ইমরোজ
দৃষ্টি মেলে রাখা ভার। চৈত্রের দুপুর। আকাশে কড়া রোদ। ঘামতে ঘামতে শরীর ভিজে গেছে। সার্টটা সময়ে সময়ে শরীরের সাথে লেপ্টে যাচ্ছে।
বাসের জন্য অপেক্ষারত ছিলাম।
বাসের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোরও একই অবস্থা। সবারই গন্তব্য বাসের গন্তব্যের সাথে সমান্তরাল রেখায় অবস্থান করে। আমার অবাক লাগে না। এইতো প্রতিদিনের কাজ আমাদের।
পৃথিবীটা নির্মম ঠেকে অনেক সময়।
পাশ দিয়ে হেটে গেল একজন। মেয়েটির বয়স তেমন বেশি নয়। কালো সুন্দর চুল। মেয়েটি বিবাহিত বুঝাই যায়।
টিকিট কেটে আমাদের লাইনে দাঁড়ালো। কোন কারণে তার দিকে আকৃষ্ট হলাম। কেন জানি না। তার চোখে একরকমের তীব্রতা আমাকে উন্মত্ত করে তোলে। তীক্ষ্ণ চাহনি তার।
চারিদিকটা সবসময়ই নিরীক্ষণ করে নিচ্ছে।
বাসের দেখা নেই। যারা লাইন ধরে বাসে উঠেন তারাই কেবল বুঝতে পারেন এই অপেক্ষার যন্ত্রণা। রোদটাও ঠিক মাথার উপরে বেরসিকের মত তাপ দিচ্ছে। যেন তার কিছুই যায় আসে না এই লোকগুলোর কষ্টে।
কেউ অফিসের ব্যাগ, কেউ বা কাগজ দিয়ে রোদকে ঠেকাচ্ছেন। আমি দাঁড়িয়ে সে রোদে ভিজছি। চোখের সীমানায় শুধুই ধূ ধূ মরুময় রাস্তা। ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।
এমনই সময় টিকিট কাউন্টারে লোকটি চিৎকার করে বলল, "বাস আইছে বাস আইছে...সিট খালি সিট খালি"।
সিট খালি তা অবশ্য আমাদের ভাগ্য। এই সময় সাধারণত বাসে সীট খালি পাওয়া যায় না। আমি বাসে উঠে পড়লাম। যেখানে বসলাম আমার ভেতরের দিকে একটি সিট খালি ছিল। মেয়েটির বসার জায়গা নেই।
অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে আমার পাশের ভেতরের সিটে বসতে হলো। বাসটির শেষ গন্তব্য গাজীপুর। আমি যাচ্ছি উত্তরা।
মেয়েটির দিকে চোখ পড়ছে না। হঠাৎ দৃষ্টি কাড়ল তার মোবাইল ফোনটা।
অনেক দামী সেট। তাই মোহের বসে তাকানো। ব্যাগে তিনি মোবাইল ঢুকিয়ে রাখতে গিয়ে ঝিলিক মেরে উঠলো একটি আংটি। নিজের অজান্তেই বলে উঠলাম, "হীরা!"।
মেয়েটি অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি চুপ করে পাশে তাকালাম। জানি হয়তো সে ভয় পেয়েছে! আমাকে বলল, "এটা পাথরের, দামী নয়"।
আমি আস্তে করে বললাম, "আমি হীরার ব্যবসা করি, ওটা হীরা না পাথর তা প্রথম দেখাতেই বুঝেছি"।
মেয়েটি এবার ব্যাগ খুলে সেটা আরও ভেতরে গুজে রাখে। আমি মনে মনে হাসি।
তাকে সাত্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললাম, "কেউ শুনে নাই"।
মেয়েটি পানি খাচ্ছে। হাসফাস করছেন। যদি আমি তাকে ফলো করি?
আমি বললাম, "এত ভয় পাবার কোন কারণ দেখি না, আমাকে দেখলে কী আপনার খারাপ মনে হয়"?
এবার সে দৃষ্টি কেমন মলিন হয়ে যায়। তারপর আস্তে করে বলে,
-এনগেজমেন্ট রিং!
-হতেই পারে, দামী মোবাইল, দামী ব্যাগ আর সেরকম একজনের কাছে এটা থাকা অস্বাভাবিক কিছু না।
-আপনি ভুল বুঝছেন!
-তাই?
-আমি সেসব ফেলে এসেছি।
-অত সহজে?
-এটা সে নিতে চায়নি, মানে আমার হাসবেন্ড।
এমন সময় বাস কাউন্টারে থামে। লোক নেমে পড়ে কিছু। সবে মাত্র বনানী পার হচ্ছি আমরা।
অবান্তর প্রশ্নটা করেই ফেলতে ইচ্ছে করে, "কেন চল এলেন"?
-আপনি জেনে কী করবেন?
-নাহ! জানতে ইচ্ছে করাটাই স্বাভাবিক!
-না হয় নাই জানলেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, "আমার মনে হয় ভালোবাসার জিনিসটির মালিককে ফেলে এসে ভুল করছেন"।
-এটা কোন ভালোবাসার জিনিস নয়। টাকার জিনিস। যেটা দিয়ে কোন যুগে মানুষ ভালোবাসা কিনতে পারেনি।
-আমি এটার কথা বলছিলাম না!
-তো কিসের কথা বলছেন?
-আপনার ছেলে মেয়েদের কথা বলছিলাম।
-নেই! ভালোবাসা? দেহ ভোগ করে সকালে অন্যত্র চলে গেলে, আর তারপর রাতের পর রাত আর না আসলে সেটাকে ভালোবাসা বলে না।
-তাই একজনকেও জন্ম দেননি?
-নাহ আমার দাম্পত্যের দ্বন্দে কেউ আসতে পারে না। একটি জীবন নষ্ট করে কী লাভ?
-বোকা আপনি, ভালোবাসা পেতে হলে দিতে হয়।
-থাক, কিছুই যখন দিতে পারিনি আর কেনই বা বৃথা চেষ্টা করবো?
-আপনার ভেতরের কথাগুলো জেনে নিতে চাচ্ছি না।
আমার স্টেশন সামনে আমি নেমে পড়বো।
মেয়েটি কোন কথা বললেন না। হয়তো বাঁকা হাসি দিল! খেয়াল করিনি। আমার এই গন্তব্যে আসার কোন ইচ্ছা ছিল না। তবু আসতে হলো।
হঠাৎই সে আমাকে বলে, "উত্তরায় খুব কী জরুরী কাজ"?
-নাহ!
-আমাকে গাজীপুরে রেখে আসবেন?
-হীরার আংটি চলে যেতে পারে তাই?
-নাহ! চলে গেলে যাক, তবু পরাজিত জীবনটাকে তো ফেলে দিতে পারি না। এও ঠিক আমার কিছু হলে আপনার কিছুই আসবে যাবে না।
-কিচ্ছু হবে না। বলবেন এ পাথরের।
স্টেশন ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে বাস।
মেয়েটি খানিক্ষণ অবাক হয়ে, "আপনি নামলেন না যে"?
-যেতে ইচ্ছা করছে আপনার সাথে।
-কোথায় যাচ্ছি বলেন তো?
-জানি না, তবে যেখানেই যান, পৌছে দেব।
কথায় কথায় গাজীপুর চলে এলো বাস। রিক্সায় চড়ে তার বাবার বাড়ির সামনে এসে পড়ি। সবই তার কথা।
তার জীবনের নানা কথা আমাকে বলছে। হয়তো নিতান্তই আগুন্তুক দেখে। আলিশান বাড়ির সামনে রিক্সা থামতেই, বললাম, "আমি চলি"।
-না একটু বসুন না।
-আমার সময় নেই।
-কেন?
-বলতে পারছি না।
-যদি আপনার সাথে যোগাযোগ করতে চাই?
-আমার কোন ঠিকানা নেই।
-আপনার ব্যবসা কোথায়?
-আমি কোন ব্যবসা করি না।
-তবে যে বললেন...
-মিথ্যা বলেছিলাম।
সেদিন চলে এসেছিলাম বটে।
কিন্তু তার জন্য যে এতটুকু অনুভব করিনি তা বলতে পারি না। হাজার চেষ্টাও সে আমার নাম্বার নিতে পারে নি। তার নাম্বার জোর করে দিলেও সেটা আসার সময় পথেই পরে গেছে। শুধু বলে এসেছিলাম, মেঘে মেঘে ঘর্ষণ হলে যদি বিদ্যুৎ চমকে ওঠে, ভাববেন আপনার মত আমিও দেখছি। অদৃশ্য কোন সুতা আমাদেরকে কাছে টানবে হয়তো বা দূরেও সরাতে পারে!
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।