রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীসহ দেশের সাংবিধানিক সব পদে বেতনভাতা বাড়ানো হচ্ছে। এবার বাড়ানো হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ। মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য ইতিমধ্যে একটি খসড়া সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করা হয়েছে। শিগগিরই এটা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হবে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে। সর্বশেষ সাংবিধানিক পদে নিয়োজিতদের জন্য পারিশ্রমিক বাড়ানো হয় ২০০৫ সালে, বিগত জোট সরকারের আমলে।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব আবদুল আজিজ বেতনভাতা বাড়ানোর বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি সমকালের এই প্রতিবেদককে বলেন, এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত কয়েকটি প্রস্তাব সম্মতির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পাওয়ার পরই বেতন বাড়াতে আইন সংশোধনের জন্য সারসংক্ষেপ মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার সাংবিধানিক সব পদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটাতেই সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য ক্ষেত্রে বেতনভাতার প্রস্তাব কাটছাঁট করা হলেও সাংবিধানিক পদের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। তবে সাংবিধানিক পদের নতুন বেতন কাঠামো যেদিনই ঘোষণা করা হোক না কেন, এটা গত বছর জুলাই থেকে কার্যকর হবে, যেহেতু সপ্তম পে-স্কেল জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়েছে।
সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত ওই খসড়া সারসংক্ষেপ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও এমপিসহ সব সাংবিধানিক পদের পারিশ্রমিক গড়ে ৮৩ শতাংশ বাড়নোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া তাদের অন্যান্য ভাতাও প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে। এবারই প্রথম এমপিদের জন্য যানবাহনভাতা চালু করা হচ্ছে।
এই ভাতা হিসাবে এমপিরা প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা পাবেন। এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সাংবিধানিক পদে নিয়োজিতদের পারিশ্রমিক ও ভাতা বাড়ানোর পৃথক ১২টি প্রস্তাবে সম্মতি
দেওয়া হয়েছে। তবে এজন্য আইনও সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। শিগগিরই এই আইন সংশোধনীর প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির মূল বেতন ৩৩ হাজার ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৬১ হাজার ২০০, প্রধানমন্ত্রীর ৩২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫৮ হাজার ৫০০, বিরোধীদলীয় নেত্রীর ২৯ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫৩ হাজার ৭০, মন্ত্রীদের ২৯ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৭০, প্রতিমন্ত্রীদের ২৬ হাজার ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৪৭ হাজার ৭৪০, উপমন্ত্রীদের ২৪ হাজার ৬৫০ থেকে ৪৫ হাজার ২০০, স্পিকারের ৩১ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ৫৭ হাজার, ডেপুটি স্পিকারের ২৯ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৭০, সংসদ উপনেতার ২৯ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৭০, চিফ হুইপের ২৯ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৭০, হুইপের ২৬ হাজার ১০০ থেকে ৪৯ হাজার ৪১০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির মূল বেতন ৩০ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার, আপিল বিভাগের বিচারপতির ২৯ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৭০, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির ২৭ হাজার থেকে ৪৯ হাজার ৪১০, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ২৯ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৭০, নির্বাচন কমিশনারদের পারিশ্রমিক ২৭ হাজার থেকে ৪৯ হাজার ৪১০, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের (পিএসসি) ২৩ হাজার ৭৫০ থেকে ৪৩ হাজার ৪৬২, পিএসসির সদস্যদের পারিশ্রমিক ৩৭ হাজার ৮৮১, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের ২৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার এবং এমপিদের পারিশ্রমিক ১৫ হাজার থেকে ২৮ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
জানা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার গত বছর জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সপ্তম বেতন স্কেল কার্যকর করে। কিন্তু সপ্তম বেতন স্কেল অনুযায়ী কর্মকর্তাদের বেতন সাংবিধানিক পদধারীদের পারিশ্রমিকের চেয়ে বেশি হওয়ায় সরকার তাদের পারিশ্রমিক পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীদের পারিশ্রমিক বাড়ানোর জন্য গত জানুয়ারি মাসে দ্য প্রেসিডেন্টস (রিমিউনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট-১৯৭৫, দ্য প্রাইম মিনিস্টার (রিমিউনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট-১৯৭৫, দ্য মিনিস্টারস, স্টেট মিনিস্টার্স অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রিমিউনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট-১৯৭৩ সংশোধনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এটা তখন ফেরত দেওয়া হয়।
বৈঠকে সব সাংবিধানিক পদের পারিশ্রমিক একসঙ্গে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই ৩টি অ্যাক্টসহ বাকি ৯টি সাংবিধানিক পদের পারিশ্রমিক অ্যাক্ট সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ মোতাবেক সাংবিধানিক সব পদের পারিশ্রমিক বাড়াতে শিগগিরই প্রতিটি পদের পৃথক রিমিউনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস অ্যাক্ট সংশোধনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সাংবিধানিক পদধারীদের পারিশ্রমিক বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য ভাতাও প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে। বর্তমানে মন্ত্রীরা সরকারি বাসায় থাকলে দেড় লাখ টাকার আসবাবপত্র পান।
এখন তা বাড়িয়ে ৫ লাখ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীদের ১ লাখ টাকার পরিবর্তে ৪ লাখ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। সরকারি বাসায় না থাকলে মন্ত্রীর ভাড়া বাবদ টাকা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪৫ হাজার এবং প্রতিমন্ত্রীদের ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রীদের ব্যয় নিয়ন্ত্রক ভাতা প্রতি মাসে ৬ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার, প্রতিমন্ত্র্রীদের ৪ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮ হাজার এবং উপমন্ত্রীদের ৩ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রীদের প্রতিদিনকার ভাতা ৭৫০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের দৈনিক ভাতা ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন তহবিল থেকে অনুদান দেওয়ার পরিমাণ ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দৈনিক ভাতা ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী যাতে সরকারি খরচে দেশ-বিদেশের যে কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন, সেই বিষয়টি আইনে সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা যাতে সরকারি খরচে দেশের যে কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন, আইনে সেই বিধানটিও রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এবারই প্রথম এমপিদের জন্য যানবাহনভাতা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এমপিরা তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই ভাতার আওতায় প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা পাবেন। এছাড়া এমপিদের নির্বাচনীয় এলাকার খরচ বাবদ ভাতা প্রতি মাসে ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যয় নিয়ন্ত্রক ভাতা ২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এমপিদের দৈনিক খরচ ২০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ভ্রমণভাতার আওতায় এমপিদের প্রতি কিলোমিটার ৬ টাকার স্থলে ১০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া ধোলাই ভাতা, ব্যয় নিয়ামক ভাতা, বিমান ভ্রমণে বীমা সুবিধা ভাতা, চিকিৎসা ভাতা এবং ঐচ্ছিক অনুদান দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।