আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ইরানের দিনগুলো - ১১ (শেষ)

ইরানের দিনগুলো - ১ , ২ , ৩ , ৪ , ৫ , ৬ , ৭ , ৮ , ৯ , ১০ লদানের কথা বলতে গেলে শেষ হবে না। কুটুর কুটুর করে অনেক গল্প করতাম আমরা। তবে মিস হত বাসে, লদান সব সময় খালাম্মার সাথে বসত, আর আমরা দুই পিচ্চি একসাথে। আমি শুনতাম লদান খালাম্মার সাথে পুরোটা রাস্তাই গল্প করত। একদিন আমরা জায়গা বদল করলাম।

আমি বসলাম লদানের পাশে। সেদিন আমরা ইচ্ছামত গল্প করলাম। লদানের দুইটা ছোট ভাই-বোন ছিল। আমার এতগুলো ভাইবোনের খবরও নিল সে। ওর বাবা ছিলেন রিটায়ার্ড, মা অসুস্থ।

পুরো সংসার লদানই চালাত। পরে চিঠির মাধ্যমে জানতে পারি তার মায়ের ক্যান্সার হয়েছিল, কেমোথরাপি দিয়েও তাকে বাঁচানো যায়নি। লদান আমার কাছে জানতে চাইত আমি বড় হয়ে কী হতে চাই। বলেছিলাম, ডাক্তার হতে চাই, কাটাকুটির ডাক্তার। পরে যখন চিঠিতে জানিয়েছিলাম আমার ডাক্তার হয়ে কাটাকুটি করার খবর, খুব খুশি হয়েছিল লদান।

একবার লদান আমাকে বলেছিল, আচ্ছা আমি যদি কখনও তোমাকে এমনি দাওয়াত করি আমাদের দেশে আসার জন্য, তুমি কি আসতে পারবে? বলেছিলাম, না রে ভাই, ঐ সামর্থ্য নেই আমার। বেচারী কষ্ট পেয়েছিল, এই প্রসঙ্গ ভুলেও আর কখনও তোলেনি। যেদিন আমার ঠিকানা লিখে নিয়েছিল, ঠিকানার একটা অংশ বুঝতে পারছিল না। বলল, এটা কী? রাস্তার নাম? বললাম, না, এটা আমাদের বাড়ির নাম। খুব অবাক হয়েছিল, তোমাদের দেশে বাড়িরও নাম হয়? প্রায়ই সে আমাদের দেশ সম্পর্কে জানতে চাইত।

একবার জানতে চেয়েছিল আমাদের দেশের মেয়েরাও কি ওদের মত হিজাব পরে কি না। বলেছিলাম, কেউ কেউ পরে, সবাই না। আবার একবার কোথা থেকে শুনেছিল যে আমরা চুলে তেল দিই। জানতে চেয়েছিল কী তেল দিই। বললাম, নারকেল তেল।

আরও কোন তেল দিই কি না সেটাও জানতে চেয়েছিল। কিন্তু ঐ মুহূর্তে মনে পড়ছিল না আর কোন নাম। মনে পড়লে কদুর তেলের কথা বলতে পারতাম। রাস্তায় বের হলেই লদান পরিবেশ দূষণের কথা বলত। আমি বলতাম, আমাদের দেশের দূষণের তুলনায় এটা কিছুই না।

যেদিন পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম, পাহাড় থেকে তেহরান শহরটা দেখা যাচ্ছিল ধোঁয়ার সাগরে ডুবে থাকা একটা শহরের মত। ভাবছিলাম ঢাকা শহরকে এইভাবে দেখলে না জানি কেমন দেখা যাবে। তেহরানের রাস্তাঘাট পরিষ্কার তো ছিলই, আরেকটা ব্যাপার খুব ভালো লেগেছিল। তেহরানের ফুলের দোকানগুলো খুবই সুন্দর আর অদ্ভূত। এগুলো সরকারীভাবে করা কি না জানি না।

প্রতিটা দোকানই এক রকম, সবচেয়ে মজার হল এদের অবস্থান। বড় বড় রাস্তার পাশের দোকানগুলো এমনভাবে অবস্থিত যে দোকানের অর্ধেকটা বড় রাস্তায়, আর বাকী অর্ধেকটা থাকে ফুটপাথ জুড়ে। দোকানগুলোর আকার হল ষড়ভুজাকৃতির। আর পুরোটাই কাঁচের দেয়ালে মোড়া। তাই ভিতরের সব সুন্দর সুন্দর ফুল বাইরে থেকেই দেখা যেত।

আর সকালবেলা রাস্তায় বের হলেই একটা দৃশ্য রোজ দেখতাম। কোন বৃদ্ধলোক অথবা বৃদ্ধমহিলা কাঁধে করে এত্তগুলো নানরুটি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। জানি না এগুলো কোন বাড়ির জন্য না কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য, কিন্তু এই কাজে বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধা ছাড়া অন্য কাউকে দেখিনি। আমাদের যে বাসে নেয়া হত, সেটা বেশ বড় বাস ছিল। তবে তার চেয়েও বড় বড় বাস রাস্তায় দেখেছি।

মজা লাগত দুইটা বাসের জোড়া লাগানো দেখে, মাঝখানটা দেখা যেত কেঁচোর মত। ওখানে মটর সাইকেলগুলোর সামনে বড় একটা প্লাস্টিকের ঢালের মত লাগানো থাকত। ঢালটা পুরোটা ঘষা কাঁচের মত, মাঝখানে দেখার জন্য একটু অংশ পরিষ্কার। আর মটর সাইকেলে পুরুষ বা মহিলা যে-ই বসুক, দুই পাশে পা দিয়ে বসত। এমন কি বড় বড় জোব্বা টাইপের বোরকা পরেও।

আমাদের দেশের মেয়েদের মত একপাশে দুই পা ঝুলিয়ে কখনও কাউকে বসতে দেখিনি। বড় বড় রাস্তাগুলোতে আমাদের প্রতিযোগিতার লোগোসহ ব্যানার আর ফেস্টুন ঝুলতে দেখেছি অনেক। বুঝতে পারছিলাম বেশ জোরে-সোরে প্রচার করেই প্রতিযোগিতাটা হচ্ছিল। তার প্রমাণও পেয়েছিলাম মাশহাদ যাওয়ার সময়। আমাদের সামনেই একটা পরিবার বসেছিল।

একটা সুন্দর বাবু ছিল ওদের। বাবুর মা আমাদের দিকে তাকিয়েই খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বাবুর বাবাকে কি যেন বলল। ভদ্রলোকও আমাদের দিকে তাকিয়ে একই অভিব্যক্তি দিলেন। তাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে তারা চিনতে পেরেছে যে আমরা প্রতিযোগী।

মাশহাদে যাওয়ার সময় আরেকটা মজা হয়েছিল। আমাদের দুই পিচ্চির পাশেই বসেছিল সুদানের পুরুষ সুপারভাইজার। তার সাথে কখনই কথা হয়নি। এখনও হচ্ছিল না। একবার দেখলাম উনি সামনের সিটের সাথে লাগানো টেবিলের মত অংশটুকু খোলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু আসল চাবিটা না ঘুরিয়ে একবার এই কোণা, আরেকবার ঐ কোণা ধরে টানাটানি করছেন।

আমার মাথায় একটা দুষ্টুমি বুদ্ধি এল। আমার পাশে ছিল আমার রুমমেট, আর তার অন্যপাশে সেই সুদানী ভদ্রলোক। আমি রুমমেটকে বললাম, দেখ উনি তো বুঝতে পারছেন না টেবিলটা কিভাবে খুলবেন, আমরা তাকে একটু শিখিয়ে দিই, আমরা আমাদের টেবিলগুলো খুলে দেখাই। রুমমেটও রাজী হল। আমরা একসাথে আমাদের টেবিল দুটো খুলে টেবিলের উপর একটু তবলা বাজিয়ে আবার বন্ধ করে রাখলাম।

ভদ্রলোক ঠিকই খেয়াল করলেন। আর মনে হয় একটু লজ্জাও পেলেন। যা হোক, যখন আমাদের খাবার এল, আমি আমার টেবিলটা আবার খুলে নিলাম। সুদানী ভদ্রলোক ঝটপট নিজের টেবিলটা ঠিকমত খুলে নিয়ে তাড়াতাড়ি করে আমার রুমমেটের টেবিলটাও খুলে দিলেন। আমরা ফিক ফিক করে হাসতে থাকলাম।

মাশহাদ থেকে ফিরে এসে লদানের সাথে আর দেখা হয়নি, তবে আমরা যাবার আগের দিন লদান ফোন করেছিল। অনেক কথা বলছিল সে, ভালো ভাবে যেন যাই বারবার এই দুআ করছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম কোথায় আছে এখন, কিছুতেই সেই উত্তর দিল না। আমাদের সাথে একটু দেখা করতে বলতাম, কিন্তু মনে হল সেটা সম্ভব হবে না তার জন্য, সেজন্যই এড়িয়ে যেতে চাইছিল। যা হোক, আমাদের যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এল।

আমরা সবাই পোটলা-পুঁটলি বেঁধে রওনা দিলাম খুব ভোরে। এয়ারপোর্টে পৌঁছে পেলাম দুঃসংবাদটা। আমাদের ভিসার মেয়াদ নাকি চার ঘন্টা আগে শেষ হয়ে গিয়েছে। সবার মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা। শাহরম এসেছিল আমাদের বিদায় জানাতে।

সে বলল, আপনারা চিন্তা করবেন না, আমি এর ব্যবস্থা করছি। সে সবার পাসপোর্ট নিয়ে দৌড় দিল। একটা ঘন্টা সবাই বসে বসে দুআ পড়ছিল, সবাই ধরেই নিয়েছিল যে আমাদের আর দেশে যাওয়া হবে না আর আমাদেরকে ধরে জেলে ভরে দিবে। একমাত্র আমারই কোনরকম দুশ্চিন্তা হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল একটা না একটা ব্যবস্থা হবেই, বরং আমরা আর একদিন পরেই দেশের মাটিতে পা রাখব এই খুশিতেই আমি উৎফুল্ল ছিলাম।

যা হোক, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই শাহরম ফিরে এল, আমাদের ভিসার মেয়াদ সে বাড়িয়ে এনেছে। বিদায় জানিয়ে আমরা রওনা দিলাম দেশের উদ্দেশ্যে। এইবার আমরা করাচী না হয়ে দুবাই হয়ে এলাম। আর এইবার এয়ারপোর্টে বসে বসে বোর হবার মত ইচ্ছা কারুর ছিল না। আমরা বের হয়ে গেলাম।

পার্ক ভিউ হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে পাশের একটা ইন্ডিয়ান হোটেলে ভাত খেলাম। এরপর বের হলাম ঘুরতে। হাঁটতে হাঁটতেই দেখতে থাকলাম শহরটা। একটা ব্যাপার খুব অদ্ভূত লেগেছিল। দুবাইয়ের সবগুলো ব্যাংক বিশাল বিশাল, আর প্রতিটাই লাইটিং করে সাজানো, আমাদের দেশের বিয়েবাড়ির মত।

একটা নদীর পাড়ে গেলাম হাঁটতে হাঁটতে। নদীর নাম জানি না। আমাদের সাথের এক প্রতিযোগী কী মনে করে নদীর পানি আঁজলা ভরে নিয়ে মুখে দিল। দিয়েই ইয়াক থুঃ। নোনা পানির নদী এটা।

আবার আমাদের সবাইকেও সাধছিল টেস্ট করে দেখার জন্য। আমি বললাম, দরকার নাই। এরপর গেলাম শপিং-এ। মার্কেট খুঁজতে কষ্ট হয়নি। দুবাইয়ের রাস্তাঘাটে সব ইন্ডিয়ান লোকজন।

ওদেরকে জিজ্ঞেস করে করেই পৌঁছে গেলাম মার্কেটে। এখানেও সব দোকান চালাচ্ছে ইন্ডিয়ানরা। স্বর্ণের দোকান থেকে শুরু করে ঘড়ি, কসমেটিক্স, কাপড় সব দোকানই ইন্ডিয়ানদের। খালাম্মা স্বর্ণের একটা চেইন কিনলেন। ছেলে প্রতিযোগীরা কিনল ঘড়ি।

আমরা দুই পিচ্চি এক সেট করে জামার কাপড় কিনলাম। আমিই কিনেছিলাম প্রথমে, আমার দেখাদেখি রুমমেটও ঐ একই জিনিস নিয়ে নিল, সে নিজে কোনটাই পছন্দ করতে পারছিল না। হোটেলে ফিরে গোসল করে আবার রওনা দিলাম এয়ারপোর্টে। এমিরেটস এয়ারলাইনসে করে 'বেবি'স ডে আউট' দেখতে দেখতে চলে এলাম ঢাকায়। এয়ারপোর্ট থেকে নেমে কি যে একটা শান্তি লাগছিল সেটা নিজেও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।

নেমেই দেখি আমাদের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবাইকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নিয়ে গেল ভিআইপি লাউঞ্জে। এতদিন শুধু টিভিতেই দেখতাম এখানে সব খেলোয়াড়দের বরণ করা হয়। এখন আমরাই এখানে বসে আছি। ফুলের শুভেচ্ছার আরও বাকী ছিল।

আমার রুমমেটের ফুফু আমাদের জন্য ফুলের মালা নিয়ে এসেছিলেন, আর আমার বাসা থেকেও আব্বা-আম্মা আর ছোট ভাই-বোন এসেছে, তারাও ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছে। আমি এক ঝলক আব্বা-আম্মার সাথে দেখা করেই আমার পোটলা-পুঁটলি আনতে চলে গেলাম। একটু টেনশনে ছিলাম কারণ শুরুতে বেল্টে পাচ্ছিলাম না আমার লাগেজ। পরে দেখলাম যে ভিআইপি-দের জন্য আলাদা বেল্ট। ওখানে গিয়েই পেয়ে গেলাম সব লাগেজ।

এর মধ্যে ছোট বোন এসে শোনে যে আমি এসেই আবার ভিতরে চলে গিয়েছি। বেচারী দুঃখে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। যা হোক, পোটলা-পুঁটলি উদ্ধার করে এনে আবার দেখা হল সবার সাথে। সবাইকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিসে নিয়ে যাওয়া হল। আরেক দফা সংবর্ধনার পর আমরা যার যার বাসায় গেলাম।

ছোট ভাইটা এতক্ষণ কোন কথা বলার সুযোগ পায়নি আমার সাথে। বাসায় রওনা দেয়ার সময় সুযোগ পেয়ে আমার কাছে এসে কানে কানে বলল, আচ্ছা, তোমাকে তো ইরান থেকে একটা বস্তা দিয়েছে, আর কী কী দিয়েছে? আমি আঁৎকে উঠলাম, বস্তা! কম্বলের প্যাকেটে মোড়া দামী ইরানী কার্পেটটাকে ও মনে করেছে বস্তা! পুরাই জাত মেরে দিল। যাক, শেষ হল আমার ছোট্ট কিন্তু বিশাল ভ্রমণ। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.