কারো আশাকে নষ্ট করবেন না, হয়তো এ আশাই তার শেষ সম্বল। সেই গল্পটা
পূর্ণেন্দু পত্রী
আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।
শোনো।
পাহাড়টা, আগেই বলেছি
ভালোবেসেছিলো মেঘকে
আর মেঘ কি ভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে
বানিয়ে তুলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকরা
সে তো আগেই শুনেছো।
সেদিন ছিলো পাহাড়টার জন্মদিন।
পাহাড় মেঘকে বললে
– আজ তুমি লাল শাড়ি পরে আসবে।
মেঘ পাহাড়কে বললে
– আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেবো চন্দন জলে।
ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরম নদী
পুরুষেরা জ্বলন্ত কাঠ।
সেইভাবেই মেঘ ছিল পাহাড়ের আলিঙ্গনের আগুনে
পাহাড় ছিলো মেঘের ঢেউ-জলে।
হঠাৎ,
আকাশ জুড়ে বেজে উঠলো ঝড়ের জগঝম্প
ঝাঁকড়া চুল উড়িয়ে ছিনতাই এর ভঙ্গিতে ছুটে এল
এক ঝাঁক হাওয়া
মেঘের আঁচলে টান মেরে বললে
– ওঠ্ ছুঁড়ি! তোর বিয়ে ।
এখনো শেষ হয়নি গল্পটা।
বজ্রের সঙ্গে মেঘের বিয়েটা হয়ে গেলো ঠিকই
কিন্তু পাহাড়কে সে কোনোদিন ভুলতে পারলনা।
বিশ্বাস না হয় তো চিরে দেখতে পারো
পাহাড়টার হাড়-পাঁজর,
ভিতরে থৈথৈ করছে
শত ঝর্ণার জল।
গৃহত্যাগী জ্যোৎস্না
হুমায়ুন আহমেদ
প্রতি পুর্ণিমার মধ্যরাতে একবার আকাশের দিকে তাকাই
গৃহত্যাগী হবার মত জ্যোৎস্না কি উঠেছে?
বালিকা ভুলানো জ্যোৎস্না নয়
যে জোতস্নায় বালিকারা ছাদের রেলিং ধরে
ছুটোছুটি করতে করতে বলবে
“ও মাগো! কি সুন্দর চাঁদ !”
নব দম্পত্তির জ্যোৎস্নাও নয়
যে জ্যোৎস্না দেখে স্বামী গাঢ় স্বরে স্ত্রী কে বলবেন
“দেখো দেখো নীতু, চাঁদটা তোমার মুখের মতই সুন্দর”
কাজলা দিদির স্যাতস্যাতে জ্যোৎস্নাও নয়
যে জ্যোৎস্না বাসি স্মৃতিপূর্ন ডাস্টবিন উল্টে দেয় অন্ধকারে
কবির জোৎস্না নয়, যে জ্যোৎস্না দেখে কবি বলবেন
কি আশ্চর্য রূপার থালার মত চাঁদ।
আমি সিদ্ধার্থের মত গৃহিত্যাগী জ্যোৎস্নার জন্য বসে আছি
যে জোৎস্না দেখা মাত্র গৃহের সমস্ত দরজা খুলে যাবে
ঘরের ভিতর ধুকে পড়বে বিস্তৃত প্রান্তর
প্রান্তরে হাঁটবো, হাঁটবো আর হাঁটবো,
পূর্নিমার চাঁদ স্থির হয়ে থাকবে আকাশে
চারদিক থেকে ডাকবে আয়, আয়, আয়।
মহাকবি সমুদ্র গুপ্তের কবিতা :
তুমি বললে ফুল
আমি বললাম কাগজের নিষ্প্রাণ গন্ধহীন
তুমি বললে যাই হোক
তবুও তো ফুল
মানুষটা তো কাগজ কেটে কেটে
কামান বন্দুক মারণাস্ত্র বানাতেও পারত'
কবির কি বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি, এবার তাঁর নিচের কবিতাটি দেখুন প্রতিহিংসার সাবলীল ও সহজ সরল বর্ণনা :
প্রতিহিংসা
তোমার দুধের বাটিতে আমি
বেড়ালের সাদা লোম মিশিয়ে দেবো
চোখে ফুঁক দেবো ঢুকিয়ে দেবো ভুরু
পায়ের তালুতে গুল লাগিয়ে
পিঁপড়া লেলিয়ে দেবো
শুকনো চুলের মধ্যে
পাকা খাগড়ার গোটা ছড়িয়ে
ডলে দেবো আচ্ছা মতোন
পাঁজরের একটু উপরে, পিঠের বেকায়দা স্থানে
বিছুটির পাতা ঘষে দেবো
কানের লতির মধ্যে কাঁচা লংকা ভেঙে দেবো
নাভির ওপর শুকনো ধান রেখে
পা দিয়ে ডলে ডলে চাল করবো
তোমার দাম্পত্য ঝগড়ার সময়
হেঁসেলে লবণ ছিটাবো
পাকা ধানে মই দেবো, তোমার
বাড়া ভাতে ছিটিয়ে দেবো ছাই
মনে নাই
তুমি আমার স্বপ্নের বাড়ির উঠানে
দুঃস্বপ্নের কুকুর ছেড়েছ!
প্রতীক্ষা
– রফিক আজাদ
এমন অনেক দিন গেছে
আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি,
হেমন্তে পাতা-ঝরার শব্দ শুনবো ব’লে
নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতে-
কোনো বন্ধুর জন্যে
কিংবা অন্য অনেকের জন্যে
হয়তো বা ভবিষ্যতেও অপেক্ষা করবো…
এমন অনেক দিনই তো গেছে
কারো অপেক্ষায় বাড়ি ব’সে আছি-
হয়তো কেউ বলেছিলো, “অপেক্ষা ক’রো
একসঙ্গে বেরুবো। ”
এক শনিবার রাতে খুব ক্যাজুয়ালি
কোনো বন্ধু ঘোরের মধ্যে গোঙানির মতো
উচ্চারণ করেছিলো, “বাড়ি থেকো
ভোরবেলা তোমাকে তুলে নেবো। ”
হয়তো বা ওর মনের মধ্যে ছিলো
চুনিয়া অথবা শ্রীপুর ফরেস্ট বাংলো;
-আমি অপেক্ষায় থেকেছি।
যুদ্ধের অনেক আগে
একবার আমার প্রিয়বন্ধু অলোক মিত্র
ঠাট্টা ক’রে বলেছিলো,
“জীবনে তো কিছুই দেখলি না
ন্যুব্জপীঠ পানশালা ছাড়া। চল, তোকে
দিনাজপুরে নিয়ে যাবো
কান্তজীর মন্দির ও রামসাগর দেখবি,
বিরাট গোলাকার চাঁদ মস্ত খোলা আকাশ দেখবি,
পলা ও আধিয়ারদের জীবন দেখবি,
গল্প-টল্প লেখার ব্যাপারে কিছু উপাদান
পেয়ে যেতেও পারিস,
তৈরী থাকিস- আমি আসবো”
-আমি অপেক্ষায় থেকেছি;
আমি বন্ধু, পরিচিত-জন, এমনকি- শত্রুর জন্যেও
অপেক্ষায় থেকেছি,
বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে
অপেক্ষায় থেকেছি-
কিন্তু তোমার জন্য আমি অপেক্ষায় থাকবো না,
-প্রতীক্ষা করবো।
‘প্রতীক্ষা’ শব্দটি আমি শুধু তোমারই জন্যে খুব যত্নে
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম,
অভিধানে শব্দ-দু’টির তেমন কোনো
আলাদা মানে নেই-
কিন্তু আমরা দু’জন জানি
ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,
‘অপেক্ষা’ একটি দরকারি শব্দ—
আটপৌরে, দ্যোতনাহীন, ব্যঞ্জনাবিহীন,
অনেকের প্রয়োজন মেটায়।
‘প্রতীক্ষা’ই আমাদের ব্যবহার্য সঠিক শব্দ,
ঊনমান অপর শব্দটি আমাদের ব্যবহারের অযোগ্য,
আমরা কি একে অপরের জন্যে প্রতীক্ষা করবো না ?
আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের মতো
দাঁড়িয়ে থাকবো-
ঐ বৃক্ষ অনন্তকাল ধ’রে যোগ্য পথিকের
জন্যে প্রতীক্ষমান,
আমাকে তুমি প্রতীক্ষা করতে বোলো
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবো অনড় বিশ্বাসে,
দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে
আমার পায়ে শিকড় গজাবে…
আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না.
ম’রে যেতে সাধ হয়
আনিসুল হক
শাহানা, তুমি গোলাপী জামা প’রে জীবন্ত গোলাপের মতো
ক্যাম্পাসে এসো না, আমার খারাপ লাগে।
সখী পরিবৃতা হয়ে মোগল-দুহিতার মতো
করিডোরে অমন ক’রে হেঁটো না, আমার খারাপ লাগে।
শাহানা, তুমি চিবুক নাড়িয়ে
রাঙা মাড়িতে
দুধ শাদা হাতে
লালিম জিহ্বায়
গিটারের তারের মতো বেজে উঠো না —
দরদালান কেঁপে উঠে, ঢিল পড়ে বুকের পুকুরে,
কাঁপে পানি থিরিথিরি, আমার খারাপ লাগে।
শাহানা, তুমি টিফিন আওয়ারে ক্লাসরুমে ব’সে
অমন করে রাধার মতো দীর্ঘ চুল মেলে দিও না
অন্ধকার করে আসে সারাটা আকাশ
নিবে যায় সবগুলি নিয়ন
কালো মেঘের উপমা দিতে আমার ভালো লাগে না।
শাহানা, তুমি ক্যাফেটেরিয়ায় নিরেট চায়ের কাপে
ওই দুটি ঠোঁট রেখো না;
নিদাঘ খরার পোড়ে ঠোঁটের বাগান,
মরুভূর মতো জ্বলে তৃষ্ণার্ত সবুজ;
আমার মরে যেতে সাধ হয়।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।