আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

সংস্কৃতির সংস্কারে ‘নেমন্তন্ন’

কবি হওয়ার ভান করি, উদাস হই; ভালোবাসার মাহাত্ব খূঁজি

রাশেদুল হাসান অনুশীলন দ্বারা লব্ধ বিদ্যাবুদ্ধি রীতি-নীতি ইত্যাদির উৎকর্ষ অথবা সভ্যতাজনিত উৎকর্ষ বৃদ্ধিকেই সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংস্কৃতি সত্যিই সভ্যতার উৎকর্ষতা বাড়ায়। সভ্যতাকে সভ্য হিসেবে চিহ্নিত করে। বলতে গেলে সংস্কৃতিই সভ্যতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। একটি জাতি বা গোষ্ঠির মধ্যে লব্ধ বিদ্যাবুদ্ধি, রীতি-নীতি যদি সফলভাবে অনুশীলন করা হয় তবে সংস্কৃতির উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায় বাড়ে সভ্যতার উৎকর্ষতাও।

লব্ধ বিদ্যাবুদ্ধিই সংস্কৃতির সংস্কার করে। এ সংস্কার উন্নয়নের, অগ্রগতির, সফলতার, মাথা নোয়াবার নয়। সংস্কার সত্যকে ধারণ করার, সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার। প্রত্যেক জাতি বা গোষ্ঠির একটি নিজস্ব সংস্কৃতি বা কালচার রয়েছে। সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি জাতি বা গোষ্ঠিকে চেনা ও জানা যায়।

সংস্কৃতি জাতি বা গোষ্ঠির স্বপ্ন-আশা ও আবেগ-অনুভূতি ফেরি করে। সংস্কৃতি ভাব-ভাষা ও বৈচিত্রতা প্রকাশ করে। নতুনত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কস্তুরিটা দেশ থেকে দেশান্তরিত হয় এ সংস্কৃতির মাধ্যমে। আমরা সকলেই সংস্কৃতির চর্চা চাই, উন্নতি চাই, সভ্যতার অগ্রগতির চাই, সংস্কৃতির সংস্কার চাই। একবিংশ শতাব্দির এ অংশে এসে সংস্কৃতির উৎকর্ষ বা অধঃপতনের মনভোলানো যুক্তি তর্কে যেতে চাইনা।

সংস্কৃতির অধঃপতনের ধোঁয়া তুলে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবিদের মায়াকান্না তো আর কম দেখা হলো না। আবার এসব বুদ্ধিজীবিরাই ধর্ষকের হাতে তুলে দেয় সংস্কৃতিকে। আরেক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবির অবস্থা ‘বিহাই-ইতো হ্যায়, দেখে বিহ্যায় কা করে’ মত। সংস্কৃতির প্রতি এ ঐদাসীন্যতা সত্যিই অবাক করে। স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে ভাবতে সত্যিই কষ্ট হয়।

যারা পথ দেখায় তারাই থেকে যায় অন্ধকারে। যারা অন্ধকারের কীট রাতভর চুরি করে সকালে হাতেমতাই সাজেন তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু যারা ‘দেখি বিয়াই কি করে’, ‘দেখি বিয়াই কি করে’ বলে সর্বস্ব খোয়ান তাদের কি বলি! আর কত কাল দেখবো বিয়াই কি করে! একটি গল্পের মাধ্যমেই বোঝার চেষ্টা করি আসলে এসব বিয়াইরা কি করে। বিহার অঞ্চলের একটি বহুল প্রচারিত দেহাতী গল্প এটি। এক মহিলা বিছানায় শুয়ে দেখছিলো-বিহাই উঠানে এলো, তারপর ঘরের দুয়ারে এল, ঘরে ঢুকে বিছানায় এসে বসলো-এক সময় শুয়েও পড়লো তার পাশে।

মহিলা ভাবতে লাগলো ‘বিহাই ইতো হ্যায়, দেখে বিহ্যায় কা করে!’ তারপর বিহাই যখন বেরিয়ে চলে গেল, তখন মহিলার খেয়াল হল ‘আরে সাতিয়াতো নাশ হো গায়া। ’ সংস্কৃতির বিহাইরা এক সময় সংস্কৃতির সাতিয়া নাশ করে চলে যাবে। তখন দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। সংস্কৃতির সাতিয়া নাশ করার জন্য এক শ্রেণীর বিহাইদের আনাগোনা বেশ লক্ষণীয়। আর এ সব বিহাইদের ঘরে ঢোকানোর জন্য আরেক শ্রেণীর দালালরাও বেশ সক্রিয়।

আমরা অনেক কিছু হারাই নি। হারাতে বসেছি। একটু সাবধান হলে, আরেকটু সতর্ক হলে কোন ভয় থাকতো না। কিন্তু আমরা সতর্ক হই না। আমরা শিক্ষা নেই না ইতিহাস থেকে।

আমরা জাতে ওঠার জন্য ড্যান্স পার্টির আয়োজন করি। শিল্পী আমদানী করি চড়া মূল্যে। ‘আমরা বিদেশী কুকুর ধরি স্বদেশী ঠাকুর ফেলিয়া। ’ আমাদের জারি-সারি ও লালনগীতিকে আমরা সেকেলে মনে করি। পুঁথি-লোকগীতির প্রতি কোন প্রীতি আর দেখা যায় না।

‘আমরা মজেছি ভাই দাদার মাজারে। ’ মজায় দোষ নেই কিন্তু অতি শব্দটা যোগ হলেই বিপত্তি বাঁধে। সীমালঙ্ঘন হলে তো দোষ হবেই। কিন্তু সীমালঙ্ঘনই আমাদের ব্যাধি হয়ে দাড়াচ্ছে। সংস্কৃতির সংস্কার হয় আদান-প্রদানের মাধ্যমে।

স্বীয় সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সভ্যতার উৎকর্ষতা সম্ভব। কিন্তু অসামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চয়ই সভ্যতার উন্নতি সম্ভব নয়। কিন্তু সে ব্যর্থ চেষ্টাই করছে এক শ্রেণীর সংস্কৃতি সেবীর শ্রদ্ধাবরণে ঢাকা দালালচক্র। এরা সংস্কৃতির উন্নয়নের নামে সংস্কৃতির বিকৃতিতে মত্ত। আমরা অস্বীকার করি না যে, শিল্প-সংস্কৃতিকে অবরুদ্ধ করে রাখা যায় না।

শিকলবদ্ধ করার ক্ষমতা আছে বলেও বিশ্বাস হয় না। শিল্প-সংস্কৃতির লেনদেনে স¤প্রীতির বন্ধনই শুধু দৃঢ় হয় না। পরস্পরকে চেনা জানার কাজটিও হয়ে যায়। স্বাধীনতার চার দশক চেনা জানার পরও ষোল আনাই চেনার বাকী থেকে যায়। এদেশে সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ে কোন সভা-সেমিনারে পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেকেই আমন্ত্রিত হন।

একুশে বই মেলায় অনেকেই আসেন। ভারতীয় লেখকদের বই প্রকাশ হয় প্রচুর। কিন্তু কলকাতার বই মেলায় বাংলাদেশী ক’জন লেখকের বই প্রকাশ হয় এর খোঁজ ক’জন রাখেন। স¤প্রতি কলকাতার লেখক শিল্পীদের ‘নেমন্তন্ন’ অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বাদ যাননি বিউটিশিয়ান, নরসুন্দর (নাপিত) পর্যন্তও।

প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ‘কারিগরি শিক্ষা’ বিতরণ করে গেছেন। বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী বা বিভিন্ন ইভেন্ট ম্যানেজারের উদ্যোগে অভিজাত হোটেল কিংবা ক্লাব অথবা ব্যয় বহুল আর্ন্তজাতিক মানের মিলনায়তনে শতশত কনসার্টে অংশ নিচ্ছে ভারতীয় শিল্পীরা। মুম্বাইয়ের ‘আইটেম গাল’ নামে এক ধরনের নৃত্যপটিয়সীরা মঞ্চ কাঁপান। অন্তরে আগুন ধরিয়ে দেন চড়ামূল্যে। এসব শিল্পীর কেউ কেউ নাকি সম্মানী বাবদ কোটি টাকা বা তারও বেশী পেয়ে থাকেন।

চার-পাঁচ-হাজার টাকার বিনিময়ে শিল্প-সংস্কৃতি ভোক্তারা ভোগ করেন নভ্যসংস্কৃতি। স¤প্রতি বেশ হইচই পড়ে গেছে বলিউড তারকা কিং খান বাংলাদেশে আসছেন পঞ্চাশ সদস্যের সফরসঙ্গী নিয়ে। ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার অতি মাতামাতি দেখে লজ্জা লাগে। মনে শংকা জাগে সংস্কৃতির ভবিষ্যত নিয়ে। আমাদের বোঝা উচিত- শিল্পীরা যখন কোন দেশে যান তারা আর ব্যক্তিবিশেষ থাকেন না।

হয়ে পড়েন নিজ দেশের একজন প্রতিনিধি। সাংস্কৃতিক একজন দূত হিসেবে একজন শিল্পী অন্য দেশে যে প্রভাব বলয় তৈরী করতে পারেন কোন কূটনৈতিক প্রতিনিধির পক্ষে সম্ভব হয় না বলে বোদ্ধামহল মনে করেন। কূটনৈতিক প্রতিনিধির কর্মকান্ডে তার প্রতিনিধিত্বে দেশের স্বার্থ স্থূলভাবেই জড়িত থাকে এবং বিভিন্ন দিক বিবেচনায় একজন কূটনৈতিক প্রতিনিধির ‘জেনেভা কনভেনশন’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন। কিন্তু একজন সাংস্কৃতিক প্রতিনির্ধির ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়মনীতি ব্যতিত অন্য কোন বিধিনিষেধ থাকে না। সংস্কৃতির আদানে আমাদের প্রতিযোগীতা বেশ লক্ষণীয় কিন্তু প্রদানের বেলায় শূন্য ঝুলি! একজন সুনীল গঙ্গোপধ্যায়কে নিমন্ত্রণ করি অন্যজন ঢাকঢোল পিটিয়ে নিমন্ত্রণ করি শাহরুখকে।

কিন্তু আমাদের শামসুর রাহমান-আল মাহমুদ-কিংবা আবদুল হাদী-রুনা লায়লাদের নিমন্ত্রণের প্রতিযোগীতা দূরে থাক এদের এড়িয়ে যান অনেকেই। শিল্প সংস্কৃতির পশরা নিয়ে ভারতের প্রায় ত্রিশটি চ্যানেল বাংলাদেশে চলে। তাদের সংস্কৃতির সুধা পান করাতে মরিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের একটি চ্যানেলও ওপারে চলার অনুমতি নেই। এদেশের গান নাটককি ভারতের চেয়ে কম মানসম্পন্ন? কিন্তু পাঁচ-দশ-পনের এমনকি পঁচিশ হাজার টাকার টিকেটের বিনিময়ে সংস্কৃতি আদান প্রদান নাদানের নগ্ন দৃশ্য দেখি।

গল্পের বিয়াইন তো ‘সাতিয়া’ নাশ হওয়ার পরে বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু আমাদের সংস্কৃতির বিয়াইনরা টেরও পান না। আমন্ত্রণে আমার অসন্তোষ অথবা বিরোধী ভাবাটা ঠিক হবে না। কিন্তু এ আমন্ত্রণে কতটুকু লাভ আর ক্ষতি এর হিসাব কষা নিশ্চয়ই কারও অসন্তোষের কারণ হবে না। এ আমন্ত্রণ সংস্কৃতি চালু হয়েছিল স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে। জ্যামিতিক হারে এ আমন্ত্রণ বেড়েই চলছে।

এখন এ আমন্ত্রিতদের ভাব দেখে মনে হয় এদেশে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। এটা কেবলই কলকাতার একটা বাজার। আমরা বলে বেড়াই শিল্পের কোন সীমান্ত নেই, সাহিত্যের সীমারেখা অসীম, সঙ্গীতেরও সীমানা নেই। সীমানা না থাকাটাই উচিত কিন্তু এ সীমানা না থাকাটা একমুখী হওয়া কতটা উচিত বুদ্ধিমান পাঠকই বিচার করবে। এক পক্ষ সীমানা অতিক্রম করে স্বীয় সংস্কৃতির টোপ ফেলবে আর অপর পক্ষ চেয়ে চেয়ে দেখবে তাতো হতে পারে না।

হতে দেয়া উচিতও না। ওরা বিতরণ করে যান সংস্কৃতির অমিয় সুধা। আমরাও লুফে নিই হজম হোক আর না হোক। বৈধ- অবৈধ পন্থায় আমাদের সংস্কৃতিকে, কৃষ্টি কালচারকে গিলে পেলার প্রস্তুতি চলছে। চোখ বন্ধ করলেই বোঝা যায় তাদের সংস্কৃতি কেমন আছর করেছে আমাদের।

এর মাত্র একটি নজির পেশ করলেই সংস্কৃতির প্রতি আমাদের দরদ এবং আগমণের সংস্কৃতি থেকে আমাদের অর্জন স্পষ্ট হবে। স¤প্রতি দেশের প্রধান ধর্মীয় গবেষণালয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমামদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত নর্তকী দিয়ে অশ্লীল ব্যালে ড্যান্স পরিবেশন করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ফাউন্ডেশনের ডিজি নতর্কীদের করমদন করে সংস্কৃতির সংস্কারের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন! রাশেদুল হাসান সাব-এডিটর, দৈনিক ফেনীর সময়

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।