সবটাই চাই। তুমি নয় খানিকটাই দিও,তাও না পারো তো-কিছুই চাইনা। তবুও সবটাই চাইতে চাই। চাইতে দিও.. আগামী ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। এই বার্ষিকী পালনের জন্য নয়, সঠিক ইতিহাসের স্বার্থেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা স্মরণ করা দরকার।
এর কারণও ক্ষমতাসীনরাই তৈরি করে চলেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয়করণ নীতির বদৌলতে রাষ্ট্রের উচ্চতর প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসন গেড়ে বসা কোনো কোনো গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জিয়াউর রহমানকে শুধু বিতর্কিতই করা হচ্ছে না, তাকে কেন্দ্র করে ইতিহাসও বিকৃত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যেমন কোনো এক উপলক্ষে চিহ্নিতজনেরা বলেছেন, এরশাদ পেনাল কোডের ১২১ (ক), ১২৪ এবং ১২৪ (ক) ধারায় অপরাধ করেছেন এবং অপরাধের দায়ে তার বিচার হওয়া উচিত। এ পর্যন্ত এসে থেমে গেলে হয়তো কথা বাড়াতে হতো না। অন্যদিকে ওই বিশেষজনেরা অনেক পেছনে চলে গেছেন এবং নিজেদের মতো করে ইতিহাসের ব্যাখ্যা হাজির করেছেন।
তারা বলেছেন, দেশে প্রথম সামরিক শাসন জারির জন্য খন্দকার মোশতাক আহমদ ও জিয়াউর রহমান দায়ী। ‘মোশতাক-জিয়া চক্র’ সংবিধানকে নিম্ন মর্যাদায় ঠেলে দিয়েছিলেন। এজন্য তারাও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় এরশাদও একই অপরাধে অপরাধী হয়েছেন। জিয়াউর রহমান সংবিধানের মূলস্তম্ভ ভঙ্গ করেছিলেন।
এরশাদও জিয়ার পথ অনুসরণ করে এই ভঙ্গস্তম্ভ নিয়ে দেশ চালিয়ে গেছেন। ইতিহাসে আওয়ামী ধরনের ব্যাখ্যার পাশাপাশি অন্যকিছু বিষয়েও বিশেষজনেরা বক্তব্য রেখেছেন, যেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার। এখানে অবশ্য শুধু জিয়া প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকা হবে। তবে এটুকু না বললে অসম্পূর্ণ থাকবে যে, ‘ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে’ এরশাদের বিচার না হওয়ার পেছনে রয়েছে আওয়ামী লীগের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা।
লক্ষণীয় যে, চিহ্নিত ওই বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, জিয়াউর রহমান সংবিধানের মূলস্তম্ভ ভঙ্গ করেন, এরশাদ এই ভঙ্গস্তম্ভ নিয়ে দেশ শাসন করে গেছেন।
অন্যদিকে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস কিন্তু এমন ঢালাও মন্তব্যকে সমর্থন করে না। কারণ, বিশিষ্টজনেরাই আবার এ কথাও বলেছেন, ‘প্রথম সামরিক শাসন’ জারি করেছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। খন্দকার মোশতাক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বাকশাল মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য। অর্থাত্ সামরিক শাসন জারি এবং মুজিব-উত্তর ক্ষমতার রদবদলে জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। বাস্তবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত সিপাহী-জনতার যে বিপ্লব দেশের মানুষকে বাকশালসৃষ্ট শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছিল, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেছিলেন সেই বিপ্লবকেন্দ্রিক ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে।
প্রধান নেতা হিসেবে বেরিয়ে এলেও জিয়া ওই বিপ্লবের স্রষ্টা ছিলেন না। বাস্তবে ৭ নভেম্বরের সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছিল ছাত্র-জনতার সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর মিলিত প্রতিরোধ ও পদক্ষেপের ফলে। বহুদিন পর এদেশের ছাত্র-জনতা ও সশস্ত্র বাহিনীর সে ঐক্য প্রমাণ করেছিল, দেশ ও জাতির যে কোনো দুঃসময়ে দেশপ্রেমিকরা ঐক্যবদ্ধ হন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ-বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এজন্য তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকে সিদ্ধান্ত বা আহ্বানের অপেক্ষা করেন না। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও নিজেদের তাগিদেই তারা ঐক্যবদ্ধভাবে পা বাড়িয়েছিলেন বলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করা এবং বাংলাদেশকে দেশ বিশেষের পদানত করে ফেলা সম্ভব হয়নি।
চিহ্নিতজনেরা পাশ কাটালেও ইতিহাসের সত্য হলো, সবকিছুর পেছনে ছিল শেখ মুজিবের একদলীয় শাসন। সে বছরের ১৫ আগস্ট এক অভ্যুত্থানে একদলীয় বাকশাল সরকারের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি পদটিতে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন শেখ মুজিবেরই সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমদ। শেখ মুজিবের মন্ত্রীদের নিয়েই মোশতাক সরকার গঠন করেছিলেন। ৩ নভেম্বর অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ও মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গ্রেফতার করে তিনি সেনা প্রধানের পদ দখল করেছিলেন।
খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থান বাকশালী শাসনে ফিরিয়ে নেয়ার ভারতপন্থী পদক্ষেপ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। ওদিকে সেনাবাহিনীর মধ্যে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বি। ফলে জনগণের পাশাপাশি সেনাবাহিনীতেও খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে চরম বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। ৬ নভেম্বর রাত থেকে শুরু হয়েছিল সিপাহী-জনতার বিপ্লব। এই বিপ্লবে খালেদ মোশাররফ মারা গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে জিয়াউর রহমান মুক্তি পেলেও জাসদের নেতৃত্বাধীন একটি গোষ্ঠীর উদ্যোগে সেনা অফিসারদের হত্যার কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। অফিসার মাত্রই খালেদ মোশাররফের সমর্থক—এমন এক প্রচারণায় বিভ্রান্ত সৈনিকদের হাতে বেশ কিছু অফিসারের মৃত্যু ঘটেছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছিলেন জিয়াউর রহমান।
বস্তুত ১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহে শুধু নয়, পরবর্তীকালে সংশ্লিষ্ট অনেকের স্বীকারোক্তি এবং তথ্য-প্রমাণেও সুনির্দিষ্টভাবেই জানা গেছে, স্বাধীনতা ধ্বংস করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে দেশ বিশেষের অধীনস্থ করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে বিভক্তি ঘটানোর এবং হানাহানি উস্কে দেয়ার ভয়ঙ্কর পদক্ষেপ নিয়েছিল ষড়যন্ত্রকারীরা।
সিপাহীরা গরিবের সন্তান ও অল্প শিক্ষিত বলে ধনীর সন্তান অফিসাররা তাদের ওপর নির্যাতন চালান এবং সিপাহী ও অফিসারের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকা অন্যায়—এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক স্লোগান তুলেছিল তারা। এর ফলে সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ছিল। একযোগে অফিসার মাত্রকেই হত্যা করার নিষ্ঠুর অভিযানও শুরু হয়েছিল। সব বিষয়ে নির্দেশনা আসছিল একটি বিশেষ কেন্দ্র থেকে। সেখানে নেতৃত্বের আসনে ছিলেন জাসদের তাত্ত্বিক নেতা।
তার সঙ্গে ছিলেন সেনাবাহিনী থেকে বিদায় নেয়া পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা অফিসার লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের বীর উত্তম। কর্নেল তাহের নিজেকে বঞ্চিত মনে করতেন। তার এ মানসিক বৈকল্যেরই সুযোগ নিয়েছিল জাসদসহ ষড়যন্ত্রকারীরা। কর্নেল তাহেরকে সামনে রেখে তারা এমনভাবেই অফিসার হত্যা চালাতে চেয়েছিল, যার পরিণতিতে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীতে একমাত্র তাহের ছাড়া অন্য কোনো অফিসার থাকতে পারতেন না। আর তাহের নিজে যেহেতু জাসদের মাধ্যমে স্বাধীনতা ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলেন, সেহেতু স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের সশস্ত্র বাহিনী অফিসারবিহীন হয়ে পড়ত।
পরিণতিতে সশস্ত্র বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়া দেশ বিশেষের জন্য কোনো ব্যাপারই হতো না। ওই ষড়যন্ত্রে ও কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের ভূমিকা সম্পর্কে বেশি বলার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, সে বছরের ১৫ আগস্ট বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন অফিসার শেখ মুজিবকে হত্যা করলেও আওয়ামী লীগ গোটা সেনা বাহিনীকেই শত্রু মনে করত। দলটি চাইত না, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী টিকে থাকুক এবং শক্তিশালী হোক।
কিন্তু জাতির ভাগ্য ভালো, সিপাহী এবং নন-কমিশন্ড অফিসারদের সমন্বয়ে সেনা বাহিনীরই একটি অংশ সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন।
তার নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থাও ছিল সীমাহীন। ফলে জেনারেল জিয়া সম্পর্কে সশস্ত্র বাহিনীতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা যায়নি। জেনারেল জিয়াও বলিষ্ঠতার সঙ্গেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিলেন। প্রতিটি ক্যান্টনমেন্টে ঝটিকা সফরে গেছেন তিনি। বলেছেন, তার এবং সিপাহী ও নন-কমিশন্ড অফিসারদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
সবাই একই মাতৃভূমির জন্য কাজ করছেন তারা। জিয়াউর রহমানের মতো একজন জনপ্রিয় জেনারেলের এই তত্পরতা ও বক্তব্য সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অনতিবিলম্বে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছিল। ষড়যন্ত্র বুঝতেও তাদের দেরি হয়নি। ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে অনেকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও ছিল। ফলে সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যেও দ্রুত প্রচারিত হয়েছিল যে, অফিসার হত্যার অভিযানে দেশ বিশেষের ভূমিকা রয়েছে।
দেশটি কেন অফিসারদের হত্যা করতে চায়—সে কথা তাদের বুঝিয়ে বলতে হয়নি। মূলত এ ধরনের বিভিন্ন কারণেই জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং সশস্ত্র বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে পেরেছিলেন। প্রতিটি ক্যান্টনমেন্টে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিল। পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল চেইন অব কমান্ড। বড় কথা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী সশস্ত্র বাহিনীকে নির্মূল করে ফেলা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল জিয়াউর রহমানের প্রধান অবদান। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন সরকার ‘বাকশাল’ নামে একটি মাত্র দল রেখে অন্য সব দলকে নিষিদ্ধ করেছিল। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় সর্বময় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল শেখ মুজিবের হাতে। প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে রাতারাতি তিনি রাষ্ট্রপতি হয়ে বসেছিলেন।
বাকশালেরও চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। বাকশালের গঠনতন্ত্রে সব ক্ষমতা এই চেয়ারম্যানের হাতে দেয়া হয়েছিল কিন্তু চেয়ারম্যান কীভাবে নির্বাচিত হবেন তার কোনো উল্লেখ ছিল না। অর্থাত্ শেখ মুজিবকে একই সঙ্গে দেশের আজীবন রাষ্ট্রপতি এবং বাকশালের আজীবন চেয়ারম্যান বানানো হয়েছিল। এই সুযোগে আওয়ামী-বাকশালীরা দেশে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং বিরোধীদের উচ্ছেদের জন্যও নিষ্ঠুর অভিযান শুরু হয়েছিল।
কোনো হত্যা বা নির্যাতনের বিরুদ্ধেই তখন প্রতিবাদ জানানোর উপায় ছিল না। সমগ্র জাতি বন্দি হয়ে পড়েছিল।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশ ও দেশের মানুষকে ওই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আগত জেনারেল জিয়াউর রহমান বাকশালের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাতিল করেছিলেন। তিনি সেই সঙ্গে খুলে দিয়েছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের দরজা।
এই পথ ধরেই বাতিল হয়ে যওয়া দলগুলো আবারও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের নামে শেখ মুজিব যে ইসলামী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেছিলেন জিয়াউর রহমান সে দলগুলোকে রাজনীতি করার অনুমতি দিয়েছিলেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তার আমলেই প্রথমবারের মতো দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে (১৯৭৮), তার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ বলেই সংবিধানের শুরুতে জিয়াউর রহমান ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ সংযোজন করেছেন।
তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় সব কাজের ক্ষেত্রে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’কে বাধ্যতামূলক করাও ছিল জিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
এখানে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার ব্যাপারে জিয়ার নেয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে উল্লেখ করা দরকার। এটা ১৯৮১ সালের ঘটনা। দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। একই আওয়ামী লীগ নাম নিয়ে সে সময় ব্র্যাকেটবন্দি খান তিনেক দলের আবির্ভাব ঘটেছিল।
আবদুল মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন উপদলটি প্রধান আওয়ামী লীগের অবস্থান অর্জন করেছিল। কিন্তু সেখানে সভাপতির পদ নিয়ে সংঘাত মারাত্মক হয়ে ওঠে। আপস ফর্মুলা হিসেবে শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী বানানো হয়। শেখ হাসিনা তখন ভারতের আশ্রিতা হিসেবে নয়াদিল্লিতে বসবাস করছিলেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হওয়ার পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন ওঠে।
মহল বিশেষের পক্ষ থেকে পানি ঘোলা করার চেষ্টা চালানো হলেও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা অবাধে দেশে ফিরতে এবং বসবাস করতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার এই ঘোষণার পরই নয়াদিল্লি থেকে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা হয় (১৭ মে, ১৯৮১)। জিয়া শুধু শেখ হাসিনাকেই ফিরিয়ে আনেননি, তাকে তার পৈতৃক বাসভবনও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। জিয়ার নির্দেশে বাসভবনের প্রতিটি জিনিসের বিস্তারিত তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। সে তালিকায় শেখ মুজিবের পাইপ ও চশমা, শেখ কামাল-জামালের সোনার মুকুট, অলঙ্কার, নগদ টাকা, মার্কিন ডলার, ভারতীয় রুপি, ব্রিটিশ পাউন্ড এবং কাপড়-চোপড় ও আসবাবপত্র যেমন ছিল, তেমনি ছিল লাইসেন্সবিহীন কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং সেগুলোর গুলিও।
শেখ হাসিনা প্রতিটি জিনিস তালিকার সঙ্গে একটি একটি করে মিলিয়ে ও যাচাই করে তারপর লিখিতভাবে বুঝে নিয়েছিলেন। স্বর্ণকার দিয়ে সোনার মুকুট ও প্রতিটি স্বর্ণালঙ্কার ওজন করিয়ে এবং রীতিমত ‘বাজিয়ে’ নিয়েছিলেন। তিনি শুধু আগ্নেয়াস্ত্রগুলো বুঝে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, একই নেত্রী শেখ হাসিনা এবার ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্ত্রী ও সন্তানদের ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে উত্খাত করে ছেড়েছেন। একেই সম্ভবত কৃতঘ্নতা বলে।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে আর চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে জিয়ার মৃত্যু ঘটেছিল ৩০ মে।
এভাবে পর্যালোচনায় দেখা যাবে, হুকুম তামিল করতে গিয়ে চিহ্নিত বিশেষজনেরা যা কিছুই বলুন না কেন, সব মিলিয়ে প্রমাণিত সত্য হচ্ছে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে দিয়ে গেছেন জিয়াউর রহমান। অন্যদিকে এরশাদ ছিলেন সব ব্যাখ্যাতেই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী। দূরপ্রসারী অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এমনভাবে জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণের অভিনয় করেছিলেন, যাতে জিয়াকে নিন্দিত করা যায়। আওয়ামী ঘরানার ওই বিশেষজনেরাও এরশাদের সে কৌশলের জালেই আটকে গেছেন।
এজন্যই তারা এমন এক বিচিত্র ব্যাখ্যা হাজির করেছেন, যা পড়ে যে কারও মনে হবে যেন জিয়া ও এরশাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই! অথচ ইতিহাসের সঠিক ব্যাখ্যায় প্রমাণিত হবে, জিয়ার সঙ্গে কোনোদিক থেকেই এরশাদের তুলনা চলে না। ‘মোশতাক-জিয়া চক্র’ ধরনের উল্লেখ ও মন্তব্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মুল লিখা ফেসবুক নোট থেকে নেওয়া উপরে তার নাম। ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।