এক সময় ঢাকা শহরের বিভিন্ন পথে গলিতে হাটা হত। ঢাকার অনেক নামকরা ব্যস্ত রাস্তার পাশাপাশি সরু গলি দেয়ালে একটি লেখা দেখা যেত "কষ্টে আছি আইজ উদ্দিন"। ধিরে ধিরে বন্ধু মহলে, চায়ের আসরে কেও যখন জিজ্ঞাস করতো কিরে কেমন আছিস বলতাম কষ্টে আছি আইজ উদ্দিন। এক সময় এই উক্তিটি প্রচুর জনপ্রিয়তা পেল। বিভিন্ন স্থানে এই উক্তিটি মানুষের মুখে মুখে শুনতে থাকলাম।
সবার অজান্তেই এই আইজ উদ্দিন হয়ে গেলেন একজন কিংবদন্তি। এক সময় একটা সাধারন প্রশ্ন জাগল কে এই আইজ উদ্দিন? যখন এই প্রশ্নটি আইজ উদ্দিনের মতো বিখ্যাত হল তখন আইজ উদ্দিন নামক এই প্রানিটি কে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গেল। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়
এই বিষয়টি মহা-গুরুত্তের সাথে প্রকাশ হয়া শুরু করলো।
অবশেষে একদিন একটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা পৌঁছে গেল আইজ উদ্দিনের কছে। উপস্থাপক জিজ্ঞাস করা শুরু করলেন তাঁর অতান্ত বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন গুলো,
আইজ উদ্দিন সাহেব কথায় ছিলেন আপনি??
উত্তর আসলো কই আর থাকুম সাড়া দিন ঠেলা চালাই রাইতে বাড়ি গিয়া ঘুমাই।
এই যে শহরের পথে পথে লেখা কষ্টে আছি আইজ উদ্দিন এই লেখা কি আপনি লিখেছেন?
জি আমি লেখছি।
আপনি কি শিক্ষিত? লেখাপড়া কতটুকু জানেন?
জি আমি ক্লাস ফাইভ পাস।
তারপর আর লেখাপড়া করেন নাই কেন?
অভাবের সংসারে বড় হইসি, অল্প বয়সেই কাম কাজে নামছি। টেকা নাই পরুম কেমনে?
কত বছর বয়সে কাজকর্মে নেমেছেন?
খুব ছোট থাকতে নামছি, বয়স মনে নাই।
সাড়া দিনে কত টাকা কামান?
কামানির কোন ঠিক ঠিকানা নাই।
কাম বেশি পাইলে কামাই বেশি না পাইলে কামাই নাই।
কষ্টে আছি আইজ উদ্দিন এইটা কেন লেখেন??
এইটা লেইখা জানান দেই আমি আইজ উদ্দিন কষ্টে আছি।
এই লেখার জন্য তো রং কেনা লাগে টাকা কই পান?
আমার নিজের কামানি টাকা থেইক্কা টাকা বাচায় রং কিনা লেখি।
কত দিন যাবত লিখছেন?
তা ধরেন ৫ বছর।
এখন পর্যন্ত কয়টি স্থানের কয়টি দেয়ালে লিখসেন?
হিসাব রাহি নাই।
দর্শকদের কিছু বলবেন?
অনেকক্ষণ নিরবতা, এদিক সেদিক তাকানোর পর আমি আইজ উদ্দিন কষ্টে আছি।
কিছুক্ষণ হাটাহাটি অনুষ্ঠান শেষ।
অনুষ্ঠানটি যিনি উপস্থাপন করতেন তিনি এই ধরনের আরও অনেক গুলো লোকের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানটি সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি দিনের একই সময় হত। অনুষ্ঠানটি হতো ৪৫ মিনিটের মতো যার মধ্যে ১৫-২০ মিনিট বিজ্ঞাপন দেখানো হতো।
বিভিন্ন বড়বড় কোম্পানির গুণগান গাওয়া এই সব বিজ্ঞাপন থেকে ভালো পরিমানের একটি অর্থ এই অনুষ্ঠানের নির্মাতা, পরিচালক, সঞ্চালক, চ্যানেল মালিকরা পেয়ে থাকতেন, এই সমস্ত অনুষ্ঠান এখনো পুনঃপ্রচার করে তাঁরা যেমন তাঁদের মান বাঁচাচ্ছেন তেমনই অর্থ বাচিয়ে বিপুল পরিমান অর্থ লাভ করছেন।
এই যে আজকের টকশো, নিম্ন মানের নাটক, ফালতু অনুষ্ঠান, জোর করে মানুষকে কাতুকুতু দিয়ে হাঁসানোর প্রয়াশ এসব করে কার্যত কারা লাভবান হচ্ছেন? এই সব অনুষ্ঠানের জন্য উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা যে বিরুপ ধারনা নিয়ে নিজের দেশের টিভি চ্যানেল গুলো প্রত্যাখ্যান করছে এর জন্য কারা দায়ী? এমনও অবস্থা বিভিন্ন লোক নিজেদের টাকা পয়সা দিয়ে নিজেদের অভিনয় শিল্পী, গায়ক, কমেডিয়ান, ম্যাজিসিয়ান, পরিচালক, প্রযোজক, নির্মাতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করছেন। যার কারনে চ্যানেল গুলোর কোন চিন্তাই করা লাগেনা, চ্যানেল গুলোর হাতে সব সময় চালানোর মতো কোন না কোন রসদ থাকে অপর দিকে চ্যানেল মালিকরা গড়ে তলেন টাকার পাহার।
আজকের সামাজিক অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য এই সব লোভী মালিকানাধীণ চ্যানেল এবং তাঁদের অনুষ্ঠান গুলো দায়ী। নিজের দেশকে ভালোবাসুন পচা সাবান কিনুন, তাতের বস্ত্র পড়ুন, বাংলা সিনেমা দেখুন গান শুনুন এইসব বলে মুখে ফেনা তুলে কিছু মানুষের ঝুটা খেয়ে একটি মহলের একদল সুবিধাবাদী লোক যখন প্রচারনা চালায় তখন হাঁসি পায়।
ভালো ছবি বানান যার কাহিনী ভালো, বাস্তব সম্মত। ভালো গান করেন মানুষ শুনবে। ভালো অনুষ্ঠান করেন মানুষ দেখবে। আর কতকাল ধাপ্পাবাজি করে নিজেরাই নিজেদের কে অপমান করবেন। আর কতদিন ছলচাতুরীতে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে মানুষের মধ্যে বিবাদ লাগিয়ে রাখবেন??
আইজ উদ্দিন কারো কাছে হাত পাতে নাই, সে যা লেখসে তা নিজের টাকায়।
তাকে পুজি করে কিছু লোক বিখ্যাত হয়েছে কিছু লোক অর্থ লাভ করেছে কিছু লোক মজা পেয়েছে কিছু লোক উৎসাহ দিয়েছে যার যা খুশি তাই করেছে। কেও উপলব্ধি করে নাই,আইজ উদ্দিন কি সাক্ষাতকার দিয়ে টাকা পেয়েছে??আইজ উদ্দিন লেখেছে সে থামেনি "কষ্টে আছি আইজ উদ্দিন"
আইজ উদ্দিনরা কষ্টে থাকে সীমাহীন কষ্ট অন্তহীন কষ্ট আর লিখতে থাকে
"কষ্টে আছি আইজ উদ্দিন" ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।