আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ঠাকুর মিয়ার পক্ষীবাড়ি

সময়... অনাদি... হতে... অনন্তের... পথে...

প্রতিদিন পড়ন্ত বিকেলে হাজারো পাখি এসে আশ্রয় নেয় বাড়ির পাঁচটি গাছে। নির্বিঘ্নে-নিরাপদে রাত যাপন করে সুর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে উড়ে যায়। পাখির রাত যাপন নিরাপদ করতে পালা করে জেগে থাকেন বাড়ির লোকেরা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়িটি পাখির কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে ওঠে। রাত যত গভীর হয় তত বাড়ে পাখির ডাকাডাকি, ডানা ঝাপটানো।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের একটি গ্রাম লৈয়ারকুল। গ্রামটির পশ্চিম প্রান্তের প্রয়াত আব্দুর রহমান ওরফে ঠাকুর মিয়ার বাড়িটি ওই এলাকায় "পক্ষীবাড়ি" নামে পরিচিতি লাভ করেছে। পাশের বাড়ির কলেজ পড়ুয়া ছাত্র আব্দুস শহীদ বলেন, "পাখি সব করে রব" কবির এই উক্তির বাস্তব চিত্র দেখা যায় এখানে। ঠাকুর মিয়ার স্ত্রী মোছাঃ আমেনা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী পাখি ভালা পাইতা (ভালবাসতেন)। বনের পাখিরে তো ধরতা পারতা না।

অতারলাগি কইতর পালতা (এজন্যে কবুতর পোষতেন)। ঘরের কইতর ধইরা আকাশো ছাড়তা। কইতর ফিইরা আইত। আবার ধইরা ছাড়তা। আবার আইত।

অলাকান (এরকম) খেলতা। পাখির লগে (সঙ্গে) একলা একলা মাতিতা (কথা বলতেন)। ইতা (এসব) আমার ভালা লাগত না। ১৪০৭ সালের ২০ ভাদ্র তাইন ইন্তেকাল করইন। আইজ অত (এত) বছর পরে মনে অয় (হয়) পাখির কথা তাইনে বুঝতা পারতা (তিনি বুঝতে পারতেন)।

নাইলে অত বাড়ি থাকতে আমার বাড়িত এরা আইত কেনে? বাড়ির বাসিন্দারা জানান, ২০০৪ সালের মে-জুন মাসে দুই জোড়া সাদা বক এসে বড়ির একটি তেঁতুল গাছে বাসা বাঁধে। বক দম্পতিদ্বয় সেখানে বাচ্চা ফোঁটায়। পরে এরা এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে সাদা বক দম্পতির সঙ্গে যোগ দেয় কয়েকজোড়া ধলাবক, কাঁনিবক, লালবক, বালিঝুড়ি হাঁস। একই বছরের মে মাস থেকে পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে।

তখন ঝাঁক বেধে আসতে থাকে পানকৌঁড়ি। এরা বক পাখিদের গাছটি দখল করে নেয়। বক দম্পতিরা আশ্রয় নেয় বাড়ির বাঁশঝাড় সংলগ্ন একটি করই গাছে। এরপর থেকে বাড়িটি এলাকায় পক্ষীবাড়ি নামে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। এবছর পাখির সংখ্যা বেড়ে হাজার ছাড়িয়ে গেছে, দখল করে নিয়েছে বাড়ির পাঁচটি বড় বড় গাছ।

গ্রামবাসীরা জানান, পক্ষীবাড়ি নিয়ে এলাকায় বেশকিছু কাহিনী আছে। একটি ব্যাংকের স্থানীয় শাখার কর্মকর্তা ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন পাখির অত্যাচারে তিনি বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। বাড়িতে পাখির বিষ্ঠার গন্ধ তাই বাড়ি ভাড়া নিতে চান না কেউ। বাড়ির গরু ঘরের দরজা মেরামতের জন্য বড় তেঁতুল গাছটি কাটার সিদ্ধান্ত নিলেও পাখিরা কষ্ট পাবে এই বিবেচনায় আমেনা খাতুনের নির্দেশে গাছ কাটা যায়নি। পক্ষীবাড়ির বাড়ির এক অংশে আমেনা খাতুনের তিন ছেলে মোঃ আব্দুল গনি, মোঃ আব্দুল মন্নান ও মোঃ আব্দুল ছত্তার বসবাস করেন।

অন্য অংশে আছেন আমেনার দেবরের ছেলে মোঃ আব্দুল ছামাদ। বৌ-নাতি-নাতনি সব মিলে বাড়িতে থাকেন প্রায় ২০ জন। সবাই পাখি ভালবাসেন। পাখিদের নিরাপদে রাত যাপনের জন্য তাঁরা পালা করে রাত জাগেন। আব্দুস ছামাদ বলেন, ‘রাত না জেগে উপায় নেই।

পাখিদের নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের কর্তব্য। এরা আমাদের এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ’ আব্দুল ছত্তার বলেন, ‘কয়েকমাস আগে একদিন ভোরে গ্রামের এক ছেলে গাছে ওঠে বাচ্চা নিয়ে যাচ্ছিল। টের পেয়ে দরজা খোলে গাছ তলায় গিয়ে ঘুমঘুম চোখে লাঠি দিয়ে দেই মাথা ফাটিয়ে। এরপর আর কি? ওষুধপত্র কিনে নিজেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করি।

’ আব্দুল মন্নান বলেন, ‘ইয়ারগান নিয়ে শিকারীরা আগে আসতেন। শিকারের চেষ্টা করতেন। আমরা বাধা দিতাম। এনিয়ে দেনদরবার হত। এখন আর এসব হয় না, শিকারীরা আর আসে না।

প্রতিদিন বিকেলে এখন পাখি দেখতে ভীড় করেন লোকজন। দেখে ভাল লাগে আমাদের। ’ ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত মৌলভীবাজারের হাইল হাওরের জীব বৈচিত্র পুণরুদ্ধার ও রার কাজে নিয়োজিত সমাজভিত্তিক জলাভূমি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের (মাচ) এলাকা সমন্বয়কারী (সাইট কো-অর্ডিনেটর) হিসেবে কাজ করছেন মোঃ মাজহারুল ইসলাম জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘নিশ্চিত ভাবে বলা যায় লৈয়ারকুলের আলোচিত সেই পক্ষীবাড়ির লোকজন সব পাখিপ্রেমী। না হলে হাজারো পাখি সেখানে রাত কাটাতে যেত না।

কেননা প্রকৃতিগতভাবেই পাখিরা নিরাপদ আশ্রয় না পেলে কোথাও থাকে না। এরকম সাদা মনের মানুষ আমাদের জীববৈচিত্র রক্ষায় খুব বেশি প্রয়োজন।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।