হয়তো কোন এক জ্যোত্স্না রাতে তুমি আবার আসবে ফিরে...হাতটি ধরে বলবে "ভালবাসি"...জেনে রেখো সেদিন আমি আর নই যে তোমার..এখন আমি ভালবাসি শুধুই আমায়... বাহিরে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পরছে। এই বৃষ্টিই হয়তো এমন একটা জিনিস যা মন ভাল অথবা খারাপ যে কোন অবস্থায় থাকলেও শুধুই দেখতে ইচ্ছে করে। বৃষ্টি মানুষকে নিয়ে যায় কষ্ট এবং আনন্দের উর্ধে কোন এক অজানা জগতে। যেখানে বসবাস কেবল নিজের আবেগ ও অনুভূতি গুলির।
রুমের জানালাটা খুলে বিছানাতে আড়াআড়িভাবে শুয়ে অনেকক্ষণ ধরে উদাস মনে বৃষ্টি দেখছে রেজোয়ানা।
কিছুক্ষণ পরপর দখিনা হাওয়ায় বৃষ্টির দু একটা ফোঁটা তার চোখ,গাল অথবা নাকের ডগায় ছুঁয়ে দিয়ে যায়। কিন্তু সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই তার। এই বৃষ্টির দিনে হঠাত্ চয়নের কথা খুবই মনে পরছে তার। আজ পুরুনো কয়েকটা দিনের স্মৃতিগুলি বারবার কড়া নাড়ছে রেজোয়ানার মনের দরজায়। খুলবনা খুলবনা করেও খট করে মনের দরজা খুলে যায় এবং চয়নের স্মৃতিগুলি মুহূর্তেই ছেয়ে যায় তার পুরো মন আকাশে।
প্রায় একটা মাসের মতো হয়ে গেলো ছেলেটার কোন খবরই নেই। এতো দিন কথা বলে হৃদয়ে বিশাল একটা স্থান দখল করে তারপর যখন সেই মানুষটাই স্বেচ্ছায় হৃদয় ছিড়ে বের হতে চায় তখন খুব কষ্ট হয়। এই কষ্ট বর্ণনাতীত। চলেই যখন যাবি তাহলে আসলিই বা কেন?
রেজোয়ানার সাথে চয়নের প্রথম পরিচয় পর্বটা ছিল বেশ ভিন্ন রকম। তখন সে ইন্টার ১ম বর্ষের ছাত্রী।
একদিন দুপুরবেলা কলেজ থেকে ফিরেই মোবাইল হাতে নিয়ে সিম কোম্পানী থেকে আসা একটি মেসেজ চোখে পরে তার। ঐ মেসেজে দুই দিনের মধ্যেই সিম রেজিস্ট্রেশন করতে বলা হয় তাকে।
এমনিতেই কিছুদিন আগে অনেক জোড়াজোড়ি করে বাবার থেকে এই নতুন মোবাইল সেটটি আদায় করেছে। এই বয়সে মেয়ের মোবাইল ব্যবহার করা রেজোয়ানার বাবা মায়ের কাছে অনুচিত বলে মনে হয়। তার উপরে এখন তাদেরকে সিম রেজিস্ট্রেশনের কথা শোনানোটা নিছক বোকামী।
তাই একাই এই কাজটা করার জন্যে মনোস্থির করে সে।
ঐদিন বিকালে কোচিং থেকে ফেরার পথে হঠাত্ বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে যায় সে। কিন্তু গিয়েই দেখে এক হুলস্থুল কান্ড। মাত্র দুই দিনের সময় দেয়ার সবাই হুমড়ি খেয়ে পরে সিমের কাস্টমার কেয়ারে।
তার উপরে মেয়েদের জন্যে নেই কোন আলাদা ব্যবস্থা। তাই রেজোয়ানার মতো কলেজ ছাত্রীর পক্ষে কাজটা করা অসম্ভব হয়ে পরে। অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থেকেও যখন ভীড় কমার কোন নমুনাই চোখে পরলো না তখন আশাহত হয়ে সে ফিরে যেতে পা বাড়ালো।
ঠিক তখনই একটা ছেলে হঠাত্ করে একটা ফর্ম নিয়ে এসে বললো,
'এইটা পূরণ করুন। আমি আপনার সিম রেজিস্ট্রেশন করার ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি'
পুরো ব্যপারটা আকস্মিক ঘটে যাওয়ায় রেজোয়ানা ছেলেটির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
'তাড়াতাড়ি করুন..সময় বেশি নেই আর'
ছেলেটির কথায় আবার সম্ভিত ফিরে পায় সে। কিন্তু কোন কথা না বলেই ধীরে ধীরে রেজিস্ট্রেশন ফর্ম পূরণ করা শুরু করে।
ফর্ম পূরণ শেষ হতেই ছেলেটি সেটা নিয়ে ভেতরে যায় তাকে অপেক্ষা করতে বলে। প্রায় ১০ মিনিট পরে ফিরে এসে রেজোয়ানার হাতে কিছু কাগজ ধরিয়ে দেয় এবং হাসিমুখে বলে,
-আপনার কাজ শেষ।
-আসলে কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দিব! এমন একটা কঠিন সময়ে আপনি আমার সাহায্য করলেন!
-ধন্যবাদ দিতে হবে না।
অনেকক্ষণ যাবত্ খেয়াল করছিলাম যে আপনি সমস্যায় পরেছেন তাই সাহায্যের হাত বাড়ালাম। আর এখানে আমার একজন ফ্রেন্ড চাকরী করে। সেই সূত্রে তাকে দিয়ে সহজেই কাজটা করিয়ে নিলাম।
-ও আচ্ছা। তাহলে এখন আমি যাই।
দেড়ি হয়ে যাচ্ছে।
- আচ্ছা। ভাল থাকবেন।
ঘরে ফিরে ছেলেটির কথা চিন্তা করতে করতে কখন যে রাত হয়ে আসে তা সে বুঝতেই পারে না। রাতে যখন ঘুমানো প্রস্তুতি নিবে তখনই রেজোয়ানার মোবাইলে একটা মেসেজ আসে অপরিচিত নম্বর থেকে।
'আজ বিকেলে আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছিলো। আমি কি আপনার বন্ধু হতে পারি?'
এই অপ্রত্যাশিত মেসেজে রেজোয়ানা খুবই বিচলিত হয়ে উঠে। মনে মনে ভাবতে থাকে কে হতে পারে এটা। কিন্তু কিছুতেই কিছু মেলাতে পারে না। তাই সে বাধ্য হয়ে একটা ফিরতি মেসেজ পাঠায়,
'কে আপনি?আর একজন অপরিচিত মানুষের সাথে কেনই বা আমি বন্ধুত্ব করবো?'
সাথে সাথেই আবার মেসেজ আসে,
'আজ বিকেলে এতো বড় একটা উপকার করলাম আর আপনি তা কয়েকটা ঘন্টার ব্যাবধানেই ভুলে গেলেন? হায়রে নারী!!'
এবার রেজোয়ানা ঠিকই চিনতে পারে তাকে।
এক গাল হেসে রিপ্লাই দেয়,
'ও আচ্ছা আপনি! তা আমার নম্বর পেলেন কিভাবে?'
'সিম রেজিস্ট্রেশন করার সময় রেখে দিয়েছিলাম। রূপসী মেয়ের নাম্বার হাত ছাড়া কিভাবে করি!'
'হুম!'
এভাবে আরো অনেক কথা। দুটি অচেনা মানুষ ধীরে ধীরে ভাল বন্ধুতে পরিনত হয়। মেসেজ আদান প্রদানের মাধ্যমে ছেলেটির সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনে নেয় সে।
তার নাম চয়ন।
সিলেটে স্থায়ী হলেও বর্তমানে ঢাকাতে বি বি এ পড়ছে। বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে।
তাদের মাঝে প্রতিনিয়ত মেসেজ আদান প্রদান এবং ফোনে কথা হলেও এখন পর্যন্ত আর একবার ও দেখা হয় নি। চয়ন অনেক বার দেখা করতে চললেও সবসময় পড়ালেখার অজুহাতে এড়িয়ে গেছে রেজোয়ানা। কিন্তু এইচ এস সি পরীক্ষা দেয়ার পর রেজোয়ানা যখন একেবারে অবসর তখন একদিন ছুটিতে সিলেট আসে চয়ন।
মেসেজ দিয়ে রেজোয়ানাকে বলে দেখা করতে। কিন্তু খুবই রক্ষণশীল পরিবারের হওয়ার কারণে লোকলজ্জার এক অজানা ভয় কাজ করে তার ভেতর। তাই চয়নের শত অনুরোধ সত্তেও তার সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দেয়।
সে দিন চয়ন খুবই কষ্ট পেয়েছিল। রাগ,ক্ষোভ এবং কিছুটা অপমানবোধ অনুভব করে সে রেজোয়ানার এই আচরণে।
শত শত অভিমান এসে বাসা বাঁধে হৃদয়ে এবং সেই অভিমান থেকেই রেজোয়ানার সাথে সব ধরণের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় সে।
বৃষ্টি কমার কোন নাম গন্ধই নেই। রেজোয়ানার হৃদয়ের ঝড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রকৃতিতেও আজ ঝড় উঠেছে। এইদিকে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যারা ছুটে আসে রাজ্যের আধার নিয়ে। অতীত স্মৃতিচারণে কখন যে গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে বুঝতেই পারে নি রেজোয়ানা।
বাম হাতের উল্টোপাশ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ডান হাতে মোবাইলটা তুলে ধরে।
নাহ! তার কোন মেসেজ আসেনি। তাহলে কি ছেলেটা সত্যি সত্যি ভুলে গেলো। একটা ফোন দিয়ে দেখবো নাকি!
নাহ! আমি কোনো ফোন দিবো? যোগাযোগ তো সে ই বন্ধ করেছে। আবার যোগাযোগ করলে সে ই প্রথমে করবে!
রাজ্যের অভিমান ঝরে পরে রেজোয়ানার মন থেকে।
ঠিক তখনই হঠাত্ মোবাইলটা বেজে উঠে।
মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখে সে। নামটা দেখেই অজানা শিহরণে পুরো শরীরটা কেঁপে উঠে। মোবাইলের সবুজ বাটনে চাপ দিয়ে ধীরে ধীরে কানের কাছে নিয়ে যায়। ওপাশ থেকে একটা চেনা কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
- কেমন আছো?
- তুমি যেমনটা ছেড়ে গিয়েছিলে ঠিক তেমন।
তুমি ভালো আছো তো?
- ভালো থাকার প্রত্যাশায় বেঁচে থাকার ব্যর্থ প্রয়াস চালাচ্ছি।
- হঠাত্ এতো দিন পরে এই অভাগিনীর কথা মনে পরলো যে?
- কেনো? মনে পরতে বারন নাকি? তোমাকে মনে করার দায়িত্বটা এরই মাঝে অন্যের দখলে চলে গেলো?
- সবাইকে নিজের মতো ভাবো কেনো?
- আমাকে কারো মনে পরে না! আমি সবার করুনার পাত্র!
- তাই বুঝি? আমার জানা মতে পূর্বে কেউ একজনের হৃদয়ে শুধু তুমিই ছিলে! কিন্তু হৃদয়ের প্রাচীর ছিন্নভিন্ন করে নির্দয়ের মতো কেন যে পালিয়ে গেলে সেই প্রশ্নের উত্তর সেই মানুষটি এখনো খুঁজে বেড়ায়।
- হুম (দীর্ঘশ্বাস)..
- হুম (নিঃশব্দে কপট হাসির অভিনয়)...
- কিছু বলবে?
- এতো দিন পরে কেনো আজ ফোন দিলে?
- তোমার সাথে কথা না বলে থাকাটা কষ্টকর। অনেক চেষ্টা করলাম। পারলাম না থাকতে তোমায় ছাড়া।
- তাহলে ঐদিন এভাবে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলে কেনো?
- এমনি। দেখলাম কেউ একজন আমাকে মিস করে কিনা!
- হুম..ভালো!
- রাগ নাকি?
- না! আমি রাগ করার কে?
- রাগে দেখি গাল ফুলিয়ে লাল টমাটো বানিয়ে রেখেছো আবার বলো আমি রাগ করার কে!
কথা শুনে হাসি পায় রেজোয়ানার। চয়ন আবার বলে উঠে,
- দেখা করবে?
পরিবারের ভয় থাকলেও এবার আর ফিরিয়ে দিতে পারে না রেজোয়ানা। পুরুনো বন্ধুত্ব আবার তার হাত বাড়িয়েছে। এই মুহূর্তে কিছুতেই আর হাত সরিয়ে নিতে পারবেনা সে।
পার্কের পূর্বের বেঞ্চিটাতে প্রায় ১০ মিনিটের মতো বসে আছে রেজোয়ানা। এই জায়গাটা খুবই পছন্দ তার। বেঞ্চিটার উপরে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ছায়া হয়ে দাড়িয়ে আছে। এখানে বসলে তার মনে হয় গাছটি তাকে আলাদা করে রেখেছে চারপাশের জগত্ থেকে। আচ্ছন্ন করেছে এক অজানা মায়ায়।
চয়নের পছন্দের নীল শাড়ি ও কালো টিপ পরে এসেছে সে।
দূরে একটা ছেলে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। একটু কাছে আসতেই চয়নকে চিনতে পারলো রেজোয়ানা। আজ প্রায় দুই বছর পরে দেখা হচ্ছে তাদের।
চয়ন এসে বসলো রেজোয়ানার পাশে।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। রেজোয়ানা নিরবতা ভাঙ্গলো,
- দুই বছরে অনেক বদলে গিয়েছো তুমি।
- বদলাতেই হয়। সময়টাও তো নেই আর আগের মতো। দুই বছর আগে ছিলাম বিবিএ এর ছাত্র কিন্তু এখন একজন বিজনেসম্যান।
- তাই নাকি!
- হুম। এখন সিলেটেই আছি। বাবার ব্যাবসাটা দেখাশোনা করছি।
- ও আচ্ছা।
- তুমিও তো কম বদলাও নি! আগের থেকে আরো অনেক রূপসী হয়ে গিয়েছো।
মৃদু হাসি ফোঁটে উঠে রেজোয়ানার ঠোটে। কিন্তু মুখ দিয়ে আর একটি শব্দ ও বের হয় না।
সেদিনের পর থেকে আবার প্রতিনিয়ত কথা হতে থাকে দুই বন্ধুর। তাদের বন্ধুত্ব ক্রমান্বয়ে গভীর থেকে গভীরতম হতে থাকে।
এরই মাঝে প্রকৃতির কোল বেয়ে নেমে আসে আরেকটি বসন্ত।
বসন্তের প্রথম দিনটি পালন করার পরিকল্পনায় মত্ত হয় চয়ন ও রেজোয়ানা।
পহেলা ফাল্গুনে সারাদিন একসাথে ঘুরে বেড়ায় তারা বাসন্তী শাড়ি ও পান্জাবী পরে। বিকেলবেলা এসে বসে পার্কের সেই পূর্বের বেঞ্চিটিতে। আজ জায়গাটিকে প্রকৃতি খুবই অপরূপে সাজিয়েছে। মাথার উপর এবং পায়ের নিচে শত শত রক্ত লাল কৃষ্ণচূড়া।
তার মাঝে বসে আছে দুজন বাসন্তী কপোত কপোতী।
পাশাপাশি বসে তারা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। হঠাত্ রেজোয়ানা তার বাম হাতে চয়নের ডান হাতের উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব করে। একট অজানা ভাল লাগায় তার দেহ মন বিদ্যুত্ বেগে শিহরিত হয়।
মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটা কৃষ্ণচূড়া মুঠোভরে নিয়ে রেজোয়ানার সম্মুখে এগিয়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে চয়ন বলে উঠে,
'ভালবাসি ভালবাসি ভালবাসি'
আনন্দের অতিসহ্যে রেজোয়ানার চোখ গুলি ঝাপসা হয়ে আসে।
তার চোখের জলের সাথে একাত্ব হয়ে এই বসন্তের মাঝেও হঠাত্ আকাশটা কেঁদে উঠে এবং ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পরতে শুরু করে। রেজোয়ানার সুখ-দুঃখের সাথে যেন বৃষ্টিদের কোন এক আত্বিক সম্পর্ক রয়েছে।
আজ বসন্তের অনাকাঙ্খিত বৃষ্টিরা বিন্দু বিন্দু সুখ হয়ে ঝরে পরে তাদের চোখের পাতায়। এবং হাতে হাত রেখে দুজনার এই বৃষ্টির সুখের পরশ নিতে নিতে পাশাপাশি হাটতে থাকে একজোড়া ভালোবাসার পায়রা..... ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।