ভেস্তে গেছে বিএনপির ভবিষ্যত কর্ণধার তারেক রহমানের তৃণমূল সম্মেলনের উদ্দেশ্য। সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনে তার অর্জিত সাফল্য মাত্র ছ’বছরের ব্যবধানেই যেন সোনালী অতীতে পরিণত হয়েছে। তার নিজ জেলা বগুড়াতেই দলের মধ্যে দেখা দিয়েছে বহুধাবিভক্তি। ইউনিয়ন আর ওয়ার্ড পর্যায়ে তো বটেই, পাল্টাপাল্টি কমিটি হয়েছে থানা আর জেলাতেও।
আর এসব কমিটিতে পুনর্বাসিত হয়েছে তৃণমূল সম্মেলনের মাধ্যমে দল থেকে বাদ পড়া অপরাধী, দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিতরা।
ওয়ান-ইলেভেনের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান দীর্ঘ দিন দেশের বাইরে থাকায় দলে অরাজকতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
এতে একদিকে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বাক বিতণ্ডা ও হাতাহাতি যেমন হচ্ছে, তেমনি ঘটছে দলীয় কার্যালয় ও নেতাদের গাড়ী ভাংচুরের মতো অনাকাঙ্খিত ঘটনা। হচ্ছে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ মিছিল আর সংবাদ সম্মেলনও।
দলীয় সূত্রমতে, গত বছরের ১০ জুন বগুড়া জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও দলীয় কোন্দলের কারণে সেই কমিটি দু’দফা বাড়ানো হয়। ১ জুলাই ৫১ ও ২০ জুলাই ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে রূপ নেয় বগুড়া জেলা বিএনপি।
৩ ডিসেম্বর থানা, পৌর ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ২৩টি আহবায়ক কমিটি পত্র পত্রিকায় প্রকাশ হলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন করে সংশয় দেখা দেয়। এরপর পাল্টাপাল্টি পৌর ও থানা কমিটি গঠনের ধুম পড়ে।
একদিকে জেলা বিএনপির আহবায়ক ও বগুড়া পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট একেএম মাহবুবর রহমানের স্বাক্ষর সম্বলিত আহবায়ক কমিটি ঘোষণা হয়, অন্যদিকে জেলা কমিটির ১ নম্বর যুগ্ম-আহবায়ক ভিপি সাইফুল ইসলামের স্বাক্ষরে ঘোষিত হয় পাল্টা কমিটি।
এ ব্যাপারে আহবায়ক মাহবুবর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার স্বাক্ষর করা কমিটিই মূল কমিটি। এর বাইরে যারা অন্য কমিটি করে বিভিন্ন যায়গায় কাগজপত্র বিলি করেছেন তারা দলের ঐক্য চান না।
’
অপরদিকে যুগ্ম- আহবায়ক সাইফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘ঢাকা থেকে ফ্যাক্স যোগে যে কমিটি আমার কাছে এসেছে সেটাই কেবল কপি করে বিলি করেছি। ’
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান হারেজ, বগুড়া জেলা বিএনপির বিদায়ী কমিটির সহ-সভাপতি জাকিউল্লাহ আপেল, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান মনি, বগুড়া জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক রেজানুর ইসলাম রেজা, বগুড়া জেলা মহিলা দলের সভাপতি লাভলী রহমানসহ বেশ ক’জন নেতা বাংলানিউজকে বলেন, ‘তৃণমূল সম্মেলনের মাধ্যমে তারেক জিয়া গোটা বগুড়াতেই বিএনপির সংগঠন গুছিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এখানে দলীয় কোন্দল এতোটাই বেড়েছে যে সরকার বিরোধী আন্দোলনই জমানো যাচ্ছে না। ’
শহীদ জিয়া কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘কমিটি গঠন নিয়ে শুধু বগুড়া নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় চরম কোন্দলসহ বিভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
যা সরকারি দলতে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। ’
ধুনট উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল মতিন ম-ল বাংলানিউজকে বলেন, ‘নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকলে আজ বিএনপি’র এতো ভরাডুবি হতো না। ’
একই এলাকার ক্লিন ইমেজের অধিকারী অধ্যক্ষ শাজাহান আলী বাংলানিউজকে বলেন, ‘টাকার জন্য তিনি বিগত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাননি। কিন্তু ভোট পেয়েছেন ৪০ হাজারের বেশী। তার বিএনপি যাকে মনোনয়ন দিয়েছিলো তার জামানত বাজয়াপ্ত হয়েছে।
’
আক্ষেপ ভরে বাংলানিউজকে তিনি আরো বলেন, ‘বাইরে থেকে ভাড়া করে লোক নিয়ে এসে এ ধরনের আচরণ করতে থাকলে দলে ভাল লোক থাকবে না। ’
এ পরিস্থিতিতে দল বাঁচাতে খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন ত্যাগী তৃণমূল নেতারা।
‘দল বাঁচাতে খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপের বিকল্প নেই’ উল্লেখ করে ধুনট উপজেলার ভা-ারবাড়ী ইউনিয়নের আব্দুল হালিম সরকার মুকুল, চিকাশী ইউনয়িনের জাকির হোসেন জুয়েল, জামিলুর খন্দকার ও গোসাইবাড়ী ইউনিয়নের নাটাবাড়ী গ্রামের মঈনুল হাসান মুকুল বাংলানিউজকে বলেন, ‘তারেক রহমান সর্বদা চেষ্টা করেছেন তৃণমূল কর্মীদের প্রত্যাশা জানতে। তাই তিনি প্রত্যক্ষ ভোটে নেতা নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন। ’
তারা বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের পর তারেক রহমানই প্রথম ব্যক্তি যিনি তৃণমূল কর্মীদের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছেন।
তার চালু করা প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থা চালু থাকলে অর্থের বিনিময়ে বা বিশেষ পরিচয়ে নেতা নির্বাচন সম্ভব হতো না। ’
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চালুয়াবাড়ী ও নারচী ইউনিয়নের মন্টু ও শহীদুল বাংলানিউজকে বলেন, ‘বর্তমান বেহাল দশা থেকে বিএনপিকে বাঁচাতে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ’
প্রসঙ্গত, ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির সদস্য পদ নিয়ে রাজনীতিতে নাম লেখান তারেক রহমান। পরে জেলা নির্বাহী কমিটির সদস্য হন তিনি। ২০০২ সালের ২ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব মনোনীত হন তারেক।
সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান করা হয় তাকে।
সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব থাকাকালে ২০০৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রাজশাহী বিভাগের ঠাকুরগাঁও জেলা থেকে তৃণমূল সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন শুরু করেন তারেক রহমান। এরপর একে একে নাটোর, রাজশাহী, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের সবক’টি জেলায় তৃণমূল সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করেন তিনি।
অবশ্য যুগ্ম-মহাসচিব হওয়ার আগেই বগুড়া জেলার প্রায় সকল ইউনিয়নে প্রতিনিধি সম্মেলন করেন তারেক রহমান। এসব ইউনিয়নে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ও উপ কমিটি এবং সাব কমিটি করে সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচন করেন তিনি।
কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ দিন দেশের বাইরে থাকার কারণে তার গড়া কমিটিগুলো পুরনো চেহারায় ফিরে গেছে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।