডারা।

নদীনালা শুকিয়ে কাঠ, গ্যাসের অভাবে রান্না বন্ধ, বিদ্যুত্ ও গ্যাসের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ শূন্যের কোটায়। দেশের প্রতিটি শহর ও জনপদ থেকে যখন আওয়াজ উঠতে শুরু করেছে ‘বিদ্যুত্ দে, পানি দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’—সেই দুঃসময়ে সমস্যার সমাধান না করে, সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে কর্তাদের এ বেতনভাতা দ্বিগুণ করা বিল পাস—জনঅন্তরে এর চোট লাগবে যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা। এই বৃদ্ধির ফলে যদি জনরোষ তপ্ত হয়ে ওঠে, তাহলে আবার ‘কেষ্টা বেটাই’ চোর বলে পার পাওয়ার উপায় যে থাকবে না—তা হলফ করে বলা যায়। যে ছয়টি বিল নিয়ে এত কথা, সেগুলো ২২ মার্চ সংসদে উত্থাপিত হলে ওইদিনই একমাত্র সুপ্রিমকোর্ট জাজেসদের বিলটি ছাড়া বাকি ৫টি বিলের ব্যাপারেই বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু সরকারি দল তা গ্রাহ্যের মধ্যে নেয়নি।

এর মধ্যে এমপিদের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। উত্থাপনের দিনের মতো বিল পাসের দিনেও বিরোধী দলের আপত্তিকে আমলে নেয়নি সরকারি দল। সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী তার আপত্তি জানিয়ে বলেছেন, দেশ আজ অচল, দেশে কোনো সরকার আছে বলে তো মনে হয় না। চারদিকে হাহাকার, পানি নেই, গ্যাস নেই, বিদ্যুত্ নেই। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।

সীমান্ত আজ অরক্ষিত, যখন-তখন গুলি করে বাংলাদেশের মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, ৪০০ অফিসারকে ওএসডি করে রাখা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর অফিসারদের যখন-তখন চাকরি খাওয়া হচ্ছে। এ অবস্থার এসব সমস্যার সমাধান আগে করুন। পরে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, এমপিদের বেতনভাতা বাড়ান। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ মানেই দুর্ভিক্ষ।

সরকারি দলের এমপিরাই বলছেন বিদ্যুতের জন্য জনবিস্ফোরণ ঘটবে— তাহলে সেই অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পাশ কাটিয়ে নিজেদের আরাম-আয়েশ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা কি নিষ্ঠুর ইয়ার্কি নয়? জনগণকে কষ্টের মধ্যে রেখে নিজেদের বাড়িতে ঝাড়বাতি জ্বালানোর প্রয়াস আখেরে সত্যি সত্যি মঙ্গল বয়ে আনবে না। আমরা সবসময়ই শুভবুদ্ধিতে পরিচালিত হওয়ার পক্ষে। পাশাপাশি এও বিশ্বাস করি, প্রতিটি জিনিসেরই একটা সময় ও পদ্ধতি আছে। সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। আবার এ কথাও বিশ্বাস করি যখনকার গান তখনই গাইতে হয়, অন্য সময় গাইলে তা হাস্যকর, বিরক্তিকর ও অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে।

আমাদের কর্তাদের আরাম বৃদ্ধির যে বিল সেটাও আসলে বড় অসময়ে গীত হচ্ছে। জনজীবন যখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত নানা সমস্যায়, তখন সেগুলোর সমাধানের ব্যাপারে রীতিমতো ঔদাসীন্য দেখিয়ে, জাতিকে মামলা-হামলা ও নামবদলের কুিসত নাটক দেখতে বাধ্য করে সবশেষে এ বিল নিশ্চয়ই জনমনে স্বস্তি দান করবে না। এজন্যই সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করলে সরকার ভালো করত। এ ধৈর্য দেখাতে সরকার ব্যর্থ হলো বলেই জনমনের বিরক্তির পারদ আরও একধাপ চড়ল বলে ধরে নেয়া যায়।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.