আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি উক্তি দিয়ে লেখাটি শুরু করতে চাই। ২০০৫ সালের ১৪ জুন তিনি চারদলীয় জোট সরকারের প্রণীত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় উক্তিটি করেছিলেন। পরের দিন সব জাতীয় দৈনিক এ উক্তি দিয়ে সংবাদের শিরোনাম করেছে। ২০০৫ সালের ১৫ জুন দৈনিক জনকণ্ঠ—‘লুটপাটের টাকা জায়েজ করতেই জোট সরকার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে—হাসিনা’। একই দিন প্রথম আলোর শিরোনাম—‘সাভারে জনসভায় শেখ হাসিনা : মন্ত্রী-এমপিদের কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা হয়েছে বাজেটে’।

দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল ‘অবৈধভাবে আবার ক্ষমতায় আসার জন্য কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে : শেখ হাসিনা’। মোদ্দা কথা, প্রতিটি দৈনিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার বিষয়টিকেই সংবাদের শিরোনামে নিয়ে আসা হয়। এবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ঘোষিত বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সেই সুযোগও দেয়া হয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন রাখছি—এবার কাদের কালো টাকা সাদা করার জন্য আপনি সুযোগ দিয়েছেন? আপনার মন্ত্রী-এমপিসহ দলের বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে শেয়ার মার্কেট থেকে এক লাখ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। শুধু শেয়ার মার্কেট নয়, সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের টাকাও কীভাবে লুটপাট হচ্ছে তা পত্রিকায় মাঝে মধ্যেই প্রকাশিত হয়। আপনার আমলে বিদেশে কালো টাকা পাচারেরও অনেক অভিযোগ শোনা যায়। কারও কারও কালো টাকা আমেরিকায় জব্দ করার কাহিনী মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত। চারদলীয় জোট সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ২০০৫ সালের ১০ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন।

রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সাংবাদিকদের ডেকে তিনি এই ভাষণটি দেন। পরের দিন জাতীয় দৈনিকগুলোতে ফলাও করে তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভাষণ প্রচার করা হয়। তার এই ভাষণ সেদিন সরাসরি সম্প্রচার করেছিল বেসরকারি টেলিভিশনগুলো। পুরো ভাষণ থেকে শুধু আমি দ্রব্যমূল্যের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করব। তার এই ভাষণে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ত্যাগের সময় দ্রব্যমূল্যের পরিস্থিতি ও ২০০৫ সালে দ্রব্যমূল্যের পরিসংখ্যানের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়।

তখন চারদলীয় জোট সরকারের চার বছর শেষ। পঞ্জিকা অনুযায়ী ক্ষমতা আছে আর মাত্র এক বছর। এই তালিকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় ২২টি পণ্যের মূল্য স্থান পায়। চার বছরে কী পরিমাণ বেড়েছে তা দেখাতেই তুলনামূলক এই চিত্র। এই চিত্রটি ছিল আওয়ামী লীগের নিজেদের ধারণা থেকে তৈরি।

তারপরও চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে জাতির উদ্দেশে ভাষণের জন্য তৈরি দ্রব্যমূল্য তালিকাটিকে আমি সঠিক চিত্র বলে ধরে নিচ্ছি। এই চিত্রে দেখা যায়—২০০৫ সালের অক্টোবরে অর্থাত্ চারদলীয় জোট সরকারের শেষ বছরে চাল প্রতি কেজি ইরি ২০ টাকা, পাইজাম ২৩ টাকা, নাজিরশাইল ২৮ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৫৬ টাকা, সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ৬০ টাকা, আটা প্রতি কেজি ২০ টাকা, লবণ ১৮ টাকা, চিনি ৪২ টাকা, গুঁড়ো দুধ প্রতি কেজি ৩৪০ টাকা, পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৩২ টাকা, কাঁচামরিচ ৮০ টাকা, ডিম প্রতি হালি ১৮ টাকা, আদা প্রতি কেজি ১২০ টাকা, জিরা ২৫০ টাকা, গরুর মাংস প্রতি কেজি ১২০ টাকা, খাসির মাংস ২১০ টাকা, বিদ্যুত্ ইউনিট ৩ টাকা, পানি হাজার লিটার ৫ টাকা, গ্যাস ১ বার্নার ৩৫০ টাকা, ২ বার্নার ৪০০ টাকা, ডিজেল প্রতি লিটার ৩০ টাকা, কেরোসিন প্রতি কেজি ৩২ টাকা, পেট্রল প্রতি লিটার ৪২ টাকা। এই ভাষণে তিনি ১৬ দফার একটি প্রস্তাবনাও দিয়েছিলেন। অর্থাত্ হিসাব অনুযায়ী নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর আগে তিনি ভাষণটি দেন। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হলে তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণটির এক বছর পর নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল।

লগি-বৈঠার আন্দোলনের ফসল জরুরি অবস্থার সরকার এসে নির্বাচন ২ বছর পিছিয়ে দেয়। সেদিনের ভাষণের পরের দিন কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত শিরোনাম এখানে উল্লেখ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে। ১১ অক্টোবর ২০০৫ দৈনিক প্রথম আলোর শিরোনাম—‘নির্বাচন সামনে রেখে ১৬ দফা প্রতিশ্রুতি শেখ হাসিনার’। ভাষণে তিনি চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে লাগামহীন উল্লেখ করেন এবং এর জন্য সরকারের ভেতরে সিন্ডিকেট রয়েছে বলে দাবি করেন। এই ভাষণ ছাড়াও তিনি একাধিক বক্তব্যে বলেছেন, চারদলীয় জোট সরকারের ভেতরে সিন্ডিকেটের কারণেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে।

এছাড়াও বলতেন, হাওয়া ভবনে কমিশন দিতে হয়। কমিশন দেয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এই উক্তিগুলো ছিল কমন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের মাত্র আড়াই বছর পার হয়েছে। চার বছর হতে এখন আরও ১৮ মাস বাকি।

তাতেই জিনিসপত্রের দাম কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। আড়াই বছরে বাড়ি ভাড়া বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ। রিকশায় যারা চলতেন তারা এখন হাঁটেন। বাস ভাড়াও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। সে তুলনায় সীমিত আয়ের মানুষের উপার্জন কিছুই বাড়েনি।

৩৫ লাখ লোক শেয়ারবাজারে নতুন করে ফতুর হয়েছেন। তাদের অবস্থা কী হবে সেটা বোঝার জন্য বর্তমান বাজারের একটি মূল্য তালিকা তুলে ধরলাম। এখন প্রতি কেজি মোটা চালের সর্বনিম্ন মূল্য হচ্ছে ৩৩ টাকা। প্রতি কেজি চিনির দাম ৬৯ টাকা, সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১২৫ টাকা, অকটেন প্রতি লিটার ৭৯ টাকা, পেট্রল প্রতি লিটার ৭৭ টাকা, ডিজেল প্রতি লিটার ৪৭ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ১১৫ টাকা, গরুর মাংস প্রতি কেজি ২৫০ টাকা, খাসির মাংস ৩৫০ টাকা। আর মাছের কাছে তো সীমিত আয়ের মানুষের যাওয়ারই কোনো উপায় নেই।

সাধারণ পুঁটি মাছও এখন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। যারা নানাভাবে দেশের খেটে খাওয়া মানুষকে চুষছেন, কেবল তারাই নিয়মিত মাছ-মাংসের বাজারে যেতে পারেন। প্রতিটি পণ্যের দামই এই অনুপাতে বেড়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন—এখন যদি আপনি বিরোধী দলে থাকতেন এটাকে কী বলতেন? আমরা যারা তখন আপনার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছি এবং মনে রেখেছি—এখন আপনার কাছে প্রশ্ন, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী কোন সিন্ডিকেট? বর্তমানে কমিশনটা কোথায় যায়? মূল্যবৃদ্ধির কমিশন এখন কাদের অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে। বিরোধী দলে থাকতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পণ্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য সিন্ডিকেট ও হাওয়া ভবনকে জড়িয়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ করতে করতে মুখে ফেনা তুলেছেন।

শুধু দেশের ভেতরে নয়, বিদেশে গিয়েও তিনি একই কথা বলতেন। ২০০৪ সালের ২৬ অক্টাৈবর আমেরিকার নিউইয়র্কে এক সমাবেশে তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, হাওয়া ভবনে চাঁদা না দিলে কোনো ব্যবসা করা যায় না। পরের দিন বর্তমানে কট্টর আওয়ামী সমর্থক পত্রিকা দৈনিক ইনকিলাবের শিরোনাম ছিল ‘হাওয়া ভবনে চাঁদা না দিলে কোন ব্যবসা করা যায় না’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন কিসের ভিত্তিতে এত গুরুতর অভিযোগ তত্কালীন সরকারের বিরুদ্ধে করেছিলেন? এখনও দাম বাড়ছে। ২০০৫ সালে আওয়ামী লীগের তৈরি মূল্য তালিকা ও বর্তমান বাজার দরের ক্ষুদ্র একটি চিত্র দেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোন চশমা দিয়ে বর্তমান মূল্য তালিকার বিচার করবেন। এখন কাদের তিনি দায়ী করবেন। তাহলে কি শুধু রাজনীতির জন্য এসব কথা তিনি তখন বলেছিলেন? দেশের মানুষকে বোকা ভেবে তখন এসব বক্তব্য দিয়ে ধোঁকা দিয়েছেন! বরং ইদানীং উল্টো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় জিনিসপত্রের দাম কমই রয়েছে। চারদলীয় জোট সরকারের সময়ও আন্তর্জাতিক বাজার ছিল। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেল ও চিনির দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল।

অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। সাইফুর রহমানের এই বক্তব্য নিয়েও মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী বিরূপ মন্তব্য এবং নানা ঠাট্টা করেছিলেন। ২০০৪ সালের ১৭ অক্টোবর এক বক্তব্যে তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য বাণিজ্যমন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। অনুভব করা যায় তিনি বিরোধী দলে থাকার সময় পণ্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন ছিলেন। এই উদ্বেগের জন্য আমরা জনগণ তখন তাকে সাধুবাদ জানিয়েছি।

বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির জন্য তাকে কোন ভাষায় ধন্যবাদ জানাব সেটা বুঝতে পারছি না। শুধু পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়, আমেরিকান ডলারের দাম বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে এক বক্তব্যে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে দায়ী করে বলেছিলেন, লুটপাটের টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে বলেই ডলারের দাম বাড়ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দয়া করে বলবেন কি, বর্তমান বিশ্বে সব দেশে ডলারের দাম কমলেও বাংলাদেশে অব্যাহতভাবে বাড়ছে কেন? ব্যাংকে টাকার সঙ্কট কেন? এখন কারা বিদেশে টাকা পাচার করছে? শুধু রাজনীতি করার জন্য ভালো ভালো কথা আমরা আর শুনতে চাই না। প্রত্যেকে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষে রাজনীতি করবেন—এটাই সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.