ভালোবাসার ঊর্বশী বুকে লেখা আছে এক নাম- সে আমার দেশ, আলগ্ন সুন্দর ভূমি- বিমূর্ত অঙ্গনে প্রতিদিন প্রতিরাত জেগে ওঠে তার উদ্ভাসিত মুখ
নিম্ন আয়ের মধ্যবিত্ত দু'টি পরিবার। একই ফ্লোরে পাশাপাশি ফ্ল্যাট। ও পাশে মাঝে মাঝে গেট খোলা থাকে। ভেতরের কথাবার্তা স্পষ্ট কানে আসে। এ পাশে ড্রইং রুমে বসে আছি আমি।
হট্টগোলে দরোজায় চুপিসারে কান পাতি। জাহিদ সাহেব আর তার স্ত্রীর বাকবিতণ্ডা জমে উঠেছে।
-বইসা বইসা এই টাকা কয়দিন খাইবা শুনি! তারপর তো ভিক্ষা করন লাগবো। সেইদিকে খেয়াল আছে কোনো?
-তোমার এতো কীসের চিন্তা! যে কয়দিন যায়, যাক না।
- তারপর, তারপর কি করবা?
- দেখা যাক, একটা কিছু তো হয়েই যাবে।
- আর অইছে। ম্যালা তো ঘুরলা। কোনো হানে কিছু অইলো? বইসা বইসা খাইলে রাজার ভাণ্ডারও শ্যাষ অইয়া যায়!
- শেষ হলে তোমার অসুবিধা কি? তখন চিন্তা করা যাবে।
- অসুবিধা নাই! কিচ্ছু অসুবিধা নাই? পোলামাইয়ার চিন্তা করো। অগোরও একটু চিন্তা করো।
আমার চিন্তা করন লাগবো না। বাপের বাড়ি যা আছে সারাজীবন চইলা যাইবো।
- তোমার তো আছে একটা জিনিসই- ঢাকায় বাপের জমিদারী। আমার বাপে কিছুই রাখে নাই, তো কি হয়েছে? তাই বলে কি আমি কিছুই করি নাই! সাভারে এক খণ্ড, গ্রামের বাড়িতে যে জমি আছে শেষটায় ওখানেই ঘর বানিয়ে থাকবো।
- রাখো তোমার সাভারের জমি।
ঐ গৈ-গেরামে কবে লোকবসতি অইবো? তোমার পোলামাইয়ারা কি ঐখানে যাইবো? গেরামে থাকবো?
- না গেলে নাই, ওরা নিজেরটা করে নেবে। বুড়োবুড়ি দুজন শেষ বয়সে নাহয় গ্রামের বাড়িতে চলে যাবো।
- তুমি বেজায় স্বার্থপর! পোলামাইয়ার জন্য ঢাকায় কিছু করবা না! খালি বইসা বইসা সব ভাইঙ্গা খাইবা আর আণ্ডা পারবা।
- হ, তাই করমু, সব খামু, কারো লাইগা কিচ্ছু রাখমু না।
জাহিদ সাহেবের রাগ বাড়ছে।
কথায় আঞ্চলিকতা চলে এসেছে। আমি ড্রইং রুমের দরোজা বন্ধ করে দেই। আর শুনতে ইচ্ছে করে না।
জাহিদ সাহেবের সাথে বন্ধুত্ব পাঁচ বছরের। বিকেলে একসাথে লেকের পাড়ে ঘুরতে যাই।
হাঁটতে হাঁটতে তার সাথে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংসারিক নানান বিষয়ে কথা হয়। আজ একটু ভাবগম্ভীর।
- কি জাহিদ সাহেব, কেমন যেন লাগছে আজ আপনাকে!
- আর বলবেন না। ঢাকা শহরে আর ভাল্লাগছে না।
- কেন, কী হয়েছে?
- এই যে ধরুন এই লেকের পাড়।
এখন কি আর হাঁটার জো আছে। দখল, বেদখল আর সংস্কারের নামে লেক তো আর লেক নাই।
-হু।
আমি হাঁটি আর সায় দেই।
-ঐ যে ঐ পাড়ে দেখেন 'জাহাজ মার্কা বাড়ি'।
লেকের পেটের ভিতর ঢুকে গেছে। কই এখনও ভাঙলো নাতো! আর এ পাশে এতো অ্যাপারমেন্ট আগে ছিলো? একটুখানি পায়ে চলা পথ। তার উপর আবার লোকে লোকারণ্য। স্বস্তিতে হাঁটার, শ্বাস ফেলার জায়গা আছে কোথাও?
- তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। দিনদিন এ শহরটা অসহ্য হয়ে যাচ্ছে।
তো, কী করবেন এখন?
- ভাবছি গ্রামে চলে যাবো। এ শহরে আর না।
- তো, গ্রাম কি আগের মতো আছে?
- তা অবশ্য নেই। হাটেবাজারে, স্কুলকলেজে এখন নেশার আখড়া হয়। শুনলাম ব্লু ফিল্মও নাকি চলে।
সব উচ্ছন্নে গেছে!
- ভিলেজ পলিটিক্স নেই?
- আর বলবেন না! সেতো আছেই। সুদখোর, টাউট,বাটপার আরো বেড়েছে।
-তাহলে যেতে চাইছেন কেন?
- ঐ যে বললাম, একটু স্বস্তির হাওয়া, খোলামেলা জায়গা।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে জাহিদ সাহেবের বুক থেকে।
আমি আর কথা বাড়াই না।
জাহিদ সাহেব যেন কথায় কিছু একটা লুকিয়ে গেলেন। খুব মায়া হলো তার মুখ দেখে। হাজার হলেও বন্ধু মানুষ। আসল সমস্যাটা আমি জানি। দুপুরে যে সব শুনেছি বুঝতে দিলাম না তাকে।
পাঁচ বছর ধরে আছি পড়শি হয়ে। আলাপে আলাপে জাহিদ সাহেবের টাকাপয়সা, সহায়সম্পতির বিষয় সব জানা হয়ে গেছে আমার।
জাহিদ সাহেব হাঁটে আমার পাশে। আমি হাঁটি ভাবনার জগতে। সারাজীবন চাকরির টাকায় ভাড়া টানে মধ্যবিত্ত পরিবার।
আর সে টাকায় নতুন বাড়ি করে উচ্চবিত্তরা। ঐ সব মধ্যবিত্ত পরিবার এক সময় গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়। মাঝপথে থেমে যায় ছেলেমেয়ের লেখাপড়া। এই ঢাকা শহরে তাদের কোনো উত্তরাধিকার নেই, স্থায়ী ঠিকানা নেই। গ্রামে গিয়েও নিজেদের খাপ খাইয়ে চলতে পারে না এরা।
আসলে জাহিদ সাহেবরা না গ্রামের, না শহরের। কোথাও ঠাঁই নেই তাদের। অপাংক্তেয় এরকম হাজার জীবন হারিয়ে যায়, গত হয়ে যায় নাগরিক ভিড় থেকে। কে-ই বা কার রাখে খোঁজ!
১২.০৩.২০০৮
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।