আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আওয়ামীলীগের মাথায় বিএনপির ভূত

এক সময় বিএনপি তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির ঘোর বিরোধী ছিল। আজ ক্ষমতাসীন মহাজোট তত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বিএনপির মতই আপোশহীন। বড় বিচিত্র এদেশের রাজনীতি। জন কল্যাণ এখানে মুখ্য নয় মোক্ষ লাভের একটি উপলক্ষ মাত্র। ক্ষমতাসীন হবার জন্য জনপ্রিয়তা বড় কোন নিয়ামক নয়, যিনি জনতাকে যতবেশি ব্যবহার করতে পারেন তিনিই সরকারে গিয়ে সর খান।

তাহলে রাজনীতিকদের কাজ টা কী? রাজনীতিবিদরা স্বপ্ন প্রদর্শক। এদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে বলেই নেতারা তাদের স্বপ্ন দেখান। দু:খী এসব মানুষের স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া নয়। দু'বেলা পেট ভরে ভাত খাওয়া তাদের প্রিয় স্বপ্ন কল্প। এই ভাত খাবার আশাতেই তারা নিশ্চিন্তে ভোট দিতে চায়।

ভোট কোন পদ্ধতিতে হবে সে বিষয়ে তারা ততক্ষণ মাথা ঘামায় না যতক্ষণ সুন্দর কোন স্বপ্ন দৃশ্য তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এই জনতা কখনও স্বৈরাচারি শাসকের চটকদারিতে চমতকৃত হয়, কখনও গণতন্ত্রীদের নতুন কোন আব্দারে আপ্লুত হয়। আমার বিচারে এরকমই একটি আব্দার ছিল তত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মূলা। এই ফর্মুলায় আমদের রাজনীতিবিদদের পারষ্পারিক আস্থার দীনতা পরিষ্ফূট হয়েছে। নিজেদের প্রতি আস্থা না থাকুক জনগণকে তারা বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে দেশে রাজনীতিবিদরা ছাড়াও ভালো লোক আছে যাদের উপর ভরসা করা যায়।

দেশের কর্ণধারদের কর্ণ ধরার কথা এর আগে মানুষের মাথায় আসেনি। তাদের দেখানো পথে অসাংবিধানিক একটি শক্তি জনতাকে সাথে নিয়ে তাও করে দেখিয়েছে। হালের তত্বাবধায়ক প্রেমিরা বিষয়টিকে কলসীর কানা হিসাবে মেনে নিয়েছেন। অন্যদিকে যারা দীর্ঘদিন সংসদ বর্জন করে, ডানে যুদ্ধাপরাধী বামে স্বৈরাচার নিয়ে হরতাল হাঙ্গামার দামামা বাজিয়ে তত্বাবধায়ক সরকারকে বরণ করেছিলেন তারা এখন ঘটক বিদায়ের তত্ব তালাসে ব্যস্ত। জনগণ আগের মতই আতঙ্কিত, ভীত এবং দ্বিধাগ্রস্থ।

অনেকে বাংলাদেশের তাবৎ সমস্যা সমাধানের জন্যে দুই নেত্রীর এক টেবিলে বসার উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আমার কাছে এই আরোপিত বিষয় তত গুরত্বপূর্ণ নয়। কর্ম পদ্ধতির মিলের জন্যে তারা ক্ষমতায় গেলে একই ভাষায কথা বলেন। ক্ষমতার বাইরেও তার ব্যতিক্রম কিছু হয় না। বিরোধী দলে থাকার সময় দু'জনেরই ই অসাংবিধানিক সরকারের প্রতি পক্ষ পাতিত্ব থাকে আর সরকারে থাকার সময় হন সংবিধানের রক্ষাকর্তা।

তখন মনে হয় জনগনের জন্যে সংবিধান নয় সংবিধানের জন্যে জনগণ্। এর ব্যতিক্রম শুধু একবারই হয়ে ছিল, ১৯৯০ সালে। বাজনৈতিক দলগুলির যুগপৎ আন্দোলনের তীব্রতায় এরশাদের পতন হয়। আন্দোলনকারী দলগুলি রাষ্ট্রপরিচালনার ধারাবাহিকতা রক্ষা ও একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশায় বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মনোনিত করেন। এরাপর সর্বদলীয় উদ্যোগে আঠার জন উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়।

নির্বাচনী তোড় জোড় শুরু হতেই রাজনৈতিক দলগুলির অসবর্ণ প্রেমের ছ্ন্দ পতন ঘটে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতারোহনের জন্যে প্রস্তুত থাকলেও সব হিসাব নিকাশ উল্টে দিয়ে ক্ষমতায় বসে বিএনপি। সে বারের নির্বাচনে কারচুপির কথা তেমন ভাবে শোনা যায়নি । সে সময়ের বিরোধী দল সুক্ষ কারচুপির অভিযোগ তুললেও জনমনে তার প্রভাব পড়েনি। ১৯৯১ এর ডিসেম্বরে জামায়াতী ইসলাম বাংলাদেশ, বেসরকারী বিল হিসাবে তত্বাবধায়ক সরকারের রুপরেখা সংসদে উপস্থাপন করে।

পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে আওয়ামীলীগ এবং সে বছরই নভেম্বর মাসে জাতীয়পার্টি সংসদে তত্বাবধায়ক সরকার বিল উপস্থাপন করে। প্রথম দু'বছর দেশে মোটামুটি শান্তি থাকায়, বিএনপির আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। নেতারা নিজেদের ভাগ্যবিধাতা ভাবতে শুরু করেন,সাধারণের সাথে দুরত্ব বেড়ে যায়। এরই পরিণতিতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশণ নির্বাচনে মেয়র হানিফের কাছে ধরাশায়ী হন বিএনপি প্রার্থী। এই একটি ঘটনা বিরোধী দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।

ভোটের অধিকারের জন্যে বিরোধী জোটের আন্দোলন গণমানুষকেও প্রভাবিত করতে শুরু করে। বিএনপি তখন গণ বিচ্ছিন্ন, এসব আন্দোলন আপোষহীন নেতৃকে বিচলিত করেনি। এরই মধ্যে মাগুরায় উপনির্বাচনের দিন চলে আসে। আওয়ামী লীগের ত্যাগি নেতা আসাদুজ্জামানের মৃত্যুতে আসনটি শুণ্য হওয়ায়, আওয়ামীলীগের কাছে আসনটি গুরুত্ব পূর্ণ ছিল। এই আসনের জয়পরাজয বিএনপির কাছে তেমন গুরুত্ববহ না হলেও এই আসনে একটি সুষ্ঠু নির্বচন সরকারের জন্যে ছিল জরুরী।

ভোটযুদ্ধে নবাগত ইকোনো কলমের মালিক বিএনপির সেলিমুল হকের কাছে এ আসনটি ছিল অমূল্য আর তিনি বিনিয়োগও করেছিলেন বিশাল। শেষ পর্যন্ত ব্যবসার কাছে রাজনীতি পরাস্ত হয়। নির্বাচন কমিশন হারায় বিশ্বাস যোগ্যতা আর সরকার হারায় জন সমর্থণ। বিরোধী দল সমূহের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ। বেগম জিয়া যেদিন বললেন একমাত্র শিশূ এবং পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ হতে পারে না।

বিরোধী দল বরাবরের মত তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবের কথা জনগণকে মনে করিয়ে দিতে থাকলেন। হুমায়ুন আহমেদ ছাড়া অন্য সব তথাকথিত নির্দলীয় বুদ্ধিজীবিরাও তত্ব্বাবধায়েক সরকার ব্যবস্থার সুফল নিয়ে লেখা শুরু করলেন। শুধু হুমায়ুন আহমেদ লিখলেন এরকম একটি উদ্ভট ব্যবস্থাকে যদিও তিনি সমর্থণ করেন না তবুও দেশের স্বার্থে, দেশের শান্তি ফিরিয়ে আনার স্বার্থে সরকারের উচিৎ বিরোধী দলের দাবী আপাতত: মেনে নেয়। " বলাই বাহুল্য এ ধরণের সদুপদেশ সরকারের পছন্দ হয়নি। তাঁরা যথারিতী ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার ঘোষণা দিতে থাকলেন।

১৯৯৪ ডিসেম্বরে বিরোধী দলের এমপিরা একযোগে পদত্যাগ করায়, সংসদ কার্যকরীতা হারায়। বিরোধী দল ক্রমাগত হরতাল অবরোধ করে দেশ অচল করে দেয়। সে হরতালগুলির কোন কোনটির স্থায়ীত্ব ৭২ ঘন্টা অতিক্রম করেছিল। একটি হরতাল ছিল ৯৬ ঘন্টার। আমাদের প্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়া একটি ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে আলাদা।

কোন বিষয় ভালোভাবে না বুঝে তিনি কাজে নামেন না। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথা বুঝতে বুঝতে ৯৪টি হরতাল পার হয়ে গেল। তিনি পদত্যাগ করে পৃণ: নির্বাচন দিলেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর সে নির্বাচন আমাদের দু'দুটি জিনিষ উপহার দিয়েছিল। এই নির্বাচনের আগে বা পরে যারা কোন দিন এমপি হবার সুযোগ পেতেন না এরকম কজন এমপি আর তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা।

১৯৯৬ সালের ২৬শে মার্চ তত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ হবার সাথে সাথে সারা দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায। আজ যে সব বুদ্ধিজীবি তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির সীমাবদ্ধতার কথা জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্যে প্রাণান্ত পরিশ্রম করছেন তারাই সেদিন তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিশ্ব সেরা হিসাবে সার্টিফিকেট দিয়ে ছিলেন। বুদ্ধিজীবি এবং তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরা ১৯৯৬ সালের সংসদকে স্বীকৃতি দিতে চান না। অথচ ওই সংসদে পাশ হওয়া আইন দ্বারা পরিচালিত নির্বচনে অংশ নেন। এ ধরণের বৈপরিত্য আমাদের রাজনীতির সর্বত্র।

দেশের বারো কোটি মানুষের আন্দোলনের সাফল্য কিভাবে একজন বিচারকের কয়েকঘন্টার বিবেচনায় ব্যর্থতায় পরিনত হয় ভেবে বিচলিত হই। একপক্ষ তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ১৯৯৩-৯৪ এর আলোকে দেখতে ভালোবাসে। তারা বলেন সে সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থায় ত্রুটি ছিল। সঠিক ভোটার তালিকা ছিলনা। জাতীয় পরিচয় পত্র চালু হয়নি।

সে সময়ের নিরিখে অবশ্যই তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ভালো ছিল। তারা মাত্র দু'ই একটি নির্বাচন এই পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার কথা বলেছিলেন। তাদের এই বিবৃতি সম্পূর্ণ সত্য নয়। তখন তারা এই পদ্ধাতিকে বিশ্ব সেরা বলে গর্ব করেছিলেন। কেউ কেউ এক কাঠি এগিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রও আমাদের পদ্ধতিকে অনুসরণ করতে যাচ্ছে।

ইউএন ডিপির একজরিপ মতে একদিনের হরতালে বাংলাদেশে ক্ষতির পরিমান হয় ৫২০ কোটি ঠাকার সমান। সেই হিসাবে তত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্যে পালিত হরতালে হতাহত হয়েছে অসংখ্য মানুষ আর আর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি যা সে সমযের এক বছরের বাজেটের সমান। বুদ্ধিজীবিরা এখন যে ভাবে তত্বাবধায়ক ব্যবস্থার খুত ধরছেন তাতে ভেবে কষ্ট পাচ্ছি কত তুচ্ছতার জন্যে কত বড় খেসারত দিতে হয়েছে আমাদের। আমাদের নেতা নেত্রীরা যদি সহয অংকটি বুঝতে পারতেন তাহলে দেশ অনেক বড় ক্ষতি থেকে বেচে যেত। আমাদের প্রধান দুই নেত্রীর সবচেয়ে বড় অমিল পার্সেপশনে।

এক নেত্রী নিমিষেই সব বুঝে যান এবং কোন রাখ ঢাক না করে বলেও দেন মনের কথা। অন্যরা ভাবে আমারও ছিল মনে..। আর একজন বুঝতে সময় একটু বেশি নেন বটে তবে যা বোঝেন তা শক্ত করেই বোঝেন। তত্বাবধায়ক তত্বটি তিনি এখন শুধু মেনেই নেন নি মনেও নিয়েছেন। আজ আওয়ামীলীগ যখন তার তত্বে বিশ্বাস এনেছে ( নিরপেক্ষতা ভ্রান্ত ধারণা মাত্র, শিশু ও পাগল ছাড়া নিরপেক্ষ নাই) তখন তিনি নিজেই বিভ্রান্ত।

এর পর আবার অন্য কোন তত্ব বাজারে আসে কিনা বলা মুশকিল। এ প্রসঙ্গে বিসিএস ক্যাডারের এক বন্ধুর কথা মনে পড়ছে। প্রশিক্ষণের সময় তাদের বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমিতে কিছূদিন ট্রেনিং করতে হয়েছিল্। ড্রিলের সারি বেধে একটি পর্যায়ে ডানে ঘোর , বায়ে ঘোর ইত্যাদি করতে হত। ড্রিল শেখানোর ওস্তাদটি সম্ভবত রিফ্লেক্স একশন বাড়ানোর জন্যে একবার ডানে ঘোর একবার বায়ে ঘোর বলে পাগল করে দিচ্ছিল সকলকে।

আমার বন্ধুটি হঠাৎ করে দাঁডিয়ে পড়ায় ড্রিল শিক্ষক তেডে আসেন বলেন দাঁড়িয়ে আছেন কেন সাহেব? বন্ধু উত্তরে বলেন ডানে ঘুরবো না বামে ঘুরবো আগে ঠিক করে নেন। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.