আশুরা বা ১০ মহররম একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। দুনিয়া সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত রয়েছে এ দিনের সম্পর্ক। দুনিয়া যেদিন ধ্বংস হবে এবং মানুষ যেদিন বিচারের সম্মুখীন হবে সেই রোজ কেয়ামতের তারিখও এটি। এ দিনে দুনিয়ার প্রথম মানব-মানবী হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নির্বাসিত হন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এই মহান দিনে পাপিষ্ট রাজা নমরুদের আগুন থেকে রেহাই পান আল্লাহর অসীম রহমতে।
হজরত দাউদ (আ.), সুলাইমান (আ.), ইউসুফ (আ.), ইয়াকুব (আ.), আইয়ুব (আ.), ইউনূস (আ.), নূহ (আ.), মুসা (আ.) এবং ঈসা (আ.)সহ আরও অনেক নবীর সঙ্গে আশুরার দিনটি সম্পর্কিত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতদের জন্য এটি এক শোকাবহ দিন। এ দিনটি অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রত্যয়দীপ্ত দিন। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) ও তার অনুসারীরা।
পবিত্র কোরআনে যে চারটি মাসকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়েছে মহররম তারই একটি।
রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায় হজেও মহররমের নাম উল্লেখ করে সম্মান দেখিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যুদয়ের আগে থেকেই আরব জাহানে চারটি মাসকে সম্মানের চোখে দেখা হতো। এ চারটি মাস হলো_ জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। এ চারটি মাস শুধু মুসলমানদের কাছেই নয়, আগের সব নবী ও রাসূলের আমলেও বরকতময় হিসেবে ভাবা হতো। এই চার মাসের ইবাদত-বন্দেগিতে বান্দা যেমন বিশেষ সওয়াব লাভ করে, তেমনি এ চারটি মাসের মর্যাদা লঙ্ঘন করে কেউ যদি পাপাচারে লিপ্ত হয়, তবে তার জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
পৃথিবীতে মানুষের আবাসন থেকে শুরু করে বহু নবী ও রাসূলের পবিত্র স্মৃতি ধারণ করছে মহররম মাস। এই পবিত্র মাসে দুনিয়ার প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)-কে আল্লাহ তার খলিফা নিযুক্ত করেন। জান্নাত থেকে পৃথিবীতে হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাসিত হওয়ার পর ১০ মহররম মক্কার আরাফাত ময়দানে পুনর্মিলিত হন। এই দিনে প্রিয়নবী হজরত নূহ (আ.) মহাপ্লাবন শেষে জুদি পাহাড়ে অবতরণ করে পৃথিবীকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতদের কাছে মহররম মাসের তাৎপর্য অপরিসীম।
এ মাসের ১০ তারিখে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন রাসূল দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)। অসত্য, অন্যায়, অসাম্য ও ভোগবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে শাহাদাতবরণ করেন এই পুণ্য পুরুষ। পাপিষ্ট ইয়াজিদ প্রস্তাব দিয়েছিল তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নিলে হোসাইন (রা.) এবং তার অনুসারীদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা হবে। তাদের সসম্মানে যেখানে ইচ্ছা যেতে দেওয়া হবে। হজরত হোসাইন (রা.) অন্যায়কারীদের সঙ্গে আপস করার চেয়ে জীবন উৎসর্গ করাকেই শ্রেয় বলে বেছে নেন।
চতুর্থ খলিফা হজরত আলীর (রা.) আমলে খেলাফত নিয়ে হজরত মুয়াবিয়ার (রা.) সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। খেলাফতের ঐক্য রক্ষায় হজরত আলী (রা.) উমাইয়াদের সঙ্গে সমঝোতায় উপনীত হন। এই সমঝোতা অনুসারে হজরত আলীর (রা.) পর খেলাফতের অধিকারী হবেন মুয়াবিয়া_ এই শর্ত নির্ধারিত হয়। তারপর আবার খেলাফত ফিরে যাবে হজরত আলী (রা.) ও হজরত ফাতেমা (রা.)-এর সন্তানদের হাতে। এই সমঝোতা ভঙ্গ করে উমাইয়ারা।
মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার মদ্যপ পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উমাইয়ারা ইয়াজিদের পক্ষে আনুগত্য লাভে উঠেপড়ে লাগে। তৎকালীন রীতি অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান পরিবর্তন বিশিষ্ট নাগরিক তথা রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকার অধিবাসীরা রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য গ্রহণ করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের বিশিষ্টজনরা মুয়াবিয়া (রা.) পুত্র ইয়াজিদের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করে। ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের বাইয়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।
ইয়াজিদের বিরুদ্ধে মদ্যপান এবং নারী লোলুপতার অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ছিল। তিনি খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে রাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন। হজরত ইমাম হোসাইন ইসলামী চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে উদ্যোগী হন। তিনি ইয়াজিদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কুফা সফরের সিদ্ধান্ত নেন।
মক্কা থেকে কুফা যাওয়ার পথে অনুসারীদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে সুস্পষ্টভাবেই বলেন, 'আমার সফরের উদ্দেশ্য হলো কপট উমাইয়া শাসকদের স্বরূপ উন্মোচন করা, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। এ ছাড়া আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। '
উল্লেখ্য, ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে ঘোষণার বিরোধিতা করে কুফার দেড় শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ইমাম হোসাইনকে (রা.) আনুগত্য স্বীকার করে চিঠি লিখেন এবং তাকে কুফা গমনের আমন্ত্রণ জানান।
হজরত হোসাইনের কুফা সফরের প্রস্তুতিতে ইয়াজিদ শিবিরে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। তারা কুফার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে তাদের নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে।
এই অপচেষ্টা সাময়িকভাবে সফলও হয়। ইতোমধ্যে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার সহযাত্রীদের অবরুদ্ধ করা হয় ইয়াজিদের নিয়োজিত কুফার গভর্নরের নির্দেশে। এক মাস অবরুদ্ধ থাকার পর হজরত ইমাম হোসাইন কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর মুখোমুখি হন। অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার শপথে তিনি ঘোষণা করেন 'অপমানজনক জীবনের চেয়ে সম্মানজনক মৃত্যু শ্রেয়। ' ইয়াজিদ বাহিনী হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) শিবিরের পানি সরবরাহ বন্ধে ফোরাত নদীর তীরে অবরোধ সৃষ্টি করেছিল।
ইমাম পরিবারের শিশুদের জীবন রক্ষায় তিনি সে অবরোধ ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। শুরু হয় নির্দয় ইয়াজিদ বাহিনীর সঙ্গে ইসলামী আদর্শের প্রতি অনুগত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর অনুসারীদের যুদ্ধ। সেই অসম যুদ্ধের একদিকে ইমাম হোসাইনের (রা.) পক্ষে ছিলেন মাত্র ৭২ জন সৈন্য। অন্যদিকে মুয়াবিয়ার (রা.) পুত্র ইয়াজিদের পক্ষে ছিল ৪ হাজার সৈন্য। যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সহযোদ্ধাদের একে একে সবাই শাহাদাতবরণ করেন।
পবিত্রতা ও শুদ্ধতার প্রতীক হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) একাই শেষ লড়াই চালিয়ে শাহাদাতবরণ করেন। তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে ইয়াজিদের সৈন্যরা। কারবালার প্রান্তরে অসম যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন জীবনের চেয়ে আদর্শ অনেক বড়। ইসলামের আদর্শ সমুন্নত রাখতে তার শাহাদাতবরণ রোজ কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক : ইসলামী গবেষক।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।