তৃণমূলে জামায়াতের নতুন কৌশল
শেখ গোলাম মোস্তফা
=========================
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নামক উগ্র সাম্প্রদায়িক দলটি দলের ধর্মপ্রাণ হাজিদের মধ্যে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ শুরু করেছে। মংলা বন্দর ও তার পার্শ্ববর্তী থানা রামপালে সম্প্রতি হাজিদের নিয়ে কয়েকটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে-সমাবেশগুলোর আয়োজন করেছে হাজিদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। যাদের মধ্যে আছে গোপন রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং সংগতভাবেই তারা জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় এজেন্ট। রামপাল ও মংলার সমাবেশগুলোতে খুলনা এবং বাগেরহাট জেলার শীর্ষ জামায়াত নেতারা বক্তব্য দিয়েছেন এবং তাদের বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবেই দেশে ইসলামি শরিয়াভিত্তিক আইন চালু ও বাংলাদেশকে কিভাবে ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করা যায় সে বিষয়ে হাজিদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে বলে তথ্যনির্ভর সূত্রে প্রকাশ।
মুসলমান ধর্মীয় সম্প্রদায়সহ যেকোনো ধর্মাবলম্বী মানুষ যখন তীর্থে যাওয়ার মনস্থির করে, তখন তারা আর পেছনে ফিরে তাকায় না। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য তীর্থে গমন এবং পুণ্য সঞ্চয় করা। সে জন্য অধিকাংশ তীর্থযাত্রীরই মনের মধ্যে বাসনা থাকে, তীর্থস্থান বা পুণ্যভূমিতে যেন তার জীবনাবসান ঘটে এবং সেখানেই তার মরদেহের সৎকার হয়। উদ্দেশ্য একটাই এবং তাহলো পরলোকে শান্তিতে থাকা। হাজিদের প্রসঙ্গেও একই কথা প্রযোজ্য।
তবে পবিত্র হজের সময় প্রতিবছর সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় সারা পৃথিবী থেকে যে লাখ লাখ পুণ্যার্থীর সমাবেশ ঘটে, অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একত্রে এত লোকের সমাগম হয় না। হজব্রত পালনের আগেকার মানসিক প্রস্তুতি, সৌদি আরবে অবস্থান, হজশেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরও তাদের মনোলোকে একধরনের প্রশান্তি বিরাজ করে এবং তাঁরা শুদ্ধ জীবনাচরণ ও পারলৌকিক জগৎ সম্পর্কে শুধু নিজস্ব পরিবারগুলোর ওপরই প্রভাব বিস্তার করেন না, পারিপাশ্বর্িক পরিচিত পরিমণ্ডলের মধ্যেও তাঁদের মনের স্নিগ্ধতা ও শুদ্ধতার ব্যাপ্তি ছড়িয়ে দেন। এতে যুগ যুগ ধরে সমাজকে তাঁরা উপকারই করছেন। এর মধ্যে থাকে না কোনো রাজনৈতিক দর্শন বা পারস্পরিক বিদ্বেষ অথবা অন্য ধর্মকে খাটো করার কোনো প্রবণতা, যার মধ্যে থাকে না সমাজকে কলুষিত করারও কোনো উপাদান। তাঁদের স্মৃতিতে সর্বদা জাগ্রত থাকে মক্কা, মদিনা, আরাফাতের ময়দান, সাফা-মারওয়া, হাজরে আসওয়াদ, কাবা শরিফ, মহানবী (সা.) তাঁর রওজা মোবারক এবং মহানবী (সা.)-এর ক্লেশময় জীবন উপেক্ষা করে কিভাবে ইসলামের শাশ্বত বাণী তিনি এবং তাঁর সাহাবিদের নিয়ে প্রচার করেছেন, দেড় হাজার বছর আগের সেসব কথা হজ প্রত্যাগত একজন নতুন হাজির সঙ্গে দেখা হতেই দুজনে শুরু করেন মিষ্টিমধুর আলাপন এবং স্মৃতি তর্পণ।
সেই হাজিদের নিয়ে যারা সমাবেশের আয়োজন করেন বিভিন্ন স্থানে, তার মধ্যে আয়োজকদের হিডেন এজেন্ডা বা গোপন কর্মসূচি বাস্তবায়নের একটা দুরভিসন্ধিমূলক অভীপ্সা যে কাজ করে চলেছে, জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের অংশগ্রহণ এবং সেখানে তাদের কথাবার্তায় তা প্রকাশিত হচ্ছে, যা শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সমাজের জন্য ক্ষতিকর। জামায়াতে ইসলামী নেতারা ভালোভাবেই জানেন যে আমাদের সমাজে দুই শ্রেণীর লোক আছে, যাদের রয়েছে সমাজে সুস্পষ্ট প্রভাব। এক. মসজিদের ইমাম এবং দুই. হাজি সাহেবরা। বাংলাদেশের মসজিদগুলোর ইমামদের ওপর উগ্র মৌলবাদী এ দলটির এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে রাজনৈতিক প্রভাব। তার বলয়ের মধ্যে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ইমাম ঘুরপাক খাচ্ছেন এবং স্পষ্ট করে বলতে গেলে তাদের অনেকেই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নামক দলটির হয় সদস্য নতুবা গোঁড়া সমর্থক।
তাই দেখা যায়, প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবার আগে ইমামরা যে বয়ান করেন, সেখানে তাঁরা বাংলাদেশে ইসলামী শাসনতন্ত্র কায়েমের জন্য সরাসরি বক্তব্য দেন এবং মোনাজাতের সময়ও একই কাজ করেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, ইমাম সাহেবের ওই সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্যদানের সময় উপস্থিত মুসলি্লরা কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন না বা প্রতিবাদও করেন না_যদিও অনেকেই ধর্মীয় স্থানে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া সমর্থন করেন না। এসব ইমামের অধিকাংশই স্বল্প ধর্মীয় শিক্ষার কারণে ধর্ম বিশেষত ইসলামের অপব্যাখ্যা করেন এবং আজগুবি কথাবার্তা বলে থাকেন। সচেতন মুসলি্লরা মসজিদের বাইরে এসে এসব নিয়ে হাসি-তামাশা করলেও মসজিদের মধ্যে তারা নিশ্চুপ থাকেন। তবে সাধারণ মুসলি্লদের তাঁরা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য বিশেষত জামায়াতের কর্মসূচি দ্বারা প্রভাবান্বিত করে চলেছেন।
এভাবে জামায়াত সারা বাংলাদেশের অগণিত মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে তাদের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে অপ্রতিহতভাবে। সরকার বিশেষত তার দলীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি কোনোই আমল দিচ্ছেন না। আগেও তাঁরা দেননি, এখনো দিচ্ছেন না। সরকারদলীয় উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের এদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সবাই ভুলে বসে আছেন ২০০১ থেকে ২০০৬-এর অক্টোবর পর্যন্ত চারদলীয় জোটের অত্যাচার-নিপীড়নের দুঃসহ ইতিহাস।
একটিবারও তাঁরা ভেবে দেখছেন না যে জামায়াত এবং বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন ও বক্তব্য একই। মসজিদে জামায়াত বিএনপিরই প্রতিনিধিত্ব করছে। বিএনপি এখানে দ্বিতীয় সারিতে।
জামায়াত ইমামদের পরে এখন হাজিদের ওপর দৃষ্টি ফেলেছে। তারা হাজি সমাবেশ ঘটিয়ে সেখানে প্রথমে ইসলামের কথা বলছে এবং ধীরে ধীরে তারা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করার পথ অনুসরণ করছে।
গ্রামগঞ্জের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা জীবনের একটা পর্যায়ে তীর্থগমনের জন্য মক্কা-মদিনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন; কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হজে যাচ্ছেন মৌলবাদী সংগঠনের সদস্যরাও, বিশেষত সরকার যেসব তথাকথিত ইসলামি মৌলবাদী সংগঠন এরই মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, তাদের সদস্যরা ওই হাজি সমাবেশের আড়ালে সমাজদেহে নিজেদের অবস্থান সংহত যে করছে না, তারইবা নিশ্চয়তা কী? আমরা তো তথাকথিত ইসলামি বিপ্লবের উদ্ভব হতে দেখেছি আধুনিক ইরানে। ইসলামি মৌলবাদীরা সত্তরের দশকে দেশটির কর্তৃত্ব আপন মুঠোয় নেয়ার পর আজও ইরান সেই আগের অবস্থানে প্রত্যাবর্তন করতে পারেনি। কবে ফিরবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ওই সময় ইরান থেকে হাজিদের ছদ্মাবরণে কিভাবে ইসলামি মৌলবাদীরা মক্কা নগরীর পবিত্র হেরেম শরিফে দাঙ্গা করেছিল, সে-স্মৃতি আমরা এখনো ভুলিনি। সৌদি সরকারকে উগ্রবাদীদের দমন ও তাদের সম্প্রসারণরোধে প্রচুর ঘাম ঝরাতে হয়েছিল।
হজব্রত পালনশেষে প্রত্যেক হাজিকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর আপন পরিবার এবং পরিমণ্ডলে সুফিস্নিগ্ধ অনুকরণীয় ধর্মাচরণ করতে দেখেছি এবং আমৃত্যু তাঁরা সমাজদেহে যে ধর্মীয় পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন, তা জীবিতদের মধ্যে চমৎকার স্বর্গীয় স্মৃতিচারণার বিষয় ছিল। কিন্তু বাগেরহাটের রামপাল এবং মংলায় হাজি সমাবেশের নামে জামায়াতে ইসলামী যে-কর্মকাণ্ড শুরু করেছে, তার পরিণাম নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের কোনো মাথাব্যথা আছে,_তেমন কোনো আলামত তাদের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপের সময় খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং খবর পেয়েছি একই মঞ্চে জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যান উভয়েই আওয়ামী লীগ দলীয়_তাঁরা বক্তৃতা করেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা হয়তো মনে করেছেন, একসঙ্গে এতজন হাজিকে পেয়ে তাঁরা তাদের আগামী নির্বাচনের মাটিতে চাষ করার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু তাঁরা একবারও ভেবে দেখছেন না যে তাঁদের গতানুগতিক বক্তব্য আর জামায়াতের নেতাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন বক্তব্যের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান।
কারণ জামায়াত নেতাদের বক্তব্যে অবধারিতভাবে এসে যাচ্ছে, রাসুলে করিমের জীবনাচরণ ও ইসলামি হুকুমতের কথা এবং এগুলো তারা অত্যন্ত ধীরে ধীরে হাজিদের মনোজগতে প্রবিষ্ট করার কাজটি সম্পন্ন করছে, যা হাজিদের অনেকেরই চিন্তাচেতনাকে প্রভাবিত করবে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর এজেন্টরাও এখানে কাজ করছে, তা কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের বিবেচনায় আসছে না। রামপাল ও মংলার মতো দেশের আরো না জানি কত জায়গায় এভাবে হাজি সমাবেশের আড়ালে জামায়াতি ও উগ্র জঙ্গিরা তাদের তৎপরতা শুরু করেছে, সে-খবর তো সরকারেরই রাখা প্রয়োজন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সম্প্রতি খোদ রাজধানীর একটি আবাসিক এলাকা যেখানে আমি নিজে বসবাস করি, সেখানে একটি কল্যাণ সমিতির নির্বাচনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জামায়াতে ইসলামীর প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে একত্রে প্রগতিশীল প্রার্থীদের পরাজিত করার কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের তাঁরা কাছের মানুষ।
তিনি এ খবর নিজে জানেন কি না জানি না। তবে এলাকাটি থেকে এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচন করেছেন। জামায়াত নেতাদের কোনো সমর্থনই তিনি পাননি। এই হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দু-একটি খণ্ডচিত্র। দেশব্যাপী এমন চিত্র অনেক পাওয়া যাবে।
সুতরাং সাধু সাবধান! সামনে সময় মাত্র চার বছর।
------------------------------------------------------------
দৈনিক কালের কন্ঠ / ২০ জানুয়ারি ২০১০ বুধবার
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।