বিএনপির মাঠের কোন্দল থামছে না।
মাঠে-ময়দানে বিএনপি গৃহদাহে পুড়ছে। এতে না পারছে শক্তি নিয়ে আন্দোলন বা নির্বাচনে নামতে। দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের পর ৭৫টি সাংগঠনিক জেলায় কমিটি গঠন করা হলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে। যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে কমিটি গঠন করার অভিযোগে তৃণমূল বিএনপিতে হতাশা বিরাজ করছে।অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্থানীয় পর্যায়ের দ্বন্দ্বকে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের প্রার্থী হওয়া নিয়ে কিছুটা বিবাদের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বড় দলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। এটা এক ধরনের প্রতিযোগিতা। প্রতিটি জেলায় সাংগঠনিক কমিটি সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপি এখন নির্বাচন ও আন্দোলনমুখী।
সুতরাং এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির কর্মিসভায় ?জেলা ?বিএনপির সভাপতি এম নাসের রহমান ও সাধারণ সম্পাদক বেগম খালেদা রব্বানী গ্রুপের সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। দাওয়াত পাওয়া না পাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এর মধ্যে গুরুতর কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা সেখানে উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের বেগ পেতে হয়।
গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন উদযাপন অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় একপক্ষ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেনের গাড়িতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে। মহানগর ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সভাপতি গাজী সিরাজ উল্লাহকেও লাঞ্ছিত করা হয়। এছাড়া দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে মহানগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ডা. শাহাদাত হোসেনের অনুসারীদের মধ্যে এ সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলাও হয়। সুনামগঞ্জে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান সফরে গিয়ে ত্রিধাবিভক্ত গ্রুপের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ঘাম ঝরছে কোন্দল থামাতে। একাংশের নেতৃত্বে সাবেক হুইপ ফজলুল হক আশপিয়া, আরেক অংশের সাবেক এমপি নাসির চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন এবং তৃতীয় গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওয়াকিবুর রহমান গিলমান ও নাদের আহমদরা। জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিএনপি বহুমুখী কোন্দলে বিপর্যস্ত।
নেতাদের প্রত্যেকের আলাদা গ্রুপ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, এম মোরশেদ খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মীর মোহাম্মদ নাছির হোসেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গোলাম আকবর খন্দকার, ডা. শাহাদাত হোসেন পৃথক গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে কয়েক দিন পরপরই সেখানে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রকাশ্যে রূপ নেয়। রাজবাড়ী জেলা বিএনপির কোন্দল কমিটি গঠনের পর থেকেই। আন্তঃকোন্দলের কারণে দলের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী খুনের ঘটনাও ঘটেছে সেখানে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের দ্বন্দ্বের কারণেই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একাধিকবার সময় দিয়েও রাজবাড়ী সফর স্থগিত করেছেন। সর্বশেষ গত রবিবার ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে কর্মিসভা পণ্ড হয়ে যায়। জেলা সভাপতি আলী নেওয়াজ খৈয়ামের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ ও সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আসলামের দ্বন্দ্ব বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে রূপ নিতে দেখা যায়। দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ফরহাদ হোসেন আজাদের সঙ্গে জেলা সভাপতি মজাহার হোসেন ও সহসভাপতি তহিদুল ইসলামের কোন্দল চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মারা যাওয়ার পরও দ্বন্দ্বের কারণে এখনো ওই পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
কোন্দলে জর্জরিত পুরো বরিশাল বিভাগ। যদিও সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ার ও নবনির্বাচিত মেয়র আহসান হাবিব কামালের মধ্যে ঐক্য লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তাদের মধ্যে চলে আসা দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এখনো শেষ হয়নি বলে জানা গেছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল সমর্থিত এমপি প্রার্থীসহ নানা কারণে পুরো বরিশাল বিভাগে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা কয়েক ভাগে বিভক্ত। পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে কুর্তি সরকার ও মোস্তাক আহমেদ পিনুর সঙ্গে কোন্দল চলছে অনেক দিন ধরে।
ঝালকাঠিতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের সঙ্গে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহবুবুল হক নান্নু ও ডা. পি আহমদের দ্বন্দ্ব চলে আসছে কমিটি গঠনের পর থেকেই। একইভাবে পিরোজপুর, বরগুনা, বরিশাল জেলা উত্তর ও দক্ষিণসহ পুরো বিভাগেই কোন্দলে জর্জরিত বিএনপি। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু ও দলের বিশেষ সম্পাদক নাদিম মোস্তফার দ্বন্দ্ব পার্টির বহুল আলোচিত বিষয়। রাজশাহী সিটি নির্বাচনে তাদের একমঞ্চে দেখা গেলেও পরবর্তীতে তাদের স্বরূপ বেরিয়ে পড়েছে। আগামী নির্বাচনে রাজশাহীতে দলীয় প্রার্থী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মিনু-নাদিমের দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া রংপুরের আহ্বায়ক মোজাফফর আহমেদের সঙ্গে রহিম উদ্দিন ভরসা, গাইবান্ধায় জেলা সভাপতি আনিসুল হক বাবুর সঙ্গে হামিদুল হক সানার, টাঙ্গাইলে জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খানের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম তোফার, গাজীপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহর সঙ্গে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলনের, চুয়াডাঙ্গায় সাবেক সভাপতি অহিদুল বিশ্বাসের সঙ্গে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদুর, ঝিনাইদহে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমানের সঙ্গে সাবেক এমপি শহিদুজ্জামান বেল্টু, শহিদুল মাস্টার ও আবদুল ওয়াহাবের, মাগুরায় জেলা সভাপতি কবির মুরাদের সঙ্গে সাবেক সভাপতি কাজী সলিমুল হক কামালের, ফরিদপুরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের সঙ্গে জেলা সভাপতি শাহজাদা মিয়ার দ্বন্দ্ব দলীয় কর্মীদের বিভক্ত করে রেখেছে। কোনো কোনো এলাকায় কোন্দলের কারণে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে। ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ দুই জেলাতেই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকে দ্বন্দ্ব ও সিলেট মহানগরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী সমর্থকদের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে।
ঢাকা মহানগর বিএনপি : আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার দ্বন্দ্ব নতুন নয়। খোকা ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক হলেও থানা কমিটি গঠন নিয়ে আব্বাস সমর্থকদের সঙ্গে প্রতিনিয়তই বিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন।
যার কারণে অধিকাংশ থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ঢাকায় বিএনপির এমপি প্রার্থীদের সঙ্গেও বনিবনা না হওয়ায় কমিটি গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। এদিকে ঢাকা জেলার বিভিন্ন ইউনিটে ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। ঢাকা জেলায় বর্তমান সভাপতি এমএ মান্নান ও সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান। কিন্তু জেলার সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার সমর্থকদের সঙ্গে মান্নান গ্রুপের সমর্থকদের মাঝেমধ্যেই বিবাদ লক্ষ্য করা যায়।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান জানান, একটি বড় দলে নানা মত ও পথের লোক থাকে। তাই দল পরিচালনায় কিছু সমস্যা থাকতেই পারে। এ জন্যই কেন্দ্রীয় নেতাদের জেলা সফর কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। আশা করি, নির্বাচনের আগ মুহূর্তের এই সফরে সব ধরনের কোন্দল নিরসন করে নেতা-কর্মীদের আন্দোলনমুখী করে তোলা সম্ভব হবে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।