আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অবাস্তব পরাবাস্তববাদ (শেষ পর্ব)

www.choturmatrik.com/blogs/আকাশ-অম্বর
অবাস্তব পরাবাস্তববাদ (প্রথম পর্ব) ৪ তাঁর নাম ছিলো জঁ-পল সার্ত্র্‌। বিংশ শতাব্দীর এক ফরাসী অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, নাট্যকার, সাহিত্যিক এবং সমালোচক। তিনি হঠাৎ এখানে? তিনি কি একজন পরাবাস্তববাদী? মোটেই নন। বরং তিনি ছিলেন একজন বিদ্রোহী। তিনিই পরাবাস্তববাদ এবং সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবীক্ষণ (Psychoanalysis) এর বিপক্ষে প্রশ্ন তুলেছেন।

আপত্তি জানিয়েছেন। আপত্তি কেন? কারণ ঐ পরাবাস্তববাদ এবং মনোবীক্ষণ, দুটো ক্ষেত্রেই একরকম অনুমান/ধারণা করে নেয়া হয় অবচেতন/অচেতন মনের অস্তিত্ব। সার্ত্র্‌’র আপত্তি এখানেই যখন তিনি বলছেন, we have complete conscious access to all causes of our actions! যখন তিনি বলছেন, as humans, we are condemned to be free! সার্ত্র্‌’র চিন্তা কি ছিলো? চিন্তা! তার চেয়ে বলা ভালো, তিনি কি বলতে ‘পেরেছেন’? The Transcendence of the Ego-তে আমরা তার অস্তিত্ববাদী (existentialism) চিন্তার একটা রূপ ধরতে পারি বোধহয়। আচ্ছা, তার আগে সহজ কিছু কথা বলে নেই। দৃশ্যমান এই জগতের সবকিছুই আমরা কিভাবে দেখি? কিভাবে শুনি? কিভাবে অনুভব করি? চোখের কালার পিগমেন্ট? দৃশ্যমান আলোর এক টুকরো বর্ণালীর অংশ? চর্ম-স্পর্শ? কর্ণকুহরের ককলিয়া? ঘ্রাণ? জিহ্বা? এবং সর্বোপরি মস্তিষ্কে অনুরণন? হ্যাঁ, আমাদের মহান ইন্দ্রিয়সমূহ! আমরা ওদের বিশ্বাস করি! আমরা জানি ওরা প্রতারণা করতে পারে না! ওদের মাধ্যমেই জগত-প্রকৃতি বেঁচে থাকে আমাদের ভেতর।

নাকি দৃশ্যমান এই জগতটা বেঁচে আছে কারণ আমরা তাদের অনুভব করতে পারি বলে? থাক্‌! আর না এগোই... আমি কি? আমার ‘অস্তিত্ব’ (existence) কি? আমার ‘নির্যাস’ (essence) কি? জন্ম পরবর্তী সময়গুলোতে আমার চারপাশের মানুষ আমার উপর যে মুখোশ চাপিয়ে দিয়েছে, আমাকে যারা অনুধাবন করে তাদের জ্ঞানেন্দ্রিয় দিয়ে, যে জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলোর সাথে আমার কিছুই যায় আসে না; আমাকে যারা বিচার করে তাদের বিবেকবুদ্ধি দিয়ে, যে বিবেকবুদ্ধিগুলোর সাথে আমার কিছুই যায় আসে না, এগুলোই হচ্ছে আমার এসেন্স। আমার নির্যাস। আমার উপর চাপিয়ে দেয়া বিভ্রম। ওটাই আমার পরিচয়। কিন্তু, ওটা আমি নই।

আমি তাহলে সত্যিকারভাবে কি? আমার সত্যিকার অস্তিত্ব কোথায়? এটা আছে। ব্রোকাস্‌-এরিয়ার সীমাবদ্ধতায় এটা অবিবক্ষিত। কিন্তু এটাই আমি। অচিন পাখি! এটা একান্তই আমার কোয়ালিয়া। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের জন্যই এটা সত্য।

কী অদ্ভুত! নিজেকে আর কত গুরুত্বপূর্ণ ভাববে, হে মানব! কতটা আকর্ষণীয় করে তুলবে জগত-চক্ষুর সম্মুখে! জেনে রাখো তোমার অস্তিত্বের কাছে তুমি অগুরুত্বপূর্ণ, অনাকর্ষনীয়! তাই existence precedes essence। নির্যাসে ধরা দিয়ো না মানব! বুঝতে শেখো অস্তিত্ব! সার্ত্র্‌ তাই গুরুত্বপূর্ণ। এবার একটু অগ্রসর হওয়া যাক আর ধারণা করে নেয়া যাক যে নির্যাস ছাড়া বস্তু বা সত্তার যে সত্যিকারের গুণাবলী, যেটার অবস্থান হয়তো শুধুই মনের ভেতর, সর্বপ্রকার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার ঊর্ধ্বে, সেটাই বস্তুর পরম গুণাবলী। পরম ভাব। ধরে নিলাম এটার নাম Noumenon বা thing-in-itself! Noumenon is a posited object or event as it is in itself, independent of the senses. And the thing-in-itself is infinite and overflowing. সার্ত্র্‌’র কথা অনুযায়ী, Any direct consciousness of the thing-in-itself is a “pre-reflective consciousness”. Any attempt to describe, understand, historicize the thing-in-itself, is called "reflective consciousness." There is no way for the reflective consciousness to subsume the pre-reflective, and so reflection is fated to a form of anxiety. The reflective consciousness in all its forms, (scientific, artistic or otherwise) can only limit the thing-in-itself by virtue of its attempt to understand or describe it. It follows, therefore, that any attempt at self-knowledge is a construct that fails no matter how often it is attempted. Anxiety! উদ্বেগ।

অনিশ্চয়তাবোধ। আলোড়ন তুলতে পারে এখানে শব্দগুলো। উদ্বেগ কোত্থেকে আসছে? নাকি এটাই মানব-মন? এই anxiety কি মানব-মনের এক সার্বিক অবস্থা? বস্তু বা সত্তার যে সত্যিকারের গুণাবলী (Noumenon) সেটা ব্যাখ্যা করার প্রতিবন্ধকতা? বোঝার প্রতিবন্ধকতা? অন্তরালে ডুকরে কেঁদে মরে এই নীরব সত্তা? এটা কোন অচেনা চেতন-মন/আত্মপ্রকৃতি? আমার প্রাণের ’পরে চলে গেল কে বসন্তের বাতাসটুকুর মতো। সে যে ছুঁয়ে গেল, নুয়ে গেল রে– সে চলে গেল, বলে গেল না– সে কোথায় গেল ফিরে এল না। সে যেতে যেতে চেয়ে গেল, কী যেন গেয়ে গেল– কে সে? প্রেয়সী? কবিগুরুর জীবন-দেবতা? হৃদয় আমার আকুল হল, নয়ন আমার মুদে এল রে... কোথা দিয়ে কোথায় গেল সে... আমি কোথায় যাব, কোথায় যাব... আমি কোথায় যাব, কোথায় যাব... এই হাহাকার কিসের! এই উদ্বেগই বা কিসের! Anxiety? মানব-মনের চিরন্তন অবস্থা? সার্ত্র্‌’র কথা অনুযায়ী এটাই কি পরমকে জানার সেই আকুলতা যা সর্বাবস্থায় হাহাকারে পর্যবসিত? এটাই কি অবচেতন/অচেতন? অন্তরালের চিন্তা প্রকাশের চেষ্টা তাই কি শুধুই প্রচেষ্টায় পর্যবসিত? সার্ত্র্‌তো বলছেন, এই চেষ্টা কখনই তুলে ধরতে পারবে না সত্যিকারের সেই অধরা।

অবচেতন/অচেতন বলে তাই সত্যি কিছু আছে কি? নাকি চেতন মনের নীরব হাহাকারই হচ্ছে মানব-মনের সেই দশা! হুম! চেতন মনের নীরব আর্তনাদ হোক বা না হোক, কিংবা অস্তিত্ববাদী জঁ-পল সার্ত্র্‌ অস্বীকৃতি জানালেও প্রাচীন ভাগবত-পুরাণ/শ্রীমদ্ভাগবত হতে শুরু করে কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর কালেকটিভ আনকনশাসনেস বা যৌথ-অবচেতনার ধারণা পর্যন্ত কিন্তু অবচেতন/অচেতনকে আদৌ অস্তিত্বহীন বলা হচ্ছে না। এইসব প্রস্তাবনাসমূহে বরং স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে অবচেতন/অচেতনকে যা কিনা মানব-মনের এক উচ্চমাত্রার মহিমান্বিত পরিস্থিতি। শ্রীমদ্ভাগবতে সজ্ঞানতা/চেতনার তিনটি ধারণা আমরা পাই। জাগ্রত (awakened state), স্বপ্ন (dreaming state) এবং সুষুপ্তি (deep sleep)। শ্রীমদ্ভাগবতে (৬.৫.১২, ৭.৯.৩২) বলা হচ্ছে, এই তিনটি সচেতন মাত্রার উপরে আরও একটি মাত্রা বিদ্যমান যা কিনা বস্তুগত নয় মোটেই (non-material)।

এটা কি সচেতনের এক চরমাবস্থা, নাকি সার্বিক অ-সচেতনতা! যাই হোক, এই চতুর্থ মাত্রা বা তুর্য’ই হচ্ছে মানব-মনের সেই দশা যেখানে পরমের অবস্থান! আরও ‘স্পষ্ট’ করে বলতে গেলে, হ্যাঁ, the level where the Supreme Lord can be perceived! আদিম বৈদিক ধারণাতেও এই ‘pure consciousness’ এক বিমূর্ত, নির্বস্তুক, ভাবমূলক, নীরব, নির্বাক একীভূত ‘field of consciousness’ যা কিনা ক্রমবর্ধমানভাবে বিমূর্ত (increasingly abstract) এবং ব্যবহারিকভাবে অঙ্গীভূত (functionally integrated) মানসিক শক্তিস্তর। এই মুহূর্তে ফরাসী কবি-দার্শনিক পল ভ্যালেরির একটি উক্তি মনে হওয়ায় তা উল্লেখ না করে পারছিনা যখন তিনি বলছেন, কবিতার পংক্তিগুলো ঈশ্বর/প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট। ওগুলো অবতীর্ণ হয়। নাযেল হয়। আর বাকিটুকু কবিকেই স্ব-প্রণোদনায় আবিষ্কার করতে হয়! কী দারুণ কথা! তার মানে ঐ তাড়না কবিকে তার সৃষ্টিকর্মের এমনই এক স্তরে নিয়ে যায় যেখানে সজ্ঞান/সচেতন নয়, অচেতন/অবচেতনের গভীরতর অংশ হতে উদ্ভূত হয় স্বয়ংক্রিয় শব্দমালা! কবি নই বলে সত্যিকারভাবেই বলতে পারছি না কথাগুলো কতটুকু সত্যি, তবে স্থূল ‘অন্তর্জ্ঞান’ এক্ষেত্রে কিঞ্চিত সহায়ক বটে! আর কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং’এর কথাতেও খুঁজে পাই এই কথারই অনুরণন যখন তিনি বলছেন, সৃষ্টির উপকরণ আসে অবচেতনের অতল থেকে।

অবচেতনের ঐ স্তরেই কি তাই পরমের সান্নিধ্য! রহস্যময় মানুষের অপার মহিমান্বিত ঐ স্তরে বিচরণকারী কবি তাই স্রষ্টার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া এক সত্তা বটে! মানব-মনের এই enigmatic স্তর তাই ভাবিয়েছে শেক্সপিয়ার, স্পিনোজা, লেবনিজ, কিয়ের্কেগাদ, সোপেনহাওয়ার, নীৎসেদের। আর কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং অচেতন নিয়ে সেই কবি-দার্শনিকদের ধারণাগুলোকেই আরও সম্প্রসারিত করেছে। বলছেন, মানব-মনের এই অচেতন আসলে দুইটি অংশে বিভক্ত – personal unconscious আর collective unconscious। The personal unconscious is a reservoir of material that was once conscious but has been forgotten or suppressed আর collective unconscious is the deepest level of the psyche containing the accumulation of inherited psychic structures and archetypal experiences, expressed in humanity and all life forms with nervous systems, and describes how the structure of the psyche autonomously organizes experience অদ্ভুত শিরশিরানি কথা! Horripilation! যাই হোক! হাজার হাজার বছর আগের বেদ থেকে আজ পরাবাস্তববাদ পর্যন্ত এই অচেতন/অবচেতনের তাড়ণা হতে উদ্বুদ্ধ মানব-প্রজাতি সৃষ্ট শব্দ-তুলি-আঁচড় এক নিমেষেই উড়ে যেতে পারে কি! ব্যক্তি-মানুষের পারিপার্শ্বিকতার উপর এর প্রভাবকে অবমূল্যায়ন করবে কে? মানব-মনের নিজ স্বার্থেই অবচেতন/অচেতন প্রতিপালিত। তবে মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড যে পরাবাস্তববাদের অনুপ্রেরণা, তার প্রবর্তিত ধারণার বিপক্ষে এক প্রাজ্ঞ অস্তিত্ববাদী সার্ত্র্‌’র বিরোধিতায় তাই দুটো যুক্তিবাদী অনুসিদ্ধান্ত জরুরী – স্বয়ং অবচেতন/অচেতন (unconscious) অস্তিত্বহীন কিংবা অবচেতন/অচেতন চিন্তাশালা বা কার্যকলাপ (unconscious mental processes) অস্তিত্বহীন।

সার্ত্র্‌ কি দুটো ক্ষেত্রেই বিরোধিতা করেছিলেন? অযৌক্তিক শিল্পের প্রতিষ্ঠায় যুক্তিবাদী অভিগমন! হাস্য-উৎপত্তি নিরর্থক নয় মোটেই! ৫ তথ্যের সমৃদ্ধতা চিন্তার ব্যাপকতাকে বাড়ায়। আর তারপর মনুষ্য প্রবৃত্তির বশবর্তী না হলেই মুক্তি। জ্ঞানের নির্যাস মহা কাম্য বস্তু। তবে খুঁটিনাটী আনুপুঙ্খিক তথ্য এড়িয়ে চলাতেই সমৃদ্ধি। অন্যথায় বিক্ষিপ্তচিত্ত।

তাই ভারসাম্যতা এত গুরুত্বপূর্ণ! ভরশূন্য অবস্থা তাই অনাকাঙ্ক্ষিত! আবার বিক্ষিপ্তচিত্ত! কি হইতে কী! ডা ডা ডা! এক পশম-বণিকের সন্তান, "মনোবীক্ষণ" (Psychoanalysis) নামক মনোচিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবক, ‘অবচেতন’, ‘ফ্রয়েডিয় স্খলন’, ‘আত্মরক্ষন প্রক্রিয়া’ এবং ‘স্বপ্নের প্রতিকী মূল্যয়ন’ প্রভৃতি ধারণার প্রবর্তক/প্রসারক সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigismund Schlomo Freud) ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান মনস্তত্ববিদ। তিনি আরও অনেক কথাই বলেছেন, তবে সেগুলো এখানে মুখ্য নয়। আমরা এখানে শুধু একটু জানতে চাই ফ্রয়েড অবচেতন কিভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যে অবচেতন পরাবাস্তববাদীদের আরাধ্য বস্তু। ফ্রয়েড প্রস্তাব করছেন, মানব-মন আসলে সচেতন (conscious) ও অচেতন (unconscious) উপাদানসমূহ দ্বারাই গঠিত। ভালো কথা! কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে তিনি যখন বলছেন (এটা তিনি একাই বলেননি), যে কিছু কিছু মানসিক কার্যকলাপ (mental processes) নাকি আছে যেগুলো সম্পর্কে আমাদের ‘সচেতন মন’ সচেতন/অবহিত নয় মোটেই।

নিজ জীবদ্দশায় মানসিক গঠনপ্রনালী (structure of mind) নিয়ে ফ্রয়েড বেশ কিছু মতবাদ/তত্ত্ব দিয়েছেন। ভেঙেছেন। গড়েছেন। এদের মধ্যে কিছু কিছু মতবাদ সদৃশ হলেও, কিছু কিছুর মাঝে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দৃশ্যমান। যাই হোক।

যে দুটো ফ্রয়েডিয়ান মতবাদ আমাদের এখানে বিবেচনার জন্য আবশ্যক, সেগুলো হচ্ছে, ১) Freud’s earlier model of the mind that involves the structures of an unconscious (Ucs.), preconscious (Pcs.), consciousness (Cs.) and a censor. ২) Freud’s later model of the mind that includes the id, ego and super-ego. পূর্বের মডেল অনুযায়ী (General Introduction to Psychoanalysis, 1917) ফ্রয়েড মানব-মনকে কল্পনা করছেন দুটো ঘরের সাথে। পাশাপাশি। ঘর দুটোর মাঝখানে শুধু একটি দরজা। প্রথম ঘরেই (ante-room) অচেতনের (Ucs.) বসবাস। তার পাশের ছোট্ট ঘরেই (reception room) সচেতন (Cs.) সদা জাগ্রত! আর ঘর দুটোর মাঝের দরজায় দাঁড়িয়ে এক দ্বাররক্ষী (censor)! একাকী! সর্বপ্রকার মানসিক আন্দোলন, উত্তেজনা এই দ্বাররক্ষীর হাত দিয়েই তো যায়! সেই বাধা দেয় কিছু কিছু নির্বোধ আলোড়ন! পরিস্রুত করে কিছু।

কর্তন করে কিছু। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় সেইসব অনুভূতির (Pcs.) আর্তনাদ কে শোনে! সচেতন চক্ষুর দৃষ্টিগোচর হলেই এই preconscious পুরোপুরি consciousness-এ রূপান্তরিত হয় শুধু! আহ্‌! হ্যাঁ, অন্য ঘরে কি হচ্ছে? পরাবাস্তববাদীদের quest সেখানেই বুঝি! কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন আসতেই পারে। প্রশ্নটা ঐ দ্বাররক্ষীকে (censor) নিয়ে, তাই না! প্রশ্নটা আর কিছুই না। প্রশ্নটা হচ্ছে – দ্বাররক্ষী কি সচেতন মনের অংশ? উত্তর হতে পারে – না। সে সচেতন কক্ষে তো নয়! এবার পরবর্তী প্রশ্নটা নিশ্চয়ই হবে যে সচেতন মনের বাইরে থাকা ঐ দ্বাররক্ষীর প্রতিরোধ (resistance) স্পৃহা আসছে কোত্থেকে? মোটামুটি এইরকম আরেকটা প্রশ্ন করেছিলেন সার্ত্র্‌ - From what part of the mind does an unconscious resistance arise? ১৯২০ সালে এই মডেলের অন্য অনেক সমস্যার সাথে সাথে এই প্রশ্নটি হয়তো ফ্রয়েড নিজেই নিজেকেই করেছিলেন।

আর তাই হয়তো তার এই মডেল থেকে দূরে চলে গিয়েছিলেন তিনি। এটার পরিবর্তে তিনি বলতে থাকলেন id, ego আর super-ego’দের কথা। বলতে থাকলেন, The id is the blind, uncoordinated, instinctual drives. The ego is the organised part of the mind that attempts to integrate the drives of the id with external reality. The super-ego is the moral aspect of the mind; it can be thought of as the conscience. It is the critical part of the self that constantly evaluates itself, comparing itself with an ego ideal that develops according to social and cultural practices. এখানে শুধু একটা ব্যাপার একটু গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বের মডেলের সাথে কিছু মিল থাকলেও, id আর unconscious এবং ego আর conscious এক করে বোঝাননি সিগমুন্ড। কিন্তু ১৯৪৩ সালে সার্ত্র্‌ যখন তাঁর Being and Nothingness গ্রন্থে Freudian unconscious and psychoanalysis’এর বিপক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছেন, তখন কেন জানি তিনি ফ্রয়েডের আগের মডেলকেই বেছে নিয়েছেন।

যেমন তিনি বলছেন, In the psychological interpretation, for example, they use the hypothesis of a censor, conceived as a line of demarcation with customs, passport, division, currency control, etc., to re-establish the duality of the deceiver and the deceived. কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিভ্রান্তিকরভাবে, সার্ত্র্‌ id আর unconscious এবং ego আর conscious কে বোধহয় মিলিয়ে ফেলেছিলেন যখন তিনি বলছেন, By the distinction between the “id” and the “ego,” Freud has cut the psychic whole in two. I am the ego but I am not the id. I hold no privileged position in relation to my unconscious psyche. … I stand in relation to my “id” in the position of the Other. হুম। ফ্রয়েডের দুই-কক্ষ ধারণার ব্যাপারে সার্ত্র্‌ শুধু বলতে চাচ্ছেন, অবদমিত মানসিক উত্তেজনা (repressed mental excitation) গুলোর ব্যাপারে দ্বাররক্ষী এক স্ব-বিরোধী (paradox) অবস্থানে পর্যবসিত, কারণ, কোন এক নির্দিষ্ট মুহূর্তে সে অবশ্যই সচেতন সেগুলোর ব্যাপারে (কর্তন, ছেদন, সেন্সর), কিন্তু সেই মুহূর্তেই তাকে অসচেতন হতে হবে যেহেতু সে সচেতন কক্ষের অংশীদার নয়। অবচেতন বলে তাই কিছু নেই কারণ we have complete conscious access to all causes of our actions! সার্ত্র্‌ তাই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ফ্রয়েডের প্রথম অবচেতন মনের কাঠামো যেটা অবশ্য ফ্রয়েড স্বয়ং পরিত্যাগ করেছিলেন মোটামুটি বিশ বছর আগেই! সার্ত্র্‌ হয়তো ভেবেছিলেন, the concern is that thinking of a person as composed of person-like parts is circular and may involve problems of infinite regress! যাই হোক! কিন্তু শুধুমাত্র এক ফ্রয়েডিয়ান অবচেতন মনের (unconscious mind) কাঠামো প্রত্যাখ্যান করা মানে এই নয় যে অবচেতন/অচেতন কার্যকলাপ (unconscious mental processes) অস্তিত্বহীন। কারণ এই দুটো বস্তু একই নয়! সার্ত্র্‌ কি অবচেতন মনের কার্যকলাপও অস্তিত্বহীন বলছেন? আগের যুক্তি অনুযায়ী কিছুটা হলেও বোঝা যাচ্ছে যে সার্ত্র্‌ এটাই বলতে চাচ্ছেন যে - Both the repressed material and also the repressing agency must be conscious. This is because, the censor knows the repressed material, it is the repressor of the material, and that the censor is conscious of its own activity! তাই সার্ত্র্‌’র কথা অনুযায়ী এটা মেনে নেয়া খুবই কষ্টসাধ্য যে censor’এর কোন unconscious mechanism’ও থাকতে পারে না। এখান থেকে তাই এই ‘সিদ্ধান্তেই’ (!) হয়তো উপনীত হওয়া সম্ভব যে Sartre is undoubtedly making the stronger claim that there are no unconscious psychic processes।

পরাবাস্তববাদের ইশতিহারে মানব-অবচেতনের কোন কাঠামোর প্রতি অনুগত হওয়ার কথা উল্লেখ না থাকলেও, অবচেতন চিন্তাপ্রনালী/কার্যকলাপের অস্তিত্ব এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই শিল্পের জন্য। Sartre, thus, rejected the essential assumption of the surrealist doctrine as well! এখন কি? অবচেতনের থম্‌কে দাঁড়ালো কি কোথাও! মনের অতলে বিদ্যমান বিভ্রান্ত এই স্তর/সত্তা কি ইতস্তত ভ্রু-কুঁচ্‌কে এই কথাই বলছে না যে – Come on, O conscious rational people! da! Don’t you see Breton seemed more concerned with developing a way of living and an artistic methodology rather than examining in detail specific metaphysical and physical structures of the mind! তাই এত কথা কেন? এত আপত্তি কেন? এত বিভাজন কেন? শিল্পের জন্য কোন ‘ইজম’ প্রতিষ্ঠার দরকার আছে কি আদৌ? আদিম গুহা-গ্রাফিতি আর একবিংশ শতাব্দীর দেয়াল-গ্রাফিতি – দুটো কি একই নয়! আদিম মানুষের জৈবিক ক্ষুধা অতিক্রম করে সেপ্টাল-উচ্চমার্গীয় অন্নের যোগানদার এই শিল্পের কোন বিভাজন হতে পারে কি? শিল্পের কোন দল হতে পারে কি? পরাবাস্তব চিত্রাঙ্কন কি আদিম সেই গুহা-চিত্রের মধ্যেও বিনম্র হাসি হাসে না? রহস্যময় সময়ের ঔরসজাত এই শিল্পও তো এক পরম্পরা মাত্র। এর নেই কোন অতীত। নেই কোন বর্তমান। নেই কোন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য।

শুধু পরম্পরা। শুধু পরম্পরা। ৬ শেষ করার আগে শেষবারের মতন আরেকবার ফিরে যাওয়া যাক নিস্তব্ধ দুপুরের রঙচটা রোদের ফ্যাকাসে আলোয় ম্রিয়মাণ টেবিলের মৃত লেখার-খাতাটির উপর দীর্ঘশ্বাসে নিজের অজান্তে ছেড়ে দেয়া পেনসিলটার কাছে। পেনসিলটা ছেড়ে দিয়েছিলো অন্যমনস্ক ছেলেটি। সে হয়তো ভেবেছিলো ওটাই আজ লিখবে চেপে রাখা সব আর্তনাদ।

ওটাই বুঝি শোনাবে জান্তব সহজপ্রকৃতির আস্ফালন! পরাবাস্তববাদের ভাষায় এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত লেখনীকে বলা হচ্ছে automatic writing। হ্যাঁ, বলা হচ্ছে these writing materials does not come from the conscious thoughts of the writer! নীৎসে একসময় বলেছিলেন, the conscious subject is dependent on the existence of language! ভাষা! তার মানে কি দাঁড়ায়? শিশুরা কি conscious নয় যখন তাদের ভেতর ভাষা বিকাশ লাভ করে নি? হুম! আর যখন সার্ত্র্‌’র কথা অনুযায়ী বস্তু/সত্তার আদর্শ/পরম সেই অবস্থা ব্যাখ্যা/বোঝার প্রতিবন্ধকতার ফলস্বরূপ মানব-মনের যে উদ্বেগ সেটার কারণও কি এই ভাষার প্রতিবন্ধকতা? একটা সময় ছিলো (১৯১৩ সাল) যখন জন ওয়াটসনের মতন ‘চরমপন্থী’ ভাষাতাত্ত্বিকরা ভাবতেন যে thought processes are really motor habits in the larynx বা আমাদের বোধ-চিন্তা আর ভাষা একই। চরমপন্থী বলার কারণ কি? কারণ, ভাষা ব্যাপারটা কি এতটাই খেলো! হতেই পারে না! তাই যখন Lev Vygotsky’র মতন মনোবিদরা বলে উঠেন যে the flow of thought is not accompanied by a simultaneous unfolding of speech, তখন আমরা এই ভেবেই হয়তো স্বস্তি পাই যে কি যৌগিক আর দুর্বোধ্যই না আমরা! পরাবাস্তববাদে তাই যখন এই automatic writing’কে বেশ প্রভাবশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায় (কারণ ‘চিন্তাছাড়া’ এই লেখাই বুঝি সেই অবচেতন-কথন!), তখন আরেকটা প্রশ্ন আসতেই পারে, এই automatic writing আসলে কতটুকু automatic! ভাষাসংক্রান্ত চিন্তাভাবনায় আধুনিক ভাষাবিদ্যার ভিতটি গড়ে উঠেছে ফার্দিনান্দ সাস্যুর অবদানে। ফার্দিনান্দ সাস্যুর ভাষাকে দেখেছেন একটি স্বয়ংসম্পূর্ন পদ্ধতি হিসেবে। সাস্যুর বললেন, দুটি পৃথক বিষয়ের সঙ্গে শব্দের অর্থ জড়িত – Signified এবং Signifier।

সিগনিফায়ার হল যে কোনও ভাষার যে কোনও শব্দ। আর, সিগনিফায়েড হল সেই শব্দের সঙ্গে জড়িত বস্তু। যেমন, সিগনিফায়ার হল গাছ। আর, সিগনিফায়েড হল সত্যিকারের গাছ। সিগনিফায়ার দিয়ে ভাষা তৈরি হয়।

সিগনিফায়েড দিয়ে নয়। মানে সত্যিকারের বস্তু ভাষায় কোনওই কাজে আসে না। সাস্যুরের মতে, সিগনিফায়েড এবং সিগনিফায়ার-এর সম্পর্ক কখনেই সুস্থির বা ধ্রুব নয়! ভাষার প্রকাশে প্রকৃত ভাবখানি নাকি সবসময়ই থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে! (ওহ্‌ বুদ্ধ! ওহ্‌ তোমার শূন্যতাবোধ!) তাই লেখনীর নির্মাণকৌশল নিয়ে যখন বুঝতে যাই, তখন জানতে ইচ্ছে করে, বাক্যের গঠনে সচেতন মন নিষ্ক্রিয় হতে পারে কিনা, কারণ সচেতন মনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগেই বুঝি অবচেতন সক্রিয়! দেখা যাক্‌ ভাষাতাত্ত্বিকরা কি বলছেন বাক্যের গঠন নিয়ে! জার্মান মনোবিদ-দার্শনিক Wilhelm Wundt। ১৯১২ সালে তিনি বলছেন, “The sentence is not an image running with precision through consciousness, in which there is never more than a momentary word or sound, while what precedes and follows sinks away into nothingness. Rather, as long as it is being uttered, the sentence is present in consciousness as a whole entity.” হাহ! complete conscious access to all causes of our actions! Wundt এই ফাঁকে বলেই চলেছেন, “The sentence is both a simultaneous and a sequential structure. It is simultaneous, because at each moment it is present to consciousness in its totality, even though individual subordinate elements may occasionally disappear.” ওহ্‌! সার্ত্র্‌! আমেরিকান কবি Brewster Ghiselin আর তার বই The Creative Process (1955)। এই সুযোগে তিনিও বলে উঠলেন, “The words of the language, as they are written or spoken, do not seem to play any role in my mechanism of thought. The Physical entities which seem to serve as elements in thought are certain signs and more or less clear images which can be ‘voluntarily’ reproduced and combined.” Voluntarily! Out of your own free will! মনে পড়ছে, দস্তয়েভস্কি - a thought will not enter words! নিস্তব্ধ দুপুরের রঙচটা রোদের ফ্যাকাসে আলোয় ম্রিয়মাণ টেবিলের মৃত লেখার-খাতাটির উপর শুধু চেতন মনের দীর্ঘশ্বাস! ৭ ধন্যবাদ স্বপ্নকে, মৃত্যুর মানে আর রহস্যময় রইলো না আর, জীবনের মানে আর তেমন জরুরী নয় - পল এলুয়ার, কবি, পরাবাস্তববাদী।

৮ সাদা মৌমাছি, তুমি আমার ভিতরে গুনগুন কর- তুমি মধু পান করে মাতাল ধোঁওয়ার ধীর কুন্ডলীতে তুমি ঘুরে ঘুরে উড়ছ আমি দিশেহারা, প্রতিধ্বনিশূন্য শব্দ, সকলই হারিয়েছে যে- অথচ যার সকলই ছিল। সর্বশেষ বাঁধন, আমার আকাঙ্খায় তুমি তোল ঝড় আমার বিরানভূমিতে তুমিই সর্বশেষ গোলাপ। আহ্, তুমি কী নিশ্চুপ! তোমার গভীর চোখ বন্ধ কর। রাত্রি নামছে ওহ্, তোমার শরীর এক সুগন্ধী ভাস্কর্য, নগ্ন। তোমার গভীর চোখে রাত্রি নামে ফুলের শীতল হাত আর গোলাপের কোল।

সাদা শামুকের মতন তোমার স্তন তোমার নাভীর ওপর ছায়ার প্রজাপতিরা ঘুমাতে এসেছে। আহ্, তুমি কী নিশ্চুপ! এই নির্জনতায় তুমি নেই। বৃষ্টি ঝরছে। সমুদ্রবাতাস শঙ্খচিলদের তাড়িয়ে দিচ্ছে ভেজা রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটছে জল গাছের পাতারা বলছে ওদের শরীর খারাপ সাদা মৌমাছি, যখন তুমি আমার ভিতরে গুনগুন কর তুমি আবার সময়ে বাঁচ, তন্বি-নীরব। আহ্ তুমি কী নিশ্চুপ! কবি - পাবলো নেরুদা অনুবাদ - ইমন জুবায়ের _________________________ মূল তথ্যসূত্র : * বিংশ শতাব্দীর শিল্প-আন্দোলন - আবদুল মান্নান সৈয়দ * Sartre on the Freudian Unconscious and Surrealism - Glenn Mason-Riseborough * ‘আমরা কথা বলি না, ভাষা আমাদের ভিতর দিয়ে কথা বলে।

’ - ইমন জুবায়ের * Psycholinguistics (Second Edition) - Dan Issac Slobin
 

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ১১ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।