আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

লোহিত তটিনী দয়া

পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয় ,,,,,পথের পাশেই আছে মোর দেবালয় সম্রাট অশোক অনেক সকাল ঘুম ভেংগে গেল। লাফিয়ে উঠে বারান্দায় উকি দিলাম। নাহ এখনো ট্যুর কোম্পানীর গাড়ি আসে নি। অদুরে পুরীর সমুদ্রের ফেনিল ঢেউ কি এক আক্রোশ নিয়ে আছড়ে পরছে বালুকাবেলায়। বিকেলে বালু শিল্পীদের গড়া বুদ্ধ মুর্তি জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে।

রুমের মাঝেও তার গর্জন শোনা যাচ্ছে। ঝটপট রেডি হয়ে বসে আছি। ভুবনেশ্বর যাবো। পথে কত কিছু আছে দেখার যা দেখতে দেখতে হয়তো সারাদিন কেটে যাবে। পুরীর বালুকাবেলায় বালুর বুদ্ধ মুর্তি শেষ পর্যন্ত আটটায় বাহন আসলো আর আমরা রওনা হোলাম দুজন।

ঊড়ির‌্যার রাজধানী ভুবোনেশ্বরের দিকে যাচ্ছি আমরা। চওড়া রাস্তার দুদিকে সরকারী সংরক্ষিত বন। ঝাউগাছ সহ অনেক চেনা পরিচিত গাছ। হাতের ডানদিক ঘেষে সমুদ্র। মাঝে মাঝে গাছের ফাকে উকি দিয়ে যাচ্ছে নীল জলরাশি।

আমাদের প্রথম গন্তব্য চন্দ্রভাগা সৈকত। তার অদুরেই বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রতীক রথের আদলে তৈরী কোনার্ক মন্দির। নিরিবিলি চন্দ্রভাগা সমুদ্রতীর এখানে নেমে কিছুক্ষন উপভোগ করলাম নীল সমুদ্রের অসাধারন রূপ। চা খেলাম রাস্তার পাশের টং দোকানে আবার যাত্রা শুরু। অদুরে বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে ঘোষিত কোনার্কের মন্দির।

গাইড নিয়ে খুটিয়ে দেখলাম। এর আগেও আমি এসেছিলাম। কিন্ত তার যে এত ইতিহাস তা জানা ছিল না। কোনার্কের মন্দির সামনে গাড়ি থামিয়ে এবার একটা বেশ বড় সড় ব্রীজ। কি সুন্দর এক শান্তসিষ্ট নদী বয়ে চলেছে সমুদ্রের পানে।

ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলুম কি নাম নদীটর। বোল্লো 'দয়া' চমকে গেলাম ড্রাইভারের কথা শুনে! কোন দয়া রমেশ? ম্যাডাম ঐ যে দয়া যে নদী রক্তে লাল হয়েছিল অশোকের হাতে। আজও ভুলেনি মানুষ সেই কত যুগ আগের কথা। হাতের বা দিক দিয়ে এসে ডান দিকে গিয়ে সমুদ্রে পড়েছে। ব্রীজের ডান দিকে দেখা যাচ্ছে দয়া ঝাপিয়ে পড়ছে মোহনায় ড্রাইভারের কথায় মনে পড়লো উপমহাদেশের সেই বিখ্যাত সম্রাট অশোকের কথা।

অনেক অনেক বছর আগে সেই খৃষ্টের জন্মেরও আগে ৩০৪ খৃষ্ট পুর্বে মৌর্য বংশের দ্বীতিয় সম্রাট বিন্দুসারা আর সাধারন এক নারী ধর্মার ঘরে জন্ম নেন এক ছেলে। নাম রাখা হলো অশোক বিন্দুসারা মৌর্য। ছোটবেলা থেকেই যে ছিল অত্যন্ত সাহসী, একরোখা এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির। শিকার প্রিয় অশোক একটি সামান্য লাঠি দিয়ে সিংহকে হত্যা করেছিল বলে শোনা যায়। তার এই অসীম সাহসিকতায় ভয় পেয়ে যায় তার চেয়ে বড় সৎ ভাইয়েরা।

পিতাকে অনুরোধ করে যেন অশোক কে সেনাপতি বানিয়ে সাম্রাজ্যের কোন সীমান্তঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য। অশোক নিজেকে একজন উপযুক্ত সেনাপতি হিসেবে প্রমান করে পাঞ্জাবের তক্ষশীলার বিদ্রোহ দমনের মাধ্যমে। কলিঙ্গ সে বুঝতে পেরেছিল ভাইয়েরা তাকে সিংহাসনের প্রতিদন্ধী মনে করে। যে কারণে সে প্রতিবেশী রাস্ট্র কলিঙ্গএ আশ্রয় নেন। সেখানে সে এক জেলে রমনীর প্রেমে পড়েন এবং পরবর্তীতে তাকে বিয়ে করেন।

দুবছর পর অশোকের পিতা বিন্দুসারা তাকে ডেকে পাঠান উজ্জ্যয়িনীর বিদ্রোহ দমন করার জন্য। সেই বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে অশোক আহত হন। বুদ্ধ সন্ন্যাসীরা গোপনে তার শুশ্রসা করে যা তার বড় ভাই সিংহাসনের অন্যতম দাবীদার সুষমা জানতে পারে নি। সে সময়ই অশোক তাদের কাছ থেকে বুদ্ধ ধর্মের সার কথাগুলো জানতে পারে। আহত অশোকের সেবারত বিদিশার এক রমনী দেবী যার নাম তাকে ভালোবাসেন অশোক এবং বিয়ে করেন।

কলিঙ্গের ময়দান ২৭৫ খৃষ্টপুর্বে বিন্দুসারা মারা গেলে সিংহাসনের দাবীতে দু বছর ব্যাপী ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ চলতে থাকে। শেষপর্যন্ত অশোক এই গৃহ যুদ্ধে জয়লাভ করে মৌর্য বংশের তৃতীয় সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে বসেন। কারো কারো মতে এই যুদ্ধে নিষ্ঠুর অশোক তার সব ভাইদের হত্যা করেছিল। ধৌলি পাহাড় বেয়ে উঠছি আর মনে পড়ছে সেই ইতিহাসের খুটিনাটি। পাহাড়ের চুড়োয় জাপানী সরকারের বানানো শান্তি স্তুপায় রয়েছে শান্তির ধর্ম প্রচারকারী বুদ্ধের বিভিন্ন ভংগীমার মুর্তি।

অশোকের স্ম্বৃতির প্রতি উৎসর্গকৃত। ধৌলির পাহাড় চুড়োয় শান্তি স্তুপা এই অশোক তার রাজত্বের প্রথম আট বছর ক্রমাগত একটার পর একটা যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এবং যার ফলশ্রুতিতে সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে প্রতিষ্ঠা করেছিল বিশাল এক সাম্রাজ্য। পশ্চিম দিকে বর্তমান ইরান আর আফগানিস্তান আর পুর্বে বাংলাদেশ বার্মার সীমান্ত পর্যন্ত। বাকী ছিল ভারতের দক্ষিনে শেষ বিন্দু কন্যাকুমারী, শ্রী-লংকা আর দক্ষিন-পুর্ব ভারতের কলিঙ্গ রাজ্য।

নিঃশব্দে নীরবে বয়ে চলেছে দয়া নদী ২য় স্ত্রীর জন্মভুমি এবং বিপদের সময়ের আশ্রয়দাতার মহানুভবতা বিস্মৃত হয়ে রাজ্য জয়ের নেশায় অশোক ২৬৩-৬২ খৃষ্ট পুর্বে ভারতীয় ইতিহাসের স্মরণকালের সর্ববৃহত এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে কলিঙ্গ আক্রমন করেন। সেই ভয়ংকর যুদ্ধে কলিঙ্গ যোদ্ধারাও অত্যন্ত সাহসীকতার সাথে অশোকের সৈন্যবাহিনীর মোকাবেলা করেন। কিন্ত শেষ পর্যন্ত তারা অশোকের নেতৃত্ব দেয়া বাহিনীর কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। তাদের সমস্ত শহরগুলো জালিয়ে পুড়িয়ে খাঁক করে দেয়া হয়। ধৌলি পাহাড়ের চুড়ো থেকে কলিঙ্গ পরদিন সকালে সে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি স্বচক্ষে দেখার জন্য বের হন স্বয়ং সম্রাট অশোক।

তিনি দেখলেন বিদ্ধস্ত বাড়ীঘর এবং লক্ষাধিক মানুষের মৃতদেহ। আর যুদ্ধের ময়দানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী দয়া যার পানি সাদা নয়, নীল নয় এমন কি ঘোলাও নয়। সে রং ছিল মানুষের রক্তে রঞ্জিত টকটকে লাল। বলা হয়ে থাকে যে কলিঙ্গের সৈন্যসহ প্রায় এক লক্ষ সাধারণ মানুষ এবং অশোকের প্রায় ১০ হাজার সৈন্য সেই যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী দয়া নিজের এই কৃতকর্ম এবং নিষ্ঠুরতা সম্রাট অশোককে অসুস্থ, বিচলিত এবং অনুতপ্ত করে তোলে।

আর যার ফলশ্রুতিতে উনিগ্রহন করেন বৌদ্ধ ধর্ম । জীবে প্রেমের মর্ম বানীটি তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলেন। এরপর থেকে বাকী জীবন তিনি মানব জাতির কল্যানে নিজেকে উৎসর্গ করলেন। এমনকি একদা বীর শিকারি অশোক মানুষ ছাড়াও জীব জন্তুর জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের প্রাসাদ সহ সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে প্রানী হত্যা নিষিদ্ধ করেন।

অশোকের শিলালিপির বর্ননা। অশোক তার সাম্রাজ্য জুড়ে এই পরিবর্তিত চিন্তাধারার ব্যপক প্রচারের প্রয়াস নিয়েছিলেন। তিনি অসংখ্য শিলালিপি এবং সুউচ্চ স্তম্ভে যা অশোক পিলার নামে সুপরিচিত সেগুলোতে তার বানী উৎকীর্ন করে গিয়েছেন। যা আজও এই উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন হিসেবে ছড়িয়ে আছে। তবে ধৌলির প্রতি অশোকের একটি আলাদা দুর্বলতা ছিল।

যার ফলে সেখানে তিনি বুদ্ধের অহিংস বানী প্রচারে অনেক শিলালিপি ও স্তম্ভ নির্মান করেন। ১৯৫০ সালে ভারত সরকার অশোক স্তম্ভের উপরে খোদিত তিনটি সিংহের মুর্তিকে তাদের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যাবহার করে আসছে। ধৌলি পাহাড়ের পাদদেশে বর্তমান ভারতের জাতীয় প্রতীক চিন্হ অশোক স্তম্ভ উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বরের আট কিলোমিটার দক্ষিনে মহানদীর শাখা দয়া নদীর পাশেই বিস্তীর্ন এক এলাকা যা কলিঙ্গ ময়দান বলে ধারণা করা হয় । তার পাশে বিখ্যাত ধৌলি পাহাড় যার অদুরেই বিশাল এক শিলাখন্ডের উপর আবিস্কৃত হয়েছে অশোকের বিখ্যাত শিলালিপি যা কলিঙ্গ শিলালিপি নামে সুপরিচিত। পুর্ব দিকে মুখ করা হাতীর ভাস্কর্যের উত্তর দিকে এই লিপি খোদাইকরা রয়েছে।

হাতীর পেছনে শিলালিপি পাথরের গায়ে খোদাই করা লিপিগুলো সংরক্ষনের জন্য কর্তৃপক্ষ কাঁচের ঘর করে রেখেছে যাতে দর্শনার্থীরা বাইরে থেকে দেখতে পায়। এই কাচের ঘরের ভেতর সম্রাট অশোকের শিলালিপি কাচের বাইরে থেকে তোলা ছবি পাথরের গায়ে ক্ষুদে ক্ষুদে হরফে লেখা বুদ্ধের বানী ১৯৭০ সালে জাপানী সরকার ধৌলি পাহাড়ের উপর সাদা রংয়ের এক আধুনিক শান্তি স্তুপা তৈরী করেছেন। গোলাকার এই স্তুপাটির চারিদিকে বুদ্ধের বিভিন্ন ভঙ্গীমার মুর্তি রয়েছে। আশীর্বা্দরত বুদ্ধ শয়নরত বুদ্ধ প্রাচীন কাল থেকে এখানে হিন্দু ধর্মাবম্বীদের যে শিব মন্দিরটি ছিল তার পুননির্মান করা হয়েছে ধৌলি শান্তি স্তুপে প্রাচীন শিব মন্দির ২৩২ খৃষ্টপুর্বে ৭২ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তার পরিবার সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় নি।

তবে তার দুই সন্তান মহিন্দ্রা এবং সংঘমিত্রা শ্রীলঙ্কায় অহিংস বুদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন। তারসময় কাল এবং পরবর্তীতেই সমস্ত দক্ষিন পুর্ব এশিয়ায় বুদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করে। তবে দয়া নামের নদীটি আজও সেই বিভৎসতার স্মৃতি বুকে নিয়ে বয়ে চলেছে কলিঙ্গের গা ঘেষে। .  ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ২৬ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।